মহাস্থানগড়ে স্থাপনা নির্মাণে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন, যা বললেন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম

· Prothom Alo

ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রাথমিক তালিকাভুক্ত আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নস্থল বগুড়ার মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেখানে নির্মাণ ও মাটি খনন বন্ধ রাখা-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেছে সরকারপক্ষ। এতে ৫ হাজার ২৭৯ দিন দেরি মার্জনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাইকোর্টের রায়ও স্থগিত চাওয়া হয়েছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায় ও ২০২০ সালের ৫ মার্চ হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে এই লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করা হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি), বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি), মহাস্থানগড়ের কাস্টোডিয়ান এবং শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) আবেদনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আজ শনিবার সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগের রোববারের কার্যতালিকায় ওই লিভ টু আপিলটি শুনানির জন্য পাঁচ নম্বর ক্রমিকে আছে।

এর আগে মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নষ্ট করে স্থাপনা নির্মাণ, মাজার সম্প্রসারণ এবং প্রত্নস্থল খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ চেয়ে ২০১০ সালের শেষ দিকে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়। শুনানি নিয়ে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে এ-সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় অবৈধ দখল প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এবং প্রত্ন স্মারক এলাকার পূর্ব পাশে ২০০ ফুট দূরে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ করতে রায়ে বলা হয়।

মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় দখল নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আগের রিটের সূত্র ধরে ২০২০ সালে একটি আবেদন করে এইচআরপিবি। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ৫ মার্চ হাইকোর্ট মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় স্থানীয়দের মাটি খননসহ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মোতায়েন করাসহ কয়েকটি নির্দেশনা দেন।

লিভ টু আপিলে উল্লেখ করা হয়, হাইকোর্টের আদেশের ফলে এত দিন মহাস্থানগড় এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ঐতিহাসিক স্থানটিকে আকর্ষণীয় ও দর্শনার্থীবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নও করা সম্ভব হয়নি। পবিত্র ও ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় মসজিদ উন্নয়নে সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। তবে হাইকোর্টের আদেশের কারণে কোনো উন্নয়নকাজ শুরু করা যায়নি।

অভিযোগ আছে, মাজার কমিটির উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের উদ্যোগে বগুড়া জেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রায় ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মহাস্থানগড় মাজারসংলগ্ন এলাকায় নারী মুসল্লিদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নির্মাণকাজের আপত্তি জানিয়ে চিঠি দিলে মহাস্থানগড় মাজার কমিটির সভাপতি ও বগুড়ার জেলা প্রশাসক একপর্যায়ে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। এর পরপরই হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে লিভ টু আপিল করা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালের সংশোধিত পুরাকীর্তি আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত প্রত্নস্থল ধ্বংস, ক্ষতিসাধন বা বিকৃত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি এবং ২০২০ সালের ৫ মার্চ হাইকোর্টের পৃথক আদেশে মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার সাড়ে সাত কিলোমিটার পরিসরের মধ্যে যেকোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। অধিদপ্তরের দাবি, সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাজারসংলগ্ন এলাকায় খনন করে নারী মুসল্লিদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ শুরু হয়। বিষয়টি নজরে এলে ১৭ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় বগুড়ার জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৫ জুন মাজার এলাকায় ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের উদ্দেশ্যে মাটি খনন করা হয়। এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলের ক্ষতি করছে এবং এটি প্রত্নসম্পদ আইনের লঙ্ঘন। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি উল্লেখ করে নির্মাণকাজ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

বগুড়ার মহাস্থানগড়ে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় যেকোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে। সম্প্রতি মহাস্থানগড়ের জাহাজঘাটা এলাকায়

জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী এবং মাজার কমিটির উপদেষ্টা মীর শাহে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের অর্থায়নে নারী মুসল্লিদের জন্য নামাজঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর হাইকোর্টের রায়ের কথা উল্লেখ করে উন্নয়নকাজে বাধা দেয়। এতে মুসল্লিদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। মুসল্লি ও স্থানীয়রা মহাস্থানগড় মাজার ও মসজিদের উন্নয়ন চান। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমিও মসজিদ ও মাজারের উন্নয়ন চাই। যেহেতু হাইকোর্টের আদেশের কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে, এ কারণে আদালতের আদেশ স্থগিত চেয়ে সরকারের পক্ষ থেকে লিভ টু আপিল আবেদন করা হয়। রোববার আপিল শুনানি আছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও মহাস্থানগড় মাজার কমিটি দুটোই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ক্ষতিসাধন না করে সরকার মাজার উন্নয়ন করতে চায়। আদালত যে আদেশ দেবেন, সরকার সেই আলোকেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।’

লিভ টু আপিলের বিষয়ে জানেন না জেলা প্রশাসক-পুলিশ সুপার

জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ, মহাস্থানগড়ের কাস্টোডিয়ান রাজিয়া সুলতানা এবং শিবগঞ্জ থানার ওসি মো. শাহিনুজ্জামান জানিয়েছেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে লিভ টু আপিলের আবেদন করা হলেও এ সম্পর্কে তাঁরা কিছুই জানেন না। লিভ টু আপিলে পক্ষ করার বিষয়টি কেউ তাঁদের অবগত করেননি।

পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, ‘মহাস্থানগড় এলাকায় বিদ্যমান হাইকোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করে লিভ টু আপিলে পুলিশ সুপারকে পক্ষ করা হলেও এ বিষয়ে কেউ আমাকে কিছুই জানাননি।’

জেলা প্রশাসক ও মাজার কমিটির সভাপতি তৌফিকুর রহমান বলেন, সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় যেকোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে। সম্প্রতি জেলা পরিষদ থেকে সেখানে গ্রহণ করা উন্নয়ন প্রকল্প হাইকোর্টের আদেশের পরিপন্থী হওয়ায় কাজ বন্ধ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ বিষয়ে আমাকে আগে থেকে কেউ কিছু জানাননি।’

Read full story at source