নির্দিষ্ট বেতন নেই, তবু নিজের শ্রমে পাহাড়ে ঋতুপর্ণা–রুপনাদের মতো ফুটবলার গড়ে তুলছেন এই কোচ
· Prothom Alo
মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীর সেন চাকমা একদিন ডেকে বললেন, ‘একটা বালিকা ফুটবল দল গড়ে তোল।’
সেই একটি বাক্যই যেন বদলে দিল শান্তিমনি চাকমার জীবন।
Visit sportbet.reviews for more information.
খেলাধুলার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও অভাবের কারণে পেশাদার খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগ পাননি রাঙামাটির এই সন্তান। এ যেন অন্যের মাধ্যমে নিজের স্বপ্নপূরণের সুযোগ।
বীর সেন চাকমাকে নিয়ে পার্বত্য জেলাগুলোর পাড়া-মহল্লা ঘুরে মেয়ে ফুটবলার খুঁজতে শুরু করলেন শান্তিমনি। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। অনেক অভিভাবকই রাজি হননি। মেয়েরা ফুটবল খেলবে—২০১১ সালের দিকে এ ধারণাই অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল। নানা বোঝাপড়া আর চেষ্টার পর ১৭ জন মেয়েকে পাওয়া গেল। তাদের জন্য ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনে আবাসনের ব্যবস্থা হলো। সকাল-বিকেল চলতে থাকল অনুশীলন।
দ্রুতই সাফল্য এল। ২০১২ সালে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হলো মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দল। এরপর মেয়েরা যখন মাধ্যমিকে ওঠে, তখন উদ্যোগ নিয়ে সবাইকে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করান শান্তিমনি ও বীর সেন চাকমা। উদ্দেশ্য একটাই—দল যেন ভেঙে না যায়।
শুরুর দিনগুলো ছিল কঠিন। খেলোয়াড়দের জন্য বুট কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। ছেঁড়া বুট সেলাই করে অনুশীলন চালাতে হয়েছে।
অনেক সময় মেয়েদের জন্য ন্যূনতম নাশতার ব্যবস্থাও করা যায়নি।
শান্তিমনি চাকমা বলেন, ‘একজন ফুটবলারের শরীর ঠিক রাখতে ভালো খাবার লাগে। সেটা দিতে না পারাটা আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট।’
রাঙামাটির কোচ শান্তিমনি চাকমাতবে অভাব সাফল্যের পথ রুখতে পারেনি। সেই দলই পরে এক দশকে স্কুল ফুটবলে তৈরি করে অনন্য ইতিহাস। ২০১৩ থেকে ২০১৫—টানা তিনবার জাতীয় রানার্সআপ, ২০১৬ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। এরপরও একের পর এক জাতীয় আসরে সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে ঘাগড়ার মেয়েরা।
বাংলাদেশ নারী ফুটবলের সাম্প্রতিক সাফল্যের গল্পে যেসব নাম বারবার উচ্চারিত হয়—ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, রুপনা চাকমা, আনাই মগিনী ও আনু মগিনী—তাঁদের যাত্রার শুরু এই মানুষটির হাত ধরেই। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জাতীয় দলের জার্সি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার পেছনে রয়েছে তাঁর এক দশকের বেশি সময়ের নিরলস শ্রম।
শান্তিমনি বলেন, ‘নিজে খেলতে পারিনি। টাকার অভাবে স্বপ্নটা মাঝপথেই থেমে গিয়েছিল। তখনই ঠিক করেছিলাম, আমার না-পারা স্বপ্নটা পাহাড়ের মেয়েদের দিয়ে পূরণ করব।’
আড়ালের লড়াই
আজও শান্তিমনি চাকমার কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। আগে ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। এখন শ্রমিক দিয়ে পাহাড়ে হলুদ ও আদার চাষ করেন। সেই আয়েই চলে সংসার, চলে ফুটবলের স্বপ্ন।
৪৫ বছর বয়সী শান্তিমনি এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। চার বছর আগে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে দুর্ঘটনায় মারা যায় তাঁর বড় মেয়ে নৃত্যশিল্পী শিল্পা চাকমা। সেই শোক এখনো বয়ে বেড়ান। কিন্তু ব্যক্তিগত বেদনা তাঁকে মাঠ থেকে সরাতে পারেনি।
২০২২ সালে সাফজয়ী দলের ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, রুপনা চাকমা, আনাই মোগিনী, আনুচিং মোগিনীদের সঙ্গে কোচ শান্তিমনি চাকমাকেও কাউখালীতে সংবর্ধনা দেওয়া হয়ফুটবলের পাশাপাশি পাহাড়ে সেপাক তাকরাও (ভলিবলজাতীয় খেলা, হাতের বদলে পা দিয়ে খেলতে হয়) জনপ্রিয় করে তুলেছেন শান্তিমনি। ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের মেয়েরাই প্রথম জাতীয় পর্যায়ে এই খেলায় প্রতিনিধিত্ব করে। নেপাল ও থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক আসরেও অংশ নিয়েছে তারা।
২০১৬ সালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটি হোস্টেল নির্মিত হয়। বর্তমানে সেখানে থেকে ২৬ জন মেয়ে ফুটবল অনুশীলন করে। খেলোয়াড়দের অসুস্থতা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে অনেক ক্ষেত্রে তাঁকেই খরচ বহন করতে হয়।
এই মেয়েরা তাকে কম আনন্দও দেয়নি। বাংলাদেশ নারী ফুটবলের দলটি সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়, তার গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ সদস্যই তাঁর শিষ্য। মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলেন, ‘জীবনে অনেক আনন্দ পেয়েছি, কিন্তু ওই দিনের মতো সুখ আর কখনো পাইনি।’
তাই মেয়েকে হারানোর শোক, অর্থকষ্ট, অবহেলা—এত কিছুর পরও মাঠ ছাড়েননি শান্তিমনি। বরং প্রতিদিন বিকেলে আবার গিয়ে দাঁড়ান মাঠে, খুঁজে ফেরেন নতুন কোনো মুখ। ‘যত দিন বেঁচে আছি, হাল ছাড়ব না। সহযোগিতা করুক বা না করুক, খেলোয়াড় তৈরির কাজ চালিয়ে যাব।’ বলেন শান্তিমনি। তাঁর বিশ্বাস, পাহাড়ের কোনো না কোনো গ্রামে আজও লুকিয়ে আছে আরও এক ঋতুপর্ণা, আরও এক মনিকা—শুধু খুঁজে বের করার অপেক্ষা।
জাহাজের মালপত্র কম দামে কিনতে পারবেন যে মার্কেট থেকে