স্বর্ণের যম অ্যাকুয়া রেজিয়া
· Prothom Alo

সোনা বা স্বর্ণ—এই ধাতুর নাম শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে অমূল্য সম্পদের ছবি। হাজার বছর ধরে মানুষ সোনাকে সৌন্দর্য, সম্পদ আর ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখেছে। কারণ এটি এমন একটি ধাতু, যা আগুনে পোড়ানো যায়, হাতুড়ি দিয়ে পেটানো যায়, পাতলা তার বানানো যায়, কিন্তু সহজে নষ্ট করা যায় না।
প্রকৃতিতে অন্য সব ধাতুর একটা মেয়াদ থাকে। লোহায় মরিচা ধরে ক্ষয়ে যায়, তামা বাতাসে উন্মুক্ত থাকলে সবুজ হয়ে যায়, রূপা সময়ের সাথে সাথে কালো হয়ে মলিন হয়ে যায়, কিন্তু সোনার গায়ে একটা দাগও কাটে না। হাজার বছর মাটির নিচে বা সাগরের তলদেশে পড়ে থাকলেও সে যেমন চকচকে, তেমনই থাকে। বাতাস, পানি, এমনকি বেশির ভাগ রাসায়নিক পদার্থও সোনার তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তাই তো প্রাচীন যুগের অনেক সোনার অলংকার আজও প্রায় আগের মতোই চকচক করছে। রসায়নবিদরা এককালে বলতেন, পৃথিবীতে এমন কোনো সাধারণ এসিড নেই, যা সোনাকে গলাতে পারে। রসায়নের ল্যাবরেটরির সবচেয়ে শক্তিশালী এসিডগুলোও সোনা গলাতে পারে না। তীব্র গাঢ় সালফিউরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক বা নাইট্রিক এসিডের বোতল খুলে সোনার ওপর ঢেলে দিন, সোনা যেমনকে তেমনই থাকবে।
Visit biznow.biz for more information.
রসায়নবিদরা এককালে বলতেন, পৃথিবীতে এমন কোনো সাধারণ এসিড নেই, যা সোনাকে গলাতে পারেসোনা মানেই তো চিরকালীন, অক্ষয়, অবিনশ্বর ধাতু। ফারাওদের কফিন থেকে শুরু করে জাদুঘরের প্রাচীন মুদ্রা পর্যন্ত হাজার হাজার বছর ধরে সোনা যেমন ছিল তেমনই আছে, এতটুকু মরচে ধরেনি, রঙ বদলায়নি। রসায়নের ভাষায় সোনাকে বলা হয় নোবেল মেটাল— আভিজাত্যপূর্ণ ধাতু, যে কারো সাথে সহজে বন্ধুত্ব করে না, বিক্রিয়া করতে চায় না।
পৃথিবীতে কত স্বর্ণ আছেরসায়নবিদরা এককালে বলতেন, পৃথিবীতে এমন কোনো সাধারণ এসিড নেই, যা সোনাকে গলাতে পারে। রসায়নের ল্যাবরেটরির সবচেয়ে শক্তিশালী এসিডগুলোও সোনা গলাতে পারে না।
কিন্তু প্রকৃতি যেন এই অহংকার ভাঙার জন্যই লুকিয়ে রেখেছিল এক বিস্ময়কর তরল। নাম তার—অ্যাকুয়া রেজিয়া। ল্যাটিন এই নামের বাংলা করলে দাঁড়ায় রাজকীয় পানি বা রাজঅম্ল।
রাজঅম্ল আবিষ্কার হয়েছিল আজ থেকে প্রায় বারোশো বছরেরও আগে—অষ্টম শতাব্দীর ইরাকের কুফা নগরীতে। সেখানে নিজের ল্যাবরেটরিতে নানারকম কাঁচের পাত্র, চোঙ আর জলন্ত চুল্লি নিয়ে দিনরাত মগ্ন থাকতেন এক জাদুকর। তাঁকে আসলে জাদুকর বলা ভুল হবে, তিনি ছিলেন আলকেমিস্ট বা প্রাচীন রসায়নবিদ। তাঁর নাম জাবির ইবনে হাইয়ান। তাঁর পুরো নাম আবু মুসা জাবির ইবন হাইয়ান। তাঁকে প্রায়ই আরব রসায়নের জনক বলা হয়। পশ্চিমা বিশ্ব তিনি পরিচিত জিবার বা জেবার নামে।
আলকেমিস্ট আবু মুসা জাবির ইবন হাইয়ানজাবির ছিলেন একটু খ্যাপাটে কিসিমের মানুষ। তিনি ভাবতেন, সস্তা কোনো ধাতুকে যদি কোনো উপায়ে সোনা বানিয়ে ফেলা যায়, তাহলে কেমন হয়? এই পরশ পাথরের খোঁজে তিনি একের পর এক তরল ফুটিয়ে যেতেন, নতুন নতুন এসিড তৈরি করতেন। একদিন তিনি ল্যাবরেটরিতে পাতন প্রক্রিয়ায় আবিষ্কার করে ফেললেন গাঢ় নাইট্রিক এসিড আর হাইড্রোক্লোরিক এসিড। তিনি ভাবলেন, এই দুটি এসিড তো আলাদাভাবে বেশ শক্তিশালী, এদের যদি একসাথে মেশানো যায় তবে কেমন হবে?
অন্য মৌল থেকে কি স্বর্ণ বানানো সম্ভবতাঁকে জাদুকর বলা ভুল হবে, তিনি ছিলেন আলকেমিস্ট বা প্রাচীন রসায়নবিদ। তাঁর নাম জাবির ইবনে হাইয়ান। তাঁর পুরো নাম আবু মুসা জাবির ইবন হাইয়ান। তাঁকে প্রায়ই আরব রসায়নের জনক বলা হয়।
সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য তিনি এক ভাগ নাইট্রিক এসিডের সাথে তিন ভাগ হাইড্রোক্লোরিক এসিড মেশালেন। মানে ১:৩ অনুপাতে মেশানো হলো। পাত্রের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত ঝাঁঝালো গন্ধ বের হতে লাগল, তরলটার রঙ বদলে হয়ে গেল হালকা হলুদাভ কমলা। জাবির কৌতূহলী হয়ে তাঁর ল্যাবে থাকা এক টুকরো নিরেট সোনা ফেলে দিলেন সেই মিশ্রণে। তারপর যা ঘটল, তা দেখার জন্য তিনি হয়তো মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। চোখের পলকে, কোনো রকম ধোঁয়া বা বিস্ফোরণ ছাড়াই, সেই শক্ত নিরেট সোনা তরলের ভেতর মিলিয়ে যেতে লাগল, ঠিক যেমনটা চায়ের কাপে চিনির দলা মিলিয়ে যায়! জাবির তাজ্জব বনে গেলেন। তিনি এই অলৌকিক তরলটির নাম দিলেন মাউদ জাহাব বা স্বর্ণের পানি। পরে অবশ্য তিনি এর রাজকীয় ক্ষমতা দেখে এর নাম বদলে রাখেন আল-মা আল-মালাকি বা রাজকীয় পানি। সেই আরবি নামটাই পরে ইউরোপে গিয়ে ল্যাটিন আক্ষরিক অনুবাদে হয়ে গেল অ্যাকুয়া রেজিয়া।
১৬০০ শতাব্দীর এক বিখ্যাত আলকেমিস্টের বইয়ে অ্যাকুয়া রেজিয়া আর সোনার বিক্রিয়াকে বোঝানোর জন্য এই চমৎকার ছবি আঁকা হয়েছিলমধ্যযুগের আলকেমিস্টদের কাছেও অ্যাকুয়া রেজিয়ার খাতির ছিল অন্যরকম। তারা তখন সবকিছু একটু রহস্যময় করে রাখতে ভালোবাসতেন। সাধারণ মানুষ যাতে তাদের রসায়নের সূত্র চুরি করতে না পারে, সেজন্য তারা কোড ল্যাঙ্গুয়েজ বা রূপক ছবি ব্যবহার করতেন। ১৬০০ শতাব্দীর এক বিখ্যাত আলকেমিস্টের বইয়ে এই অ্যাকুয়া রেজিয়া আর সোনার বিক্রিয়াকে বোঝানোর জন্য একটা চমৎকার ছবি আঁকা হয়েছিল। ছবিতে দেখা যায়, একটা হিংস্র শিয়াল একটা জ্যান্ত মোরগকে কামড়ে ধরে গিলে খাচ্ছে। এখানে মোরগটি ছিল সোনার প্রতীক, কারণ মোরগ সূর্যের আলোয় ডাকে আর সূর্যের রঙ সোনার মতো হলুদ। আর সেই ক্ষুধার্ত শিয়ালটি ছিল আর কেউ নয়, স্বয়ং অ্যাকুয়া রেজিয়া! এই রূপক ছবি দেখে প্রাচীন আলকেমিস্টরা ঠিকই বুঝে নিতেন যে কোন তরল দিয়ে সোনাকে বাগে আনতে হবে।
লোহায় মরিচা পড়ে কেনচোখের পলকে, কোনো রকম ধোঁয়া বা বিস্ফোরণ ছাড়াই, সেই শক্ত নিরেট সোনা তরলের ভেতর মিলিয়ে যেতে লাগল, ঠিক যেমনটা চায়ের কাপে চিনির দলা মিলিয়ে যায়! জাবির তাজ্জব বনে গেলেন।
২.
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই দুই এসিডের আলাদাভাবে সোনা গলানোর ক্ষমতা নেই কেন? আর এই দুটো এসিড একসঙ্গে হলেই কেন তারা এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে?
পুরো ব্যাপারটাই আসলে একটা টিম ওয়ার্কের মতো। ব্যাপারটাকে একটা জমজমাট ব্যাংকের ডাকাতির গল্পের মতো করে ভাবা যাক। ধরা যাক, সোনা বা স্বর্ণ হলো সেই সুরক্ষিত ব্যাংক, যার দেয়াল ভাঙা অসম্ভব। অন্যদিকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড হলো সেই ডাকাত দলের প্রধান। তার কাছে সোনাকে বেঁধে ফেলার মতো হাতকড়া বা ক্লোরিন আছে, কিন্তু সে ব্যাংকের ভেতরে ঢুকতেই পারে না। এদিকে নাইট্রিক এসিড হলো প্রধান ডাকাতের একজন চতুর পার্টনার। সে ব্যাংকের দেয়ালে ছোট্ট একটা ফুটো করতে পারে, কিন্তু তার কাছে সোনাকে আটকে রাখার মতো কোনো অস্ত্র নেই।
এবার এই দুজনে যখন হাত মেলায়, তখনই ঘটে আসল ম্যাজিক। নাইট্রিক এসিড (HNO₃) প্রথমে সোনার পরমাণুগুলোকে হালকা একটু ধাক্কা দিয়ে ইলেকট্রন কেড়ে নেয়। মানে নাইট্রিক এসিড একাই সোনার উপরিভাগে সামান্য অক্সিডেশন ঘটাতে পারে। এভাবে সোনার আয়নে পরিণত করতে চেষ্টা করে। এতে সোনাকে কিছুটা কাবু করে ফেলে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এভাবে তৈরি হওয়া সোনার আয়নগুলো সাথে সাথেই আবার সোনার উপরিভাগে জমে গিয়ে এক পাতলা প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে ফেলে। এই স্তরটা আর ভেতরের সোনাকে ছুঁতে দেয় না। অনেকটা যেন সোনার শরীরে সাথে সাথেই একটা বর্ম তৈরি হয়ে যাচ্ছে, আর এসিড সেই বর্মের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
শক্তিশালী ও দুর্বল অ্যাসিড কীনাইট্রিক এসিড প্রথমে সোনার পরমাণুগুলোকে হালকা একটু ধাক্কা দিয়ে ইলেকট্রন কেড়ে নেয়। মানে নাইট্রিক এসিড একাই সোনার উপরিভাগে সামান্য অক্সিডেশন ঘটাতে পারে।
এখানেই আসে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের (HCl) আসল কেরামতি। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওত পেতে থাকা হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ক্লোরিন সেনারা (ক্লোরাইড আয়ন) ঝাঁপিয়ে পড়ে সোনার (Au) ওপর। তারা সোনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। অর্থাৎ থাকা ক্লোরাইড আয়নগুলো সেই সদ্য তৈরি সোনার আয়নের সাথে দ্রুত জোট বাঁধে। এভাবে দুইয়ে মিলে তৈরি করে ফেলে এক নতুন ও জটিল যৌগ। এই যৌগের নাম টেট্রাক্লোরোঅরেট আয়ন। এই যৌগটা পানিতে সহজে দ্রবীভূত হয়ে তৈরি করে ক্লোরোঅরিক এসিড (HAuCl₄)। ব্যস, সোনার পরমাণুগুলো নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে তরলের সাথে একাকার হয়ে যায়। বিক্রিয়াটা এরকম:
Au + HNO₃ + 4HCl → HAuCl₄ + NO + 2H₂O
এভাবে সোনার পৃষ্ঠ থেকে সেই প্রতিরক্ষামূলক স্তর ক্রমাগত সরে যেতে থাকে, আর ভেতরের নতুন সোনার পরমাণুগুলো বেরিয়ে আসতে থাকে অ্যাসিডের নাগালে। এভাবেই একে অপরের অসম্পূর্ণতা পূরণ করে নাইট্রিক আর হাইড্রোক্লোরিক এসিড মিলেমিশে সোনার মতো অটল ধাতুকেও ধীরে ধীরে গলিয়ে দেয়।
রসায়নবিদদের যখনই সোনা গলানোর দরকার হয়, তারা তখনই টাটকা বা সদ্য প্রস্তুত অ্যাকুয়া রেজিয়া বানিয়ে নেনরসায়নের এই মেলবন্ধন এতই নিখুঁত যে, একে প্রকৃতির অন্যতম সেরা টিমওয়ার্ক বলা চলে। তবে এই টিমওয়ার্কের একটা বড় সমস্যা আছে। অ্যাকুয়া রেজিয়া তৈরি করার পর আপনি যদি ভাবেন একে বোতলে ভরে আলমারিতে সাজিয়ে রাখবেন, তাহলে বড় ভুল করবেন। এটি অত্যন্ত মেজাজি তরল। তৈরি করার পর থেকেই এর ভেতর অনবরত রাসায়নিক যুদ্ধ চলতে থাকে এবং নাইট্রোসিল ক্লোরাইড আর ক্লোরিন গ্যাস উৎপন্ন হতে থাকে। ফলে কয়েক ঘণ্টা পরেই এর ঝাঁঝ কমে যায়। তখন সেটা সাধারণ এসিডের মতো আচরণ করতে শুরু করে। তাই রসায়নবিদদের যখনই সোনা গলানোর দরকার হয়, তারা তখনই টাটকা বা সদ্য প্রস্তুত অ্যাকুয়া রেজিয়া বানিয়ে নেন।
লোহাকে সোনায় পরিণত করা গেলেও বিজ্ঞানীরা তা করেন না কেনতৈরি করার পর থেকেই অ্যাকুয়া রেজিয়ার ভেতর অনবরত রাসায়নিক যুদ্ধ চলতে থাকে এবং নাইট্রোসিল ক্লোরাইড আর ক্লোরিন গ্যাস উৎপন্ন হতে থাকে। ফলে কয়েক ঘণ্টা পরে এর ঝাঁঝ কমে যায়।
৩.
অ্যাকুয়া রেজিয়ার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্পটা ঘটেছিল বিশ শতকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন জার্মান একনায়ক হিটলারের নাৎসি বাহিনি ইউরোপজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ডেনমার্কে বসে থাকা রসায়নবিদ জর্জ দ্য হেভেসির কাছে সংরক্ষিত ছিল দুটো নোবেল পুরস্কারের সোনার মেডেল। এর মধ্যে একটা ছিল জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স ফন লাউয়ের, আরেকটা জেমস ফ্রাংকের। মেডেল দুটো রাখা হয়েছিল কোপেনহেগেনের নীলস বোর ইনস্টিটিউটে।
নাৎসি জার্মানি তখন কড়া আইন করেছিল, কেউ যেন সোনা বিদেশে পাচার করতে না পারে। কারো কাছে সোনা থাকলে তা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হবে। অমান্য করলে মৃত্যুদণ্ড। আর নোবেল পদক বিদেশি নাগরিকের কাছে রাখাও নাৎসিদের চোখে ছিল বিপজ্জনক অপরাধ।
রসায়নবিদ জর্জ দ্য হেভেসিহঠাৎ একদিন খবর এলো, নাৎসি সেনারা কোপেনহেগেন শহরের রাস্তায় ঢুকে পড়েছে এবং তারা যেকোনো মুহূর্তে নীলস বোর ইনস্টিটিউটে তল্লাশি চালাতে পারে। ল্যাবে তখন উপস্থিত ছিলেন হাঙ্গেরীয় রসায়নবিদ জর্জ ডি হেভেসি। মেডেল দুটি মাটির নিচে পুঁতে রাখা বা অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল, কারণ নাৎসিরা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পুরো ল্যাব চষে ফেলত। সবাই যখন আতঙ্কে কাঁপছে, তখন হেভেসির মাথায় খেলে গেল এক দুর্দান্ত বুদ্ধি।
খাবারে সোনা কি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদনাৎসি জার্মানি তখন কড়া আইন করেছিল, কেউ যেন সোনা বিদেশে পাচার করতে না পারে। কারো কাছে সোনা থাকলে তা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হবে। অমান্য করলে মৃত্যুদণ্ড।
তিনি ল্যাবের তাক থেকে নামিয়ে আনলেন গাঢ় নাইট্রিক এসিড আর হাইড্রোক্লোরিক এসিডের বোতল। চটজলদি তৈরি করে ফেললেন এক বড় পাত্র অ্যাকুয়া রেজিয়া। তারপর নাৎসি সেনারা যখন প্রায় দরজার দোরগোড়ায়, তখন তিনি ওই পাত্রে ফেলে দিলেন নোবেল মেডেল দুটি। মেডেলগুলো ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল। বাইরে বুটের আওয়াজ, আর ভেতরে তীব্র এসিডের রাজকীয় বিক্রিয়া।
এক সময় নাৎসি সেনারা ল্যাবে প্রবেশ করল। তারা পুরো ল্যাব উলটপালট করে খুঁজল, আলমারি ভাঙল, মাটির নিচে খোঁড়াখুঁড়ি করার চেষ্টা করল। কিন্তু ল্যাবের এক কোণায় সেলফের ওপর রাখা একটি সাধারণ কাঁচের পাত্রের দিকে তাদের চোখই গেল না। সেই পাত্রে তখনো ফুটছিল এক জোড়া নোবেল মেডেলের তরল রূপ! নাৎসিরা ভাবল ওটা বুঝি ল্যাবের কোনো ফেলনা রাসায়নিক বর্জ্য। কিছু না পেয়ে তারা চলে গেল।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন হেভেসি। যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেই উজ্জ্বল কমলা রঙের তরলটি ল্যাবের তাকেই পড়ে ছিল। যুদ্ধ থামার পর হেভেসি সেই দ্রবণ থেকে রাসায়নিক উপায়ে সোনাকে আবার আগের কঠিন অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেন। সেই সোনা পাঠানো হলো স্টকহোমের নোবেল ফাউন্ডেশনে। ফাউন্ডেশন সেই সোনা গলিয়ে আবার নতুন করে দুটি মেডেল তৈরি করে ভন লাউ এবং জেমস ফ্রাঙ্ককে ফিরিয়ে দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে রোমাঞ্চকর উপায়ে সম্পদ বাঁচানোর গল্প বিরল।
সোনা ভেবে রাখলেন পাথর, পরে দেখা গেল তা সোনার চেয়েও দামি১৯ শতকের শুরুতে বিজ্ঞানীরা খনি থেকে পাওয়া অশোধিত প্ল্যাটিনাম আকরিককে অ্যাকুয়া রেজিয়া দিয়ে গলানোর চেষ্টা করছিলেন। তখন তাঁরা লক্ষ্য করেন যে সবটুকু অংশ গলছে না।
৪.
অ্যাকুয়া রেজিয়া কিন্তু শুধু বিজ্ঞানীদের বন্ধুই নয়, কখনো কখনো সে চরম শত্রুও হয়ে উঠতে পারে। রসায়নের ছাত্রছাত্রীদের কাছে অ্যাকুয়া রেজিয়া মানেই এক মূর্ত আতঙ্ক। একে ল্যাবরেটরির টাইম বোমা বলা চলে। কেন?
কারণ আগেই বলেছি, এর ভেতর থেকে অনবরত গ্যাস বের হতে থাকে। এখন কোনো আনাড়ি ছাত্র যদি অ্যাকুয়া রেজিয়া দিয়ে কাজ শেষ করার পর ভাবেন, ‘ইস, এত দামি এসিড, নষ্ট করা যাবে না’। সেটা ভেবে একটা কাঁচের বোতলে তা ভরে কর্ক বা ঢাকনা দিয়ে শক্ত করে আটকে রেখে দেন, তবেই কেল্লাফতে! বোতলের ভেতরের গ্যাস বের হতে না পেরে চাপ বাড়াতে থাকবে। এক সময় চাপ এতই বেড়ে যাবে যে বোতলটি প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হবে।
অ্যাকুয়া রেজিয়াকে ল্যাবরেটরির টাইম বোমা বলা হয়ল্যাবের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রতি বছরই বিশ্বের কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অ্যাকুয়া রেজিয়ার বোতল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কাঁচের টুকরো আর জ্বলন্ত এসিডের বৃষ্টিতে ল্যাবের ভারী কাঠের টেবিল বা দেয়াল পর্যন্ত পুড়ে খাক হয়ে যায়। রসায়নের শিক্ষকেরা তাই শুরুতেই নতুন ছাত্রদের শিখিয়ে দেন—কাজ শেষ তো অ্যাকুয়া রেজিয়া ধ্বংস! একে আটকে রাখার চেষ্টা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।
শুধু সোনা গলানোই নয়, এই তরলটি বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন আবিষ্কারেও সাহায্য করেছে। ১৯ শতকের শুরুতে বিজ্ঞানীরা খনি থেকে পাওয়া অশোধিত প্ল্যাটিনাম আকরিককে অ্যাকুয়া রেজিয়া দিয়ে গলানোর চেষ্টা করছিলেন। তখন তাঁরা লক্ষ্য করেন যে সবটুকু অংশ গলছে না। পাত্রের নিচে কিছু কালো রঙের গুঁড়ো অবশিষ্ট হিসেবে জমা হয়ে থাকছে।
এসিড-ক্ষারের বিক্রিয়ায় লবণ ও পানি উৎপন্ন হয়, উল্টোটা হয় না কেনমজার ব্যাপার হলো, এত শক্তিশালী হয়েও অ্যাকুয়া রেজিয়া সবকিছু গলাতে পারে না। যেমন, স্বর্ণের চেয়েও দামি ধাতু ইরিডিয়াম এই তরলের সামনেও নির্বিকার থাকে, একটুও গলে না।
ইংরেজ রসায়নবিদ স্মিথসন টেন্যান্ট এই অদ্রবণীয় কালো গুঁড়ো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি দেখতে পান এটি কোনো ময়লা নয়, বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ নতুন দুটি মৌলিক ধাতু! এভাবেই অ্যাকুয়া রেজিয়ার কল্যাণে আবিষ্কৃত হয় পর্যায় সারণির দুটি অত্যন্ত ভারী ও মূল্যবান ধাতু—ইরিডিয়াম এবং অসমিয়াম।
আধুনিক যুগেও কিন্তু অ্যাকুয়া রেজিয়ার গুরুত্ব একটুও কমেনি। আমরা যে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহার করছি, সেগুলোর ভেতরের সার্কিট বোর্ডে কিন্তু খুব সামান্য পরিমাণে হলেও খাঁটি সোনা ব্যবহার করা হয়।
ইংরেজ রসায়নবিদ স্মিথসন টেন্যান্টকিন্তু এই ইলেকট্রনিক বর্জ্যগুলো ফেলে দেওয়ার পর এই বর্জ্য থেকে সোনা পুনরুদ্ধার করার জন্য এখনো বড় বড় রিফাইনারি কারখানায় অ্যাকুয়া রেজিয়া ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সোনা আর প্ল্যাটিনামের মতো দামি ধাতু পরিশোধন করতে, ল্যাবরেটরির কাচের পাত্র পরিষ্কার করতেও এই তরল ব্যবহৃত হয়।
মজার ব্যাপার হলো, এত শক্তিশালী হয়েও অ্যাকুয়া রেজিয়া সবকিছু গলাতে পারে না। যেমন, স্বর্ণের চেয়েও দামি ধাতু ইরিডিয়াম এই তরলের সামনেও নির্বিকার থাকে, একটুও গলে না। প্রকৃতিতে এমন কিছু ব্যতিক্রম থাকাটাই বোধহয় রসায়নকে এত রহস্যময় আর আকর্ষণীয় করে তোলে।
সূত্র: কেমেস্ট্রি ওয়ার্ল্ড ডট কমউইকিপিডিয়াপৃথিবীতে এত বেশি ধাতু, অধাতু কেন এত কম