সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ও রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার নেপথ্যের ব্যক্তিরা এখনো ধরা পড়েননি
· Prothom Alo

রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দুই অস্ত্রধারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একইভাবে মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দুই ঘটনাতেই হামলার নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী বা মূল ব্যক্তিদের এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।
নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনায় পুলিশ বলছে, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এ হামলা হয়েছে। হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম এসেছে। তাঁর বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
Visit h-doctor.club for more information.
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মামলার ৪ নম্বর আসামি মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিনের ৩৫ শতাংশ জমি আছে নিউগিনি প্রপার্টিজের পাশে। আশপাশের সব জমি নিউগিনি প্রপার্টিজের। ফলে ওই জমিতে ঢুকতে, বের হতে নিউগিনি প্রপার্টিজের রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। চলাচলের ফটকও নিউগিনি প্রপার্টিজের নিয়ন্ত্রণে। প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে, এ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সেখানে হামলা হয়েছে। জমি নিয়ে অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা। এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত শনিবার দিবাগত রাতে নিউগিনি প্রকল্পের কার্যালয় ও আশপাশের স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ব্যাপক হামলা–ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনায়ও ভাঙচুর হয়। নিউগিনি প্রকল্পের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লিয়াকত আলী গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও।
এ ঘটনায় নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করছে ক্যান্টনমেন্ট থানা-পুলিশ। গতকাল পর্যন্ত থানা-পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
রাড্ডা গুঁড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে কারা, অনুসন্ধানে যা বেরিয়ে এলডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, হামলার ঘটনায় ডিবি তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের একজন শাহ আলম অনিক মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক।
গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন মামুন, আসলাম, মুন্না, মিজানুর রহমান ও শাহরিয়ার মাহমুদ। মামুনের বাড়ি গফরগাঁওয়ে, তিনি ও মুন্না ভাষানটেক বস্তিতে থাকেন। টাঙ্গাইলের বাসিন্দা আসলাম অটোরিকশা চালান। সর্বশেষ গ্রেপ্তার মিজানুর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মামুন ও মুন্না অস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনাস্থলে কারা এক্সক্যাভেটর এনেছিলেন এবং নেতৃত্বে কে বা কারা ছিলেন, তা জানার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তাঁদের গ্রেপ্তার ও এক্সক্যাভেটর উদ্ধারে অভিযান চলছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: নেপথ্যের ব্যক্তিরা অধরা
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা। এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। ফেরদৌসী আহমেদ অবশ্য এ ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন।
গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের কাউকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনাস্থলে কারা এক্সক্যাভেটর এনেছিলেন এবং নেতৃত্বে কে বা কারা ছিলেন, তা জানার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তাঁদের গ্রেপ্তার ও এক্সক্যাভেটর উদ্ধারে অভিযান চলছে।
স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হামলার আগে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। পরে তাঁরা সেখান থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা করতে যান।
মানবাধিকারকর্মী নূর খানসাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবরে হামলার ঘটনায় মনে হয়েছে দেশ মব সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি। সরকার এমন কোনো বার্তা দিতে পারেনি, যাতে সন্ত্রাসীরা ভয় পায়।বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন লেলিনের কার্যালয়ের সামনে লোকজন জড়ো হচ্ছেন, এমন দৃশ্য কাছাকাছি একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রসংলগ্ন বিভিন্ন মার্কেটের ফুটেজে ঘটনার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস ঘুরতে দেখা যায়।
স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ কয়েকজন একটি সাদা মাইক্রোবাসে ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘুরে নির্দেশনা দেন। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সর্বশেষ রোববার রাতে মো. মিন্টু (৩৫) ও মো. মিলন (৪০) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা ভাঙচুরে অংশ নেন এবং পরে মালামাল লুট করেন। তাঁদের কাছ থেকে লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার রাতে মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), জিহাদ হাসান (২১) ও মো. রাব্বি (২০) নামের চার তরুণকে গ্রেপ্তার করে শাহ আলী থানার পুলিশ। পুলিশ–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুয়েল শাহ আলী বাগের করলাপাড়ায় থাকতেন। অন্য তিনজন শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান তরুণ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, টাকার বিনিময়ে তাঁরা ভাঙচুরে অংশ নেন।
গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঢুকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর, পরে লুটপাটএরপর শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার হন ছয়জন। তাঁরা হলেন মো. শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), মো. শাহ আলম (৫৩), মো. আতিকুর রহমান (৩৩), মো. কামরুল ইসলাম (৫২) ও মো. শাকিল (২০)। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে শাহবাগ থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। অন্যজনকে শাহ আলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে থানা-পুলিশ। রোববার আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তার ১২ জনের মধ্যে শাহ আলম সমমনা দোকানদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক।
সাম্প্রতিক হামলা–ভাঙচুর, দখলের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির লক্ষণ বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে ভাঙচুর ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার সঙ্গে সরকারি দলের লোকজন বা শক্তিশালী মহল জড়িত বলে শোনা যায়। সে জন্য পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবরে হামলার ঘটনায় মনে হয়েছে দেশ মব সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি। সরকার এমন কোনো বার্তা দিতে পারেনি, যাতে সন্ত্রাসীরা ভয় পায়।