হাসিনার প্রেস কনফারেন্স ও ভারতের দায়িত্ব অস্বীকার

· Prothom Alo

ইংরেজিতে ‘প্লজিবল ডিনায়াবিলিটি’ বা ‘দায়িত্ব অস্বীকার’ বলে একটি ধারণা আছে। এর পাঠ্যবই সংজ্ঞা হলো—কোনো ব্যক্তি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান বিতর্কিত, বেআইনি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞান বা দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে, কারণ তাদের সঙ্গে ওই কর্মকাণ্ডের সরাসরি, স্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ থাকে না। এতে নেতৃত্বকে সচেতনভাবে ‘অবগত না থাকা’ বা ‘দূরত্ব বজায় রাখা’ অবস্থানে রাখা হয়।

এই ধারণার বিস্তৃত ব্যাখ্যায় বলা হয়, এমন পরিস্থিতিতে যোগাযোগ সাধারণত অস্পষ্ট, ইঙ্গিতপূর্ণ বা অলিখিত অবস্থায় হয়। অর্থাৎ মৌখিক সম্মতি, মাথা নাড়া বা চোখ টেপার মাধ্যমে যোগাযোগ হয়, যাতে অধস্তনরা কোনো কাগজপত্র ছাড়াই কাজটি সম্পন্ন করতে পারে।

Visit palladian.co.za for more information.

যদি অপারেশনটি প্রকাশ পায়, নেতৃত্ব তখন বিশ্বাসযোগ্যভাবে অজ্ঞতার দাবি করতে পারে এবং দোষ চাপিয়ে দিতে পারে ‘দুর্বৃত্ত’ এজেন্ট বা নিম্নপদস্থ কর্মীদের ওপর। ঐতিহাসিকভাবে, এই কৌশল বিদেশে গোপন অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে রাষ্ট্র বা নির্বাহী শাখা ধরা পড়লেও দায় অস্বীকার করতে পারে।

যে কারণে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না ভারত

সম্প্রতি ভারতের ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব নিউ দিল্লির আয়োজনে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল (অডিও) প্রেস কনফারেন্সটি ভারতের পক্ষ থেকে দায়িত্ব অস্বীকারের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রেস কনফারেন্সে কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে এবং সংগঠনটিকে ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠান’ বলে দাবি করেছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান কতটা বেসরকারি বা কতটা বিদেশি?

ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি) দিল্লিভিত্তিক একটি সংগঠন, যা প্রায় পাঁচ শ সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীকে নিয়ে গঠিত—যাঁরা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান ও তিব্বত কাভার করেন। ক্লাবের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি শুরু হয়েছিল বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের মাধ্যমে; তবে বর্তমানে স্থানীয় পত্রিকা, টিভি ও ম্যাগাজিনের সাংবাদিকরাও এর সদস্য। এ ছাড়া কূটনীতিক, আইনজীবী, এনজিও ও করপোরেট মিডিয়া-সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও সহযোগী সদস্য হতে পারেন।

ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি দলকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন দলটি ছিন্নভিন্ন—নেতারা ছুটোছুটি করছেন। দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলটি আজ ভেঙে পড়েছে ‘হাসিনা ইফেক্ট’-এর কারণে। এটি শুধু তাঁর ভাবমূর্তিই নয়, দলের বহু নেতার ভাবমূর্তিও নষ্ট করেছে। তাঁর প্রেস কনফারেন্সে দেশে ফেরার ঘোষণা এখন অনেকটাই ফাঁপা শোনায়। কারণ, তাঁর নিজের দলই আজ তাঁকে ঘিরে দাঁড়াতে পারছে না।

অর্থাৎ এই ক্লাবের ‘বিদেশি’ পরিচয়টি মূলত নামেই। বাস্তবে এটি দিল্লির বাসিন্দাদের একটি সংগঠন। প্রায় পাঁচ শ সদস্যের মধ্যে কিছু বিদেশি সাংবাদিক থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠই ভারতীয়। এর নির্বাহী কমিটিও মূলত ভারতীয়দের নিয়েই গঠিত। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমান সভাপতি সিরিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক ওয়াইল আউয়াদ; আর সম্পাদক ভারতীয় সাংবাদিক প্রকাশ নন্দা।

ভারত সরকার এই অনুষ্ঠানকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন বলে দায় এড়ালেও বাস্তবতা হলো—এটি মূলত ভারতীয় সাংবাদিকদেরই সংগঠন। প্রশ্ন হলো, এত বড় সংখ্যক ভারতীয় সাংবাদিকের একটি সংগঠন কি ভারতের সরকারি অনুমতি ছাড়া অন্য দেশের এক পলাতক রাজনৈতিক নেত্রীকে নিয়ে এমন রাজনৈতিক অনুষ্ঠান করতে পারে? এটি কি রাজনৈতিক ছদ্মবেশ, নাকি দুর্বল প্রতিবেশীর প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করার এক প্রকাশ্য উদাহরণ?

ভারত সরকার চাইলে সহজেই এই উসকানিমূলক অনুষ্ঠানটি বন্ধ করতে পারত। কিন্তু তারা বেছে নিল প্রচলিত রাজনৈতিক কৌশল—প্লজিবল ডিনায়াবিলিটি। কারণ, অনুষ্ঠানটি হয়েছে বেসরকারি সংগঠনের আয়োজনে। বাংলাদেশের অনুরোধ উপেক্ষা করে এই অনুষ্ঠান করলে দুই দেশের নাজুক সম্পর্ক আরও বিপন্ন হবে—এমন আশঙ্কা ছিলই। তারপরও ভারত সে অনুরোধ উপেক্ষা করল।

এই প্রেস কনফারেন্সে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে—তিনি ভারতে মানবিক কারণে অবস্থান করছেন এবং ভারতীয় আইন রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় না। কংগ্রেস এমপি শশী থারুরের নেতৃত্বে প্রকাশিত ‘দ্য ফিউচার অব ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ রিলেশনশিপ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে ভারতে অবস্থান করছেন; তবে সরকার তাঁকে কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা ভারতীয় ভূখণ্ডে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেয় না।’ এই নীতিকে বলা হয়েছে: ‘হিউম্যানিটারিয়ান রিফিউজ, নো পলিটিক্যাল স্পেস।’

কিন্তু এই ‘সরকারি অবস্থান’ সত্ত্বেও প্রেস কনফারেন্সটি অনুষ্ঠিত হলো এবং শেখ হাসিনা সেখান থেকে তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন। তিনি যে দেশে মানবিক আশ্রয়ে আছেন, সেই দেশেই তিনি রাজনৈতিক মঞ্চ পেলেন—ভারতীয় সংসদের ঘোষণার সম্পূর্ণ বিপরীতে। তিনি যে দেশে ফেরার আগেই মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত, সেই দেশ থেকে পালিয়ে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিলেন। ভারত সরকার প্লজিবল ডিনায়াবিলিটির আড়ালে থাকতে পারে, কিন্তু তাদের আশ্রিত নেত্রী দেখিয়ে দিলেন—এই আশ্রয়ই তাঁর রাজনৈতিক মঞ্চ।

শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্স দুটি বিষয় স্পষ্ট করে। প্রথমত, তিনি এখনই রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, তিনি তাঁর দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে চান। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফাঁক রয়েছে। তাঁর সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তা এখনো দেশের জনমনে প্রবল। তিনি যতই দৃঢ়ভাবে বলুন যে তিনি দেশে ফিরে দণ্ডের বিরুদ্ধে লড়বেন, তাঁকে জনরোষের বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হবে।

ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি দলকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন দলটি ছিন্নভিন্ন—নেতারা ছুটোছুটি করছেন। দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলটি আজ ভেঙে পড়েছে ‘হাসিনা ইফেক্ট’-এর কারণে। এটি শুধু তাঁর ভাবমূর্তিই নয়, দলের বহু নেতার ভাবমূর্তিও নষ্ট করেছে। তাঁর প্রেস কনফারেন্সে দেশে ফেরার ঘোষণা এখন অনেকটাই ফাঁপা শোনায়। কারণ, তাঁর নিজের দলই আজ তাঁকে ঘিরে দাঁড়াতে পারছে না।

জিয়াউদ্দিন চৌধুরী লেখক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source