এক কাপ কফি তৈরিতে কত লিটার পানি লাগে

· Prothom Alo

সকালের প্রথম কাপ কফি হাতে নিয়ে যখন কেউ জানালার পাশে দাঁড়ায়, তার চোখে ভাসে বাষ্পের একটি পাতলা রেখা। কাপের ভেতরে পানি থাকে বড়জোর ২০০ মিলিলিটার। অথচ সেই কাপ টেবিলে পৌঁছানোর আগেই পৃথিবীর কোনো এক পাহাড়ি ঢালে একটি নদীর সমান পানি খরচ হয়ে গেছে!

সংখ্যাটা শুনলে থমকে যেতে হয়। ২০০৩ সালের এক গবেষণা বলছে, এক কাপ কফি তৈরি করতে লাগে প্রায় ১৪০ লিটার পানি। এই হিসাবটি এত বেশিবার উদ্ধৃত হয়েছে যে এটি এখন প্রায় ধ্রুব সত্যের মতো ধরে নেওয়া হয়। ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের এই গবেষণাটিই মূলত পুরো বিশ্বে কফির ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট নিয়ে যাবতীয় আলোচনার মূল ভিত্তি। জাতিসংঘও তাদের প্রতিবেদনে একই সংখ্যা ব্যবহার করে।

Visit h-doctor.club for more information.

অন্যান্য খাবারের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এক কাপ চায়ে লাগে ৩০ লিটার পানি, একটি কমলালেবুতে ৫০ লিটার, একটি আপেলে ৭০ লিটার এবং এক টুকরো রুটিতে লাগে ৪০ লিটার পানি। এই তালিকায় কফি বেশ ওপরের দিকেই রয়েছে। মাংস কিংবা পনিরের তুলনায় কম হলেও একটি সাধারণ পানীয়ের জন্য এই সংখ্যাটা বেশ অস্বাভাবিক।

কিন্তু এত পানি কোথায় যায়? কাপে ঢালা তরলটুকু তো সামান্যই। এই রহস্যের সমাধান লুকিয়ে আছে কফিগাছের গোড়ায়, মাটির নিচে।

কফির রসায়ন
এক কাপ চায়ে লাগে ৩০ লিটার পানি, একটি কমলালেবুতে ৫০ লিটার, একটি আপেলে ৭০ লিটার এবং এক টুকরো রুটিতে লাগে ৪০ লিটার পানি। এই তালিকায় কফি বেশ ওপরের দিকেই রয়েছে।

গাছ যেখানে পানি টানে

কফিগাছ বেড়ে ওঠে ইথিওপিয়া, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম কিংবা কলম্বিয়ার পাহাড়ি ঢালে; এমন জায়গায়, যেখানে বৃষ্টি আর মাটির আর্দ্রতাই প্রধান ভরসা। একটি কফি চেরি পাকতে সময় লাগে মাসের পর মাস। এই দীর্ঘ সময়ে গাছ প্রতিনিয়ত শোষণ করে চলে বৃষ্টির পানি, মাটির নিচের জলীয় অংশ ও বাতাসের আর্দ্রতা। বিজ্ঞানীরা একে বলেন সবুজ পানি; যে পানি সরাসরি সেচ থেকে আসে না, আসে প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্র থেকে।

এখানেই লুকিয়ে আছে হিসাবের আসল জটিলতা। ২০০৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, কফির মোট ওয়াটার ফুটপ্রিন্টের ৯৯ শতাংশেরও বেশি আসে শুধু গাছ বেড়ে ওঠার পর্যায় থেকে। প্রক্রিয়াজাতকরণের ভূমিকা সেখানে নগণ্য। কাপে যে পানি ঢালা হয়, সেটি পুরো হিসাবের একটি ছোট অংশ মাত্র। বেশির ভাগ পানিই খরচ হয়ে যায় মাটি ও বাতাসের মধ্যে, একদম চোখের আড়ালে।

সমালোচকেরাও অবশ্য থেমে নেই। কয়েকজন গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন, এই সবুজ পানি আর সেচের পানিকে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপাটা কতটা যুক্তিসংগত। এই পদ্ধতিতে জলচক্রের মৌলিক বিষয়গুলো, বিশেষ করে সবুজ পানির ভূমিকা পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয় না। বৃষ্টির পানি যেখানে এমনিতেই মাটিতে পড়ত, সেটিকে কফিগাছের খরচ বলে গণ্য করা কতটা সঠিক, এই তর্ক এখনো পানিবিজ্ঞানের বৃত্তে চলমান।

কালো কফি সুস্বাদু, নাকি দুধ কফি
একটি কফি চেরি পাকতে সময় লাগে মাসের পর মাস। এই দীর্ঘ সময়ে গাছ প্রতিনিয়ত শোষণ করে চলে বৃষ্টির পানি, মাটির নিচের জলীয় অংশ ও বাতাসের আর্দ্রতা। বিজ্ঞানীরা একে বলেন সবুজ পানি।

প্রক্রিয়াজাত করার ধাপে

চাষের পর আসে প্রক্রিয়াকরণের ধাপ। এর দুটি পথ—ভেজা ও শুকনো পদ্ধতি। ভেজা পদ্ধতিতে চেরি থেকে বীজ আলাদা করা, গেঁজানো এবং তারপর ধোয়া—এর প্রতিটি ধাপেই পানি লাগে। অন্যদিকে শুকনো পদ্ধতিতে চেরি গোটাটাই রোদে শুকানো হয়, তাই পানির প্রয়োজন অনেক কম। এক কেজি কফি শুকনো পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করতে লাগে মাত্র এক থেকে দুই লিটার পানি।

মজার ব্যাপার হলো, সামগ্রিক জলছাপের হিসাবে এই দুই পদ্ধতির পার্থক্য খুব একটা বড় নয়। কারণ, গাছের বেড়ে ওঠার পর্যায়ের তুলনায় প্রক্রিয়াকরণের পানি এতই কম যে তা মোট সংখ্যার কাছে প্রায় হারিয়ে যায়।

তারপর রোস্টিং। এটি আগুনের কাজ, পানির নয়। এরপর ব্রুয়িংয়ের সময় আবার পানির প্রয়োজন হয়। এক কাপ সাধারণ কফি বানাতে লাগে ১০০ থেকে ২০০ মিলিলিটার পানি; যা নির্ভর করে কফির কড়া ভাব ও প্রস্তুতপ্রণালির ওপর। পানির এই সামান্য অংশটুকুই আমরা চোখে দেখি, হাতে ধরি বা ঠোঁটে ছোঁয়াই। বাকি সব ঘটে যায় দূরের কোনো পাহাড়ে, আমাদের অগোচরে।

চা পান করা ভালো নাকি কফি
ভেজা পদ্ধতিতে চেরি থেকে বীজ আলাদা করা, গেঁজানো এবং তারপর ধোয়া—এর প্রতিটি ধাপেই পানি লাগে। আর শুকনো পদ্ধতিতে চেরি গোটাটাই রোদে শুকানো হয়, তাই পানির প্রয়োজন অনেক কম।

সংখ্যাটা নিয়ে বিতর্ক

১৪০ লিটারের এই হিসাব কি সব দেশ বা সব জাতের কফির জন্য সমান? উত্তর, না। জলবায়ু, মাটির ধরন, চাষপদ্ধতি, এমনকি কফির প্রজাতিভেদেও এই সংখ্যা বদলায়।

কয়েকজন গবেষক তাই বলছেন, মাত্র একটি সংখ্যা দিয়ে পুরো বিষয়টিকে সরলীকরণ করা বিপজ্জনক। কারণ পানির প্রাপ্যতা সব জায়গায় সমান নয়। খরাপ্রবণ অঞ্চলের একজন কৃষকের কাছে যে পানি অমূল্য, বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে সেই একই পরিমাণ পানির মূল্য তেমন নয়। যেখানে পানি সীমিত সম্পদ, সেখানে তার মূল্য বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে জলবায়ুগত পার্থক্য না দেখেই সব পানিকে একইভাবে গণনা করা হয়।

এই সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি শুধু সংখ্যা নিয়ে তর্ক নয়, এর পেছনে আছে বাস্তব মানুষের জীবন। ইথিওপিয়ার এক কফিচাষি গ্রামে, যেখানে একমাত্র কুয়াটি ভেঙে গেলে ঘণ্টাখানেক হেঁটে নদী থেকে পানি আনতে হয়, সেখানে ১৪০ লিটার শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিদিনের সংগ্রাম।

কফি ঠান্ডা হওয়ার আগে
সুইজারল্যান্ডের মতো দেশেও জেনেভার বাসিন্দারা দিনে গড়ে তিন কাপ কফি খান; অথচ দেশটির মোট জলছাপের ৮০ শতাংশেরও বেশি তৈরি হয় বিদেশের মাটিতে।

কাপের ওপারে যে জীবন

গল্পটা এখানেই মোড় নেয়। ‘আমাদের এলাকায় পানির উৎস মাত্র একটি’, বলছিলেন ইথিওপিয়ার ৭০ বছর বয়সী কফিচাষি আগেনেহুশ কাহেন। তিনি আরও বলেন, ‘একটি হাতে খোঁড়া কুয়া। কুয়াটা এখন বিকল। এখন হয় শহর থেকে পানি কিনতে হয়, না হলে দেবোহেলা নামের নদী থেকে পানি আনতে প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটতে হয়।’

একজন মানুষের গল্পে যদি একটু থামা যায়, তাহলে সংখ্যাগুলো আর শুধু সংখ্যা থাকে না। কফির জলছাপ নিয়ে যা আমরা কাপে চুমুক দেওয়ার সময় ভাবিই না, তার আসল দাম গুনতে হয় হাজার মাইল দূরের কোনো গ্রামে। সুইজারল্যান্ডের মতো দেশেও জেনেভার বাসিন্দারা দিনে গড়ে তিন কাপ কফি খান; অথচ দেশটির মোট জলছাপের ৮০ শতাংশেরও বেশি তৈরি হয় বিদেশের মাটিতে। ভোগ এক জায়গায়, আর খরচ আরেক জায়গায়। এই বিচ্ছিন্নতাই বোধ হয় জলছাপের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক।

বাংলাদেশেও কফির চল বাড়ছে দিনে দিনে। ঢাকার অলিগলিতে দ্রুত গজিয়ে উঠছে কফিশপ, তরুণ প্রজন্মের হাতে লাতে ও কোল্ড ব্রুর কাপ যেন একধরনের নাগরিক পরিচয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই কাপের ভেতরে যে সুদূর জলবিন্যাসের ছায়া লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ কজনেরই-বা হয়!

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: ওয়াটার ইউনিট, ডেইলি কফি নিউজ, ওয়ান প্ল্যানেট নেটওয়ার্কপ্রতিদিন কতটুকু পানি পান করা উচিৎ

Read full story at source