বাড়িওয়ালা

· Prothom Alo

চৌধুরী সাহেবের মেজাজ খারাপ। তার দামি টাইলসের ঘরে কাদামাখা খালি পায়ে একটা বাচ্চা ছেলে ঢুকে পড়েছে। সঙ্গে বাচ্চাটার বাবা ছিল। কোন আক্কেলে সে তার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিল, কিছুতেই বুঝে আসে না। বাড়ির দারোয়ান ও চাকরবাকর মিলে বাচ্চার বাবাকে এ অপরাধে বেদম প্রহার করেছে। লোকটা বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে। এ অবস্থাতেই বাড়ির সামনে একটা গাছের সঙ্গে তাদের বেঁধে রাখা হয়েছে। লোকটা অজ্ঞান অবস্থায় পানি পানি বলে চিৎকার করছে। বাচ্চা ছেলেটা পাশে বসে তার বাবাকে ডাকছে—

‘ও বাজান, বাজান, তোমার কী হইসে, বাজান?’

Visit biznow.biz for more information.

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

চৌধুরী সাহেব এলাকার নামীদামি ব্যক্তিত্ব। তার দাদা ছিল ব্রিটিশ আমলের জমিদার। বংশপরম্পরায় তার শরীরে জমিদারি রক্ত। শেরেবাংলা চাষাভূষাদের নিয়ে জমিদারিপ্রথা বাতিল করেছিলেন। তাই এখন আর জমিদারি নেই, তবে সে রক্ত আছে। রক্ত দেহের মধ্যে টগবগ করে ফুটে। রক্তের গরমে আশপাশের মানুষগুলোকে এখনো প্রজা ভাবতেই পছন্দ করেন চৌধুরী সাহেব। তার দর্শন হচ্ছে, প্রজা প্রজার জায়গায় থাকবে। প্রজা থাকবে রাজার পায়ের কাছে, তার পাশের চেয়ারে নয়। তাই কোনো প্রজার ছেলে রাজার বাড়ির টাইলস নোংরা করবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। এর শাস্তি, অন্তত দুদিন বাপ–বেটাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখতে হবে।

রহমত ও তার ছেলে সকালে বাজারে যাচ্ছিল। রহমত একজন রাজমিস্ত্রি। প্রায় সারা বছরই সে কাজে–কর্মে ব্যস্ত থাকে। ছেলেকে তেমন সময় দিতে পারে না। আজ অনেক দিন পর সে কিছুটা সময় পেয়েছে। তাই ছেলেকে নিয়ে একটু বাজারে যাচ্ছিল। উদ্দেশ্য, সংসারের কিছু কেনাকাটা করা। রাজমিস্ত্রি হিসাবে রহমতের একটা আক্ষেপ আছে। জীবনে কত বড় বড় দালান কোঠা সে নির্মাণ করেছে, অথচ সে নিজে থাকে একটা ভাঙা বাড়িতে। সারা জীবন অন্যের ঘর গড়ে দিল; কিন্তু নিজের ঘরটাই গড়া হলো না তার। সে নিজেকে মৌমাছির মতো মনে করে। মৌমাছি ফুল থেকে তিলে তিলে মধু বানায়, অথচ সে মধু নিজে ভোগ করতে পারে না। তেমনি রহমত জীবনে কত বড় বড় দালান কোঠা বানাল, অথচ এক রাত সেই দালান কোঠার ভেতরে নরম বিছানায় কাটানোর ভাগ্য তার হয়নি। দারিদ্র্য তাকে সে সুযোগ দেয়নি।

‘বাজান, চৌধুরী বাড়ির বড় দালানটা নাকি তুমি বানাইছ?’

‘হ বাজান, আমি বানাইছি।’

‘এত বড় দালান তুমি কেমনে বানাইলা?’

‘এইডাই তো আমার কাম, বাজান।’

‘বাজান, আমগো লাইগ্যা তো তুমি ঘর বানাও না। ভাঙা ঘরে কত কষ্ট কইরা থাকি আমরা। তুমি কেমন মিস্ত্রি, বাজান? নিজের ঘরের খবর নাই, পরের ঘর নিয়া পইরা থাকো।’

রহমত জবাব দেয় না। চুপচাপ হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে পড়ে তারা।

‘বাজান, আমি বাড়িটা একটু দেখুম।’

‘না বাজান। এটা জমিদারবাড়ি। এইখানে যখন–তখন ঢুকন যায় না।’

‘না, আমি ঢুকুম। আমার বাজান যেই বাড়ি বানাইছে, সেই বাড়ি আমি একটু কাছ থেইক্কা দেখমু।’ বলেই সে এক দৌড়ে প্রকাণ্ড গেট পার হয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

রহমত ছেলেকে থামানোর চেষ্টা করে; কিন্তু ততক্ষণে সে চৌধুরী সাহেবের প্রকাণ্ড দালানের বারান্দায় গিয়ে পৌঁছেছে। পড়বি পর মালির ঘাড়েই। চৌধুরী সাহেব তখন দোতলা থেকে মাত্র নিচে নেমেছেন। নিচে নেমে এ দৃশ্য দেখার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। একটা ছোট লোকের বাচ্চা তার বাড়ি নোংরা করবে, বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না তিনি।

সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। রহমতের জ্ঞান ফিরেছে। প্রচণ্ড ক্ষুধা ও পিপাসায় তার পেট চোঁ–চোঁ করছে। ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে তার পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে। এত মামুলি অপরাধে এত বড় শাস্তি। কিছুই করার নেই। শাস্তি ভোগ করতে হবে। চৌধুরী সাহেব আজ বেমালুম ভুলে গেছেন রহমতের কথা। অথচ মাসের পর মাস গায়ে খেটে রহমত এ বাড়ি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। আসলে বড়লোকদের খেয়াল বড় অদ্ভুত। টাকা দিয়েই তারা মানুষকে মাপে। হঠাৎ বাইরে গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে। দারোয়ান গেট খুলে দেয়। একটা সাদা প্রাইভেট কার রহমতের সামনে এসে থামে। চৌধুরী সাহেবকে তার চাকরবাকরসহ হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামতে দেখা যায়। একজন সুদর্শন যুবক গাড়ি থেকে নামে। রহমত ছেলেটাকে চিনতে পারে। চৌধুরী সাহেবের একমাত্র ছেলে। ঢাকাতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। সে গাড়ি থেকে নেমেই রহমতকে দেখতে পায়।

‘রহমত চাচা না? বাবা, ওনাকে এভাবে বেঁধে রেখেছ কেন?’

‘এসব গ্রামের ব্যাপার, তুমি ওপরে চলো। এটা আমার বিষয়, আমি দেখব।’

‘কী বলছ বাবা, এসব? রহমত চাচা, আপনি কী করছেন?’

‘অন্যায় করেছি, বাজান।’

‘কী অন্যায় করেছেন?’

‘আমার পোলায় আপনাগো বারান্দায় ঢুকছে, তার পায়ের ময়লা আপনাদের বারান্দায় লাগছে, তাই এ শাস্তি।’

‘ছিঃ বাবা, তুমি একটা বাচ্চা ছেলের অবুঝ কাজের জন্য তাকে ও তার বাবাকে এভাবে বেঁধে রেখেছ।’

‘দেখো, জমিদার ও প্রজার মধ্যে একটা ব্যবধান থাকা উচিত, সেটা ওরা বুঝতে পারেনি। তাই বোঝানোর ব্যবস্থা করেছি।’

‘কিন্তু বাবা, আমরা তো এখন আর জমিদার না আর তারাও আমাদের প্রজা না।’

‘কিন্তু আমাদের রক্ত জমিদারের রক্ত। জমিদারি নেই, কিন্তু জমিদারের রক্ত আছে।’

‘এ রক্ত দূষিত রক্ত, বাবা। এ রক্ত শোষকের রক্ত। আমি এ রক্ত পরিশোধন করতে চাই।’

এতক্ষণে রহমতের ছেলে জেগে উঠেছে।

‘তুমি কেন এসেছিলে এখানে?’

‘বাবায় কইছে, এই দালান নাকি হেয় নিজের হাত দিয়া বানাইছে, তাই দেখতে আইছিলাম।’ চৌধুরীর সাহেব খেপে যান। ‘ছোটলোকের বাচ্চা, তোর বাবা ছিল সামান্য মিস্ত্রি। এর বেশি কিছু না। এই জন্য তুই আমার বাড়ি নোংরা করবি।’

‘না বাবা, তোমার কথা ঠিক নয়। শুধু মিস্ত্রি বলে তুমি রহমত চাচার অবদান অস্বীকার করতে পারো না। তোমার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। এ বাড়ির মালিক হতে পারো তুমি। তোমার সঙ্গে এ বাড়ির মালিকানার সম্পর্ক; কিন্তু রহমত চাচার সঙ্গে এ বাড়ির সম্পর্ক সন্তানের। সে নিজ মমতায় দিনের পর দিন এ বাড়ির প্রতিটি ইট গেঁথেছে।’

‘বাবা, তুমি তো তাজমহল দেখেছ?’

‘হুম, দেখেছি। সম্রাট শাহজাহান গড়ে তুলেছেন।’

‘বাবা, তাজমহল দেখে আমি অবাক হই। কী বিস্ময়জাগানিয়া সৌন্দর্য; কিন্তু বাবা, আমি আরও অবাক হই তাদের কথা চিন্তা করে, যে শ্রমিকেরা এটা গড়ে তুলেছে। সে অদেখা শ্রমিকেরা আমার কাছে তাজমহলের চেয়ে বেশি বিস্ময়ের। বাবা, রহমত চাচাকে দেখে তোমার মনে কি সে বিস্ময় জাগে না? তোমার এ প্রসাদসম অট্টালিকা দেখে যখন মানুষ মুগ্ধ হয়, তখন আমি এ রহমত চাচাকে দেখে মুগ্ধ হই। কত সাধারণ অথচ কত বিস্ময়কর মানুষ তিনি! কী নিপুণ দক্ষতায় তিনি গড়ে তুলেছেন এ বিশাল অট্টালিকা। কটা টাকা দিলেই এর পারিশ্রমিক শেষ হয়ে যায় না, বাবা। তার কাজের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত, সেটা টাকা দিয়ে নয়; বরং তাকে সম্মান দিয়ে।’

চৌধুরী সাহেব কাঁদছেন। সত্যিই তো, এমনভাবে তো তিনি ভাবেননি। এ বাড়ির মালিক তিনি, কিন্তু এ বাড়ি তো গড়ে তুলেছে এই রহমত, যাকে তিনি বেঁধে রেখেছেন। এ বাড়ি তো তার কাছে সন্তানতুল্য; অথচ তাকেই কিনা তিনি বেঁধে রেখেছে বাড়ি নোংরা করার অপরাধে।

‘দারোয়ান, রহমত ও তার ছেলের বাঁধন খুলে দাও। রহমত, আমাকে মাফ করে দাও, ভাই। আমি অন্যায় করেছি। তোমার ছেলেকে নিয়ে যাও, ওকে দেখাও তার বাবা নিজ হাতে কী বিশাল বাড়ি নির্মাণ করেছে। এটা কম গৌরবের নয়। ওর বাবার গৌরব দেখে তার মনেও বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষা জাগুক। যাও, ভেতরে যাও, রহমত। বাবুর্চি, টেবিলে ভাত দাও। আমাদের সঙ্গে রহমত ও তার ছেলে খাবে।’

রহমতের ছোট ছেলেটা দৌড়ে বাড়িতে প্রবেশ করে। তার বাবার হাতে নির্মিত এ বাড়ি তাকে মুগ্ধ করে।

  • লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শরীয়তপুর

Read full story at source