বাজেটের কিছু পদক্ষেপ নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সহায়ক
· Prothom Alo

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেসব উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। প্রস্তাবিত বাজেটকে আমি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখি। যেখানে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
Visit rouesnews.click for more information.
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য ৪০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আমি মনে করি, এই বরাদ্দ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বিস্তার ঘটাবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে কল সেন্টার সেবা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ওয়েবসাইট নকশা ও উন্নয়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল বিপণন এবং ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিংয়ের মতো খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চলে যেখানে প্রযুক্তিভিত্তিক নারী উদ্যোক্তা এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেখানে এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। যেমন আমি চট্টগ্রামে একটি বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং কোম্পানি নিয়ে কাজ করছি। যার মূল কার্যক্রম হলো কল সেন্টার সেবা প্রদান, কাস্টম সফটওয়্যার সমাধান তৈরি, ওয়েবসাইট নকশা ও উন্নয়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এবং ব্র্যান্ডিং সেবা প্রদান।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার একটি অংশ যদি নারী নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা এবং নতুন ব্যবসা উদ্যোগের জন্য সহজ শর্তে বরাদ্দ করা হয়, তাহলে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে। এতে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের উন্নয়ন নয়, সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে বাজেটের সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পৃথক কোটাব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে সহজ জামানত নীতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য অতিরিক্ত বাধার মুখে পড়তে না হয়। পাশাপাশি সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর-সংক্রান্ত জটিলতা এখনো বড় বাধা। কর প্রক্রিয়া সহজ এবং ব্যবসা নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করতে পারলে অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অনেক সময় জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে উদ্যোক্তারা আনুষ্ঠানিক খাতে আসতে আগ্রহ হারান, যা অর্থনীতির সম্ভাবনাকে সীমিত করে দেয়।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজার সংযোগ বৃদ্ধি, ই-কমার্স সক্ষমতার উন্নয়ন এবং পণ্য ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তারা যদি সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান, তাহলে তাদের পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং টেকসই ব্যবসা গড়ে উঠবে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে প্রযুক্তি, ডিজিটাল বিপণন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বিষয়ে নিয়মিত ও বিস্তৃত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা দরকার।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তাঁরা আরও বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। সরকারি দরপত্র ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হলে নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা প্রমাণের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে আমি শুধু সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখি না। এটি একটি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের মৌলিক ভিত্তি। তাই বাজেটে ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি নীতি সহায়তা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রশিক্ষণ কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নারী উদ্যোক্তারা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও দৃশ্যমান ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
— ফারাহ সুলতানা, পরিচালক, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ইনফোটাইটান লিমিটেড।