বিজ্ঞানী হলো এমন এক শিশু, যে আসলে কখনো বড় হয়নি—নীল ডিগ্র্যাস টাইসন, জ্যোতিঃপদার্থবিদ
· Prothom Alo

আধুনিক বিজ্ঞানের জগতে নীল ডিগ্র্যাস টাইসন অতি পরিচিত এক নাম। বিজ্ঞানের, বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। তাঁর জন্ম ১৯৫৮ সালের ৫ অক্টোবর নিউইয়র্ক সিটির হার্লেমে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ডে পড়াশোনা করেছেন, পিএইচডি করেছেন কলাম্বিয়া থেকেই। পেশায় তিনি অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট। কিন্তু শুধু বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দিলে তাঁকে অর্ধেক চেনা হয়। টাইসনের আসল জাদু হলো বিজ্ঞানকে মানুষের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা। কার্ল সেগানের বিখ্যাত ধারাবাহিক ‘কসমস’-এর নতুন সংস্করণ ‘কসমস: আ স্পেসটাইম ওডিসি’ উপস্থাপনা করেছেন তিনি। তাঁর জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘স্টারটক’ বিজ্ঞান ও রসবোধের এক অদ্ভুত মিশেল। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে লিখেছেন অসংখ্য বই। এর মধ্যে রয়েছে স্টারটক, অ্যাস্ট্রোফিজিকস ফর পিপল ইন আ হারি, ডেথ বাই ব্ল্যাকহোল, দ্য স্কাই ইজ নট দ্য লিমিট, ওয়েলকাম টু দ্য ইউনিভার্স।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
বিখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ল্যারি কিং (১৯৩৩-২০২১) ২০১৩ সালের অক্টোবরে একটি সাক্ষাৎকার নেন। ওই বছরের নভেম্বরে ‘ল্যারি কিং নাউ’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়। এতে ব্যক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক জীবন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন নীল টাইসন। বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য বিশেষ এই সাক্ষাৎকারের অনুবাদ ছাপানো হলো।
ল্যারি কিং: আমরা এখন বসে আছি নিউইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারের চূড়ায়। অক্টোবরের এই চমৎকার দিনে এখান থেকে দৃশ্যটা দারুণ লাগছে। আমার বিশেষ অতিথি নীল ডিগ্র্যাস টাইসন। মানুষ হিসেবে মিস্টার টাইসন অসাধারণ। তিনি একাধারে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী, বিজ্ঞানী, টুইটারে ১৫ লাখ ফলোয়ার, নিউইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার লেখক, ‘স্টারটক’ পডকাস্টের উপস্থাপক এবং নামকরা হেইডেন প্ল্যানেটারিয়ামের পরিচালক। আট বছর বয়সে আমি স্কুল থেকে ছোট ছেলেদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। তাঁর নতুন শো ‘কসমস’ ২০১৪ সালের শুরুতে ফক্স চ্যানেলে সম্প্রচার শুরু হয়। তিনি এ পর্যন্ত ১৮টি সম্মানসূচক ডক্টরেট এবং নাসার ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস মেডেল পেয়েছেন। নাসার পক্ষ থেকে কোনো বেসরকারি নাগরিককে দেওয়া এটাই সর্বোচ্চ সম্মাননা। শুরু করার আগে একটা কথা বলি, আমি অনেক ছেলের সঙ্গে বড় হয়েছি, কিন্তু তাদের কেউই জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হতে চাইত না। আমি জানি না, আপনি কোথায় বড় হয়েছেন। ব্রুকলিন? আপনি কোন স্কুলে পড়েছিলেন?
নীল ডিগ্র্যাস টাইসন: আসলে আমি বড় হয়েছি ব্রঙ্কসে।
ল্যারি কিং: ব্রঙ্কসে! তাহলে আপনি চার তারকার জেনারেল হতে চাইতেন?১ নাকি মহাকাশচারী?
নীল: শহরে বেড়ে উঠলে আকাশের সঙ্গে সেভাবে সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। বাইরে তাকালে শুধু দালানকোঠাই চোখে পড়ে। তখনকার দিনে তো ধোঁয়া আর দূষণও ছিল। আসলে হেইডেন প্ল্যানেটারিয়ামে প্রথমবার যাওয়াটাই ছিল আমার জন্য বিশাল একটা ব্যাপার। এখন আমি ওই প্ল্যানেটারিয়ামের পরিচালক। ছোটবেলায় সেখানে গিয়ে আমার চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল।
আজকের দিনে আমরা সবাই স্কুল থেকে কোনো না কোনো সময় শিক্ষাসফরে যাই। আমার ধারণা, সেই সফর সবার মনে একইভাবে দাগ কাটে না। কিন্তু আমি প্ল্যানেটারিয়ামে সেই চেয়ারে বসার পর সেটা আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। ২ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের মাথায় সব আলো নিভে গেল। কৃত্রিম আকাশে তারারা ফুটে উঠল। সেটা দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি মনে করি, সেদিন মহাবিশ্বই আমাকে বেছে নিয়েছিল। এতে আমার কোনো হাত ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারলাম...
ল্যারি কিং: তাই নাকি? তখনই ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন?
নীল: হ্যাঁ। তখন আমার বয়স ৯ বছর। ১১ বছরে বুঝলাম, এটাকে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়। ৯ বছর বয়সে তো কেউ পেশা নিয়ে ভাবে না। তখন শুধু মাথায় থাকে—সবচেয়ে চমৎকার জিনিস কোনটি?
বিজ্ঞানীরা কীভাবে দুই দিনের মধ্যে হান্টাভাইরাস পিসিআর পরীক্ষা তৈরি করলেনআমি প্ল্যানেটারিয়ামে সেই চেয়ারে বসার পর সেটা আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। ২ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের মাথায় সব আলো নিভে গেল। কৃত্রিম আকাশে তারারা ফুটে উঠল।
ল্যারি কিং: কোন ব্যাপারটা আপনাকে মুগ্ধ করেছিল?
নীল: সেই বিশালতা, সেই ইনফিনিটিটিউড (অসীমতা)...
ল্যারি কিং: ইনফিনিটিটিউড?
নীল: আমি জানি না, এই শব্দটির আসলে অস্তিত্ব আছে কি না, তবে আপনি তো বুঝতে পারছেন, আমি আসলে কী বোঝাতে চাইছি।
ল্যারি কিং: ভালো শব্দ, হ্যাঁ!
নীল: আমি বুঝতে পারলাম, একে (মহাবিশ্বকে) বুঝতে হলে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ পদ্ধতি, সরঞ্জাম ও মেধা। পরে জানতে পারলাম, গণিত শিখতে হবে। কারণ, মহাবিশ্বের ভাষা হলো গণিত। ব্যাপারটা এত অল্প বয়সে বুঝে ফেলার সুবিধাটা হলো, আমার মধ্যে গণিত নিয়ে কোনো ভীতি তৈরি হয়নি। কারণ, আমি মহাবিশ্বের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। আর আপনি যদি কারও সঙ্গে কথা বলতে চান, তাহলে অবশ্যই তার ভাষা শিখবেন। তাই এখানে ভয়ের কোনো ব্যাপারই ছিল না।
ল্যারি কিং: আমরা যখন কথা বলছি, ঠিক এই মুহূর্তে সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।২ নাসার প্রায় ৯৭ শতাংশ কর্মচারীকে সাময়িকভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে। এর প্রভাবগুলো কী?
নীল: ভালো লাগছে যে মহাকাশ স্টেশনে আমাদের নভোচারীদের দেখাশোনার লোকজন আছে। কাউকে না কাউকে তো তাঁদের দেখতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের পরবর্তী বড় মিশন—জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, যাকে হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরি বলতে পারেন—সেটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ভাগ্যক্রমে কিছু কর্মী সেই ক্রায়োজেনিক পরীক্ষা দেখাশোনা করতে পারছেন। কিন্তু এটা শুধু নাসার বিষয় নয়; বরং পুরো সরকারের ব্যাপার। মানুষ সরকারকে দোষ দিতে পছন্দ করে, কিন্তু এটা গণতন্ত্র। আসলে আমরাই তো সেসব মানুষকে নির্বাচিত করি, যারা কিনা শেষ পর্যন্ত এই সরকারব্যবস্থাই অচল করে দেয়। হয়তো আমরাই ভুল মানুষ বেছে নিচ্ছি।
ল্যারি কিং: অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, পৃথিবীতে দারিদ্র্য, ক্ষুধার মতো এত এত সমস্যা থাকতে নাসা বা মহাকাশ গবেষণা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
নীল: প্রশ্নটাকে দুভাগে ভাগ করি। প্রথমত, মহাকাশ নিয়ে আমার আগ্রহ কেন? কারণ, আমি মনে করি, এটা অসাধারণ, সীমাহীন, অন্তহীন—এটা আমাদের প্রত্যেকের কৌতূহলের বীজ ধারণ করে। আমাদের ডিএনএতে যতটুকু কৌতূহল আছে, সেটারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায় নাসা। নিশ্চয়ই বলবেন না যে আপনি কোনো রাতে বাইরে গিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ভাবেননি—তারাগুলো কত দূরে? ওগুলো কী দিয়ে তৈরি? সেখানে কি প্রাণ আছে? সবকিছু শুরু হলো কীভাবে? কীভাবে শেষ হবে?
মাতৃভাষায় বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখিতে কোনো অসুবিধা দেখি না— শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী, শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীমানুষ সরকারকে দোষ দিতে পছন্দ করে, কিন্তু এটা গণতন্ত্র। আসলে আমরাই তো সেসব মানুষকে নির্বাচিত করি, যারা কিনা শেষ পর্যন্ত এই সরকারব্যবস্থাই অচল করে দেয়।
ল্যারি কিং: কেনেডি যেমনটা বলেছিলেন, আমাদের সৃষ্টিই হয়েছে অন্বেষণ বা অভিযানের জন্য।৩ কিন্তু এটি কি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
নীল: আপনি ব্যবহারিক বিষয়গুলো নিয়ে জানতে চাইছেন? ঠিক আছে, চলুন বাস্তবসম্মত দিকগুলো দেখি। আমি যখন মহাকাশ নিয়ে ভাবি, তখন একে আমাদের সবার ওপর কাজ করা এক সম্মোহনী শক্তি হিসেবে দেখি, বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে। এটি মানুষকে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, গণিত ও প্রযুক্তি, অর্থাৎ STEM (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথ) নিয়ে পড়াশোনা করতে দারুণভাবে উৎসাহিত করে।
এখন বড় হয়ে কেউ মহাকাশ গবেষণায় কাজ করুন আর না–ই করুন, এই শিক্ষার মাধ্যমে এমন এক জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, যাদের চিন্তার ধরন অন্যদের চেয়ে আলাদা। যেমন কোনো ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে এলে আমাদের প্রথম চিন্তা কী হয়? ‘ওহ্, চলো পালিয়ে যাই!’ অথবা ‘চলো, টয়লেট পেপার আর পানি মজুত করি!’—হ্যাঁ, এটি একধরনের চিন্তা। কিন্তু অন্যদিকে একজন বিজ্ঞানী ভাববেন, কীভাবে আমরা ওই ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারি, যাতে সেটা শহর ধ্বংস করার বদলে শহরটিকে বিদ্যুৎ জোগাতে পারে? অথবা পৃথিবীর দিকে কোনো গ্রহাণু ধেয়ে এলে আমরা কোথায় পালাব, তা না ভেবে, কীভাবে আমরা এর গতিপথ বদলে দিতে পারি?
আপনার সমাজে যখন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা থাকবেন, তখন ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন তোলা হবে এবং ভিন্ন ধরনের সমাধান বেরিয়ে আসবে। এসব সমাধানই আমাদের সংস্কৃতিকে বদলে দেয় এবং পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের স্বরূপ বদলে দেয়।
ল্যারি কিং: আপনি নভোচারী হননি কেন?
নীল: সেই সময়ে নভোচারী আসলে ছিল? ষাটের দশকের কথা আমার এখনো মনে আছে। অবশ্য সত্তরের দশকেই আমি সামাজিকভাবে বেশি সক্রিয় ছিলাম। তখন এমন সব মানুষকে নভোচারী হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছিল, যাঁদের চুল একদম ছোট করে ছাঁটা এবং তাঁরা ছিলেন সামরিক বাহিনীর পাইলট।
তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। ব্রডওয়েতে ‘হেয়ার’ ছিল এক নম্বর মিউজিক্যাল। আমার মোটেও মনে হতো না যে নাসা আমার মতো কারও সঙ্গে কথা বলছে।
ল্যারি কিং: এখন তো তারা আপনাকেও (মহাকাশে) নিয়ে যাবে।
নীল: ওহ হ্যাঁ, আমি মনে করি, আমার হয়তো যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকত। কিন্তু তখনকার দিনে (নাসার লক্ষ্যের সঙ্গে আমার ইচ্ছার) কোনো মিল ছিল না। তা ছাড়া সেই সময়ে নাসা কোথায় যাচ্ছিল? তারা স্রেফ পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমাকে যদি মহাকাশে পাঠাতে চান, তাহলে আমাকে কোনো একটা গন্তব্যে নিয়ে যেতে হবে। হয় সুদূর কোনো গ্রহে কিংবা চাঁদে!
ল্যারি কিং: আপনার কি মনে হয়, সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা কংগ্রেসে আছেন, তাঁরা নাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন?
নীল: আমার ধারণা, তারা কিছুটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেটা আমাদের নিজেদের জন্যই চরম বিপদের কারণ। এর মধ্যে অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো গ্রহাণুর আঘাত। ৬৫ মিলিয়ন (সাড়ে ৬ কোটি) বছর আগে একটি গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল।
তাদের (ডাইনোসরদের) যদি কোনো স্পেস প্রোগ্রাম থাকত, তাহলে তারা হয়তো ওটাকে পথচ্যুত করার কোনো উপায় বের করে ফেলত। কিন্তু তাদের তো একটার বিপরীতে অন্যটা ব্যবহার করার মতো আঙুলই ছিল না। তাদের মগজও ছিল একটা আখরোটের সমান...
চেরনোবিল শুধু পারমাণবিক দুর্ঘটনা নয়—সেরহিই কুরিকিন, সহপ্রতিষ্ঠাতা, উইপ্ল্যানেট ইউক্রেনসত্তরের দশকেই আমি সামাজিকভাবে বেশি সক্রিয় ছিলাম। তখন এমন সব মানুষকে নভোচারী হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছিল, যাঁদের চুল একদম ছোট করে ছাঁটা এবং তাঁরা ছিলেন সামরিক বাহিনীর পাইলট।
ল্যারি কিং: তাঁদের সেই আখরোটের মতো ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে তো আর স্পেস প্রোগ্রাম চালানো সম্ভব ছিল না।
নীল: পৃথিবীকে রক্ষা করা আমাদের সাধ্যের বাইরে নয়। কোনো গ্রহাণুর আঘাতে যদি পৃথিবীতে আমরা বিলুপ্ত হই, তাহলে এই গ্যালাক্সির এলিয়েনদের কাছে আমরা হাসির পাত্র হয়ে থাকব।
ল্যারি কিং: সেলিব্রিটি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হতে কেমন লাগে?
নীল: আমি তো কখনো ভাবতেই পারিনি, এই দুটি শব্দ (সেলিব্রিটি ও অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট) কখনো একই বাক্যে বসতে পারে! এখন অবস্থা এমন যে প্রতিদিন রাস্তাঘাটে ৫০ থেকে ১০০ জন অচেনা মানুষ আমাকে থামায়।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনিই কি সেই অ্যাস্ট্রো...?’ এর ভালো দিকটা হলো—বেশির ভাগ সময় তারা বলে, ‘আপনি যে ব্ল্যাকহোলটার কথা বলেছিলেন, ওটা নিয়ে আমাকে আরও কিছু বলুন তো!’ অর্থাৎ তাদের আগ্রহ আসলে আমার প্রতি নয়, মহাবিশ্বের প্রতি। আমি স্রেফ তাদের এবং মহাকাশের মাঝখানে একটি সেতু হিসেবে কাজ করছি। অনেকটা তাদের সামনে মহাজাগতিক এক ভোজ পরিবেশন করছি।
ল্যারি কিং: আমরা আসলে কতটুকু জানি, আর কতটুকু জানি না? মানে...আমাদের জ্ঞানের শতাংশটা ঠিক কতটুকু? যদি ১০০-এর একটি স্কেল ধরা হয়, তাহলে আমরা কোথায় আছি?
অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট নীল ডিগ্র্যাস টাইসননীল: বাস্তবে আমরা আসলে কতটুকু জানি না, সে সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। তবে আমরা যদি মহাবিশ্বের দিকে তাকাই এবং এখানে যা কিছু ঘটছে, তার পেছনে কাজ করা শক্তিগুলোর দিকে নজর দিই, তাহলে আমরা মাপতে পারি যে তার কতটুকু আমাদের জানা। আর তার পরিমাণ হলো মাত্র ৪ শতাংশ!
ল্যারি কিং: মাত্র ৪ শতাংশ?
নীল: হ্যাঁ, মাত্র ৪ শতাংশ। তাই অন্যভাবে বলতে গেলে, মহাবিশ্বে এমন অনেক কিছু ঘটছে, যা আজও আমাদের স্তম্ভিত করে দেয়। মহাজগতের এসব কৌতূহলী ও রহস্যময় ঘটনাকে যদি আপনি যোগ করেন, তাহলে দেখা যাবে—ব্রহ্মাণ্ডের পুরো মহাকর্ষ বলের ৮৫ শতাংশেরই এমন এক উৎস রয়েছে, যার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না! একেই আমরা বলি ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্ত বস্তু।
আরও আছে ডার্ক এনার্জি বা গুপ্ত শক্তি। সব গ্যালাক্সির সম্মিলিত মহাকর্ষ বলের বিরুদ্ধে গিয়েও মহাবিশ্ব তার প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে (দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে)। আমরা সেটাও মাপতে পারি। কিন্তু এর পেছনে কারণটা যে কী, তা আমরা এখনো জানি না। সব মিলিয়ে দেখুন, মহাবিশ্বের ৯৬ শতাংশই আমাদের অজানা! সুতরাং আমরা এক অতল অজ্ঞতার খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি।
বিশৃঙ্খলাকে বশে এনে ৩০ কোটি টাকার ব্রেকথ্রু পুরস্কার!মহাজগতের কৌতূহলী ও রহস্যময় ঘটনাকে যদি আপনি যোগ করেন, তাহলে দেখা যাবে—ব্রহ্মাণ্ডের পুরো মহাকর্ষ বলের ৮৫ শতাংশেরই এমন এক উৎস রয়েছে, যার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না!
ল্যারি কিং: আপনি সেগানের সেই ‘কসমস’ সিরিজটিকে পুনরায় নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন।
নীল: হ্যাঁ, হ্যাঁ—একুশ শতকের জন্য। আসলে আগের সিরিজটির পর ৩৩ বছর কেটে গেছে। আমরা সারা বিশ্ব ঘুরে কাজ করেছি। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক এ মাসেই আমাদের চিত্রগ্রহণের কাজ শেষ হচ্ছে। এরপর ভয়েসওভারের কাজ, স্পেশাল ইফেক্টস, অ্যানিমেশন ও ভিজ্যুয়ালাইজেশনের কাজগুলো বাকি থাকবে। আশা করছি, এটি আগামী বসন্তে মুক্তি পাবে—আসলে এটি ফক্স নেটওয়ার্কে সম্প্রচার করা হবে।
ল্যারি কিং: সেটি সত্যিই অসাধারণ কিছু হবে!
নীল: হ্যাঁ, আমাদের সবার এই শো-টি নিয়ে অনেক আশা। আমাদের সঙ্গে লেখক হিসেবে আছেন অ্যান ড্রুয়ান। তিনি মূল সিরিজেরও অন্যতম সহলেখক ছিলেন। তাই বলা যায়, মূল সিরিজের সঙ্গে আমাদের একটি নাড়ির টান রয়েছে। অবশ্য কার্ল (সেগান) আজ আমাদের মাঝে নেই...
ল্যারি কিং: আপনি নিজে কখন মহাকাশে যেতে চান?
নীল: আমি অবশ্যই মহাকাশে যেতাম, আমাকে যদি সত্যিকারের কোনো জায়গায় পাঠানো হতো। শত শত মানুষ আগে গেছেন, এমন কোনো জায়গায় যেতে চাই না। যেমনটা স্পেস শাটল করত—ব্লকের চারপাশে গাড়ি চালিয়ে ঘোরার মতো (পৃথিবীর কক্ষপথে ঘোরা)। মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখাটা অবশ্যই মজার ব্যাপার, কিন্তু অন্য কোথাও না যাওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে চাই। আমি মঙ্গল গ্রহে কিংবা কোনো গ্রহাণুতে যেতে চাই।
ল্যারি কিং: আমরা কবে সেখানে (মঙ্গলে বা গ্রহাণুতে) পৌঁছাতে পারব?
নীল: বিষয়টিকে একটু পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য বলি, আমি যদি ক্লাসরুমে রাখা একটি গ্লোব নিই এবং আপনাকে জিজ্ঞাসা করি যে এই গ্লোবের আকারের তুলনায় স্পেস স্টেশন বা স্পেস শাটল কতটুকু ওপরে যায়? তাহলে উত্তরটি হলো, গ্লোব থেকে মাত্র ৩/৮ ইঞ্চি (বা ১ ইঞ্চির ৮ ভাগের ৩ ভাগ) ওপরে! অথচ আমরা সবাই যেন নিজেদের বুঝিয়ে দিয়েছি, ওটাই হলো মহাকাশ! কিন্তু না, আমার কাছে তা নয়—একজন জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীর কাছে ওটা মহাকাশ নয়।
তাহলে চাঁদ কত দূরে? ওই গ্লোব থেকে চাঁদ হবে প্রায় ৩০ ফুট দূরে—মানে একটি আস্ত ঘরের সমান দূরত্বে। আর মঙ্গল গ্রহ? ওই গ্লোব থেকে মঙ্গলের দূরত্ব হবে প্রায় এক মাইল দূরে!
বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে পাঠ করা—ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, লেখক ও অধ্যাপকমহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখাটা অবশ্যই মজার ব্যাপার, কিন্তু অন্য কোথাও না যাওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে চাই। আমি মঙ্গল গ্রহে কিংবা কোনো গ্রহাণুতে যেতে চাই।
ল্যারি কিং: আমরা কি আদৌ সেখানে (মঙ্গলে) পৌঁছাতে পারব?
নীল: সেখানে (মঙ্গলে) যাওয়ার মাত্র দুটি উপায় আছে। প্রথমটি হলো—আগামীকাল চীন যদি ঘোষণা করে, তারা সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি বানাতে চায়, তাহলে দেখবেন, মাত্র এক মাসের মধ্যে আমরা মহাকাশযান ডিজাইন, অর্থায়ন ও ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে ফেলব। আর পরের ৯ মাসের মধ্যেই আমরা সেখানে পৌঁছে যাব!
আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে যুদ্ধের মতো কোনো পরিস্থিতি মহাকাশ অভিযানের মূল চালিকা শক্তি হোক। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এককালে সেই তাড়নাই আমাদের চাঁদে পৌঁছে দিয়েছিল। আমরা এখন সেই সময়কে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মনে রাখি না। কিন্তু প্রথম কয়েক সপ্তাহ বা সেই শুরুর দিকে রাশিয়াই ছিল আমাদের আসল হুমকি। আর তখন চাঁদ ছিল যুদ্ধের নতুন রণক্ষেত্র। তবে একটি পুঁজিবাদী সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে মহাকাশ অভিযানের আরেকটি সম্পূর্ণ মহৎ উদ্দেশ্য হতে পারে এর অর্থনৈতিক সুফল। অর্থাৎ আপনার সংস্কৃতি বা আপনার জাতির জন্য এখান থেকে বড় মাপের আর্থিক মুনাফা অর্জন করা।
ল্যারি কিং: এক মনোবিজ্ঞানী আমাকে একবার বলেছিলেন, যেদিন রাশিয়া আমাদের আগেই মহাকাশে মানুষ পাঠিয়েছিল, সেদিনই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পৃথিবীটা বদলে গিয়েছিল।
নীল: সত্যিই তা–ই। আসলে আমরা যদি নিজেদের কাছে একদম সৎ হই, তাহলে সেই মহাকাশ প্রতিযোগিতায় নিজেদের পথপ্রদর্শক হিসেবে দাবি করাটা ঠিক হবে না। কারণ, বাস্তবে আমরা ছিলাম স্রেফ পাল্টা–প্রতিক্রিয়াশীল। আমরা কোনো কিছু নিজে থেকে শুরু করিনি; বরং রাশিয়ার করা কাজের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা–পদক্ষেপ নিয়েছি। রাশিয়া মহাকাশে স্পুতনিক পাঠাল, আর আমরা আক্ষরিক ও রূপক—উভয় অর্থেই মারমুখী হয়ে উঠলাম। সেই উত্তেজনার মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হলো নাসা (মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা)। মজার ব্যাপার হলো, নাসা যে সপ্তাহে প্রতিষ্ঠিত হয়, ঠিক সেই সপ্তাহেই আমার জন্ম। তাই নাসার সঙ্গে আমি একটা আত্মিক টান অনুভব করি।
এরপর রাশিয়া কক্ষপথে মানুষ পাঠাল। আমরাও মানুষ পাঠালাম। রাশিয়া মহাকাশে প্রথম প্রাণী (লাইকা নামে একটি কুকুর) পাঠাল। আমরাও তা–ই করলাম। অর্থাৎ সে সময় আমরা যা যা করেছি, তার প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল রাশিয়ার দেওয়া চ্যালেঞ্জের পিঠে আমাদের একেকটি পাল্টা–প্রতিক্রিয়া।
৫৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় বেঁচে ফেরা এক শিশুর গল্পআপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে যুদ্ধের মতো কোনো পরিস্থিতি মহাকাশ অভিযানের মূল চালিকা শক্তি হোক। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এককালে সেই তাড়নাই আমাদের চাঁদে পৌঁছে দিয়েছিল।
ল্যারি কিং: মহাবিশ্বের অন্য কোথাও কি জীবন আছে?
নীল: আপনি যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন, পৃথিবীতে প্রাণের যে উপাদানগুলো আছে, সেগুলো কিন্তু বিশেষ কিছু নয়। এগুলো মূলত কার্বন, নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন দিয়ে তৈরি। এগুলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ উপাদান। তাই আমাদের রসায়ন বা গঠনকে অনন্য বলা যায় না। কারণ, এগুলো সবখানেই আছে।
প্রশ্ন হলো, কোনো গ্রহের উপরিভাগে প্রাণ থাকতে পারে—এমন সম্ভাব্য জায়গা কতগুলো আছে? বর্তমানে আমরা সেই তালিকা তৈরির কাজ করছি। কেপলার টেলিস্কোপে সম্প্রতি কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলেও তার আগে সেটি সূর্যের কাছাকাছি নক্ষত্রদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করা হাজারখানেক গ্রহের একটি তালিকা দিয়েছে। সেটা স্রেফ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আমাদের আশপাশের ছোট এক অংশের হিসাবমাত্র।
ল্যারি কিং: কাজেই…
নীল: কাজেই সংখ্যাগুলো নিয়ে একটু ভাবলে আপনিও বুঝতে পারবেন যে মহাবিশ্বে আমরা একা—এমনটা দাবি করা হবে একধরনের অমার্জনীয় অহংকার। বিষয়টি নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই বলবেন, পরিসংখ্যান প্রাণের অস্তিত্বের পক্ষেই জোরালো যুক্তি দেয়।
আর সেই প্রাণ আমাদের সংজ্ঞানুযায়ী ‘বুদ্ধিমান’ কি না, সে বিষয়ে একটি কথা বলি। কথাটা শুনলে আপনার রাতের ঘুম হারাম হতে পারে। হয়তো এমন প্রাণেরও অস্তিত্ব আছে, যারা এতই বুদ্ধিমান যে তারা আমাদের বুদ্ধিমান বলেই গণ্য করে না। আমরা বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা দিয়েছি নিজেদের মতো করে। কল্পনা করুন, তারা এতই মেধাবী যে তারা আমাদের দিকে ফিরেও তাকাবে না, সময়ও নষ্ট করবে না। ঠিক যেমন সকালে বৃষ্টির পর রাস্তার পাশে খাবি খাওয়া কোনো কেঁচো দেখে আপনি কি ভাবেন, ‘আহা, কেঁচোটা জানি কী ভাবছে?’ না, আপনি সে কথা ভাবেন না; বরং নিজের অজান্তেই তার ওপর পা দিয়ে চলে যান।
সুতরাং আমরাই মহাবিশ্বের একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী এবং আমরা অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণের সঙ্গে কথা বলতে পারব—এমনটা ভাবা আমাদের নিছক দম্ভ ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীতে অন্য কোনো প্রাণী আমাদের মতো বুদ্ধিমান হতে পারেনি, আর আমরা অন্য জগতের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংলাপের আশা রাখি!
ল্যারি কিং: জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী কি ধার্মিক হতে পারেন?
নীল: অবশ্যই। আমার ধারণা, আমরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই ধর্ম আমাদের সঙ্গে আছে। আপনি যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকান—আমি স্রেফ সংখ্যাগুলোর কথাই বলছি—গড়ে সাধারণ মানুষের তুলনায় বিজ্ঞানীরা কম ধার্মিক। তবে সেই সংখ্যাটা কিন্তু শূন্য নয়। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, তাঁদের ধার্মিক হওয়ার অর্থ আসলে কী? তাঁরা যদি সক্রিয় বিজ্ঞানী হন, তাহলে তাঁরা কখনোই আপনাকে বলে বেড়াবেন না যে এই মহাবিশ্ব ছয় দিনে সৃষ্টি হয়েছে। একজন বিজ্ঞানীর ধর্মতত্ত্ব বা ধর্মীয় চেতনা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। সেটা মূলত একধরনের আধ্যাত্মিকতা, কোনো এক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের উপলব্ধি মাত্র। তাঁরা বাইবেলকে কখনোই বিজ্ঞানের পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহার করেন না।
মহাবিশ্বে এলিয়েনের অস্তিত্ব খুবই স্বাভাবিক অনুমান—আমিনুল হক, কনটেন্ট ক্রিয়েটরআপনি যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকান—আমি স্রেফ সংখ্যাগুলোর কথাই বলছি—গড়ে সাধারণ মানুষের তুলনায় বিজ্ঞানীরা কম ধার্মিক। তবে সেই সংখ্যাটা কিন্তু শূন্য নয়।
ল্যারি কিং: আপনার মা–বাবা কি আপনাকে এ ব্যাপারে (জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হতে) উৎসাহ দিয়েছিলেন?
নীল: তাঁরা আমাকে কোনো কিছু করার জন্য আলাদা করে উৎসাহিত করেননি—তাঁরা আসলে এই ব্যাপারে খুব সুনির্দিষ্ট ছিলেন। আমরা নিউইয়র্ক শহরে বড় হয়েছি। শহরটা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ঠাসা। প্রতি ছুটির দিনে আমরা চিড়িয়াখানা, মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি, আর্ট মিউজিয়াম, অপেরা বা নাটকে যেতাম। অর্থাৎ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা নামী কোনো পেশার গণ্ডির বাইরে বড়রা যা যা করেন, তার সবকিছুতেই আমরা যেতাম। সেটা করার উদ্দেশ্য ছিল কৌতূহলী এবং প্রতিভাবান মানুষেরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে কত ধরনের বৈচিত্র্যময় কাজ করতে পারে, তার পুরো ব্যাপ্তি আমাদের দেখানো।
সেই সুযোগেই আমি প্ল্যানেটারিয়ামের সংস্পর্শে আসি। আমার ভাই এখন শিল্পী। সে আর্ট মিউজিয়ামগুলোর জাদুতে মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত হাইস্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড আর্টে ভর্তি হয়েছিল। পরিবারের একমাত্র ব্যতিক্রম আমার বোন। সে করপোরেট আমেরিকায় যোগ দিয়েছে।
ল্যারি কিং: আপনি কোন স্কুলে পড়েছেন?
নীল: আমি ব্রঙ্কস হাইস্কুল অব সায়েন্সে পড়েছি। এখান থেকে এখন পর্যন্ত আটটি নোবেল পুরস্কার এসেছে।
হার্ভার্ড থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক করেছেন নীল ডিগ্র্যাস টাইসনল্যারি কিং: কোন কলেজে পড়েছেন?
নীল: হার্ভার্ড থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক করেছি। শুরু থেকেই জানতাম যে লক্ষ্যটা হলো অ্যাস্ট্রোফিজিকস বা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান।
ল্যারি কিং: কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য তো তখন জায়গাটা সহজ ছিল না।
নীল: সে সময়টা তো অবশ্যই কৃষ্ণাঙ্গদের অনুকূলে ছিল না। আসলে আমাদের সমাজে যখনই আমি আমার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করতাম, তখনই বাধা আসত। যেমন যখন বলতাম, আমি ফিজিকস ক্লাবে যোগ দিতে চাই, তখন উত্তর আসত, ‘তোমাকে দেখে তো মনে হয় তুমি বাস্কেটবলে বেশ ভালো, চলো তোমার জন্য বাস্কেটবল টিমের ব্যবস্থা করে দিই, আর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার রাইডের দায়িত্বও আমরা নেব।’ পরিস্থিতিটা এমন ছিল যে আমার আগ্রহের বিষয়গুলো যেন ছিল সবচেয়ে বড় বাধার পথ।
বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার কৌতূহল বজায় রাখা—সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন, অধ্যাপক, সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রআমার ভাই এখন শিল্পী। সে আর্ট মিউজিয়ামগুলোর জাদুতে মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত হাইস্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড আর্টে ভর্তি হয়েছিল। পরিবারের একমাত্র ব্যতিক্রম আমার বোন।
ল্যারি কিং: আপনার বাবা কী করতেন?
নীল: আমার বাবা সে সময় নাগরিক অধিকার আন্দোলনে৪ বেশ সক্রিয় ছিলেন। তিনি নিউইয়র্কের তৎকালীন মেয়র লিন্ডসের অধীন কমিশনার নিযুক্ত হন। তিনি এখানকার ম্যানপাওয়ার অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি এবং হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কমিশনার ছিলেন। তাই সেই সময়ে ইনার সিটি বা যে এলাকাগুলো ঘেটো৫ নামে পরিচিত ছিল, সেখানকার তরুণদের নিয়ে তিনি সরাসরি কাজ করতেন। ঠিক এ কারণেই ওয়াটস বা ডেট্রয়েটে সেই সময় যে ধরনের ভয়াবহ দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল, নিউইয়র্ক শহরে তেমন কিছু ঘটেনি। কারণ, তখন শহরের অবহেলিত এলাকাগুলোর সঙ্গে সিটি হলের একটি সুনির্দিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল।
ল্যারি কিং: তাঁর নাম কী ছিল?
নীল: তাঁর প্রথম নাম সিরিল। পুরো নাম সিরিল ডিগ্র্যাস টাইসন।
ল্যারি কিং: আমি হয়তো তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি কিংবা হয়তো তাঁর ইন্টারভিউও নিয়েছি।
নীল: আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করে দেখব।
ল্যারি কিং: আমি এই কাজ (সাক্ষাৎকার নেওয়া) করছি ৫৬ বছর ধরে। ষাটের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের বহু ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছি। আমি নিজেও সেই আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম।
নীল: তিনি (বাবা) কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, কিন্তু নেপথ্যে থেকে নীতিনির্ধারণী কাজগুলো গুছিয়ে নিতেন। আর আমার মা ছিলেন গৃহিণী। আমাদের পড়াশোনা শেষের দিকে যখন ঘর প্রায় খালি হয়ে আসছিল, তখন তিনি কলেজে ভর্তি হন। তাই আমাকে বিজ্ঞানী হতেই হবে—এমন কোনো জোরজবরদস্তি আমাদের পরিবারে ছিল না।
তবে তাঁরা যেটা করেছিলেন, তা হলো, ৯ বছর বয়সে আমি যখন মহাবিশ্বের প্রতি আমার এই প্রবল আগ্রহের কথা জানালাম, তাঁরা সেটা যত্ন দিয়ে লালন করেছিলেন। তাঁরা আমার হয়ে আগ্রহ তৈরি করে দেননি; বরং আমার মধ্যে যা আগে থেকেই ছিল, তাকে বাড়িয়ে তুলেছিলেন। আমাদের পরিচিত অনেকেই আছেন, যাঁরা কোনো নির্দিষ্ট পেশায় গিয়েছেন, কেবল তাঁদের মা–বাবা সেই পেশায় ছিলেন বলে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল আলাদা। আমি আজ যা হতে পেরেছি, তার কারণ আমার মা–বাবা আমার নিজের প্রকাশ করা আগ্রহটাকে ডানা মেলতে সাহায্য করেছিলেন।
প্রকৃতির ভাষা বুঝতে হলে, গণিতের ভাষা বুঝতে হবে —মুস্তাফা আমিন, মহাকাশবিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্রআমাদের পড়াশোনা শেষের দিকে যখন ঘর প্রায় খালি হয়ে আসছিল, তখন মা কলেজে ভর্তি হন। তাই আমাকে বিজ্ঞানী হতেই হবে—এমন কোনো জোরজবরদস্তি আমাদের পরিবারে ছিল না।
ল্যারি কিং: আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু ভিন্ন—গ্লাসটি অর্ধেক পূর্ণ নাকি অর্ধেক খালি—আপনি একে কীভাবে দেখেন?
নীল: আমার মনে হয়, এ প্রশ্ন (গ্লাস অর্ধেক পূর্ণ না খালি) একটু বেশিই ব্যবহার করা হয়। আমি একে এভাবে দেখি—আপনি যদি গ্লাসটি ভরতে থাকেন, তাহলে সেটা অর্ধেক পূর্ণ। আর যদি গ্লাসটি থেকে পানি পান করতে থাকেন, তাহলে সেটা অর্ধেক খালি। অর্থাৎ আরও কিছু তথ্য যোগ করলে এ প্রশ্নের উত্তরটা পরিষ্কার হয়ে যায়। আপনাকে দেখতে হবে গ্লাসটি নিয়ে আসলে কী করা হচ্ছে।
অর্ধেক খালি না পূর্ণ—এ প্রশ্ন অনেকটা ‘মুরগি আগে না ডিম আগে’ ধাঁধার মতো। ওটারও একটা নিখুঁত উত্তর আমাদের কাছে আছে, কিন্তু মানুষ এখনো একে খুব গভীর বা রহস্যময় প্রশ্ন মনে করে। উত্তরটা হলো—ডিম এসেছে আগে। কারণ, প্রথম ডিমটি এমন একটি পাখি পেড়েছিল, যেটা আসলে মুরগি ছিল না।
ল্যারি কিং: আচ্ছা, ব্যাপারটা আমি ভেবে দেখব। যাহোক, আপনি কি সত্যিই মাত্র ১২৫ অক্ষরে টুইট করেন?
নীল: হ্যাঁ, আমি ১৪০ অক্ষর নয়, বরং ১২৫ অক্ষরের মধ্যে টুইট করি।
ল্যারি কিং: তার কারণ কী?
নীল: কারণ, আমি চাই না মানুষ আমার টুইটটি রিটুইট করতে গিয়ে আমার কথাগুলো কাটছাঁট করুক বা বিকৃত করুক। যদিও এখন এমন অনেক সুবিধা আছে, যেখানে রিটুইট করতে গেলে বাড়তি অক্ষর খরচ হয় না, কিন্তু আগে ‘RT @neiltyson’ লিখতেই ১৫টি অক্ষর চলে যেত।
আমি চাই না, আপনি যখন আমার টুইটটি শেয়ার করবেন, তখন জায়গার অভাবে আমার কথাগুলো সংকুচিত করে ফেলুন বা ওই জঘন্য সব সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করুন। আমি চাই, আমার শব্দগুলো ঠিক যেভাবে আছে সেভাবেই থাকুক। তাই ১২৫ অক্ষরে টুইট করলেই তা সবার জন্য নিখুঁতভাবে পৌঁছে যায়।
ল্যারি কিং: পৃথিবী যদি এক সেকেন্ডের জন্য ঘোরা থামিয়ে দেয়, তাহলে কী হবে?
নীল: সেটা হবে চরম বিপর্যয়! কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে আমরা নিউইয়র্কে যে অক্ষাংশে আছি, সেই হিসাবে আমরা সবাই পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টায় ৮০০ মাইল বেগে পূর্ব দিকে ছুটছি। পৃথিবী যেহেতু ঘুরছে, তাই আমরাও ঘুরছি। এখন আপনি যদি হুট করে পৃথিবীকে থামিয়ে দেন এবং যদি কোনো সিটবেল্ট দিয়ে মাটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা না থাকেন, তাহলে আপনি উল্টে গিয়ে ঘণ্টায় ৮০০ মাইল বেগে পূর্ব দিকে ছুটতে শুরু করবেন।
তাতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ মারা যাবে—মানুষ জানালা দিয়ে রকেটের মতো ছিটকে বের হয়ে যাবে! সেটা হবে পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ বাজে একটা দিন। মাটির সঙ্গে শক্তভাবে স্ক্রু দিয়ে আটকানো নেই, এমন সবকিছুই ঘণ্টায় ৮০০ মাইল বেগে পূর্ব দিকে ছুটতে থাকবে। সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালিয়ে আপনি কোনো ইটের দেয়ালে ধাক্কা খেলে যা ঘটে, এটাও ঠিক তা–ই। গাড়ি থেমে গেলেও আপনি যেমন আগের গতিতেই চলতে থাকেন। আসলে এ কারণেই দুর্ঘটনাগুলোয় মানুষ আঘাত পায়।
তবে কোনোভাবে আমরা যদি পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে থামতে পারি, তাহলে ঠিক আছে। অনেকে মনে করেন, পৃথিবী থেমে গেলে আমরা ওজনহীন হয়ে যাব কিংবা বায়ুমণ্ডল হারিয়ে ফেলব—আসলে তা সত্যি নয়। পৃথিবী থেমে গেলে বড়জোর আমাদের দিনগুলো অনেক অনেক লম্বা হয়ে যাবে। কারণ, সূর্যের দিকে মুখ করে থাকা অংশটি আর সরবে না।
টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে— তানজিনা হোসেন, চিকিৎসক ও লেখকআপনি যদি হুট করে পৃথিবীকে থামিয়ে দেন এবং যদি কোনো সিটবেল্ট দিয়ে মাটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা না থাকেন, তাহলে আপনি উল্টে গিয়ে ঘণ্টায় ৮০০ মাইল বেগে পূর্ব দিকে ছুটতে শুরু করবেন।
ল্যারি কিং: পদার্থবিজ্ঞানের জগতে কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে চমকে দিয়েছে?
নীল: পদার্থবিজ্ঞানের জগতে আমাকে কী অবাক করেছে? আমি কি একটু ঘুরিয়ে উত্তর দিতে পারি? আমি অবাক হয়েছি, যে যুক্তরাষ্ট্র বিংশ শতাব্দীজুড়ে কণাপদার্থবিজ্ঞানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিল, তারা কীভাবে হুট করে সেই নেতৃত্ব থেকে সরে এল! এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টিকেল একসিলারেটর (কণা ত্বরক যন্ত্র) রয়েছে ইউরোপে—সার্নে। এর পুরো নাম ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ। কিন্তু ফরাসি বানানে লিখলে সেটা হয় CERN। ওরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। এই সার্নের যন্ত্রেই বিখ্যাত গড পার্টিকেল বা হিগস বোসন কণা খুঁজে পাওয়া গেছে। আমরা এখন সাগরের এপার থেকে অপলক চেয়ে দেখছি আর বলছি, ‘ওহ্, আমরাও কি একটু অংশ নিতে পারি?’ আমাদের কিছু বিজ্ঞানী হয়তো সেই প্রজেক্টে আছেন, কিন্তু আমরা এখন সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে নেই।
আপনি যখন জিজ্ঞাসা করলেন, পদার্থবিজ্ঞানে আমাকে কী অবাক করে? আমি বলব, আমাদের কংগ্রেসের একটি ভোটের মাধ্যমে আমরা এত দ্রুত সেই নেতৃত্বকে বিসর্জন দিলাম—এটাই আমাকে স্তম্ভিত করে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, আসলে কোন দেশে বাস করছি? এটা তো সেই দেশ নয়, যেখানে আমি বড় হয়েছি। এটা অন্য কিছু। আমি জানি, এটা হয়তো খাঁটি পদার্থবিজ্ঞানের উত্তর হলো না, তবু এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময়।
ল্যারি কিং: আন্তগ্রহ ভ্রমণের সুবিধা নিশ্চিত করতে আমাদের সামনে কী কী অন্তরায় বা বাধা রয়েছে?
নীল: আপনি তো জানেন, আমরা এইমাত্র সৌরজগৎ পার হলাম? কয়েক সপ্তাহ ধরে খবরের শিরোনামে থাকা সেই ভয়েজার মহাকাশযানের কথা বলছি, যেটা প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলছে। নভোযানটি এখন সূর্যের প্রভাব আর ছায়াপথের প্রভাবের একদম শেষ সীমানায় পৌঁছেছে। এখন যদি বলেন, ‘আচ্ছা, আমি যদি ওই মহাকাশযানে চড়ে বসি, তাহলে গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে?’
ভয়েজার ৪০ বছর ধরে মহাকাশে ছুটছে। এই গতিতে আপনি যদি আমাদের ছায়াপথের (যেখানে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি নক্ষত্র আছে) নিকটতম নক্ষত্রে পৌঁছাতে চান, তাহলে আপনার সময় লাগবে প্রায় ৪০ হাজার বছর!
তাই প্রশ্ন হলো, আন্তনক্ষত্র ভ্রমণে সক্ষম হতে আমাদের কী প্রয়োজন? হয় আমাদের এমন কোনো উপায় বের করতে হবে, যাতে মানুষ অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে; অথবা এমন একদল মহাকাশচারী পাঠাতে হবে, যারা নভোযানেই বংশবৃদ্ধি করবে, যাতে যাত্রা শুরুর প্রায় ৮০ প্রজন্ম পরের বংশধরেরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে!
তা না হলে আমাদের স্থান ও কালের বুনট সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হবে, যাতে আমরা সেই বিখ্যাত ওয়ার্প ড্রাইভ ইঞ্জিন বানাতে পারি। স্টার ট্রেক সিনেমায় যেমন বিজ্ঞাপনী বিরতির মধ্যেই তাদের পুরো গ্যালাক্সি পার হয়ে যেতে দেখা যায়, অনেকটা সে রকম!
আমরা পৃথিবীর বাইরে এমন জায়গা খুঁজছি যেখানে প্রাণ থাকতে পারে—নোজাইর খাজা, গ্রহ বিজ্ঞানীভয়েজার ৪০ বছর ধরে মহাকাশে ছুটছে। এই গতিতে আপনি যদি আমাদের ছায়াপথের নিকটতম নক্ষত্রে পৌঁছাতে চান, তাহলে আপনার সময় লাগবে প্রায় ৪০ হাজার বছর!
ল্যারি কিং: উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর অবস্থান কি পরিবর্তিত হতে পারে? সেটা কখন হতে পারে? এর ফলে আমরা কী কী পরিবর্তন বা প্রভাব অনুভব করব?
নীল: না, ওগুলো ওভাবে বদলে যায় না। ২০১২ সাল আসার আগে এই মেরু পরিবর্তন নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। ওই ২০১২ সালের পুরো উন্মাদনা আসলে ছিল পৃথিবীর বিজ্ঞান-অজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে করা একটা ধাপ্পাবাজি।
আসল ব্যাপার হলো, পৃথিবী ঘোরে এবং এর মেরু হাজার হাজার বছর ধরে সামান্য ওপর-নিচে দোলে। আমরা আসলে অনেকটা লাটিমের মতো দুলি। আপনি যখন একটা লাটিম ঘোরান, দেখবেন ঘোরার গতি কমে এলে সেটি কীভাবে টলমল করতে থাকে; যদিও আজকাল আর কেউ লাটিম নিয়ে খেলে না।
ল্যারি কিং: আমি কিন্তু লাটিম পছন্দ করি।
নীল: আমিও লাটিম নিয়ে খেলি! যাহোক, আপনি যখন লাটিম ঘোরান, তখন সেটা একদিকে হেলে গোল হয়ে ঘুরতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রিসেশন। আমরা ঠিক সেটাই করি। আমাদের পৃথিবী প্রতি ২৬ হাজার বছরে একবার পূর্ণ প্রিসেশন বা এই দুলুনি সম্পন্ন করে। আমরা কিন্তু উল্টে যাই না!
মুখোমুখি ল্যারি কিং ও নীল ডিগ্র্যাস টাইসনল্যারি কিং: আপনার মধ্যে কি সেই ছোট ছেলেটা এখনো বেঁচে আছে, যে ছেলে এককালে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হতো?
নীল: সেই ছোট বালক আসলে আমাকে কখনোই ছেড়ে যায়নি। সত্যি বলতে, বিজ্ঞানী হলো এমন এক শিশু, যে আসলে কখনো বড় হয়নি। আপনি শিশুদের সঙ্গে একটা ঘরে থেকে দেখবেন, তারা সবকিছুতে খোঁচাখুঁচি করে, সবকিছু প্রায় ভেঙে ফেলার উপক্রম করে। তখন বড়রা তাদের কী বলে? ‘ওটা কোরো না’, ‘থামো’, ‘শান্ত হও’।
আমরা একটি শিশুর জীবনের প্রথম বছরটি তাকে হাঁটতে এবং কথা বলতে শেখাতে ব্যয় করি। তার বাকি জীবনটা তাকে বলি ‘চুপ করো এবং বসে থাকো’। এভাবেই আমরা আমাদের ডিএনএতে থাকা জন্মগত সৃজনশীলতাকে পিষে ফেলি। বড়দের এই দমিয়ে রাখার চেষ্টার পরও যারা কোনোভাবে নিজেদের কৌতূহলকে টিকিয়ে রাখতে পারে, তারাই শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানী হয়।
‘ইনফিনিট স্ক্রলিং মানুষের জন্য ক্ষতিকর’—আমান্ডা বগান, গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনআপনি যখন লাটিম ঘোরান, তখন সেটা একদিকে হেলে গোল হয়ে ঘুরতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রিসেশন। আমাদের পৃথিবী প্রতি ২৬ হাজার বছরে একবার পূর্ণ প্রিসেশন সম্পন্ন করে।
ল্যারি কিং: অনেক ধন্যবাদ।
নীল: শেষ হয়ে গেল নাকি?
ল্যারি কিং: নীল ডিগ্র্যাস টাইসন—তাঁর সম্পর্কে নতুন করে বলার আর কী আছে! আবার দেখা হবে!
নীল: ধন্যবাদ।
* ঈষৎ সংক্ষেপিতভাষান্তর: আবুল বাসারফুটনোট১. ল্যারি কিং মূলত মার্কিন জেনারেল কলিন পাওয়েলের কথা উল্লেখ করছিলেন। তিনিও টাইসনের মতোই ব্রঙ্কসে বড় হয়েছিলেন। কলিন পাওয়েল সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে চার তারকা জেনারেল হয়েছিলেন।২. ২০১৩ সালের অক্টোবরে অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (ওবামাকেয়ার নামেও পরিচিত) ইস্যুতে তৎকালীন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের রেষারেষির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় সরকারি অচলাবস্থা চলছিল। ১ অক্টোবর ২০১৩ থেকে বাজেট পাস আটকে যায় এবং ১৬ দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরকার কার্যত অচল থাকে।৩. ১৯৬২ সালে রাইস ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া প্রেসিডেন্ট কেনেডির সেই ঐতিহাসিক ভাষণের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সেদিন কেনেডি বলেছিলেন, আমরা চাঁদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।৪. ১৯৫০ ও ’৬০-এর দশকে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের সমানাধিকার আদায়ের আন্দোলন।৫. সাধারণত শহরের ভেতরের সেই এলাকাগুলোকে বোঝানো হয়, যেখানে সংখ্যালঘু বা দরিদ্র মানুষ বসবাস করে।*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় মে সংখ্যায় প্রকাশিতঅনেক জায়গায় কাজ করে ও শিখে নিজের মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করেছি—রসায়নে নোবেলজয়ী সুসুমু কিতাগাওয়া