সিনেমার আবার নতুন জোয়ার দেখছি: রাজশাহীতে রেদওয়ান রনি
· Prothom Alo

‘সিনেমার আবার নতুন জোয়ার আমরা দেখছি। নানান ধরনের সিনেমা হচ্ছে। নির্মাণ, প্রযোজনা ও সঠিকভাবে বিতরণের চক্রটি পূর্ণ করতে পারলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আরও বড় জায়গায় যেতে পারে।’
চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেদওয়ান রনি এ কথা বলেছেন। আজ শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে রেইস: সৃজনশীল অংশীদারত্বে নির্মাতা ও প্রযোজক’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
Visit betsport.cv for more information.
চলচ্চিত্রবিষয়ক সংগঠন ম্যাজিক লন্ঠন আয়োজিত ‘ম্যাজিক লন্ঠন কথামালা’র ১৪তম পর্বে এ আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সম্ভাবনা, প্রযোজনা, বিতরণ, ওটিটি ও আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে কথা বলেন রেদওয়ান রনি।
রেদওয়ান রনি বলেন, রাজশাহীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু অতিথি হিসেবে আসার নয়, এই শহর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্নের শুরুর সময়টাও রাজশাহীর সঙ্গে যুক্ত।
নিজের বন্ধু রানার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা দুজন পরিকল্পনা করতেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান রানা। এ ঘটনা তাঁকে বড় ধাক্কা দেয়। পরে এক শিক্ষকের পরামর্শ তাঁকে আবার চলচ্চিত্র নির্মাণের পথে ফিরতে অনুপ্রাণিত করে।
রেদওয়ান রনি বলেন, ‘আমার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু শেখার নেই। আমি নিজেও এখনো শিখছি। ভুল করতে করতে, ঠকতে ঠকতে এবং প্রতিদিনের নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ যতটুকু করেছি, সেটাই আমার অভিজ্ঞতা।’
চলচ্চিত্রশিল্পে পেশাদার কাঠামো
রেদওয়ান রনি বলেন, চলচ্চিত্রে সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, অভিনয়সহ বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সমন্বয় ঘটে। গল্প বলার জন্য তিনি চলচ্চিত্রকে বেছে নিয়েছেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু হয় ‘ছবিয়াল’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুরুতে তাঁকে চলচ্চিত্রে না আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্তে তিনি অটল ছিলেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে আরও পেশাদার কাঠামোর মধ্যে আনার ওপর গুরুত্ব দেন রেদওয়ান রনি। তাঁর মতে, শুধু দু-একটি ভালো সিনেমা নির্মাণ করলেই হবে না। একটি শক্তিশালী চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, নির্মাণের পাশাপাশি প্রযোজনা ও বিতরণের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। একজন প্রযোজকের কাজ শুধু অর্থ বিনিয়োগ করা নয়; চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে নির্মাণ, বিপণন, বিতরণ ও দর্শকের কাছে সিনেমা পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রযোজকের ধারণা থাকা দরকার।
রেদওয়ান রনি বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অনেক নির্মাতাকেই প্রযোজকের কাজ করতে হয়েছে। এতে সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পেশাদার প্রযোজক তৈরি হলে নির্মাতারা তাঁদের মূল কাজের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
আয়োজনে দর্শকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন রেদওয়ান রনি। ছবি : শফিকুল ইসলাম‘লোকাল ইজ দ্য নিউ গ্লোবাল’
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা নিয়ে রেদওয়ান রনি বলেন, দেশের নিজস্ব গল্পই আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে নতুন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ‘লোকাল ইজ দ্য নিউ গ্লোবাল। আমরা যত বেশি আমাদের শিকড়ের গল্প বলতে পারব, তত বেশি সেটা বৈশ্বিক হয়ে উঠবে।’
বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের গল্পকে চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ভাই-বোন, মা–বাবা, পরিবার ও বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও গভীরভাবে তুলে ধরলে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
রেদওয়ান রনি বলেন, বাংলাদেশের নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের দক্ষতা রয়েছে। এখন প্রয়োজন পেশাদার কাঠামো, বিনিয়োগ, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ।
আয়োজনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ রাজশাহীর চলচ্চিত্রকর্মীরা। ছবি : শফিকুল ইসলামবিদেশে বাংলা সিনেমার বাজার
চলচ্চিত্রের বিতরণব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে নিজের ‘দম’ সিনেমার উদাহরণ দেন রেদওয়ান রনি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে সিনেমাটি প্রথম সপ্তাহে সাতটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল। দর্শকের সাড়া পাওয়ার পর দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫২টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়।
তাঁর মতে, এ অভিজ্ঞতা বাংলা সিনেমার বিদেশের বাজারের সম্ভাবনা দেখায়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষাভাষী দর্শক রয়েছেন। পেশাদারভাবে বিতরণ করতে পারলে এসব বাজার থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য উল্লেখযোগ্য আয় আসতে পারে।
রেদওয়ান রনি বলেন, শুধু প্রবাসী বাঙালিই নন, ভালোভাবে প্রচার ও বিতরণ করা গেলে অন্য ভাষাভাষী দর্শকের কাছেও বাংলা সিনেমা পৌঁছানো সম্ভব। সাবটাইটেলসহ বিভিন্ন ব্যবস্থায় এখন একটি দেশের সিনেমা অন্য দেশের দর্শকের কাছে পৌঁছানো যায়।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নতুন নির্মাতাদের সুযোগ বাড়িয়েছে উল্লেখ করে রনি বলেন, এর মাধ্যমে দর্শকের হাতে কনটেন্ট বেছে নেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে। তাই ওটিটির জন্য গল্প নির্মাণে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পাইরেসি বন্ধে ওয়ান–স্টপ সেবা
চলচ্চিত্র ও ওয়েব কনটেন্টের পাইরেসি বন্ধে সরকারি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন রেদওয়ান রনি। তাঁর মতে, বৈধ প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রকাশের পর তা অবৈধভাবে ছড়িয়ে পড়লে নির্মাতা ও প্রযোজক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
তিনি বলেন, ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো বৈধ প্ল্যাটফর্মে কপিরাইট লঙ্ঘিত হলে অভিযোগ করে কনটেন্ট সরানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অবৈধ পাইরেসি সাইটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন।
নিবন্ধিত প্রযোজকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘ওয়ান–স্টপ’ সেবা চালুর প্রস্তাব দেন তিনি। এর মাধ্যমে কোনো কনটেন্ট অবৈধভাবে ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত অভিযোগ জানানো ও লিংক সরানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সাংস্কৃতিক কাজ থামবে না
প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থামিয়ে দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন রেদওয়ান রনি।
তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক কাজ বন্ধ করার চেষ্টা অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকতে পারে। কোনো একটি জায়গায় প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হলেও অন্য জায়গায় প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাধা এলে পরিস্থিতি বুঝে যথাসময়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প জায়গায় কাজ ও প্রদর্শনের পথ খুঁজে নিতে হবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ম্যাজিক লন্ঠনের সদস্য জেরিন আল জান্নাত। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির সহযোগী সম্পাদক সোহাগ আবদুল্লাহ। রেদওয়ান রনির আলোচনা শেষে বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন। সমাপনী বক্তব্য দেন ম্যাজিক লন্ঠনের সম্পাদক কাজী মামুন হায়দার।