দৈনন্দিন সাধারণ কাজকে ইবাদতময় করার ৭ কৌশল
· Prothom Alo

দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজই আমাদের কাছে খুব সাধারণ মনে হয়। কিন্তু একজন মুমিন যখন কোনো বৈধ কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করেন এবং সে কাজে ইসলামের বিধান ও নৈতিকতা মেনে চলেন, তখন সেই সাধারণ কাজও সওয়াবের কারণ হতে পারে।
Visit rouesnews.click for more information.
অর্থাৎ শুধু নামাজ, রোজা বা অন্যান্য নির্দিষ্ট ইবাদতই নয়; জীবনের স্বাভাবিক কাজগুলোও সঠিক নিয়ত ও পদ্ধতির মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত হতে পারে।
কীভাবে? চলুন জেনে নিই সাতটি উপায়।
১. নিয়ত শুদ্ধ করা
একটি কাজের বাহ্যিক রূপ যত ভালোই হোক, তার প্রকৃত মূল্য অনেকাংশে নির্ভর করে নিয়তের ওপর। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
তাই কোনো কাজ শুরু করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমি কেন কাজটি করছি?
’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করছি, কিন্তু উদ্দেশ্য কি হালালভাবে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করা? কারও উপকার করার চেষ্টা করছি, কিন্তু এর পেছনে কি আল্লাহর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা আছে?
নিয়ত যত সুন্দর হবে, সাধারণ কাজও তত বেশি অর্থবহ হয়ে উঠবে। একজন মুমিনের জন্য তাই কাজের পাশাপাশি নিজের অন্তরের দিকেও নজর রাখা জরুরি।
২. ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুরু করা
মুমিনের জীবনে আল্লাহর নাম স্মরণ শুধু ইবাদতের নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ নয়। খাওয়া, পান করা, ঘর থেকে বের হওয়া কিংবা কোনো বৈধ কাজ শুরু করার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করা তার জীবনের অংশ।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)
ভ্রমণ যখন ইবাদত হয়আল্লাহর নাম স্মরণ করে কাজ শুরু করলে মানুষের অন্তরে এই অনুভূতি জাগ্রত হয় যে সে একা নয়; তার আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তাঁর সাহায্যই প্রকৃত সাহায্য।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। কাজের পুরো প্রক্রিয়াতেও আল্লাহর বিধান ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।
৩. কাজটি বৈধ হওয়া
কোনো কাজ লাভজনক হলেই তা বৈধ হয়ে যায় না। একজন মুমিনের প্রথম বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত, কাজটি শরিয়তসম্মত কি না।
আয়-উপার্জন, ব্যবসা, চাকরি, লেনদেন কিংবা অন্য যেকোনো উদ্যোগে হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলা জরুরি। কারণ, হারাম পথে অর্জিত বাহ্যিক সাফল্য প্রকৃত কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয় না।
কোনো কাজ করার আগে তাই ভাবতে হবে, আমার এই কাজের কারণে কারও অধিকার নষ্ট হচ্ছে কি না, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না।
আল্লাহ–তায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)
৪. অন্যের অধিকারের কথা ভাবা
ইসলামে নিজের স্বার্থের পাশাপাশি অন্য মানুষের অধিকার ও কল্যাণের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো কাজ করার আগে তাই ভাবতে হবে, আমার এই কাজের কারণে কারও অধিকার নষ্ট হচ্ছে কি না, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবে ক্ষতি করা যাবে না।’ (সুনানে দারাকুতনি, ৩/৭৭)
ব্যবসা, চাকরি, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক জীবনে এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের লাভের জন্য অন্যায়ভাবে অন্যের ক্ষতি করা একজন মুমিনের আচরণ হতে পারে না।
একটি চিকেন রোল কেনা কীভাবে ইবাদত হতে পারে৫. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করা
গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত একা একা, বিশেষ করে আবেগের বশে নিয়ে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিষয়টি ভালোভাবে চিন্তা করার পাশাপাশি অভিজ্ঞ, বিশ্বস্ত ও কল্যাণকামী মানুষের পরামর্শ নেওয়াও ইসলামের সুন্দর শিক্ষা।
আল্লাহ–তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করে বলেন, ‘তাদের কার্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)
পরামর্শ মানুষের চিন্তার পরিধি বাড়ায়, ভুলের সম্ভাবনা কমায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য আনতে সাহায্য করে।
৬. দ্বিধার সময় ইস্তিখারা করা
কোনো বৈধ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যখন একজন মুমিন দ্বিধায় পড়েন, তখন আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা উচিত। এ ক্ষেত্রে ইস্তিখারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
ইস্তিখারার অর্থ হলো কোনো বিষয়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া এবং নিজের অজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে তাঁর ওপর ভরসা করা।
সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে পছন্দ করো অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।সাহাবি জাবের রা. বলেন, ‘নবীজি (সা.) আমাদের ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন, যেমন তিনি আমাদের কোরআনের সুরা শেখাতেন...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২)
তাই গুরুত্বপূর্ণ ও বৈধ কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যথাসাধ্য চিন্তাভাবনা ও পরামর্শের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করাও একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৭. ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া
সব প্রস্তুতি ও চেষ্টা করার পরও প্রত্যাশিত ফল না–ও আসতে পারে। তখন একজন মুমিন হতাশ হয়ে পড়েন না। তিনি বিশ্বাস করেন, আল্লাহ–তাআলা সবকিছু জানেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের মধ্যে হিকমত রয়েছে।
কোরআনে এসেছে, ‘হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে পছন্দ করো অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
তাই কাজ শুরু করার আগে যেমন আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে, তেমনি কাজের ফলাফল নিয়েও তাঁর ওপর ভরসা রাখতে হবে। নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর হাতে।
রায়হান আল ইমরান : আলেম, লেখক ও গবেষক