বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের নিচে, কেন

· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমে যাওয়ায় সরবরাহ সংকট বেড়েছে। তারপরও ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে।

Visit betsport24.es for more information.

এর বড় কারণ হলো সরবরাহ যেমন কমেছে, তেমনি বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদাও কমেছে। বিকল্প পথে তেল রপ্তানি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানার মতো দেশের উৎপাদন বৃদ্ধিও দামের ওপর চাপ কিছুটা হ্রাস করেছে। এই পরিস্থিতিতে তেলের বাজারের প্রকৃত চিত্র কী? ভবিষ্যতে তেলের দামই–বা কোন দিকে যেতে পারে?

প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লেও ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের নিচে কেন

উত্তর: মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে একই সময়ে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা কমেছে। ফলে সরবরাহের ঘাটতির চাপ অনেকটাই সামাল দেওয়া গেছে। সে কারণে ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের ওপর স্থায়ী হয়নি।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আর্গাসের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এখন দিনে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হচ্ছে। ৭ মাস আগে ইরান যুদ্ধ শুরুর দিকে এই পরিমাণ ছিল দিনে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল।

প্রশ্ন: হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনের কী অবস্থা

উত্তর: ৩০ আগস্ট আবার সংঘাত শুরুর আগের সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। এরপর তা দ্রুত কমে দিনে ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে যায়। তবে দৈনিক গড় হিসাবে এখনো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রিস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিমবার্তির হিসাবে, বর্তমান সরবরাহের ভিত্তিতে ব্রেন্টের ‘ন্যায্য’ দাম হওয়া উচিত ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলার। তবে আজ মঙ্গলবার ব্রেন্টের দাম ৯৮ ডলারের ওপর ছিল।

প্রশ্ন: হরমুজ দিয়ে কি এখনো বড় জাহাজে তেল যাচ্ছে

উত্তর: কে-প্লারের তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বড় আকারের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বের হতে দেখা যায়নি। তবে শিল্প–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হিসাব বলছে, প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি এখনো হচ্ছে।

প্রশ্ন: তেলের সরবরাহ ঠিক কীভাবে হচ্ছে এখন

উত্তর: উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। হরমুজের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা হচ্ছে। এতে সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব কিছুটা কমেছে। সৌদি আরামকো আগস্টে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাস তানুরা বন্দর থেকে আবার জাহাজে তেল তোলা শুরু করেছে। তবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে রপ্তানি কমেছে। ইরানপন্থী ইয়েমেনের হুতিদের নৌ অবরোধের কারণে বন্দরটি চাপের মুখে আছে।

আগস্টে ইয়ানবু থেকে দিনে গড়ে ১৪ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। আগের ৩ মাসে এই গড় ছিল ৩৯ লাখ ব্যারেল।

মিসরের সিদি কেরি বন্দর থেকে আগস্টে দিনে ২১ লাখ ৩৯ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে, জুনের তুলনায় যা দ্বিগুণের বেশি। আগস্টে ইরাকের তেল রপ্তানিও বেড়ে দিনে প্রায় ২৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে উঠেছে।

জুলাই ও আগস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি ছিল দিনে প্রায় ২৯ লাখ ব্যারেল। একই সময়ে কুয়েতের অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি ছিল প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল।

প্রশ্ন: অন্য দেশগুলো কি তেল উৎপাদন বাড়াচ্ছে

উত্তর: বাড়াচ্ছে। রিস্টাড এনার্জির প্রতিষ্ঠাতা জারান্ড রিস্টাডের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, গায়ানাসহ ওপেকের বাইরে থাকা কয়েকটি দেশ চলতি বছর সম্মিলিতভাবে দিনে আরও ১৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়াবে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঘাটতির একাংশ এতে পূরণ হচ্ছে। জুলাই ও আগস্টে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দিনে প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেলে স্থির ছিল। জুনে তা ৬৪ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির তেল পরিশোধন কমেছে। তবে ফেব্রুয়ারির তুলনায় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এখনো ২৩ শতাংশ বেশি।

তবে বিষয় হলো ২০২৬ সালের তেল উৎপাদনের পূর্বাভাস কমিয়ে ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে রাশিয়া। ফলে ভবিষ্যতে দেশটির রপ্তানি কমে যেতে পারে।

প্রশ্ন: তেলের চাহিদা কি কমছে

উত্তর: রিস্টাডের হিসাবে, পেট্রোকেমিক্যাল ও পরিবহন জ্বালানিতে তেলের ব্যবহার কমে যাওয়ায় তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বে দৈনিক তেলের চাহিদা ৩৫ লাখ ব্যারেল কমেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই চাহদিা ছিল ৪৫ লাখ ব্যারেল।

চাহিদা যত কমেছে, তার অর্ধেকের বেশি কমেছে চীনের ক্ষেত্রে। সে দেশে পরিবহন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক শিল্পের প্রসার ঘটছে। ফলে তেলনির্ভর জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যালের চাহিদা কমছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন জুলাই ও আগস্টে সমুদ্রপথে দিনে প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। ফেব্রুয়ারিতে এই পরিমাণ ছিল দিনে ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি। বাজারে চীনের প্রভাব এত বেশি যে দেশটিকে অনেক সময় ‘নতুন ওপেক’ও বলা হয়।

কে-প্লারের হিসাবে, চীনের তেল মজুতের পরিমাণ আনুমানিক ১১৭ কোটি ব্যারেল। বড় মজুত থাকায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হলেও দেশটির বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কম।

প্রশ্ন: সব বাজারেই কি তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে

উত্তর: না। স্পট মার্কেটের পরিস্থিতি বেশ সংকটজনক। এই বাজারে তেলের অতিরিক্ত দাম এপ্রিলের পর্যায়ে ফিরে এসেছে। নভেম্বরে সরবরাহের জন্য দুবাই ও ওমানের তেলের দাম দুবাইয়ের নির্ধারিত দামের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১৯ থেকে ২০ ডলার বেশি।

গতকাল সোমবার ওমানের ফিউচার্সের দাম ছিল ১০৪ দশমিক ৫৪ ডলার। স্পট মার্কেটে দুবাইয়ের তেলের দাম ছিল ১০৫ দশমিক ১০ ডলার।

প্রশ্ন: এর অর্থ কি তেলের বাজারে সংকট এখনো আছে

উত্তর: আছে। আর্গাসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ডিজেলের বাজারেও ঘাটতির আশঙ্কা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা আরও বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি কমতে পারে। একই সময়ে শোধনাগারগুলো ডিজেল উৎপাদন বৃদ্ধি করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে।

প্রশ্ন: দামের পূর্বাভাস কী

উত্তর: হ্যাঁ, কয়েকটি বড় ব্যাংক ব্রেন্টের দামের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। মরগ্যান স্ট্যানলি বলেছে, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে ব্রেন্টের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠতে পারে।

গোল্ডম্যান স্যাকসও ২০২৬ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৭ সালের জন্য ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের পূর্বাভাস ৫ ডলার করে বাড়িয়েছে। তাদের ধারণা, আগামী বছরও মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ব্রেন্টের দাম হবে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলার, ডব্লিউটিআই ৮০ ডলার। ২০২৭ সালে এই দুই ধরনের তেলের দাম যথাক্রমে ৮০ ও ৭৫ ডলার হতে পারে।

প্রশ্ন: তাহলে মূল কথা কী

উত্তর: মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সরবরাহ কমেছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে। কিন্তু বিকল্প পথে রপ্তানি, ওপেকের বাইরের দেশগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি ও সবচেয়ে বড় বিষয়—চীনসহ বড় বাজারে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতির পুরো চাপ পড়ছে না। তাই ব্রেন্টের দাম এখনো ১০০ ডলারের নিচে। তবে স্পট মার্কেট ও ডিজেল বাজারের সংকট বলছে, পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।

Read full story at source