ষষ্ঠ শ্রেণির পোশাকেই স্কুলজীবন পার হয়েছে অনিকের

· Prothom Alo

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনের প্রথম পর্বে আজ থাকছে ছয় শিক্ষার্থীর কথা।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় যে পোশাক কিনেছিল, সেটি দিয়েই পুরো স্কুলজীবন পার করতে হয়েছে। আবার কেউ নিজের পড়ার খরচ জোগাতে স্কুল শেষে অন্যের জমিতে কাজ করেছে। কেউবা মা–বাবার স্নেহ ছাড়াই বড় হয়েছে চাচার সংসারে। তাদের কারও পরিবারই আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়; কিন্তু চেষ্টা ও পরিশ্রম দিয়ে সেই বাধা পেরিয়ে স্বপ্নপূরণের পথে এগোচ্ছে তারা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ফারিহার স্বপ্ন কি পূরণ হবে

বাবা ওমর ফারুক ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন যে আয় করেন, তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসারে দুই বেলা খাওয়াই কষ্টকর। তাই পড়ালেখার খরচ জোগাতে ফারিহাকে স্কুল ছুটির পর প্রতিদিন একজন উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠানে কাজ (চুল দিয়ে টুপি তৈরি) করতে হয়েছে। তা দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে হয়েছে তাকে।

ওমর ফারুক, ফারিহা আফরোজের বাবা ওয় ডাক্তার হবার চায়। কলেজোত ভর্তি হইবে; কিন্তু মোর ভাঙা ভ্যানোত দিন কামাই ৪০০ টাকা। এই টাকায় পেটের ভাত জোগাড় পাও না। ওক কলেজোত পড়াই কেমন করি কন?

এসএসসি পরীক্ষায় রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ফারিহা আফরোজ। তার বাড়ি তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামে। ফারিহাদের পরিবারের সম্বল বলতে চার শতক জমির ওপর টিনের বসতঘর।

বাবা ওমর ফারুক বলেন, ‘ওয় ডাক্তার হবার চায়। কলেজোত ভর্তি হইবে; কিন্তু মোর ভাঙা ভ্যানোত দিন কামাই ৪০০ টাকা। এই টাকায় পেটের ভাত জোগাড় পাও না। ওক কলেজোত পড়াই কেমন করি কন?’

ফারিহার মা সেলিনা বেগম গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে মেজ ফারিহা লেখাপড়া করে চিকিৎসক হতে চায়। সে বলে, ‘বাবার দিকে তাকালেই কষ্ট হয়। আমার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার; কিন্তু অভাবের সংসারে এ স্বপ্ন জানি না কতটুকু বাস্তবায়িত হবে।’

মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী স্মৃতি দেবনাথ এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। প্রাইভেট শিক্ষক তো দূরের কথা, গাইড বইও কিনতে পারেনি।

আনন্দের মধ্যেই দুশ্চিন্তা স্মৃতির

ভোরে ঘর থেকে বের হন বাবা। রাস্তার পাশে চা বিক্রি করে ফিরতে ফিরতে রাত। সেই আয়ে চলে চার সদস্যের সংসার। মাসে পাঁচ হাজার টাকা ঘরভাড়া, ছোট ছেলের পড়াশোনা আর অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ—সব মিলিয়ে সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। তাই মেয়ের পড়াশোনার জন্য আলাদা করে খরচ করার সামর্থ্য ছিল না।

এই প্রতিকূলতার মধ্যেও কেরানীগঞ্জের জিনজিরা পীর মোহাম্মদ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী স্মৃতি দেবনাথ এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। প্রাইভেট শিক্ষক তো দূরের কথা, গাইড বইও কিনতে পারেনি।

স্মৃতি বলে, ‘শিক্ষকেরা ক্লাসে যা পড়াতেন, বাসায় এসে সেগুলোই ভালোভাবে রিভিশন দিতাম। মাঝেমধ্যে সহপাঠীদের গাইড ফটোকপি করে পড়েছি। রেজাল্ট ভালো হয়েছে, এতে খুব আনন্দ লাগছে; কিন্তু এখন চিন্তা হচ্ছে—আরও পড়াশোনা করতে পারব কি না।’

জিনজিরার মালোপাড়া এলাকায় ছোট এক কক্ষের ভাড়া বাসায় বসবাস করে স্মৃতিদের পরিবার। তাঁর মা শিল্পী দেবী প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে আরও পড়াতে হবে; কিন্তু কলেজে ভর্তি, বই-খাতাসহ অন্যান্য খরচ চালানোর সামর্থ্য আমাদের নেই।’

স্মৃতির এমন সাফল্যে গর্বিত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাহমিনা আক্তারও। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করুক; সে জন্য সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

মো. সহিদুল ইসলাম, শিক্ষার্থী অনিক ইসলামের শিক্ষক ছেলেটা অনেক মেধাবী ও ভদ্র। এখানে আমরা তাকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলাম।

এক পোশাকে স্কুল পার অনিকের

বিদ্যালয় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে অনিক ইসলামের বাড়ি। প্রতিদিন হেঁটে তাকে বিদ্যালয়ে যাওয়া–আসা করতে হয়েছে। দিনমজুর বাবা নজরুল ইসলামের আয়ে সংসার চালিয়ে ছেলের পড়াশোনার জন্য কোনো টাকা অবশিষ্ট থাকত না। মা শেফালি বেগম তাই অন্যের গরু–ছাগল পালন করে যে বাড়তি আয় করতেন, তা খরচ করতেন ছেলের পড়াশোনার জন্য।

এভাবে অনেক কষ্টে লেখাপড়া করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের খাটুরিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের অনিক ইসলাম।

অনিকের মা শেফালি বেগম দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনিক যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তখন তার স্কুলের পোশাক বানিয়ে দিই। সে সময় প্যান্টের নিচের দিকে কাপড় বেশি রাখি। যখন সে বড় হয়, তখন একটু একটু করে খুলে দিই। শার্টে সাদা কাপড় জোড়া দিয়ে বড় করি। এভাবে এক পোশাকে তার স্কুল শেষ করেছে।’

অনিকের বড় ভাই সহির ইসলাম নীলফামারী সরকারি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। ছোট বোন নিঝুম আক্তার নার্সারিতে পড়ে। তাদের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বড় ছেলে টিউশনি করে ওর খরচ চালায়। এখন অনিকের পড়ার খরচ চালাব কেমন করে?’

অনিক খাটুরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলেটা অনেক মেধাবী ও ভদ্র। এখানে আমরা তাকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলাম।’

সালমাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় ধানগড়া এলাকায়। তার বাবা মো. জেল হোসেন সরকার তাঁত কারখানার মহাজনের কাছ থেকে কাপড় নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন। এতে যা আয় হয়, তাতে সংসার চালানোই কঠিন।

নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় সালমা

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে বড় বোন জেসমিন খাতুনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সালমা খাতুন পড়ালেখায় ভালো। তাই তাকে নিয়ে অনেক আশা দরিদ্র পরিবারটির। অদম্য সালমাও সেই আশার প্রতিদান দিয়ে চলেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

সালমাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় ধানগড়া এলাকায়। তার বাবা মো. জেল হোসেন সরকার তাঁত কারখানার মহাজনের কাছ থেকে কাপড় নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন। এতে যা আয় হয়, তাতে সংসার চালানোই কঠিন। তাই সালমা খাতুনের মা মোছা. গুলবাহার বেগম কারখানায় সুতা তোলার কাজ করেন। পড়াশোনার ফাঁকে মাকে এ কাজে সহায়তা করে সালমা।

সালমা বলে, ‘মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে যেভাবেই হোক পড়ালেখা শেষ করে ভালো কিছু করতে হবে।’

পরিবারের সবার আশা সালমা ভালো কিছু করতে পারবে। তার মা মোছা. ফুলবাহার বেগম বলেন, ‘মেয়েটা পড়ালেখায় খুব ভালো; কিন্তু ভালো একটা কলেজে ভর্তি করানো এবং খরচ জোগানো আমাদের জন্য খুব কঠিন।’

সালমা উপজেলা সদর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এমন মেধাবী ছাত্রীর জন্য হৃদয়বান মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে আশা করি।’

অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং বর্গাচাষি চাচার পিতৃস্নেহে সব বাধা পেরিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে তাসফিয়া আক্তার।

চাচার পিতৃস্নেহে বাধা পেরোচ্ছে তাসফিয়া

শৈশব থেকেই মা–বাবার স্নেহ পায়নি। জীবনের পরতে পরতে ছিল অভাব আর চরম প্রতিকূলতা; কিন্তু কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং বর্গাচাষি চাচার পিতৃস্নেহে সব বাধা পেরিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে তাসফিয়া আক্তার।

২০১০ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালীর হাতিয়ার রেহানিয়া গ্রামে জন্ম তাসফিয়ার। মাত্র ৯-১০ মাস বয়সে তার মা–বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তী সময়ে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ২০২১ সালে তিনি মারা যান। সেই সংকটে তাসফিয়ার মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়ান চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াস। নিজের সামান্য বর্গা চাষ এবং অন্যের জমিতে মজুরি খেটে নিজের এক কন্যাসন্তানের পাশাপাশি তাসফিয়াকেও আগলে রাখেন তিনি।

তাসফিয়ার এই সাফল্যে পরিবারের পাশাপাশি এলাকার মানুষও আনন্দিত। চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘বাবা-মা না থাকার কষ্ট হয়তো দূর করতে পারব না; কিন্তু অভাবের মধ্যেও তাকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছি। সে জিপিএ-৫ পাওয়ায় আমাদের সব কষ্ট সার্থক হয়েছে।’

তাসফিয়া প্রথম আলোকে বলে, ‘ভবিষ্যতে আমি শিক্ষক হতে চাই, যাতে আমার মতো কষ্টে থাকা শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পারি।’

রেহানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র দাস বলেন, ২০১৮ সাল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শুরু হয়। সেই থেকে তাসফিয়াই প্রথম জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে।

জরাজীর্ণ ঘর থেকে জিপিএ-৫ পূজার

বাবা দিনমজুর। জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। এমন পরিবারের মেয়ে পূজা বিশ্বাস এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তবে মেয়ের সেই স্বপ্ন পূরণে উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার।

পূজা নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের নলদীরচর গ্রামের দিনমজুর নিত্য গোপাল বিশ্বাস ও গৃহিণী দীপ্তি বিশ্বাসের মেয়ে। সে নড়াইল সদর উপজেলার কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল।

তিন ভাইবোনের মধ্যে সে সবার বড়। ছোট ভাই পার্থ ও বোন প্রতিভা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। পূজা বলে, ‘আমার মা-বাবা এবং বিদ্যালয়ের স্যারেরা আমাকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। এ কারণেই ভালো ফল করতে পেরেছি। আমার ইচ্ছা ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়া। চিকিৎসক হয়ে দেশ ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চাই।’

দীপ্তি বিশ্বাস, শিক্ষার্থী পূজা বিশ্বাসের মাতিনটি ছেলেমেয়ের পড়ালেখার ব্যয় অনেক। পূজার ফলাফলে আমি ভীষণ খুশি। মেয়েটাকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা।

মেয়ের সাফল্যে খুশি মা দীপ্তি বিশ্বাস। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনটি ছেলেমেয়ের পড়ালেখার ব্যয় অনেক। পূজার ফলাফলে আমি ভীষণ খুশি। মেয়েটাকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা।’

পূজার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর গোলদার বলেন, আর্থিক সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে পূজা লেখাপড়ায় আরও ভালো করবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন ‎নিজস্ব প্রতিবেদক, নোয়াখালী, প্রতিনিধি, নীলফামারী, যশোর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জতারাগঞ্জ, রংপুর]

Read full story at source