রেনে, তোমাদের পতাকা আজও ওড়ে আমার দেশে

· Prothom Alo

আর্জেন্টিনা থেকে ফিরে এক তরুণকে লেখা একটি চিঠি। রেনে আর আসেনি। কিন্তু সময় আশ্চর্যভাবে সেই চিঠির স্বপ্নকে সত্যি করেছে। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা দেখতে ছুটে এসেছেন অসংখ্য আর্জেন্টাইন সাংবাদিক, ব্লগার ও পর্যটক। মনে হয়েছে, একজন রেনে না এলেও শত শত রেনে এসে পৌঁছেছে।

সেপ্টেম্বর ২০২২। আর্জেন্টিনা ভ্রমণ শেষ করে সবে ঢাকায় ফিরেছি। দুমাস যেতে না যেতেই টেলিভিশনের পর্দায় দেখছি দেশটি  তরতর করে ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে। সেদিন শুরু হবে ফাইনাল ম্যাচ ফরাসীদের বিপক্ষে। তখন আমার মাথায় কেবল আর্জেন্টিনার টগবগে স্মৃতি। সেই  আবেগে আমি সেদিন লিখলাম এক চিঠি আমার ফেসবুকে, বুয়েনোস আইরেসের যে হোস্টেলে আমি ছিলাম, সে হোস্টেলে কর্মরত তরুণ রেনেকে।  তাকে লিখেছিলাম, ‘যদি  বাংলাদেশে আসো তবে এসো বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপে এলে দেখবে, তোমাদের দেশের নীল-সাদা পতাকা কীভাবে আমার দেশের অসংখ্য বাড়ির ছাদে পত-পত করে উড়ে।‘

Visit newsbetting.cv for more information.

ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইন সৈনিকদের জন্য স্মৃতিসৌধ

রেনে আর আসেনি। কিন্তু সময় আশ্চর্যভাবে সেই চিঠির স্বপ্নকে সত্যি করেছে এবারের বিশ্বকাপে। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা প্রত্যক্ষ করতে অসংখ্য আর্জেন্টাইন সাংবাদিক, ব্লগার এবং পর্যটক ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে। মনে হয়েছে, একজন রেনে না এলেও শত শত রেনে এসে পৌঁছেছে। চার বছর আগে বাঙালী নারীর সুদূর আর্জেন্টিনার কোন তরুণকে লেখা সেই আবেগমাখা চিঠির স্বপ্ন যেন বাস্তবে রূপ পেল। সে দিনের ফাইনাল ম্যাচেও খেলছিলো আর্জেন্টিনা। আজকের ফাইনাল ম্যাচেও আর্জেন্টিনা। আমার আবেগে আবার লাতিনের মাটির সোঁদা গন্ধ। এ চিঠি আজও প্রাসঙ্গিক। সেই চিঠিটিই পরে ভ্রমণগ্রন্থ লাতিনের নাটাই-এ স্থান পেয়েছে। সেটা বৃহত্তর পাঠকের সঙ্গে আবারও শেয়ার করে নিলাম এই অবকাশে।

প্রিয় রেনে,
তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি। তোমাকে সাথে নিয়ে যে বাজার-সদাই করেছিলাম প্রথম দিন এ শহরে, তার সবটা রেঁধে-খেয়ে শেষ করতে পারিনি। হোস্টেলের রিসেপশনের ওই সুন্দরী মেয়েটার কাছে রেখে যাচ্ছি বাকি খাবার, সংগ্রহ করো। কী আশ্চর্য, তোমার সাথে বিগত দশ-বারো দিনে আর একবারও দেখা হলো না। এ দেশে আসার প্রথম দিন অর্ধেকটা সন্ধ্যে রেঁধে কাটিয়েছি, বাকি অর্ধেকটা সন্ধ্যে এ শহরের নামের উচ্চারণ প্রাকটিস করেছি। আমরা বলি ‘বুয়েন্স আয়ার্স’ । তোমরা একে ডাকো ‘বোয়েনোসাইরেস’। তোমাদের ডাকে আদর আছে। আমরা ডাকি যেমন-তেমন। তোমায় বলা হয়নি, আমি আরেকবার গিয়েছিলাম বাজারে। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত গরুর মাংস কিনেছি। হোস্টেলের ফ্রিজে ঠিকঠাকমতোই ছিলো। ঐ সেই হতচ্ছাড়া হাফ প্যান্ট পরা ছেলেটা, সাও পাওলো ইউনিভার্সিটি থেকে এ হোষ্টেলে ক্লিনারের কাজ করতে এসেছে, সে ফ্রিজ পরিস্কার করতে গিয়ে ফেলে দিয়েছে। অনেক টাকা-পয়সা খরচা করে কিনেছিলাম।

যতবার সন্ধ্যায় এ হোষ্টেলে খিচুড়ি রেঁধেছি, একমুঠো চাল বেশি দিয়েছি। ভেবেছি তোমায় খাওয়াবো। তুমি আমার দেশের এ অসাধারণ খাবারের পদটি মিস করেছ। উইকিপিডিয়া আমায় বলেছে, তোমার দেশের মানুষ গড়ে বছরে ৫৫ কেজি গরুর মাংস খায়। এ দেশে যত মানুষ বেড়াতে আসে তার শতভাগের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে তোমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘আসাদো’। আমি বাংলাদেশের যে ভৌগোলিক অঞ্চলে জন্মেছি তার নাম চট্টগ্রাম। তোমার দেশে যেমন ‘আসাদো’, আমার চট্টগ্রামের তেমন ‘মেজবানি মাংস’ । ‘মেজবানি মাংস’ নিয়ে আমার ভারি অহংকার। আসাদোর আভিজাত্য দেখে আমার সে দম্ভ চূর্ণ হয়েছে।

বোয়েনোস আইরেস

যদি কোনো দিন আমার দেশে আসো, তবে বিশ্বকাপে এসো। দেখবে কেমন পত-পত করে ওড়ে তোমার দেশের পতাকা আমার দেশে। বিশ্বকাপে বাঙালী জাতি দু’ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগের হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা আর অন্যভাগে ব্রাজিল।

তোমাদের মেসির শহর রোজারিওতে নাকি দম্পতিরা গণহারে তাদের ছেলে বাচ্চাদের নাম রাখতে শুরু করেছে ‘মেসি’? অন্তর্জালে দেখলাম সরকার রীতিমতো আইন করেছে, আর কারো নাম মেসি রাখা যাবে না। কোনো এক নথিতে পড়েছিলাম, এক আর্জেন্টাইন বলছেন, আমাদের মেসি যখন কথা বলে তখন আমাদের প্রেসিডেন্ট চুপ থাকে। এ কথার গভীরতা আমি বুঝতে পারি।

বুয়েনোস আইরেসের রাস্তায় মেসির গ্রাফিতি

ব্যাপারটা এমন নয় যে আমি কেবলমাত্র আর্জেন্টিনার ফুটবলের ভক্ত। আমায় বিমোহিত করে লাতিন ফুটবলের নান্দনিকতা। ওরা জাদুকর। তোমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম তৈরি করেছো ফুটবলার। ফুটবলকে বানিয়েছো জন্মগত অধিকার। এটি তোমাদের প্রধান আবেগ। উপনিবেশের নিপীড়ন থেকে এর সৃষ্টি। যন্ত্রণার মাঝে লাতিন ফুটবল উচ্ছ্বাস আনে। লাতিন ফুটবল মাটি থেকে উঠে আসা। আছে বাতাসের ঘাম। তবে এটা কি তোমাদের জন্মগত ক্ষমতা? তোমরা ফুটবলের বিশুদ্ধ আত্মাকে খোঁজো।

ইউরোপীয় ফুটবল? ও তো যন্ত্রের মতো। ভারী চকচক করে। গোল্ড প্লেটেড! আমি সেখানে জোর দেখি, প্রেম দেখি না। ষাঁড়ের লড়াই। কেবল শক্তি প্রদর্শন। কি বললে? চাইনিজ? জাপানিজ? প্লিজ, আমায় দেখতে বোলো না ওসব। ও তো ভিডিও গেম, আমার ছেলেরা যেসব খেলে তাদের মোবাইল ডিভাইসে সারা দিন। শুধু গোল দেওয়াই যদি ফুটবলের প্রধান সৌন্দর্য হয় তবে ধ্বংস হোক এ খেলা।

আর্জেন্টিনায় রবীন্দ্রনাথের নামে রাস্তায় লেখক

লাতিন ফুটবল প্রেমিক-প্রেমিকার চুম্বনের মতো সুন্দর। যে প্রেমে থাকে ক্ষীণ যৌনানুভূতি। এ প্রেম রবীন্দ্রনাথের ঘড়ায় তোলা জল নয়, এ দীঘি। এ রবি-ওকাম্পোর প্রেম। এ স্বামী-স্ত্রীর নিত্যদিনের যৌনাচার নয়। লাতিন খেলোয়াড়রা বাজিগর। যদি কখনো আমার দেশে আসো, তবে তোমার সুন্দরী প্রেমিকাটিকে সঙ্গে এনো, যে সর্বক্ষণ হাসে তোমার মোবাইলের টাচস্ক্রিনে।
ভালো থেকো
মহুয়া

ছবি: লেখক

Read full story at source