দারিদ্র্যের ফিরে আসা: উন্নয়নের গল্পে ফাঁক কোথায়

· Prothom Alo

বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য একসময় উন্নয়ন আলোচনার সবচেয়ে জোরালো উদাহরণগুলোর একটি ছিল। বহু বছর ধরে প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং সামাজিক সূচকের উন্নতির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের একটি ইতিবাচক সম্পর্ক দেখা গেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক চিত্র সেই ধারাবাহিকতায় স্পষ্ট ভাঙন দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, টানা চার বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এই সময়ে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে প্রায় সোয়া ছয় কোটি মানুষ এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

Visit rouesnews.click for more information.

অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সুফল কতটা বিস্তৃত মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তায় পৌঁছেছে, সেটি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার মতো প্রশ্ন নয়। গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি হেনেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দরিদ্র পরিবারের প্রকৃত আয় দ্রুত ক্ষয় করেছে।

দুর্নীতি দূর না করতে পারলে দারিদ্র্য হটবে না

উচ্চ আয়ের পরিবার কিছু সঞ্চয় কমিয়ে বা খরচের ধরন বদলে মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে পারে। দরিদ্র পরিবার পারে না। তাদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ার অর্থ হচ্ছে কম খাবার, কম পুষ্টি, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমানো, অথবা ঋণের ওপর নির্ভর করা। তাই মূল্যস্ফীতি শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা নয়, এটি সরাসরি দারিদ্র্য ও বৈষম্যের সমস্যাও।

শ্রমবাজারের দুর্বলতা এই চাপকে আরও গভীর করেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে। সেখানে চাকরির নিশ্চয়তা কম, মজুরি কম, সামাজিক বিমা নেই বললেই চলে। নামমাত্র মজুরি কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। ফলে বাস্তব আয় কমেছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় নতুন এবং ভালো মানের চাকরি পর্যাপ্তভাবে তৈরি হয়নি। অর্থাৎ পরিবারগুলো একদিকে উচ্চ দামের চাপে, অন্যদিকে সীমিত আয়ের সুযোগে আটকে গেছে।

দারিদ্র্য–বঞ্চনা চরের মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী

এখানেই প্রবৃদ্ধির মান নিয়ে প্রশ্ন আসে। প্রবৃদ্ধি এমন হলে যে উৎপাদন বাড়ে কিন্তু কর্মসংস্থান ততটা বাড়ে না, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষমতা সীমিত হয়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এই বিচ্ছিন্নতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ ভালো কাজ পাচ্ছে না। নারীর কর্মসংস্থানে অগ্রগতি থমকে আছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা ঋণ, জ্বালানি, বাজার এবং অনিশ্চিত চাহিদার চাপে টিকে থাকার লড়াই করছে। ফলে দারিদ্র্য থেকে সামান্য ওপরে ওঠা পরিবারও স্থায়ীভাবে নিরাপদ অবস্থায় যেতে পারছে না।

সোয়া ছয় কোটি মানুষের ঝুঁকিতে থাকা তাই আরও বড় সতর্কসংকেত। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা আর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। একটি অসুস্থতা, একটি চাকরি হারানো, বন্যা, ফসলহানি, খাদ্যের দামের নতুন উল্লম্ফন, কিংবা ভাড়া ও শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়া একটি পরিবারের অবস্থান সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যদি নীতিনির্ধারণে অদৃশ্য রাখা হয়, তাহলে দারিদ্র্য কমানোর আগের অর্জনও টেকসই থাকবে না।

চরম বৈষম্য আর কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি অস্থিরতা তৈরি করতে বাধ্য

কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা এখনো এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি মূলত ভাতা ও বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিনির্ভর। দরিদ্র হয়ে পড়ার পর কিছু সহায়তা আছে, কিন্তু মানুষকে দরিদ্র হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করার কাঠামো দুর্বল। বেকারত্ব বিমা নেই, স্বাস্থ্য ব্যয়ের বিরুদ্ধে যথেষ্ট আর্থিক সুরক্ষা নেই, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের জন্য সামাজিক বিমা সীমিত। ফলে ঝুঁকি রাষ্ট্রের বদলে পরিবারকেই বহন করতে হয়।

এখানে শুধু অর্থের অভাবই সমস্যা নয়। বড় সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। সুবিধাভোগী নির্বাচনে ভুল আছে, প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়ে, আবার প্রভাবশালী বা অগ্রাধিকারবহির্ভূত মানুষও সুবিধা পায়। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, সীমিত নজরদারি এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির অভাব কর্মসূচির ফল কমিয়ে দেয়। সামাজিক সুরক্ষার বাজেট বড় হলেও তার কার্যকারিতা সব সময় সেই অনুপাতে বাড়ে না।

আরও কঠিন প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি বহু বছর ধরে এমন এক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে সংগঠিত ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো নীতি থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের দর-কষাকষির ক্ষমতা সীমিত।

বহুতল ভবনের পাশেই বস্তি। আমাদের উন্নয়ন দর্শনের বড় এক গলদ

ব্যাংক খাতে বড় ঋণখেলাপিরা বারবার ছাড় পায়। কিছু খাত কর অব্যাহতি বা সুরক্ষা পায়। অন্যদিকে একজন শ্রমিক চাকরি হারালে বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পুঁজি হারালে তার জন্য তুলনামূলকভাবে কোনো শক্তিশালী সুরক্ষা নেই। অর্থাৎ ঝুঁকির বণ্টন অসম। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ব্যর্থতার খরচ অনেক সময় রাষ্ট্র বহন করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যর্থতা ব্যক্তিগত থেকে যায়। এই কাঠামোর ফলে সম্পদ ও সুযোগ ধীরে ধীরে শক্তিশালী গোষ্ঠীর দিকে সরে যায়, আর দুর্বল পরিবার আরও অনিরাপদ হয়।

বাজারের দুর্বলতাও দারিদ্র্য বাড়ার আরেকটি কারণ। খাদ্যপণ্য, পরিবহন, আমদানি, জ্বালানি এবং পাইকারি বাণিজ্যের বিভিন্ন স্তরে প্রতিযোগিতা কতটা কার্যকর, সেটি দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার সুবিধা অনেক সময় ভোক্তার কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না, কিন্তু দাম বাড়লে সেই বাড়তি খরচ খুব দ্রুত নিচের দিকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই মূল্য-অসমতা বাজারের ক্ষমতার সম্পর্ককে প্রকাশ করে।

উন্নয়নদর্শন ও বরাদ্দের ফাঁকি

সরকারি প্রতিক্রিয়াও প্রায়ই স্বল্পমেয়াদি। বাজারে অভিযান, জরিমানা বা প্রশাসনিক নির্দেশ কিছু সময়ের জন্য আলোচনায় আসে, কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করে না। প্রয়োজন প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকর ভূমিকা, বাজার তথ্যের স্বচ্ছতা, আমদানি ও সরবরাহ চেইনের নজরদারি, এবং এমন নিয়ন্ত্রণ যা রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব থেকে যথেষ্ট স্বাধীন।

করব্যবস্থাতেও একই ধরনের বৈষম্য রয়েছে। পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি বোঝা চাপায়। বিপরীতে উচ্চ আয়, সম্পদ, মূলধন আয় এবং বিভিন্ন সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী থেকে সম্ভাব্য রাজস্ব পুরোপুরি আদায় হয় না। কর ফাঁকি, অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধা রাজস্ব সক্ষমতা কমায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং নগর সেবায়।

নীতির অগ্রাধিকারের প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ। বড় অবকাঠামো প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান। একটি সেতু, মহাসড়ক বা মেগা প্রকল্প সহজে উন্নয়নের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু একজন শ্রমিকের আয় নিরাপত্তা, একটি পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা একটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ দৃশ্যমান নয়। ফলে রাজনৈতিক প্রণোদনা অনেক সময় এমন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে দেখানো যায়, কিন্তু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা তৈরির খাত পিছিয়ে থাকে।

‘গরিবের দেশে’ ধনী কীভাবে আরও ধনী হয়

এখন তাই শুধু দারিদ্র্য কর্মসূচি বাড়ালেই হবে না। প্রথম কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শাসনের প্রশ্ন হিসেবে দেখা। খাদ্য সরবরাহ, বাজারে প্রতিযোগিতা, আমদানি নীতি, জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং মুদ্রানীতিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষাকে ভাতার সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক বিমা, বেকারত্ব ঝুঁকি, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং আয়হানি মোকাবিলার দিকে নিতে হবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানকে দারিদ্র্য হ্রাসের কেন্দ্রীয় কৌশলে ফিরিয়ে আনতে হবে।

সবশেষে, ৮০ লাখ মানুষের দারিদ্র্যে নেমে যাওয়া এবং সোয়া ছয় কোটি মানুষের ঝুঁকিতে থাকা কোনো ছোট নীতিগত বিচ্যুতি নয়। এটি আমাদের উন্নয়ন কৌশলের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। যদি প্রবৃদ্ধি মানুষের আয়কে নিরাপদ না করে, কাজের মান না বাড়ায়, এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে পরিবারকে রক্ষা না করে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সামাজিক ভিত্তি দুর্বলই থাকবে। উন্নয়নের সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন মানুষ শুধু দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠে না, সেখানে টিকে থাকার সক্ষমতাও অর্জন করে।

  • সেলিম রায়হান অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম

    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source