একটি সম্পর্কের গল্প, ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন
· Prothom Alo

আমার কাছে আসা একজন ক্লায়েন্টের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে তাঁর নাম-পরিচয় উল্লেখ করছি না।
Visit extonnews.click for more information.
পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক। এই দীর্ঘ সময়ে দুজনের মধ্যে ছিল আবেগ, ভালোবাসার প্রত্যাশা, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন। ছেলেটি তাঁর সঙ্গিনীর দৈনন্দিন খরচ, পোশাক, খাওয়াদাওয়া, ঘোরাঘুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আর্থিক চাহিদা পূরণ করতেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি সম্পর্কটিকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই সম্পর্কের মধ্যে দুজনের গভীর আবেগের বন্ধন রয়েছে।
কিন্তু একসময় ছেলেটি জানতে পারেন, তাঁর সঙ্গিনী আড়ালে আরও দুই-তিনজনের সঙ্গে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথোপকথন ও অনলাইন যৌন ঘনিষ্ঠতায় যুক্ত ছিলেন। এসবের মধ্যেও সঙ্গিনী তাঁকে ভালোবাসার কথা বলতেন। ছেলেটি বিষয়গুলো জানার পরও সম্পর্কটি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। হয়তো সম্পর্ক হারানোর ভয়, হয়তো একদিন সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা, কিংবা হয়তো এই সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ তাঁকে বারবার ফিরে যেতে বাধ্য করেছে।
ঘটনার সবচেয়ে জটিল দিকটি সামনে আসে সঙ্গিনীর বিয়ের দিন। আমার ক্লায়েন্টের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিনও তাঁদের মধ্যে অন্তরঙ্গ কথোপকথন ও ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান হয়েছিল। একাধিকবার জানতে চাওয়া সত্ত্বেও সঙ্গিনী তাঁকে জানাননি যে সেদিনই তাঁর বিয়ে হচ্ছে।
বিয়ের পরও যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। স্বামী কর্মস্থলে চলে গেলে আবারও তাঁদের মধ্যে আগের মতো কথাবার্তা চলতে থাকে। সঙ্গিনী আমার ক্লায়েন্টকে বলতেন, তিনি স্বামীকে ছেড়ে তাঁর কাছে চলে আসবেন এবং তাঁকেই বিয়ে করবেন।
এই অভিজ্ঞতা শোনার পর মনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। একজন মানুষ কেন এমন একটি সম্পর্ক ধরে রাখেন, যেখানে তাঁর বিশ্বাস বারবার ভেঙে যায়? কেন তিনি কষ্ট পাওয়ার পরও সম্পর্কটি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না? ভালোবাসা, নির্ভরতা, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা কীভাবে একজন মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে?
অন্যদিকে একটি সম্পর্কের মধ্যে সততা, পারস্পরিক সম্মান, প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
একজন পেশাদার সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে মনে করি, এসব প্রশ্নের উত্তর একটি বাক্যে দেওয়া সম্ভব নয়। মানুষের সম্পর্ককে শুধু বাইরে থেকে দেখা কিছু ঘটনা দিয়ে বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত ইতিহাস, আবেগ, প্রত্যাশা, বিশ্বাস এবং কখনো কখনো নিজের অজান্তে তৈরি হয়ে যাওয়া মানসিক অভ্যাস।
যখন কোনো ক্লায়েন্টের অভিজ্ঞতা শুনি, তখন আমার কাছে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁর অভিজ্ঞতাকে শুধু কে ঠিক আর কে ভুল, সেই বিচারে সীমাবদ্ধ না রাখা; বরং এই অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক সুস্থতা, আত্মসম্মান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা বোঝার চেষ্টা করা।
একই সঙ্গে এটাও মনে করি, একজন মানুষের বর্ণনা শোনার অর্থ অন্য ব্যক্তির উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া নয়। আমরা যা শুনছি, তা একজন মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু সম্পর্কের সব দিক বোঝার জন্য প্রয়োজন সতর্ক ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান।
মানুষের গল্প শোনা মানে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়; বরং তাঁর অভিজ্ঞতাকে বোঝার চেষ্টা করা, যাতে তিনি নিজের জীবনের জন্য আরও সচেতন ও সুস্থ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
আমরা মানুষের আচরণ দেখি, অভিজ্ঞতার গল্প শুনি কতটা?
চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনের গল্প জানি না। আমরা তাঁদের আচরণ দেখি, কিন্তু সেই আচরণের পেছনে থাকা অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাগুলো বোঝার চেষ্টা করি না।
কেউ বারবার এমন সম্পর্কে ফিরে যান, যেখানে তিনি কষ্ট পান। কেউ অন্যের প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন ভুলে যান। কেউ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন না। কেউ আবার বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও ভেতরে–ভেতরে নিজের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন।
আমরা অনেক সময় তাঁদের দুর্বল, আবেগপ্রবণ, বোকা কিংবা সিদ্ধান্তহীন বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু এসব পরিচয় কি সত্যিই তাঁদের অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করে?
কোনো মানুষ কেন একটি সম্পর্ক ছেড়ে আসতে পারছেন না, তা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, সেই সম্পর্ক তাঁর কাছে কী অর্থ বহন করে। তিনি সেখানে কী খুঁজছেন, কী হারানোর ভয় পাচ্ছেন এবং সম্পর্কটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মনে কী প্রত্যাশা কাজ করছে।
কেউ হয়তো ভালোবাসা হারানোর ভয় পান। কেউ মনে করেন, আরেকটু চেষ্টা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কেউ নিজের দেওয়া সময়, শ্রম ও আবেগের কারণে সম্পর্কটি ছেড়ে আসতে দ্বিধা করেন। আবার কারও ক্ষেত্রে একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হওয়া নির্ভরতা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
তবে আমরা যেন ভুলে না যাই, এগুলো সম্ভাব্য ব্যাখ্যামাত্র। প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা। তাই অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে ব্যাখ্যা না করে তাঁর নিজের মুখে তাঁর গল্প শোনা জরুরি।
একজন মানুষ কেন কষ্টের মধ্যেও একটি সম্পর্ক ধরে রাখেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁকে বিচার করার মধ্যে নয়; তাঁর অভিজ্ঞতা বোঝার মধ্যে লুকিয়ে থাকে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস: মানুষের কথা শোনার আহ্বান
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘লাইভড এক্সপেরিয়েন্স হেয়ার্ড: রিয়েল ভয়েস, রিয়েল চেঞ্জ’ আমাকে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষের নিজের অভিজ্ঞতাকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি?
এই প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো, যাঁরা মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা, সংকট, চিকিৎসা কিংবা পুনরুদ্ধারের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহায়তার ব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা প্রায়ই বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, গবেষণার ফলাফল কিংবা বিভিন্ন সমস্যার লক্ষণ নিয়ে আলোচনা করি। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যিনি নিজে মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা না শুনলে সেই সংকটের পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন।
আমার কাছে একজন ক্লায়েন্টের অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনা নয়; সেই অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর অনুভূতি, চাহিদা, প্রত্যাশা এবং সহায়তার প্রয়োজন সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়।
একজন মানুষ কী অনুভব করছেন, কোন পরিস্থিতিতে তাঁর কষ্ট বাড়ছে, কোন ধরনের সহায়তা তাঁর জন্য কার্যকর হচ্ছে এবং কোন অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও অসহায় করে তুলছে এসব জানা মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও মানবিক ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
আমরা যদি সত্যিই মানুষের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে শুধু তাঁদের সম্পর্কে কথা বললেই হবে না; তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাঁদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এই শোনার প্রক্রিয়া শুধু মনোচিকিৎসকের কক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও আমাদের মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে।
শোনা মানে বিচার না করে বোঝার চেষ্টা
কেউ যখন নিজের কষ্টের কথা বলেন, তখন আমাদের মধ্যে দ্রুত পরামর্শ দেওয়ার প্রবণতা কাজ করতে পারে। আমরা বলি, ‘এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দরকার কী?’ কিংবা ‘এত কিছু জানার পরও তুমি কেন সম্পর্কটা ছাড়ছ না?’
আমাদের প্রশ্নগুলো বাস্তব উদ্বেগ থেকে আসতে পারে। কিন্তু যে মানুষটি এরই মধ্যে আবেগে বিপর্যস্ত, তাঁর কাছে এমন প্রশ্ন কখনো কখনো নিজের অসহায়ত্বের জন্য আরও লজ্জা কিংবা অপরাধ বোধ তৈরি করতে পারে।
আমি যখন কোনো মানুষের অভিজ্ঞতা শুনি, তখন তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে কী অনুভূতি ও প্রত্যাশা কাজ করছে, তা বোঝার চেষ্টা করি। আমি জানতে চাইতে পারি, ‘এই সম্পর্কের কোন বিষয়টি তোমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে?’ ‘তুমি এই সম্পর্ক থেকে কী আশা করছ?’ ‘কোন বিষয়গুলো তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়?’ কিংবা ‘নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য এখন তোমার কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন?’
এ ধরনের প্রশ্ন মানুষকে নিজের অনুভূতি ও প্রত্যাশা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে নিজের প্রয়োজন, অধিকার এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সহমর্মিতা মানে ক্ষতিকর আচরণকে মেনে নেওয়া নয়। আমরা অন্যের অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করেও নিজের নিরাপত্তা, আত্মসম্মান এবং সীমারেখা রক্ষা করতে পারি।
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের কষ্টকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁকে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা—দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।
সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে আত্মবোঝাপড়ার পথে
ওপরের ঘটনাটির মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন মানুষের জন্য প্রথম কাজ হতে পারে নিজের অনুভূতিগুলো শনাক্ত করা। তিনি কি প্রতারিত বোধ করছেন? রাগ, দুঃখ, অপমান, শূন্যতা কিংবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় অনুভব করছেন? তাঁর আত্মবিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনে এই সম্পর্কের কী প্রভাব পড়ছে?
নিজের অনুভূতিকে চিহ্নিত করা আত্মবোঝাপড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ, আমরা যখন বুঝতে পারি যে আমাদের ভেতরে কী ঘটছে, তখন নিজের প্রয়োজন ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সচেতনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।
এরপর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সম্পর্কটির বাস্তবতা ও নিজের প্রত্যাশার মধ্যে পার্থক্য বোঝা।
কেউ ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হবেন এমন আশার ওপর সম্পর্ক ধরে রাখা আর বর্তমানে সেই ব্যক্তি কী আচরণ করছেন, তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে আচরণের সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে, একটি সম্পর্কের জন্য অর্থ, সময় কিংবা আবেগ বিনিয়োগ করেছেন বলে সেটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য পারস্পরিক সম্মান, সততা, সম্মতি, দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর অভাব থাকলে একজন মানুষের নিজের চাহিদা ও নিরাপত্তাকে নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
এখানে আমার উদ্দেশ্য কাউকে সম্পর্ক ছেড়ে আসার নির্দেশ দেওয়া নয়; বরং আমি চাই, মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা বুঝতে শিখুক, বিকল্পগুলো বিবেচনা করুক এবং নিজের কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করুক।
মনোচিকিৎসার ক্ষেত্রে আমি ব্যক্তির অভিজ্ঞতা শোনা, তাঁর অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে সম্মান করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সামাজিক পরিবর্তন
একজন মানুষের সম্পর্কের গল্প ব্যক্তিগত হলেও সেই অভিজ্ঞতা আমাদের বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে ভাবতে সাহায্য করতে পারে।
আমরা কি ছোটবেলা থেকে শিশুদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখাই? আমরা কি তরুণদের সুস্থ সম্পর্ক, পারস্পরিক সম্মতি ও ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা দিই? পরিবারে কি নিজের কষ্টের কথা বলার নিরাপদ পরিবেশ আছে? সম্পর্কের সংকটে থাকা মানুষ কি সহজে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন?
আমি মনে করি, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্পর্ক ও আবেগ নিয়ে বয়সোপযোগী আলোচনা, পরিবারে বিচারহীন সংলাপ, কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব এবং সহজলভ্য পেশাগত সহায়তা এসব উদ্যোগ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গল্প প্রকাশের ক্ষেত্রেও আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, যৌনজীবন, ছবি কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। অভিজ্ঞতা থেকে সামাজিক শিক্ষা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যদি মানুষের অভিজ্ঞতাকে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চাই, তাহলে সেই পরিবর্তন হতে হবে মানুষের কল্যাণে, তার অধিকারকে সম্মান করে এবং ভবিষ্যতে আরও নিরাপদ পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে।
কেউ যখন বলে ‘আমি ভালো নেই’, আমরা কি সত্যিই শুনিনিজের গল্প শোনার অধিকারও আমাদের আছে
অন্যের অভিজ্ঞতা শোনার পাশাপাশি নিজের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আমরা অনেক সময় অন্যকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজের কষ্টকে অস্বীকার করি। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের প্রয়োজন, মতামত ও সীমারেখা বিসর্জন দিই। মনে করি, আরও বেশি চেষ্টা করলে হয়তো অন্য মানুষটি আমাদের মূল্য বুঝবে।
কিন্তু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজের মর্যাদা হারাতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। অন্যের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি নিজের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন: আমি আসলে কেমন আছি? এই সম্পর্কে আমি কেমন অনুভব করি? আমার প্রয়োজন ও সীমারেখাগুলো কি সম্মানিত হচ্ছে? আমি কি ভয় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছি? আমার মানসিক সুস্থতার জন্য এখন কী প্রয়োজন? প্রয়োজনে আমি কার সহায়তা নিতে পারি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সময় লাগতে পারে। কখনো বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কখনো নিজের অনুভূতি লিখে রাখা, আবার কখনো প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করা মানে অতীতের সব সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে দোষী করা নয়; বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে নিজের জন্য আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
আসুন, মানুষের গল্প শুনি এবং পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাই
প্রত্যেক মানুষের জীবনের গল্প আলাদা। কারও গল্পে আছে সম্পর্কের ভাঙন, কারও গল্পে দীর্ঘদিনের নীরব কষ্ট, কারও গল্পে হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা। কেউ হয়তো নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে প্রস্তুত, আবার কেউ এখনো নিরাপদে কথা বলার মতো একজন শ্রোতার অপেক্ষায়।
আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পাবেন, তাঁর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হবে এবং প্রয়োজনে যথাযথ সহায়তা পাওয়ার পথ তৈরি হবে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের শুধু শোনার আহ্বান জানায় না; শোনা অভিজ্ঞতা থেকে শেখার এবং সেই শিক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করার দায়িত্বও মনে করিয়ে দেয়।
পরিবারে, সম্পর্কে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের প্রতি ক্ষেত্রে মানুষের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও সেবার পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
মানুষকে বোঝার প্রথম ধাপ হলো তাঁর কথা শোনা। আর সেই কথা শোনার মধ্য দিয়ে অর্জিত বোঝাপড়াকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়াই পরিবর্তনের সূচনা।
আসুন, আমরা বিচার করার আগে শুনি। পরামর্শ দেওয়ার আগে বুঝতে চেষ্টা করি। মানুষের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করি, তাঁর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করি। আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি সমাজ গড়ি, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা নিরাপদ এবং সহায়তা পাওয়া সহজ।
আমার বিশ্বাস, মানুষের গল্প শুধু শোনার জন্য নয়; সেই গল্প থেকে শেখার, দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর এবং বাস্তব পরিবর্তন আনার জন্যও।
আসুন জীবনের গল্প শুনি, অভিজ্ঞতাকে সম্মান করি, বাস্তব পরিবর্তন আনি। একটি সম্পর্কের গল্প, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন...
সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ