রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর কষ্টের হিসাব কোথায়

· Prothom Alo

বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি নাগরিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত, যা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অভিবাসী উৎসদেশ হিসেবে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম দেশে পরিণত করেছে (আইওএম, ২০২৫)।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা বৈধ পথে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্সগ্রাহী দেশ।

Visit rhodia.club for more information.

প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং লাখো পরিবারের জীবিকা—সব ক্ষেত্রেই প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই তাঁদের বলা হয় ‘রেমিট্যান্স–যোদ্ধা’। রাষ্ট্র তাঁদের অবদানকে সম্মান জানায়, উন্নয়নের পরিসংখ্যানে তাঁদের পাঠানো অর্থের হিসাব তুলে ধরে।

কিন্তু সংখ্যার এই সাফল্যের আড়ালে যে মানুষটি আছেন, তাঁর গল্প কতটা বলা হয়? তপ্ত মরুভূমি, নির্মাণশ্রমের ধুলামাখা পরিবেশ কিংবা কারখানার দীর্ঘ শিফটে কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত প্রতিটি ডলারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও অসংখ্য ব্যক্তিগত ত্যাগ। আমরা রেমিট্যান্সের পরিমাণ গণনা করি, কিন্তু সেই রেমিট্যান্সের মানবিক মূল্য খুব কমই হিসাব করি। অথচ অভিবাসনের প্রকৃত গল্প শুধু অর্থনীতির নয়; এটি মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও ত্যাগেরও গল্প।

রেমিট্যান্সের আড়ালে থাকা মানবিক মূল্য

আন্তর্জাতিক অভিবাসন গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘সোশ্যাল কস্ট অব মাইগ্রেশন’, অর্থাৎ অভিবাসনের সামাজিক মূল্য। অভিবাসন শুধু আয় বাড়ায় না; এটি পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, লিঙ্গভূমিকা, সন্তান প্রতিপালন ও মানসিক স্বাস্থ্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অভিবাসন–গবেষক হাইন ডে হাস দেখিয়েছেন, অভিবাসনকে শুধু উন্নয়নের সাফল্য বা শুধু সংকট হিসেবে দেখা যায় না; এটি একই সঙ্গে সুযোগ ও ত্যাগের বাস্তবতা।

একইভাবে স্টিফেন ক্যাসলস মনে করেন, অভিবাসন কখনোই শুধু একজন মানুষের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া নয়; এটি পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককেও বদলে দেয়। বাংলাদেশে এই সামাজিক মূল্য নিয়ে আলোচনা এখনো সীমিত। আমরা রেমিট্যান্সের হিসাব রাখি, কিন্তু সেই অর্থের পেছনে থাকা মানুষের ক্ষয়, বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক চাপের মূল্য খুব কমই বিবেচনা করি।

রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের সঙ্গে প্রতারণার শেষ কোথায়? দূতাবাসগুলোর ভূমিকা কী?

এই বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম দিকটি প্রতিফলিত হয় প্রবাসীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশ থেকে ৪ হাজার ৮১৩ জন বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার অভিবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে; তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ৪০ বছরের কম বয়সী কর্মক্ষম তরুণ। এই পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয়, অভিবাসনের প্রকৃত মূল্য শুধু রেমিট্যান্সে নয়; মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক ও মর্যাদার মধ্যেও নিহিত।

রেমিট্যান্সের চমকপ্রদ সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো নীরব কান্না, অজস্র অপূর্ণতা ও অসংখ্য ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের গল্প। সাম্প্রতিক একটি সামাজিক গবেষণার অংশ হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের কিছু কষ্টের দিক সম্পর্কে জেনেছি, যা নিচে উপস্থাপন করছি।

দূরত্ব যখন সম্পর্ককে বদলে দেয়

প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো দীর্ঘ পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। অনেক প্রবাসী শ্রমিক ৫, ৭, এমনকি ১০ বছর পর্যন্ত পরিবার থেকে দূরে থাকেন; অনেকের জন্য বছরে একবার ছুটিতেও দেশে ফেরা সম্ভব হয় না। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবারের আবেগীয় বন্ধনকে বদলে দেয়। সন্তান বড় হয় বাবার সান্নিধ্য ছাড়া, স্ত্রীকে একাই সংসারের অধিকাংশ দায়িত্ব বহন করতে হয়, আর বৃদ্ধ মা–বাবার অসুস্থতার সময় ছেলের উপস্থিতি থাকে শুধু ফোনের ওপারে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো দেখা যায় ভিডিও কলে, কিন্তু অনুভব করা যায় না স্পর্শে।

অনেক পরিবার এই বাস্তবতাকে অসাধারণ দৃঢ়তায় সামলে নেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগের ঘাটতি, মানসিক একাকিত্ব এবং সামাজিক চাপ সম্পর্ককে দুর্বল করে। দাম্পত্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়, তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ঘটে, কখনো নতুন সম্পর্কও গড়ে ওঠে।

এসব ঘটনাকে কেবল ব্যক্তিগত বা নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। এগুলো প্রায়ই প্রবাসী কর্মীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি, মানসিক চাপ, দুর্বল যোগাযোগ এবং সামাজিক সহায়তার অভাবের সম্মিলিত ফল, যা কখনো কখনো তাঁর পরিবারকে ভঙ্গুর করে তোলে।

আমরা বহু বছর ধরে রেমিট্যান্সের হিসাব করেছি; এখন সময় এসেছে রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা মানুষটির হিসাব করার।

বাবা যখন শুধু অর্থের উৎস হয়ে ওঠেন

সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সন্তানের সুস্থ বিকাশে অর্থের মতোই বাবার উপস্থিতিও অপরিহার্য। কিন্তু বহু প্রবাসী বাবার সন্তান বড় হয় বাবার সান্নিধ্য ছাড়াই। তাঁরা জানেন, বাবা অর্থ পাঠান; কিন্তু তাঁর সঙ্গে দৈনন্দিন সম্পর্ক, স্মৃতি ও আবেগের বন্ধন গড়ে ওঠে না। ফলে অনেকের কাছে বাবা ধীরে ধীরে একজন অভিভাবকের চেয়ে অর্থের উৎসে পরিণত হন। সন্তান বাবার কষ্ট, ত্যাগ ও সংগ্রাম সম্পর্কে খুব কমই জানে। কোনো চাহিদা পূরণ না হলে সে ক্ষুব্ধ হয়, অথচ বুঝতে পারে না সেই অর্থ উপার্জনের জন্য বাবা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করেন। নিয়মিত অর্থ পাঠানো সম্ভব হলেও সন্তানের স্কুলের প্রথম দিন, অসুস্থতার রাত,

কৈশোরের সংকট কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় বাবার পাশে থাকা সম্ভব হয় না। এ অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভাষা বদলে দেয়—অনেক সন্তান বাবাকে ভালোবাসে, কিন্তু তাঁকে সত্যিকার অর্থে চেনে না। এই আবেগগত দূরত্বের প্রভাব পরিবারেও পড়ে। সন্তানের পড়াশোনা, নৈতিক শিক্ষা, বন্ধুবান্ধব ও সামাজিক আচরণে বাবার সরাসরি ভূমিকা সীমিত হয়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শাসন, দিকনির্দেশনা ও মূল্যবোধের চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এটি শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়; বরং এমন একটি সামাজিক বাস্তবতা, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও নৈতিক বিকাশেও পড়তে পারে।

অসীম প্রত্যাশার ভারে নুয়ে পড়া প্রবাসী

বাংলাদেশে এখনো অনেকের ধারণা, বিদেশ মানেই অঢেল অর্থ। তাই একজন প্রবাসী শ্রমিকের আয়কে ঘিরে পরিবারের প্রত্যাশার শেষ থাকে না—বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ, সন্তানের পড়াশোনা, আত্মীয়ের চিকিৎসা বা বিয়ের খরচ—সবকিছুর দায় যেন তাঁর একার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক সীমিত আয়ে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন যাপন করেন। অনেকেই ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে থাকেন, প্রতিকূল আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাজ করেন এবং নিজের প্রয়োজন কমিয়ে পরিবারের জন্য বেশি অর্থ পাঠান। অনেক সময় নিজের চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামও তাঁদের নাগালের বাইরে থেকে যায়। বিদেশে চাকরি হারানো, বেতন বিলম্বিত হওয়া বা অসুস্থ হয়ে পড়াও তাঁদের জীবনের বাস্তবতা।

সমস্যা শুরু হয় যখন ভালোবাসা ও দায়িত্বের জায়গায় প্রত্যাশা অধিকারবোধে পরিণত হয়। প্রবাসী মানুষটি অর্থ পাঠান পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থকে ভালোবাসার প্রকাশ নয়, বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। ফলে সামান্য দেরি হলেই অভিযোগ, অভিমান বা চাপ তৈরি হয়, অথচ খুব কম মানুষই ভাবেন—হয়তো ওই মাসে কাজ কম ছিল, বেতন আটকে গেছে, কিংবা তিনি নিজেই অসুস্থ ছিলেন। অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাই একজন প্রবাসীর ওপর শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীর মানসিক চাপও সৃষ্টি করে।

আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা জরুরি—প্রবাসীদের কাছ থেকে আমরা কতটা নিচ্ছি, আর তাঁদের জন্য কতটা ফিরিয়ে দিচ্ছি? একজন প্রবাসী শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; একজন মানুষ। তাঁর শ্রমের যেমন মূল্য আছে, তেমনি মূল্য আছে তাঁর অনুভূতি, সম্পর্ক ও জীবনের। আমরা বহু বছর ধরে রেমিট্যান্সের হিসাব করেছি; এখন সময় এসেছে রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা মানুষটির হিসাব করার।

সম্পদের সঙ্গে বাড়ে সম্পত্তির বিরোধও

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বড় অংশ বিনিয়োগ হয় জমি কেনা বা বাড়ি নির্মাণে। কিন্তু সেই সম্পত্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—এর মালিক বেশির ভাগ সময় দেশে থাকেন না। এই অনুপস্থিতির সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে দেখা দেয় জমি দখল, কাগজপত্রে জালিয়াতি, সীমানাবিরোধ, উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমা। বেদনাদায়ক হলো অনেক সময় প্রতিপক্ষ কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নন; বরং নিকটাত্মীয়। কখনো নিজের ভাই, কখনো চাচা বা চাচাতো ভাই, কখনো দূরসম্পর্কের আত্মীয়—যাঁদের ওপর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস ছিল, তাঁদের সঙ্গেই আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে হয়।

প্রবাসী তখন একই সঙ্গে দুটি যুদ্ধ করেন—একটি বিদেশের কর্মস্থলে, অন্যটি নিজের জন্মভূমির আদালতে। বিদেশে বসে আদালতের মামলা পরিচালনা করা, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে বছরের পর বছর কষ্টের উপার্জনে কেনা সম্পত্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে দেখেন, যে জমির জন্য জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টি বিদেশে কাটিয়েছেন, সেই জমিই এখন পারিবারিক শত্রুতার কারণ।

অদৃশ্য মানসিক চাপ

প্রবাসী শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা আমরা খুব কমই বলি। অনেক প্রবাসী নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারেন না। পরিবারকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চান না, আবার কর্মস্থলেও ব্যক্তিগত সংকট প্রকাশের সুযোগ থাকে না। দীর্ঘ একাকিত্ব, পারিবারিক সমস্যা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেককে গভীর হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। অনেকে বছরের পর বছর নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারেন না। কারণ, সমাজে একটি ধারণা আছে—বিদেশে আছেন মানেই ভালো আছেন। ধীরে ধীরে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা, আত্মসম্মানবোধের সংকট কিংবা সম্পর্কহীনতার অনুভূতি তাঁদের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে।

বাস্তবে অনেক প্রবাসী প্রতিদিন মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর বিষণ্নতা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বিষয়টি এখনো নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আসেনি।

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি এই অবিচার কেন?

সমাধান কোথায়?

একজন মানুষকে বিদেশে পাঠানোই রাষ্ট্রের দায়িত্বের শেষ নয়, বরং সেখান থেকেই শুরু হয় প্রকৃত দায়িত্ব। বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদান তখনই পূর্ণ অর্থ পাবে, যখন রেমিট্যান্সের পাশাপাশি তাঁদের পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতাও সুরক্ষিত থাকবে। প্রবাসীদের সংকট কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়; এটি একটি জাতীয় নীতিগত প্রশ্ন। দেশের অর্থনীতিতে যাঁদের অবদান এত গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তাই বিদেশগামী কর্মীদের প্রাক্‌-প্রস্থান প্রশিক্ষণে ভাষা ও পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি আর্থিক পরিকল্পনা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং মানসিক সুস্থতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশে থাকা পরিবারের জন্য আর্থিক সচেতনতা, দাম্পত্য সম্পর্ক, সন্তান প্রতিপালন এবং দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে কমিউনিটি-ভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, সহজলভ্য আইনি সহায়তা, ডিজিটাল সেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

সবশেষে আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা জরুরি—প্রবাসীদের কাছ থেকে আমরা কতটা নিচ্ছি, আর তাঁদের জন্য কতটা ফিরিয়ে দিচ্ছি? একজন প্রবাসী শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; একজন মানুষ। তাঁর শ্রমের যেমন মূল্য আছে, তেমনি মূল্য আছে তাঁর অনুভূতি, সম্পর্ক ও জীবনের। আমরা বহু বছর ধরে রেমিট্যান্সের হিসাব করেছি; এখন সময় এসেছে রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা মানুষটির হিসাব করার। কারণ, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ বৈদেশিক মুদ্রা নয়—তার মানুষ।

  • ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source