ইরানের হামলার শিকার হওয়ার পরও কেন মার্কিন উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে জর্ডান সরকার

· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় তিন দশক ধরে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য জর্ডান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের পর সেই জর্ডানকে এখন চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। সম্প্রতি জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি নিশানা করে দেশটির ওপর হামলা জোরদার করেছে ইরান।

তবে জর্ডানের আকাশে নিয়মিত সাইরেন বাজতে থাকলেও দেশটি মার্কিন উপস্থিতি সীমিত করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে জর্ডান সেসব সামরিক কার্যক্রম সংকুচিত করতে পারছে না।

Visit rouesnews.click for more information.

কয়েক দশকের সম্পর্ক ও সুরক্ষার পাশাপাশি কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার জন্য জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

প্রচুর তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় কিছু আরব প্রতিবেশীর তুলনায় জর্ডান অনেকটা সম্পদহীন দেশ। দেশটি ব্যাপকভাবে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। জর্ডানের কর্মকর্তাদের মতে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ১৬৫ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এই অঞ্চলের অন্যান্য কিছু মার্কিন মিত্র তাদের ভূখণ্ডে সেনা ঘাঁটি তৈরি এবং ওপর দিয়ে বিমান উড্ডয়নের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও জর্ডান এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করার মতো অবস্থানে নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের টেম্পল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ‘জর্ডান: পলিটিকস ইন অ্যান অ্যাক্সিডেন্টাল ক্রুসিবল’ বইয়ের লেখক শন ইয়োম বলেছেন, ‘জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বল একটি রাষ্ট্র। এটি বেশ ছোট এবং আঞ্চলিক হুমকিতে ঘেরা। আর এর কোনো ধরনের মহাশক্তিধর পৃষ্ঠপোষক বা বাইরের রক্ষকের প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক প্রজন্ম ধরে সেই ভূমিকা পালন করে আসছে।’

ইয়োম বলেন, ১৯৫০-এর দশক থেকে জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যে সহায়তা পেয়ে আসছে, তা অন্য কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নেয়। যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ইরান মূলত ইসরায়েল ও উপসাগরে থাকা মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল, তবে তারা জর্ডানের দিকেও শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

উচ্চ পর্যটন মৌসুম মাত্র শুরু হওয়ার মুখে এই সংঘাত দ্রুত জর্ডানের পর্যটনশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা দেশটির রাজস্বের ১৮ শতাংশ পর্যন্ত জুগিয়ে থাকে। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আটকে দেওয়া হয়েছিল, তা সত্ত্বেও এয়ারলাইনসগুলোকে ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে এবং সম্ভাব্য পর্যটকেরা হোটেলের বুকিং বাতিল করছেন।

ইরানের হামলায় বিপদে জর্ডান

এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষই হামলা বাড়িয়েছে এবং ইরান তাদের লক্ষ্যবস্তুর পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত রোববার জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। চতুর্থ ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি জনহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে।

জর্ডান সরকারকে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক হাসান আলমোমানি বলেছেন, ‘প্রতিবেশীদের আঘাত করার এই ইরানি কৌশলগত তীব্রতার লক্ষ্য হলো ওই প্রতিবেশীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যার মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করা।’

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির মতে, ইরান সম্প্রতি জানিয়েছে, জর্ডানে ইউএস বিমান বাহিনীর কেন্দ্রস্থল আজরাকের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংক এবং অন্যান্য ঘাঁটির বিমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। এর আগে ইরান জানিয়েছিল, তারা মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত রাডার এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে নিশানা করেছিল।

শুক্রবার মুওয়াফফাক সালতি ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং তৃতীয় একজন নিখোঁজ হন। সপ্তাহের শুরুতে জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর অন্য তিনটি হামলায় ডজনখানেক মার্কিন সেনা আহত হন এবং বেশ কয়েকটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জর্ডানে মার্কিন সেনা উপস্থিতি প্রতিরক্ষাচুক্তির অংশ বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা

মার্কিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে জর্ডানের বিমানঘাঁটিগুলো থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং ইরাকে আক্রমণের মতো মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের ঘাঁটি ছিল এই দেশ। একটি সংসদীয় প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় চার হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছেন।

স্থায়ী মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মুওয়াফফাক সালতি এবং অন্য ঘাঁটিগুলোকে মানানসই করে গড়ে তোলা হয়েছে। পেন্টাগনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বর্তমানে ‘ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির’ সিনিয়র ফেলো গ্রান্ট রামলে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে জর্ডানের অবকাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী। তিনি এটিকে একটি স্থলভিত্তিক বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

রামলে বলেন, মুওয়াফফাক সালতি তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত, যা মার্কিন বাহিনীকে অহেতুক নজরকাড়া এড়িয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেয়। আর জর্ডান উপসাগরীয় দেশগুলোর চেয়ে ইরান থেকে দূরে হওয়ায় জর্ডানে থাকা মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দেওয়ার জন্য বেশি সময় পায়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ আশ্রয়

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে এবং যুদ্ধের শুরুর দিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশ থেকে তাদের কিছু সৈন্যকে জর্ডান এবং প্রতিবেশী ইসরায়েলের তুলনামূলকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিল।

আলমোমানি বলেন, ‘ইরানের যুদ্ধ প্রকাশ করে দিয়েছে, জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, চলতি বছর ওয়াশিংটন জর্ডানে সামরিক সাহায্য ৫০ কোটি ডলার বাড়িয়েছে।

জর্ডানের কর্মকর্তারা প্রায়শই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে থাকেন। এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সংঘাত কমানোর সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর জোর দেন।

জর্ডানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পেট্রার তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুর দিকে জর্ডানের সেনাবাহিনীপ্রধান মেজর জেনারেল ইউসেফ হুনাইতি এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ড্যানিয়েল জিমারম্যান সামরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

জর্ডান সরকার প্রকাশ্যে ব্যাপক মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি খুব কমই আলোচনা করে। জর্ডান ইরানে বিমান হামলা চালানোর জন্য বা ইসরায়েলের পাশাপাশি যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেনি। যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকার শুরু থেকেই এই সংঘাতের তীব্র বিরোধী ছিল।

জর্ডানের কর্মকর্তারা তাদের ভূখণ্ডে ইরানের হামলার বারবার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং গত সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি বলেছেন, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে বলে ইরান হামলার যে অজুহাত দেখাচ্ছে, তা মিথ্যা।

অ্যাসপেন সিকিউরিটি ফোরামের এক প্যানেল আলোচনায় সাফাদি বলেন, ‘জর্ডানে কোনো মার্কিন ঘাঁটি নেই। আমাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে জর্ডানে মার্কিন সেনা রয়েছে। তাদের উপস্থিতি একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পরিচালিত হয়, যা আমাদের সার্বভৌমত্বকে পূর্ণ সম্মান জানিয়ে থাকে।’

হামলা সত্ত্বেও জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের জোটের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার কথা ভাববে না বলে জানান আলমোমানি। তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই জর্ডান তার কৌশলগত অংশীদারত্ব পরিবর্তন করতে পারে না।

ইয়োম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে জর্ডানের নির্ভরশীলতা কমানোর মতো কোনো অর্থবহ দাবি সে দেশে নেই। তিনি বলেন, ‘কোনো গুরুতর রাজনৈতিক অংশীদারই এই পরামর্শ দিচ্ছে না যে জর্ডান প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া ১৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার বদলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থ বা চীনের সমর্থনের মতো কিছু নিক।’

Read full story at source