কাঠগড়ায় ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা
· Prothom Alo

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে বিতর্ক এখন চরমে। এই বিতর্কের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে জনবিক্ষোভ, সংসদের সংঘাত, জোট রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ ও আইনি জটিলতা। এসবের ফলে আমাদের নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা আজ বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একই সঙ্গে এটি একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলে ধরে—আমাদের বর্তমান আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি কোনো পদের ক্ষমতার সঠিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, নাকি পদচ্যুত করার পথটিকেই প্রায় অসম্ভব করে তোলে?
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
রাজপথে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। মানবাধিকারকর্মী, ছাত্রসংগঠন ও বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে কংগ্রেসের নেতৃত্বে এই আন্দোলন বেগবান হচ্ছে। দেশের বড় শহরগুলোতে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
এই সপ্তাহেই কংগ্রেস প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রায় ৯৩০টি জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছে এবং সামনে আরও আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। এর পাশাপাশি বিরোধী নেতারা কেবল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে পদত্যাগই চাননি, বরং ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের দাবিও তুলেছেন।
সংসদেও বিরোধীরা তাঁকে সরানোর জন্য আইনি কৌশল অবলম্বন করার পরিকল্পনা করছে। এর আগে দেওয়া আবেদনগুলো সংসদের স্পিকাররা খারিজ করে দিলেও, এবার ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে মিলে কংগ্রেস নতুন অভিশংসন প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো একেবারেই সহজ নয়, কারণ এর নিয়ম সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ পদ্ধতির মতোই জটিল। ২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী, কোনো কমিশনার নিজে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। কিন্তু তাঁকে বরখাস্ত করতে হলে সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করে দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পেতে হয়। অর্থাৎ সরকারের সমর্থন ছাড়া কাউকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সরানো প্রায় অসম্ভব।
আসন্ন নির্বাচনের আগেই বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব নথি জনসমক্ষে আনা প্রয়োজন এবং ভোটার তালিকা বাদ দেওয়া ও সফটওয়্যার পরিবর্তনের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। যতক্ষণ না এই উদ্বেগগুলোর বিশ্বাসযোগ্য সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিটি নতুন নির্বাচন সমাধান দেওয়ার বদলে আমাদের গণতন্ত্রের সংকটকে আরও গভীর করে তুলবে।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। কারণ, এটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নয়, বরং একটি জোট সরকার। ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান শরিক দলগুলোও নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বচ্ছতা দাবি করতে শুরু করেছে।
সরকার পরিচালনার জন্য শরিকদের ওপর নির্ভর করতে হয় বলে তাদের তোলা এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সরকারের জন্য কঠিন। বিজেপি নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধানের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও যদি সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে নিজের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে উঠলে জ্ঞানেশ কুমারের মতো অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে বাদ দেওয়া সরকারের জন্য মোটেও কঠিন হবে না।
আইনি লড়াই এখন সুপ্রিম কোর্টেও গড়িয়েছে। আদালতে দুটি আলাদা রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। প্রথমটিতে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের বাকিদের না জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার একতরফাভাবে গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সফটওয়্যার পরিবর্তন করেছেন।
দ্বিতীয় মামলায় ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কারণ, ওই আইনে নির্বাচন প্যানেল থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে যুক্ত করা হয়েছিল, যার ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের দিকে পাল্লা ভারী হয়ে যায় (২-১ সংখ্যাগরিষ্ঠতা)। এই দুই মামলা কমিশনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনেক বিতর্ককে প্রকাশ্যে এনে দিতে পারে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারা। এই ধারায় দায়িত্বে থাকা বা সাবেক কমিশনারদের তাঁদের কাজের জন্য আইনি মামলা থেকে পূর্ণ দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এই ধারাটিও সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনার অধীন। সুপ্রিম কোর্ট যদি এই ঢালাও সুরক্ষাবলয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন, তবে জ্ঞানেশ কুমার কেবল পদই হারাবেন না, বরং তাঁর বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর জন্য ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে পারেন।
তবে আসল সমস্যা হলো বিজেপির রাজনৈতিক মানসিকতা। তারা জনমতকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পছন্দ করে। অতীতে এক মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির জবাবে এক বিজেপি নেতা সরাসরি বলেছিলেন, ‘আমরা এনডিএ, ইউপিএ নই। আমরা সহজে মাথা নোয়াই না।’
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিতর্কিত এসআইআর পদ্ধতির পক্ষে বিজেপির অবস্থান থেকে এটিই স্পষ্ট যে তারা কোনো চাপে পড়ে কাউকেই পদচ্যুত করতে রাজি নয়। পিছু হটা মানেই বিরোধীদের জয় মেনে নেওয়া, যা আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তারা নিজেদের কর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে কোনো চাপে পড়ে কাউকে বলি দেওয়া হবে না।
কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার যদি পদে বহাল থাকেন, তবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার ভিত্তিটাই ভেঙে পড়বে। একসময় যে নির্বাচন কমিশন সারা বিশ্বের কাছে গণতন্ত্রের মডেল ছিল, যাকে জাতিসংঘসহ বহু উদীয়মান গণতান্ত্রিক দেশ পরামর্শের জন্য ডেকে নিত, সেই কমিশনের পারফরম্যান্স আজ প্রশ্নবিদ্ধ। রেকর্ড ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং একটি বুথকে মাত্র একজন ভোটারের বুথে পরিণত করার মতো ঘটনা বিশ্বের বৃহত্তম ও সম্মানিত গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের সুনামকে এক প্রহসনে পরিণত করেছে।
আসন্ন নির্বাচনের আগেই বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব নথি জনসমক্ষে আনা প্রয়োজন এবং ভোটার তালিকা বাদ দেওয়া ও সফটওয়্যার পরিবর্তনের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। যতক্ষণ না এই উদ্বেগগুলোর বিশ্বাসযোগ্য সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিটি নতুন নির্বাচন সমাধান দেওয়ার বদলে আমাদের গণতন্ত্রের সংকটকে আরও গভীর করে তুলবে।
শশী থারুর ভারতের তিরুঅনন্তপুরম থেকে চারবার নির্বাচিত কংগ্রেস সংসদ সদস্য।
দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ