লটকন টিয়া উল্টো ঝুলে ঘুমায় কেন
· Prothom Alo

লটকন টিয়াকে খুঁজে পেতে হলে ওপরে তাকানোর আগে কান পাততে হয়। শব্দটা আসে পাতার আড়াল থেকে, তীক্ষ্ণ শিসের মতো, তারপর হঠাৎ থেমে যায়। সিলেট বা চট্টগ্রামের টিলাবহুল বনে হাঁটতে গেলে এই থামা-চলা শব্দটাই প্রথম সংকেত।
Visit h-doctor.club for more information.
বৈজ্ঞানিক নাম Loriculus vernalis। বাংলায় বাসন্তী লটকনটিয়া, কোথাও ঝুলন টিয়া বা সুখপাখি। দৈর্ঘ্য মেরেকেটে ১৪ সেন্টিমিটার আর ওজন ৩০ গ্রামের কাছাকাছি। একটা মাঝারি লেবুর ওজন। বাংলাদেশের ছয় প্রজাতি টিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ছোট এই লটকন টিয়া। রং গাঢ় সবুজ। বনের পাতার সঙ্গে প্রায় নিখুঁতভাবে মিশে যায়। পিঠের নিচের দিকে একটা লাল ছোপ থাকে, উড়ন্ত অবস্থা ছাড়া সহজে সেটা চোখে পড়ে না।
একা থাকা এদের ধাতে নেই বললেই চলে। ছোট দলে ঘোরে। সাধারণত ৫ থেকে ১২টার মতো পাখি একসঙ্গে থাকে। জোড় বাঁধার পর সেই সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি হয়। পালক পরিষ্কার করে দেওয়া থেকে খাবার খোঁজা পর্যন্ত জোড় বেঁধে করে এরা। সহজে সম্পর্ক ভাঙে না এদের। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্রান্সিন বাকলি ১৯৬৮ সালে এই প্রজাতির আচরণ নিয়ে যে গবেষণা করেছিলেন, সেখানে দলের ভেতরকার হুমকি দেওয়ার ভঙ্গির কথা লেখা আছে। খাবারের জায়গা বা বিশ্রামের ডাল নিয়ন্ত্রণ হয় এভাবেই। শারীরিক সংঘর্ষে এরা তেমন জড়ায় না। শুধু হুমকি দেয়।
বাথরুমে টুথব্রাশ খোলা অবস্থায় রাখা কি স্বাস্থ্যকরউড়ালটা দেখার মতো। ঝাঁক থেকে হঠাৎ একটা পাখি ছুটে ওঠে ঘন সবুজের ভেতর দিয়ে সরু তীরের মতো গতিতে, বাকিরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পেছনে। ডানার ঝাপটা দ্রুত ও ছোট। দূর থেকে দেখলে মনে হয় একঝাঁক পোকা উড়ছে গাছের মাথার ওপর দিয়ে। ফাঁকা আকাশ এড়িয়ে চলে। গাছের ডালপালার নিচ দিয়েই বেশি ওড়ে। শিকারি পাখির চোখ ফাঁকি দেওয়ার একটা উপায় সম্ভবত। একই গাছে দিনের পর দিন ফিরে আসার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়, বিশেষ করে ফুল-ফলে ভরা গাছে।
খায় ফুলের মধু, কচি পাতা, বুনো ফল। মাঝেমধ্যে ছোট পোকামাকড়ও, যদিও সেটা মূল অভ্যাস নয়। খাওয়ার ভঙ্গিটা অ্যাক্রোবেটিক। একপায়ে ডাল আঁকড়ে ধরে শরীর উল্টে ফেলে, মাথা নিচু করে ফুলের ভেতর ঠোঁট ঢুকিয়ে দেয়। এই উল্টো হয়ে ঝোলার অভ্যাসটাই এদের নামের মধ্যেও ঢুকে গেছে। হ্যাঙ্গিং প্যারট।
ঘুমের সময়েও একই উল্টো ভঙ্গি, আর এখানেই এরা আলাদা। পৃথিবীর কোনো পাখি প্রজাতি মাথা নিচের দিকে দিয়ে বাদুড়ের মতো ঝুলে ঘুমায় না। লরিকুলাস গণের ১৫টি প্রজাতি বাদে। রাতে পাতার ভেতর ঝুলে থাকা এই ভঙ্গি আসলে ছদ্মবেশ। সবুজ শরীর। মাথা নিচু। পা দিয়ে ডাল ধরা। এসব শব্দ দূর থেকে শুকনা পাতার বলেই মনে হয়। শিকারি প্যাঁচা, বাজপাখির চোখ এড়ানোর জন্য এমন করে। মলত্যাগের সময় একপায়ে ভর দিয়ে লেজ পেছনে ঘুরিয়ে নেয়। পালক যেন নোংরা না হয়। বাকলির গবেষণায় এই অংশ বেশ মজা করেই লেখা।
অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ডের চেয়ে কি ২ জন বাস্তব বন্ধু বেশি ভালোবাসা নিজে খোঁড়ে না এরা। পুরোনো কাঠঠোকরার গর্ত বা প্রাকৃতিকভাবে পচে যাওয়া গাছের কোটর বেছে নেয়। উচ্চতা মাঝারি, খুব ওপরেও না আবার মাটির কাছেও না। জায়গা পছন্দ হলে দুজনে মিলে ভেতরটা কিছুটা গুছিয়ে নেয় মাত্র, জটিল কাঠামো তৈরি করে না অন্য অনেক পাখির মতো। ডিম পাড়ে দুই থেকে চারটা, সাদা আর গোলগাল। তা দেওয়ার কাজ দুজনে ভাগ করে নেয় পালা করে, ১৪ থেকে ১৭ দিনে ডিম ফোটে। ছানারা প্রথমে অন্ধ, অসহায়, বাকি সব টিয়ার মতোই। ১৮ থেকে ২২ দিনের মাথায় নিজেরাই হেঁটে বাসার মুখে উঠে বসতে শেখে।
এই লম্বা শৈশব, দুই থেকে তিন মাস মা–বাবার যত্নে থাকা আর গিলে নেওয়া খাবার আবার বমি করে খাওয়ানো, এর একটা যোগসূত্র আছে টিয়া প্রজাতির বড় মগজের সঙ্গে। বড় মগজ মানে জটিল আচরণ শেখার ক্ষমতা, শব্দ অনুকরণের দক্ষতাও তার সঙ্গে জড়িত কিছুটা। লটকন টিয়া মানুষের কথা নকল করে না চন্দনা টিয়ার মতো। তবে নিজেদের শিসের ভাষা জটিল বেশ। ঝাঁকের সংহতি ধরে রাখা আর বিপদের সংকেত একই ধরনের ডাক দিয়ে চলে।
আইইউসিএনের সবশেষ মূল্যায়নে সংকটমুক্ত বলা হয়েছে একে, তবে সংখ্যা কমছে বলে ধারণা। গত ১০ বছরে হয়তো ১ থেকে ১৯ শতাংশ। কারণটা অনুমান করা কঠিন নয়, পুরোনো গাছের কোটর কমছে আর সেটাই এদের বাসার একমাত্র ভরসা। বাংলাদেশে আবাস মূলত বৃহত্তর সিলেট আর চট্টগ্রামের টিলা-পাহাড়ি অংশে, সমতলে দেখা মেলে না প্রায়ই। বনের গভীরতা কমলে বা পুরোনো গাছ কাটা পড়লে যে কোটর বছরের পর বছর ধরে টিয়া, ফিঙে, হুদহুদসহ নানা পাখির আশ্রয় হয়ে থাকে, সেটাই হারায় সবার আগে।
সিলেটের কোনো টিলার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিকেলবেলা মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক ছোট সবুজ ছায়া ছুটে গেলে, প্রায় নিঃশব্দে, বুঝে নিতে হবে সেটাই লটকন। বেশিক্ষণ থামে না একজায়গায়, ফুলভরা গাছ পেলে হয়তো মিনিট দশেক। রাতে খুঁজতে গেলে অন্য গল্প—ঘন পাতার আড়ালে উল্টো ঝুলে থাকা একটা সবুজ পুঁটলি, নিঃসাড়, প্রায় অদৃশ্য, যতক্ষণ না জানা থাকে, ঠিক কী খোঁজা হচ্ছে।
সূত্র: মাই বার্ড বাডি, বার্ড নোটচাঁদ কীভাবে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা ঘটায়