যেভাবে বিশ্বমঞ্চে আমরা চতুর্থ হলাম
· Prothom Alo
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা রোবোনেশন আয়োজিত স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস প্রতিযোগিতায় চতুর্থ হয়েছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের একটি দল। সেই অভিজ্ঞতাই লিখেছেন দলের জনসংযোগ ও বিপণন বিভাগের প্রধান মাইসুন জহির।
যুক্তরাষ্ট্রে ইউআইইউর শিক্ষার্থীদের দলস্রেফ একটা আইডিয়া আর পাঁচজন সদস্য—এই নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইউআইইউ এরিয়াল রোবোটিকস টিম (ইউআরটি)। ২০২৪ সালে। সেই দলের হাত ধরেই এবার এসেছে বড় পুরস্কার। স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস প্রতিযোগিতায় চতুর্থ হয়েছি আমরা।
Visit chickenroadslot.pro for more information.
বছর ২ আগে টি এম আল আনাম ও আরও কয়েকজন সিনিয়রের উদ্যোগে, অধ্যাপক এ কে এম মুজাহিদুল ইসলাম স্যারের সহায়তায় যখন ইউআরটির যাত্রা শুরু হয়, লক্ষ্য ছিল, ‘আনম্যানড এরিয়াল রোবটিকস প্রযুক্তি’র ক্ষেত্রে বিশ্বদরবারে আমরা বাংলাদেশকে তুলে ধরব। কিন্তু এত দ্রুতই যে স্বীকৃতি আসবে, সেটা কি আমরা নিজেরাও ভেবেছিলাম!
শুরুর দিকে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু পরিকল্পনা থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় হার্ডওয়্যার উন্নয়ন ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের কাজ। একটা বড় পরিবর্তন আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, যখন ক্যাম্পাসেই আমরা আমাদের নিজস্ব ল্যাবরেটরি জন্য জায়গা পাই। দলেও যোগ দেয় নতুন অনেক সদস্য। গড়ে উঠে ২২ জনের একটি শক্তিশালী দল। মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সফটওয়্যার অ্যান্ড নেভিগেশন, কমিউনিকেশন, আরঅ্যান্ডডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) এবং পিআর অ্যান্ড মার্কেটিং (জনসংযোগ ও বিপণন)—এই ছয়টি উপদলে বিভক্ত হয়ে শুরু হয় দিনরাত কাজ। জনসংযোগ দলের প্রধান এবং গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের কর্মী হিসেবে পুরো প্রক্রিয়াই আমি কাছ থেকে দেখেছি।
ইস্ট ওয়েস্টের সঙ্গে আমারও ৩০ বছরআমাদের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার টালসায় স্কাইওয়ে রেঞ্জে আয়োজিত রোবোনেশনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস ২০২৬’-এ অংশগ্রহণ। এটি মূলত অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন, এমবেডেড সিস্টেম ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক জটিল সমন্বয়। আন্তর্জাতিক মানের একটি স্বয়ংক্রিয় ড্রোন তৈরি করতে মাসের পর মাস পরিশ্রম করেছে আমাদের পুরো দল।
ড্রোনে বেশ কিছু প্রযুক্তি যোগ করা হয়েছিল। যেমন পূর্বনির্ধারিত মিশন রুট অনুসরণের জন্য স্বায়ত্তশাসিত নেভিগেশন সিস্টেম, ভৌগোলিক তথ্য ও ছবি সংগ্রহের জন্য এরিয়াল ম্যাপিং, বস্তু শনাক্তকরণের জন্য কম্পিউটার-ভিশন ও ডেটাসেট মডেল, সেন্সিং সিস্টেমের মাধ্যমে বাধা এড়ানো ইত্যাদি।
ল্যাবে টানা কাজ করতে হতো। ছেলেরা রাত জেগেও কাজ করেছে। আর আমরা মেয়েরা বাসায় ফিরে গুগল মিটে যুক্ত থেকে সাহায্য করতাম।
শিক্ষকেরা বারবার আমাদের প্রশ্নের মুখোমুখি করেছেন, ঘাটতিগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন, ফলে নিজেদের দুর্বলতাগুলো বের করা সহজ হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত আট সদস্যের একটি দলের সামনেও আমাদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
অবশেষে ১৪ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর হয় চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। ভিসার নতুন নিয়মকানুনের জন্য বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় যেতে পেরেছিল মাত্র পাঁচজন কো-টিম লিড আহমেদ জুনায়েদ, মেকানিক্যাল টিমের মুক্তাদিরুল ইসলাম ও দিগন্ত কর্মকার, নেভিগেশন লিড ফাহাদ রহমান এবং কমিউনিকেশন লিড ইফতা ফয়সাল; সঙ্গে দলের মেন্টর বা পরামর্শক হিসেবে ছিলেন রিয়াসাত আজিম স্যার। সশরীর প্রতিযোগিতায় পাঁচজন গেলেও বাংলাদেশ থেকে প্রভাষক আজিজুর রহমান স্যারের দিকনির্দেশনায় আমরা অন্য সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সময়ের পার্থক্য সামলে নিয়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই সঙ্গে ছিলাম।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেই তুমুল চাপ সামাল দিতে হয়েছে। আমাদের প্রতিযোগীরা তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারেনি। তার ওপর প্রতিযোগিতার কিছুক্ষণ আগেই ড্রোনের ‘পেলোড ড্রপ সিস্টেমে’ ত্রুটি দেখা দেয়, যার ওপর অনেকখানি নম্বর নির্ভর করছিল। আগের প্রতিযোগিতাগুলোয় ড্রোন ক্র্যাশ করার ইতিহাস থাকায় টেনশন ছিল তুঙ্গে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে অবস্থানরত পুরো টিম একটানা জেগে সমস্যাটি সমাধান করতে সক্ষম হয়।
বিশ্বজুড়ে ৮৫টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে থেকে বাছাই ১০ দেশের ৬৪টি দলের সঙ্গে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছিল। প্রতিযোগী ছিল কর্নেল ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া টেক, মোনাশ ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের সময় তখন ভোর ৪টা ২৬ মিনিট। আমরা সবাই গুগল মিটে যুক্ত হয়ে সরাসরি ফল ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলাম। চতুর্থ হিসেবে যখন ইউআইইউর নাম ঘোষণা হলো, সে এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত!
‘মিশন ডেমোনস্ট্রেশনে’ ৬৫১ পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বে চতুর্থ হয়েছে ইউআইইউ। প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েই এই অবস্থান নিশ্চিত করা আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা।