কে পাবেন ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল
· Prothom Alo

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহজুড়ে ঘোষণা করা হবে পাঁচটি বিষয়ে এ বছরের নোবেল বিজয়ীদের নাম। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সম্মানিত এই পুরস্কার কাদের হাতে যাবে, তা নিয়ে সব মানুষের মধ্যেই কমবেশি কৌতূহল থাকে। নোবেল পুরস্কারের পুরো প্রক্রিয়াটিই সর্বোচ্চ গোপনীয়তায় ঢাকা। কোন কোন বিজ্ঞানী মনোনীত হয়েছেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হয় বহু বছর। তবুও আমাদের কৌতূহল তো থেমে থাকে না। এই লেখায় অনুমান করার চেষ্টা করব, সম্ভাব্য কাদের হাতে যেতে পারে এবারের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল।
Visit palladian.co.za for more information.
পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ যে কাজগুলো এখনো নোবেল জেতেনি, সেগুলো মোটামুটি প্রতিবারই সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই গত বছরের তালিকার প্রায় সবাই এবারও থাকবেন। পদার্থবিজ্ঞানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার যেমন—উলফ প্রাইজ, ব্রেকথ্রু প্রাইজ, ডিরাক মেডেল, নিউটন মেডেল ইত্যাদি পুরস্কারও ভবিষ্যৎ নোবেল বিজয়ী হওয়ার ভালো পূর্বাভাস দেয়। যেমন, ১৯৭৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেওয়া পদার্থবিজ্ঞানে উলফ প্রাইজ বিজয়ীদের ১৯ জনই পরে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। আবার গবেষণাপত্রের সাইটেশন, এইচ-ইনডেক্স ইত্যাদিও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বোঝার একটি ভালো উপায়।
৫ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে নোবেল পুরস্কার ঘোষণাপদার্থবিজ্ঞানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার যেমন—উল্ফ প্রাইজ, ব্রেকথ্রু প্রাইজ, ডিরাক মেডেল, নিউটন মেডেল ইত্যাদি পুরস্কারও ভবিষ্যৎ নোবেল বিজয়ী হওয়ার ভালো পূর্বাভাস দেয়।
তবে অনেক বছরেই দেখা যায়, আলোচনার বাইরে থাকা কোনো একটি পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়েছে। আরেকটি মজার ট্রেন্ড গত দুই দশক ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, দু-এক বছর বাদে একবার মহাবিশ্ব (জ্যোতির্বিজ্ঞান বা পার্টিকেল ফিজিকস), অন্যবার আলো ও পদার্থ—এভাবে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তবে সব আলোচনা ও সম্ভাব্য হিসাবের বাইরে গিয়ে ২০২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল দেওয়া হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কম্পিউটিং সিস্টেমের ওপর। এই সিদ্ধান্ত পদার্থবিজ্ঞান কমিউনিটিতে যথেষ্ট বিস্ময় ও বিতর্কের জন্ম দেয়। এরপর ২০২৫ সালে আবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সে নোবেল দেওয়া হয়। আমার ধারণা, এবার আবারও পদার্থবিজ্ঞানের অধিকতর প্রতিষ্ঠিত শাখাগুলোর মধ্য থেকেই নোবেল বিজয়ীদের নির্বাচন করা হবে।
দেহের রোগ প্রতিরোধতন্ত্র নিয়ন্ত্রণের রহস্য আবিষ্কার করে তিন বিজ্ঞানীর নোবেল জয়সব আলোচনা ও সম্ভাব্য হিসাবের বাইরে গিয়ে ২০২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল দেওয়া হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কম্পিউটিং সিস্টেমের ওপর।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স: ইয়াকির আহারোনভ ও মাইকেল বেরি
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বেশ মৌলিক দুটি বিষয় হলো আহারোনভ-বোহম ইফেক্ট এবং বেরি ফেজ। তড়িৎ ও চুম্বক দুটি ক্ষেত্রই যদি শূন্য হয়, তবে ক্ল্যাসিক্যাল ফিজিকস বলে, আধানযুক্ত কণার ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে, যদি বিদ্যুৎচুম্বকীয় বিভব শূন্য না হয়, তবে ওই বিভবের সঙ্গে আধানযুক্ত কণার কোয়ান্টাম ওয়েভ ফাংশন কাপলিংয়ের মাধ্যমে কণার ওপর প্রভাব দেখা যাবে এবং পরীক্ষায় তা-ই প্রমাণ হয়।
এই এক্সপেরিমেন্টের সঙ্গেই যুক্ত আরও মৌলিক একটি বিষয় হলো জিওমেট্রিক ফেজ। পঞ্চাশের দশকেই এ বিষয়ে গবেষণাপত্র থাকলেও মাইকেল বেরি ১৯৮৪ সালে এই ধারণাকে সাধারণ গাণিতিক রূপ দেন এবং বেরি ফেজ হিসেবেই বিষয়টি পরিচিতি পায়। এই দুই আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত বাকিরা মারা গেছেন।
ইয়াকির আহারোনভমাইকেল বেরিআহারোনভ ও বেরি ১৯৯৮ সালে একসঙ্গে উলফ প্রাইজ পেয়েছিলেন এবং অনেক বছর ধরেই তাঁরা নোবেল প্রাইজের ফেভারিটের তালিকায় রয়েছেন।
বেল ইনেকুয়ালিটির প্রমাণ অনেক বছর ধরে নোবেল না পেলেও শেষমেশ ২০২২ সালে এসে তা স্বীকৃতি পায়। তাই এ বছর আহারোনভ ও বেরিকে নিয়েও আশাবাদী হওয়া যায়। আহারোনভের বয়স বর্তমানে ৯৪ বছর ও বেরির ৮৫ বছর। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই খুশি হব, যদি এই দুই কিংবদন্তিতুল্য পদার্থবিজ্ঞানী তাঁদের কাজের স্বীকৃতি পান। যদিও মাত্র গত বছরেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তবু আমি এঁদেরই এগিয়ে রাখব।
বিজ্ঞানীর নোবেল পাওয়াআহারোনভ ও বেরি ১৯৯৮ সালে একসঙ্গে উল্ফ প্রাইজ পেয়েছিলেন এবং অনেক বছর ধরেই তাঁরা নোবেল প্রাইজের ফেভারিটের তালিকায় রয়েছেন।
ফাস্ট রেডিও বার্স্ট: ম্যাথিউ বেইলস, ডানকান লরিমার ও মউরা ম্যাকলাফলিন
ফাস্ট রেডিও বার্স্ট বা এফআরবি মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও রহস্যময় ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই ঘটনায় সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ে হুট করে কয়েকটি সূর্যের সমান বিপুল পরিমাণ শক্তি রেডিও ওয়েভ হিসেবে বিকিরিত হয়ে যায়। ২০০৭ সালের এক যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে বেইলস, লরিমার, ম্যাকলাফলিন, নারকেভিচ ও ক্রফোর্ড প্রথম ফাস্ট রেডিও বার্স্ট আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করেন।
এরপর এমন আরও হাজারো এফআরবি ধরা পড়েছে। এর সঠিক উৎস এখনো অজানা, তবে এগুলো সম্ভবত পালসার।
ম্যাথিউ বেইলসচার্লস লরিমারমরা ম্যাকলাফলিনঅতি উচ্চশক্তির হওয়ায় এফআরবি মহাবিশ্বের অতি দূরের গ্যালাক্সি থেকে আমাদের কাছে এসে ধরা পড়তে পারে। ফলে এফআরবি ব্যবহার করে উৎস থেকে আসার পথের প্লাজমা আকারে থাকা গ্যাসের পরিমাণ মাপা সম্ভব। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের তথাকথিত মিসিং ব্যারিওন প্রবলেম সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।
এ ছাড়া এফআরবিকে প্রোব হিসেবে ব্যবহার করে ফান্ডামেন্টাল ফিজিকস ও কসমোলজির আরও বিভিন্ন পরীক্ষা করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই আবিষ্কারের কারণে এই তিনজন একসঙ্গে ২০২৩ সালের শ প্রাইজ পান। এই আবিষ্কারটি নোবেল পেলে পিয়ের ও মেরি কুরির পর একসঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া দ্বিতীয় দম্পতি হবেন লরিমার ও ম্যাকলাফলিন।
হাবল কেন নোবেল বঞ্চিত ছিলেনএফআরবি ব্যবহার করে উৎস থেকে আসার পথের প্লাজমা আকারে থাকা গ্যাসের পরিমাণ মাপা সম্ভব। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের তথাকথিত মিসিং ব্যারিওন প্রবলেম সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং (থিওরি): চার্লস এইচ বেনেট, জিলে ব্রাসাঁ, পিটার শর, ডেভিড ডয়েচ ও অ্যালেক্সেই কিতায়েভ
গত দশক ও সামনের কয়েক দশকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত আবিষ্কার হতে যাচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। চার্লস বেনেট ও জিলে ব্রাসাঁ মিলে আবিষ্কার করেন কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির BB84 প্রোটোকল। দুজন মিলে ২০১৮ সালে পেয়েছেন উলফ প্রাইজ। ২০১৭ সালে বেনেট পান ডিরাক মেডেল, যেখানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন পিটার শর ও ডেভিড ডয়েচ। পিটার শর তাঁর শর অ্যালগরিদমের জন্য বিখ্যাত, যা ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার সাধারণ কম্পিউটারের চেয়ে অনেক অনেক গুণ দ্রুত ক্রিপ্টোগ্রাফি ভাঙতে পারে।
চার্লস এইচ বেনেটজিলে ব্রাসাপিটার শরডেভিড ডয়েচঅ্যালেক্সেই কিতায়েভডেভিড ডয়েচ কোয়ান্টাম টিউরিং মেশিন ও বেল ইনেকুয়ালিটি নিয়ে কাজ করেছেন। এই চারজন একসঙ্গে পেয়েছেন ২০২৩ সালের ফান্ডামেন্টাল ফিজিকস ব্রেকথ্রু প্রাইজ।
এই চারজনের মধ্যে দুই বা তিনজনকে (সর্বোচ্চ তিনজনকে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে দেওয়া হয়) একসঙ্গে নোবেল পুরস্কার পেতে দেখা যেতে পারে। আবার এদের মধ্যে কোনো এক যুগলের সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম ও কোয়ান্টাম কম্পিউটেশনে মৌলিক কাজ করা অ্যালেক্সেই কিতায়েভকে। কিতায়েভ এর আগে ২০১২ সালে ব্রেকথ্রু প্রাইজ ও ২০১৫ সালে ডিরাক মেডেল পেয়েছিলেন।
নোবেল বঞ্চিত বাঙালির কথাপিটার শর তাঁর শর অ্যালগরিদমের জন্য বিখ্যাত, যা ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার সাধারণ কম্পিউটারের চেয়ে অনেক অনেক গুণ দ্রুত ক্রিপ্টোগ্রাফি ভাঙতে পারে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং (এক্সপেরিমেন্ট) / আলট্রাকোল্ড অ্যাটমিক সিস্টেম: ইগনাসিও সিরাক, পিটার জোলার, ইমানুয়েল ব্লখ, জুন ইয়ে ও হিদেতোশি কাতোরি
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের প্রায়োগিক দিক চিন্তা করলে ইগনাসিও সিরাক ও পিটার জোলারকে যুগ্মভাবে বিবেচনা করা হতে পারে। তাঁরা যৌথভাবে আয়ন ও কোল্ড অ্যাটম সিস্টেম ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও সিমুলেটর তৈরির থিওরি ও এক্সপেরিমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা দুজন যৌথভাবে পেয়েছিলেন ২০১৩ সালের উলফ প্রাইজ।
ইগ্নাসিও সিরাকপিটার জোলারইমানুয়েল ব্লখজুন ইয়েহিদেতোশি কাতোরিজোলার পেয়েছেন ডিরাক মেডেলও। একই ফিল্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকায় যুক্ত হতে পারেন ইমানুয়েল ব্লখ, জুন ইয়ে বা হিদেতোশি কাতোরি। ইয়ে ও কাতোরি ২০২২ সালে ব্রেকথ্রু প্রাইজ এবং ব্লখ ও ইয়ে ২০২৬ সালে উলফ প্রাইজ পেয়েছেন।
লেখক: ডক্টরাল রিসার্চার, প্যারিস অবজারভেটরিনোবেল জেতার সহজ উপায়