নভেম্বরে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে নাসার সুইফট টেলিস্কোপ
· Prothom Alo

দুই দশক ধরে ব্ল্যাকহোলের ভয়ংকর সব রহস্য ফাঁস করা নাসার কিংবদন্তি টেলিস্কোপটি শিগগিরিই আছড়ে পড়বে পৃথিবীতে। কিন্তু কেন?
Visit sportbet.rodeo for more information.
মহাকাশের সবচেয়ে ভয়ংকর বিস্ফোরণগুলোর খবর পৃথিবীতে বসে পাওয়াটা একসময় অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা যখন ‘নীল গেহরেলস সুইফট অবজারভেটরি’ মহাকাশে পাঠায়, তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসটাই যেন বদলে যায়।
অবাক করা ব্যাপার হলো, এই মহাকাশযানের মূল মিশন ছিল মাত্র দুই বছরের! অথচ সেটি টানা দুই দশক ধরে মহাকাশের বুকে এক নাগাড়ে কাজ করে গেছে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা গামা-রশ্মির বিস্ফোরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করাই ছিল এর প্রধান কাজ। দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে সুইফট দুই হাজারেরও বেশি গামা-রশ্মি বিস্ফোরণ, ১৪০০-এর বেশি সুপারনোভা এবং এমনকি রাক্ষুসে ব্ল্যাকহোল কীভাবে আস্ত একটি নক্ষত্রকে গিলে খায়, তার চাক্ষুষ প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দিয়েছে।
শুধু দূরের গ্যালাক্সিই নয়, আমাদের সৌরজগতের কাছের গ্রহাণু এবং 3I/ATLAS-এর মতো আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতুর দিকেও কড়া নজর রেখেছিল এটি। এ পর্যন্ত সুইফটের পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৭ হাজার বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। হিসেব করলে দেখা যায়, মহাকাশে কাটানো প্রতি সপ্তাহে এটি গড়ে ছয়টি করে গবেষণাপত্রের রসদ জুগিয়েছে!
আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু 3I/ATLASনাসার অ্যাস্ট্রোফিজিকস ডিভিশনের পরিচালক শন ডোমগাল-গোল্ডম্যানের মতে, সুইফট বিজ্ঞানীদের এমন এক অমূল্য তথ্যের ভাণ্ডার দিয়ে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক দশক ধরে নতুন নতুন আবিষ্কারের জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এই টেলিস্কোপের ২২তম জন্মদিন আর মহাকাশে উদ্যাপন করা হচ্ছে না। কারণ, নভেম্বরের শুরুতেই এটি পৃথিবীর বুকে এক ভয়ংকর অগ্নিপিণ্ড হয়ে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে!
বিশ্বের প্রথম প্রাইভেট স্পেস টেলিস্কোপ খুঁজবে ২৭টি রহস্যময় গ্রহঅবাক করা ব্যাপার হলো, এই নীল গেহরেলস সুইফট অবজারভেটরি মহাকাশযানের মূল মিশন ছিল মাত্র দুই বছরের! অথচ সেটি টানা দুই দশক ধরে মহাকাশের বুকে এক নাগাড়ে কাজ করে গেছে।
কেন মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ল সুইফট
সুইফট যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন এর কক্ষপথ ছিল পৃথিবী থেকে ৫৮৫ থেকে ৬০৪ কিলোমিটার উঁচুতে। সেখানে বাতাস নেই বললেই চলে, কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের একদম ওপরের স্তরের অতি সামান্য ঘর্ষণ ঠিকই কাজ করে। মানুষের শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস সেখানে না থাকলেও, একটি মহাকাশযানের গতি ধীর করে দেওয়ার জন্য ওই সামান্য ঘর্ষণই যথেষ্ট। বছরের পর বছর ধরে বায়ুমণ্ডলের এই বাধায় সুইফটের গতি কমতে থাকে এবং এটি ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে নেমে আসতে শুরু করে।
সুইফট যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন এর কক্ষপথ ছিল পৃথিবী থেকে ৫৮৫ থেকে ৬০৪ কিলোমিটার উঁচুতেনাসা যখন বুঝতে পারল যে সুইফট ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন গত বছর এক দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ক্যাটালিস্ট নামের একটি বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের রোবোটিক যান ‘লিংক’ পাঠিয়ে সুইফটকে ধাক্কা দিয়ে আবারও ওপরের দিকের নিরাপদ কক্ষপথে তুলে দিতে। সুইফটকে যেহেতু এ ধরনের উদ্ধার অভিযানের জন্য তৈরি করা হয়নি, তাই পুরো বিষয়টিই ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। গত ৩ জুলাই মহাকাশে পাড়ি জমায় লিংক। শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারী যানটি নিজেই বিকল হয়ে যায়! ফলে সুইফটকে বাঁচানোর আর কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। সুইফটের মিশন টিম একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এর থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে গেছে।
রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বের মানচিত্রক্যাটালিস্ট নামের একটি বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের রোবোটিক যান লিংক পাঠিয়ে সুইফটকে ধাক্কা দিয়ে আবারও ওপরের দিকের নিরাপদ কক্ষপথে তুলে দিতে।
ধেয়ে আসা এই ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর ঠিক কোথায় আঘাত হানবে
যেহেতু সুইফটের নিজস্ব কোনো রকেট ইঞ্জিন নেই, তাই পৃথিবীতে এর পতন হবে সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। পৃথিবীর দিকে যতই এটি ধেয়ে আসছে, এর পতনের বেগ ততই বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের মহাকাশ প্রকৌশলী ডিন স্লাডেনের মতে, সুইফট যখন ভূপৃষ্ঠ থেকে ১২০ কিলোমিটার উচ্চতায় নেমে আসবে, তখন এর ধ্বংসলীলা শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগবে। বায়ুমণ্ডলের প্রচণ্ড ঘর্ষণে এর সামনের অংশের বাতাস এতই গরম হয়ে উঠবে যে, পুরো স্যাটেলাইটটি একটি জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডের মতো জ্বলতে শুরু করবে। এরপর প্রায় ৭৮ কিলোমিটার উচ্চতায় (যেখান দিয়ে সাধারণ যাত্রীবাহী বিমান ওড়ে, তার চেয়ে আট গুণ ওপরে) প্রচণ্ড চাপে মূল কাঠামোটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
প্রায় সাড়ে ৪ কোটি গ্যালাক্সির বিশাল মানচিত্র বানিয়েছে গায়া টেলিস্কোপযুক্তরাজ্যের মহাকাশ প্রকৌশলী ডিন স্লাডেনের মতে, সুইফট যখন ভূপৃষ্ঠ থেকে ১২০ কিলোমিটার উচ্চতায় নেমে আসবে, তখন এর ধ্বংসলীলা শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগবে।
মহাকাশযানটির সোলার প্যানেল এবং অ্যান্টেনাগুলো সবার আগে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। সুইফটের গায়ে ৫২ হাজার সিসার ছোট ছোট টাইলস দিয়ে তৈরি যে বিশেষ আবরণ রয়েছে, তা চোখের পলকে গলে বাষ্প হয়ে যাবে। নভেম্বরের ৪ তারিখের দিকে এই পতন ঘটার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। পুরো মহাকাশযানটির বেশিরভাগ অংশই বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও, এর কিছু মজবুত অংশ, যেমন ছয়টি ভারী রিঅ্যাকশন হুইল, লেন্স এবং আয়নার কিছু অংশ টিকে যেতে পারে।
এই অবশিষ্ট জ্বলন্ত টুকরোগুলো বিষুব রেখার ২১ ডিগ্রি উত্তর থেকে দক্ষিণের মধ্যে যেকোনো জায়গায় আছড়ে পড়তে পারে। এই বিশাল এলাকার বেশিরভাগ অংশ জুড়েই সমুদ্র থাকলেও, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, উত্তর অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু জনবহুল অঞ্চলও এর আওতায় রয়েছে। তবে টিকে যাওয়া টুকরোগুলো এতই পুড়ে যাবে যে, তা দেখে বোঝার উপায় থাকবে না এটি একসময় একটি আস্ত টেলিস্কোপ ছিল।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্সসবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের কতদূর দেখা যায়