একটি প্লাস্টিকের বোতল ধ্বংস হতে কত সময় লাগে
· Prothom Alo

মানুষের তৈরি অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী বস্তু হলো প্লাস্টিকের পানির বোতল। এসব বোতল আবিষ্কৃত হয়েছে ৫০ বছরের কিছু বেশি সময় আগে। কোমল পানীয় ও পানির জন্য আমরা আজ স্বচ্ছ পিইটি বোতল ব্যবহার করি, তার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। ডুপন্টের প্রকৌশলী নাথানিয়েল ওয়ায়েথ এই বিশেষ কনটেইনারের পেটেন্ট নেন। হালকা, ভেঙে না যাওয়ার সুবিধা এবং সস্তায় ব্যাপক উৎপাদনের কারণে এক দশকের মধ্যেই পিইটি বোতল বিশ্বজুড়ে কাচের বোতলের জায়গা দখল করে নেয়। বর্তমানে প্রতি মিনিটে ১০ লাখের বেশি পিইটি বোতল তৈরি হচ্ছে। তবে এই রাসায়নিক স্থায়িত্বই এখন পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার অবশিষ্টাংশ বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম কোণগুলোতেও খুঁজে পাচ্ছেন।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
সাধারণত বলা হয়ে থাকে, একটি প্লাস্টিকের বোতল প্রাকৃতিকভাবে পুরোপুরি ধ্বংস হতে প্রায় ৪৫০ বছর সময় নেয়। এই হিসাব মূলত ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে অনুমান করা হয়েছে। কারণ, পিইটি প্লাস্টিকের উদ্ভাবনই হয়েছে ৫০ বছর আগে। কোনো বোতলকে এখনো সম্পূর্ণ পচন চক্র শেষ করতে দেখা যায়নি। তবে নিশ্চিত বিষয় হলো, একটি কলার খোসা বা কাগজের টুকরা যেভাবে সম্পূর্ণ মিশে যায়, প্লাস্টিক সেভাবে মিলিয়ে যায় না। এটি কেবল রূপ পরিবর্তন করে মারাত্মক ক্ষতিকর আকার ধারণ করে।
কাঠ, তুলা বা কাগজের মতো প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সহজেই হজম করতে পারে। কারণ, এগুলোকে ভেঙে ফেলার মতো এনজাইম বা উৎসেচক প্রকৃতির বুকেই রয়েছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর আগে পিইটির মতো কৃত্রিম পলিমারের কোনো অস্তিত্ব প্রকৃতিতে ছিল না। ফলে কোনো অণুজীবই এই কৃত্রিম বন্ধনগুলোকে সহজে ভাঙতে পারে না। প্রকৃতির ক্ষয়প্রক্রিয়ায় এটি হারিয়ে যাওয়ার বদলে শুধু আকারে ছোট হতে থাকে। সূর্যের আলো, তাপ ও বাতাসের ঘর্ষণে বোতলগুলো ভঙ্গুর হয়ে প্রথমে টুকরা টুকরা অংশে পরিণত হয়। এরপর তা ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে এবং শেষ পর্যন্ত খালি চোখে অদৃশ্য ন্যানোপ্লাস্টিকে রূপ নেয়। প্লাস্টিক আসলে অদৃশ্য হয় না, কোটি কোটি ক্ষুদ্র কণা হয়ে বাতাসে, মাটিতে ও পানিতে মিশে যায়।
বিশ্বের ঠিক কোন কোন দুর্গম এলাকায় এই প্লাস্টিকের কণাগুলো পৌঁছে গেছে, তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। আলফ্রেড ওয়েগেনার ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা গ্রিনল্যান্ড ও স্যালবার্ডের মধ্যবর্তী ফ্রাম স্ট্রেইটের বরফ, সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বত এবং জার্মানির বিভিন্ন এলাকা থেকে পড়া তুষার পরীক্ষা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের বসতি থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আর্কটিকের উচ্চ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি তুষারের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিশে আছে।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, বাতাসের প্রবাহের মাধ্যমে এই কণাগুলো বায়ুমণ্ডলে ভেসে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের পাইরেনিস পর্বতের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে গবেষণায় দেখা গেছে, নিকটবর্তী শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে হওয়া সত্ত্বেও সেখানে প্রতিদিন প্রতি বর্গমিটারে গড়ে প্রায় ৩৬৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা তুষার ও বৃষ্টির সঙ্গে ঝরে পড়ছে। উইন্ড প্যাটার্ন বা বাতাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই কণাগুলো থিতু হওয়ার আগে বাতাসে অন্তত ৯৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। প্লাস্টিকের এই বিস্তার কেবল ওপরের দিকেই নয়, সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেন্সসহ ৬টি গভীরতম সামুদ্রিক খাত থেকে সংগৃহীত ছোট চিংড়িজাতীয় জীব অ্যামফিপডের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। দেখা গেছে, মারিয়ানা ট্রেন্সের একদম তলদেশ থেকে উদ্ধার করা শতভাগ জীবের পরিপাকতন্ত্রে নাইলন, পলিথিন ও পিভিসির মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি রয়েছে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া