লড়াইটা দেশমের সঙ্গে ফুয়েন্তেরও 

· Prothom Alo

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ডালাসের এই লড়াই বুঝি শুধু ফ্রান্স বনাম স্পেনের কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লামিনে ইয়ামালের মায়াবী ড্রিবলিংয়ের।

কিন্তু ক্যামেরার লেন্সটা যদি একটু জুমআউট করে মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে সাইডলাইনের ওপারে নিয়ে যাওয়া যায়? তবে দেখা যাবে, বাংলাদেশ সময় আজ রাত একটায় বিশ্বকাপের এই প্রথম সেমিফাইনাল আসলে দুটি ভিন্ন ফুটবল–দর্শনের লড়াইও। যেখানে পর্দার আড়াল থেকে দাবার চাল চালবেন আধুনিক ফুটবলের দুই চাণক্য—দিদিয়ের দেশম ও লুইস দে লা ফুয়েন্তে।

Visit newsbetting.club for more information.

ফুটবল কারও কারও কাছে কবিতার মতো। দেশম সেটাকে কখনো কবিতা ভাবেননি। তাঁর কাছে ফুটবলটা দাবার মতোই, যেখানে চেকমেটই শেষ সত্য। ফ্রান্স দলে দেশমের সতীর্থ এরিক ক্যান্টোনা একবার তাচ্ছিল্য করে তাঁকে বলেছিলেন ‘জলবাহক’ (ওয়াটার ক্যারিয়ার)। ক্যান্টোনা মনে করতেন, দেশমের ওই রকম সৃষ্টিশীলতা ছিল না। মাঠে গাধার খাটুনি খেটে অন্যদের জন্য বলের জোগান দিতেন শুধু।

সেই জলবাহকই এখন বিশ্ব ফুটবলে এমন কীর্তির মালিক, যার পাশে ক্যান্টোনা ভীষণ ম্লান। খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি দেশমের আগে ছিল শুধু ব্রাজিলের মারিও জাগালো আর জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের। ফ্রান্সকে যদি এই বিশ্বকাপ আবার জেতাতে পারেন দেশম, অধিনায়ক হিসেবে একবার ও কোচ হিসেবে দুইবার বিশ্বকাপ জেতার এক অনন্য কীর্তি গড়া হয়ে যাবে তাঁর।

লামিনে ইয়ামাল ও লুইস দে লা ফুয়েন্তে (ডানে)

দে লা ফুয়েন্তের খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার অবশ্য দেশমের মতো এত ঝলমলে নয়। বিলবাওয়ে লেফটব্যাক হিসেবে সুনাম ছিল, কিন্তু সেটা স্পেন দলে ডাক এনে দিতে পারেনি। খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁর অর্জন বলতে দুটি লা লিগা, একটা কোপা দেল রে। তবে সে আক্ষেপ দে লা ফুয়েন্তে ঘুচিয়েছেন কোচ হয়ে। স্পেনের দুটি বয়সভিত্তিক দলকে ইউরো জেতানোর পর জাতীয় দলের কোচ হয়েও জিতেছেন ইউরো আর নেশনস লিগ। এবার তাঁর সামনে বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি। তাঁর ফুটবলীয় দর্শনও অন্য ঘরানার। স্প্যানিশ ফুটবলের যুব কাঠামোর গভীরে বছরের পর বছর কাটিয়ে দে লা ফুয়েন্তে আজ চূড়ায়। স্পেনের সেই একঘেয়ে, ধীরগতির ‘তিকিতাকা’র কফিন ভেঙে তৈরি করেছেন এর নতুন রূপ। তাঁর ফুটবলও পজেশনাল, কিন্তু তা অলস নয়; বরং বেশ গতিশীল।

এই দুই কোচের পার্থক্য শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও। দেশম তাঁর দলকে আগলে রাখেন একধরনের নীরব কঠোরতায়। মিডিয়ার শব্দ, বাইরের রাজনীতি—সবকিছু থেকে খেলোয়াড়দের দূরে রাখেন। দলটা তাঁর কাছে পরিবার আর তিনি সেই পরিবারের রক্ষক। তাঁর অধীন দলটা সময়ের সঙ্গে বদলেছে, বড় হয়েছে। তারকাভরা ড্রেসিংরুম, তবু কোনো বিস্ফোরণ নেই। কারণ, তিনি জানেন, কীভাবে ‘ইগো’ সামলাতে হয়। এই বিশ্বকাপেই দেশমের জীবনে নেমে এসেছিল ব্যক্তিগত শোক—মায়ের মৃত্যু। কিছু সময়ের জন্য তিনি দল ছেড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখলেন, দলটা আরও বেশি এক হয়ে গেছে!

একটা দৃশ্য নিশ্চয়ই মনে আছে দর্শকদের। সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে গোল করার পর এমবাপ্পে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন দেশমকে। দেশম মাথা নত করে তাঁকে সম্মান জানালেন। এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপের চেয়েও বড় কিছু জিনিস আছে জীবনে। আমরা কোচের পাশে আছি।’ কোচ আর খেলোয়াড়ের সম্পর্কটা সেখানে শুধু পেশাদার ছিল না, ছিল ব্যক্তিগত। এ কথার ভেতরেই ফ্রান্সের ড্রেসিংরুমটা বোঝা যায়।

এমবাপ্পেকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম

দে লা ফুয়েন্তের আবেগের প্রকাশ আবার একটু অন্য রকম। ডাগআউটে তাঁর চিৎকার কম, আছে হাসি। খেলোয়াড়দের ওপর চাপ কমিয়ে তিনি তাঁদের স্বাধীনতা দেন। তাঁর কাছে ফুটবল শুধু কৌশল নয়, একটা মানসিক অবস্থাও। তাঁর দলের পেদ্রি, রদ্রি কিংবা উনাই সিমোনরা যখন টিনএজার, তখন থেকেই লুইস তাঁদের চিনেছেন অনূর্ধ্ব-১৯ কিংবা অনূর্ধ্ব-২১ দলে। ফলে এই খেলোয়াড়েরা তাঁর কাছে কোনো ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের ঘুঁটি নন, এক একজন সন্তানের মতো। তাঁর ক্যাম্পে ফুটবলাররা ট্যাকটিক্যাল ক্লাসের চেয়ে কার্ড খেলে কিংবা সাইক্লিং করে সময় কাটান বেশি।

সেটার প্রতিদানও ফুয়েন্তেকে দিয়েছেন খেলোয়াড়েরা। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১—সব জায়গায় শিরোপা জিতেছেন। অলিম্পিকে রুপা এনেছেন। এখন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও উঠেছে।

ফরাসিদের জন্য দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ইউরো থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইউরো ও নেশনস লিগেও এই দে লা ফুয়েন্তের কাছেই বারবার হারতে হয়েছে তাদের।

আজ রাতে দেশম কি হিসাবটা পাল্টে দিতে পারবেন?

আর্জেন্টিনার ম্যাচে এবার কাকে রেফারি নিয়োগ দিল ফিফা

Read full story at source