৪০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে স্বপ্নের মঞ্চে ফৌজিয়ারা

· Prothom Alo

ফৌজিয়া খান নাফিজার কাছে গত শনিবারের রাতটা যেন কাটতেই চাইছিল না। কখনো ঘুম আসছিল, কখনো ভেঙে যাচ্ছিল। সকাল হতে না হতেই বাবাকে তাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে প্রস্তুত হয়ে যায় সে। এরপর বাবার সঙ্গে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মুন্সিগঞ্জে আসে প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।

ফৌজিয়ার বাবা ফৌজিয়া হাসান বলেন, লৌহজং উপজেলার খানবাড়ি এলাকা থেকে তাঁর সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে মুন্সিগঞ্জে আসে তাঁর মেয়ে। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড় ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। মেয়ে কয়েক দিন ধরেই অনুষ্ঠান নিয়ে খুব আবেগাপ্লুত ছিল। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেই প্রস্তুত হয়েছে। অন্য দিন আমি ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি, আজ মেয়ে আমাকে ঘুম থেকে তোলে।

Visit sportbet.rodeo for more information.

শুধু ফৌজিয়া খান নয়, তার মতো প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সিরাজদিখান থেকে অর্ক রাজবংশী ও আনন্দ এবং গজারিয়া থেকে মেঘনা ও ফুলদী নদী পাড়ি দিয়ে নাঈম ইসলাম অনুষ্ঠানে আসে। এ সংবর্ধনা ছিল তাদের জন্য স্বপ্নের, উচ্ছ্বাসের।

মুন্সিগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ক্রেস্ট ও নাশতা সংগ্রহ করছে শিক্ষার্থীরা। রোববার সকালে উত্তর ইসলামপুরের ইদ্রিস আলী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে

প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় আজ রোববার সকালে মুন্সিগঞ্জ শহরের উত্তর ইসলামপুরের ইদ্রিস আলী মাদবর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে ওই অনুষ্ঠান হয়।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। এর আগেই সকালে কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার। আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণ। এদিন সকাল থেকে অনুষ্ঠানস্থলে শিক্ষার্থীদের কেউ এসেছে মা-বাবার হাত ধরে, কেউ ভাইবোন বা বন্ধুদের নিয়ে। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে কেউ আলিঙ্গন করছে, কেউ মেতেছে গল্পে, আবার কেউ ব্যস্ত ছিল এই মুহূর্তের স্মৃতি ছবিতে ধরে রাখতে।

মুন্সিগঞ্জে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একক নৃত্য পরিবেশনা। রোববার সকালে উত্তর ইসলামপুরের ইদ্রিস আলী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে

প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শ্রীনগর থেকে আসা সমাপ্তি সরকারের গল্পও ভিন্ন। তিনি এসেছেন তাঁর ভাই সীমান্ত সরকার অন্তরের সঙ্গে। সীমান্ত সরকার বলেন, তিন বছর আগে আমিও এমন একটি মঞ্চ থেকে সংবর্ধনা নিতে চেয়েছিলাম। সে সময় অল্প একটুর জন্য আমি জিপিএ-৫ পাইনি। সেদিন বন্ধুরা যখন সংবর্ধনা নিয়েছিল, মনটা একটু খারাপ হয়েছিল। ভেবেছিলাম, আমি পাইনি, আমার ছোট বোন পাবে। শুরু থেকে ওর সঙ্গে লেগেছিলাম। আমার বোনও মেধাবী ছিল। ও এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সেদিনের মিস হওয়া আনন্দটাকে আজ বোনের সংবর্ধনায় পুষিয়ে নিতে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি।

মুন্সিগঞ্জ বন্ধুসভার সভাপতি মাশফিক সিহাবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি ফয়সাল হোসেন। এরপর অন্যান্য অতিথিদের মঞ্চে ডেকে নেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা শিক্ষার্থীদের সামনে স্বপ্ন দেখার সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ শামীম আহসান বলেন, আগামীর বাংলাদেশের জন্য আমাদের যে প্রজন্ম গড়ে তোলা দরকার, প্রথম আলো তাদের অবস্থান থেকে সে দায়িত্বটা পালন করে যাচ্ছে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আনন্দের মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দী করে রাখতে ছবি তুলছে শিক্ষার্থীরা। রোববার সকালে উত্তর ইসলামপুরের ইদ্রিস আলী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলজার হোসেন নানা পরামর্শমূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তোমরা এমনভাবে নিজেদের তৈরি করবে, যাতে ভবিষ্যতে তোমাদের জ্ঞান ও মেধা পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাজে আসে।

আলোচনা অনুষ্ঠান, কুইজ ও পুরস্কার বিতরণী পর্বের মধ্যে কখনো সংগীত, কখনো নৃত্য, কখনো শিক্ষার্থীদের গল্প ও আবৃত্তিতে মুখর হয়ে ওঠে মঞ্চ।

অনুষ্ঠানের আরেক অতিথি মুন্সিগঞ্জ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি সুজন হায়দার জনি বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা মানেই চূড়ান্ত সফলতা নয়। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা, নির্মোহ মানুষ হয়ে ওঠা, নিবেদিত, মানবিক ও দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠা অনেক বেশি জরুরি।

এদিন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা তিন ‘ম’কে (মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থ) নিয়ে শিক্ষার্থীদের শপথ পড়ান। তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে দিকনির্দেশনা দেন। বক্তব্য শেষে অনুষ্ঠানস্থলের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে ‘ধন ধান্য পুষ্পভরা’ গানটি গান মাহবুবা সুলতানা।

Read full story at source