সুইডিশ নির্বাচনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া
· Prothom Alo

সুইডেনের নির্বাচনব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম স্বচ্ছ, নিরাপদ ও উচ্চমানের হিসেবে স্বীকৃত। এখানে পদ্ধতিগত ভোট কারচুপি বা জালিয়াতির সুযোগ নেই।
ভোট গ্রহণ ও গণনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ ও উন্মুক্ত। ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার সাজানো থেকে শুরু করে ভোট গণনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণ উপস্থিত থেকে নজরদারি করতে পারেন। এমনকি প্রাথমিক গণনার পর সেন্ট্রাল ইলেকশন অথরিটিতে ভোট পুনরায় ম্যানুয়ালি যাচাই করা হয়। আন্তর্জাতিক গবেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, সুইডিশ নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার হার সব সময় অত্যন্ত উঁচুতে থাকে।
Visit moryak.biz for more information.
অভিবাসী ভোটার ও রাজনৈতিক বিতর্ক
সুইডেনের ডানপন্থী দলগুলো প্রায়ই দাবি করে থাকে, অভিবাসীপ্রধান উপশহরগুলোয় বামপন্থী দলগুলো অভিবাসী ও মুসলিম ভোটারদের সমর্থন নিয়ে নিজেদের ভোটব্যাংক ভারী করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং ফিলিস্তিনপন্থী মনোভাব এই মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বামপন্থী দল ঐতিহ্যগতভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়ায় সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু অভিবাসী বা বিশেষ জনগোষ্ঠী এই দলকে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন। তবে এটিকে কোনো ‘অবৈধ বা পরিকল্পিত জয়’ না বলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সামাজিক ও জাতিগত গোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক পছন্দের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। সুইডিশ সমাজে বর্ণবাদবিরোধী কঠোর আইন রয়েছে, ফলে কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে অবমাননা করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও রাজনৈতিক আদর্শের সমালোচনা করা সম্পূর্ণ বৈধ।
রাজনৈতিক দল ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব
মাত্র এক কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে সংসদে আটটি রাজনৈতিক দল রয়েছে। বাইরে থেকে এটি বেশি মনে হতে পারে, তবে সুইডেনের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার কারণে (যেখানে কোনো দল ন্যূনতম ৪% ভোট পেলে আসন পায়) এটি সম্ভব হয়েছে। এর ফলে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব সংসদে নিশ্চিত হয়। বহুদলীয় ব্যবস্থার কারণে কোনো একটি দল এককভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারে না এবং দলগুলোকে সব সময় জোট গঠন করে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হয়।
বামপন্থী দল ও সেন্টার পার্টির আদর্শগত দ্বন্দ্ব
বামপন্থী দল ও উদারনৈতিক সেন্টার পার্টির অর্থনৈতিক আদর্শ সম্পূর্ণ বিপরীত। বামপন্থীরা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সরকারি খাতের বিস্তার এবং করপোরেট খাতের নিয়ন্ত্রণ কমাতে চায়, অন্যদিকে সেন্টার পার্টি মুক্তবাজার অর্থনীতি ও উদ্যোক্তাবান্ধব নীতির পক্ষে। কল্যাণমূলক খাতে ব্যবসার সুযোগ রাখা নিয়ে এদের মধ্যে মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং সেন্টার পার্টি সরাসরি বাম দলকে সরকারের অংশীদার করতে নারাজ। তা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট জনকল্যাণমূলক বা জলবায়ু–বিষয়ক সাধারণ এজেন্ডায় সমঝোতার মাধ্যমে তারা অতীতেও একসঙ্গে কাজ করেছে।
ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রার্থীভিত্তিক ভোট
সুইডিশ নির্বাচনব্যবস্থায় ভোটাররা শুধু দলকেই নয়, বরং দলের নির্দিষ্ট কোনো জনপ্রিয় প্রার্থীকে সরাসরি ভোট দিতে পারেন। এর মাধ্যমে তৃণমূলের যোগ্য প্রার্থীরা দলের বাধা পেরিয়ে সরাসরি উঠে আসার সুযোগ পান। তবে কোনো প্রার্থীকে শুধু নিজের জনপ্রিয়তার জোরে জিততে হলে নিজ দলের মোট ভোটের কমপক্ষে ৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এটি দলীয় একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে ভোটারদের একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক হাতিয়ার।
বর্তমান সরকার গঠনের সমীকরণ
সুইডিশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সরকার গঠনের দৌড়ে মধ্যবামপন্থী ব্লক এগিয়ে রয়েছে। এই ব্লকের চার দল মিলে সংসদের ৩৪৯টি আসনের মধ্যে ১৭৬টি নিশ্চিত করেছে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ১৭৫টি আসনের চেয়ে এক আসন বেশি। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস পার্টি নেত্রী ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বেই নতুন সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে করনীতি, অভিবাসন কিংবা জনকল্যাণমূলক ব্যয় নিয়ে জোটের দলগুলোর মধ্যকার মতপার্থক্য এবং দলগুলোর পারস্পরিক রাজনৈতিক দূরত্বের কারণে সরকার গঠন ও তা টিকিয়ে রাখা কিছুটা জটিল হতে পারে। অন্যদিকে ডানপন্থী জোট ১৭৩টি আসন পেয়ে সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে সুইডেনের এই বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সমঝোতার রাজনীতি বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]