ব্রাজিলের ফুটবলাররা ম্যাচের আগে কী করেন
· Prothom Alo

টেলিভিশনের পর্দায় আমরা কেবল ৯০ মিনিটের লড়াইটাই দেখি। কখনো কখনো সম্প্রচারকদের সৌজন্যে ম্যাচ শুরুর আগের গা-গরমের দৃশ্যও চোখে পড়ে। কিন্তু ড্রেসিংরুমের সেই রহস্যময় দরজার ওপারে আসলে কী হয়? ম্যাচের ঠিক আগের মুহূর্তে ফুটবলাররা কেমন থাকেন? দলের ভেতরের আবহটাই বা কেমন থাকে? সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে এ নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই।
Visit afsport.lat for more information.
আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে হেক্সার মিশনে নামছে ব্রাজিল। আর এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ শুরুর আগে সেলেসাওদের ড্রেসিংরুমের ভেতরের না-বলা গল্পগুলো সামনে এনেছেন ব্রাজিল দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির প্রধান সহকারী পল ক্লেমেন্ট। ‘দ্য অ্যাথলেটিক’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ম্যাচের আগে ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ আসলে কেমন থাকে।
পল ক্লেমেন্টের বর্ণনাতে, ম্যাচ শুরুর ঠিক আগের দৃশ্যটি দেখলে মনে হবে যেন কোনো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ফুটবল বিজ্ঞাপনের শুটিং চলছে। সেখানে ড্রেসিংরুমের কোথাও কোনো খেলোয়াড় ‘কিপ-আপ’ (বল শূন্যে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা) করছেন, কেউ কেউ হেডফোন কানে দিয়ে চুপচাপ গান শুনছেন, কেউ স্ট্রেচিং করছেন, কেউবা সারছেন শেষ মুহূর্তের ‘ট্রিটমেন্ট’। আবার কেউ কেউ কেবলই নিজের ভাবনায় মগ্ন। আর এই সবকিছুর আবহ তৈরির জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডে সবসময় বাজতে থাকে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী কোনো সুর।
ক্লেমেন্টের ভাষায়, সবচেয়ে জাদুকরি মুহূর্তটি আসে দল যখন মাঠের উদ্দেশ্যে ড্রেসিংরুম ছাড়ার প্রস্তুতি নেয়। ম্যাচের সময় যতই ঘনিয়ে আসে, ভেতরের চেনা পরিবেশটা পুরোপুরি বদলে যায়। গান বন্ধ হয়ে যায়, কমে আসে কোলাহল। পুরো দল তখন প্রার্থনার জন্য একসঙ্গে মিলিত হয়।
তাঁর কথা, ‘তখন অত্যন্ত ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক একটি পরিবেশ তৈরি হয়। ম্যাচের আগে এবং পরে ফুটবলাররা প্রার্থনা করেন। সাধারণত এই প্রার্থনার আগে দলের অধিনায়ক, কোনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, কোচ কিংবা ফেডারেশনের কেউ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।’
এই সুন্দর ঐতিহ্যই খেলোয়াড়দের মধ্যে বন্ধন আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে। এটি দলের মধ্যে একতা ও সৌহার্দ্য তৈরি করে সবাইকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
ব্রাজিল দলের সহকারী কোচের মতে, এবারের সেলেসাওদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব। মার্কিনিওস, আলিসন, কাসেমিরো এবং দানিলোর মতো নামগুলোকে তিনি দলের মূল চালিকাশক্তি এবং মেরুদণ্ড হিসেবে মনে করেন। ক্লেমেন্টের ভাষায়, ‘এই দলের যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, তা হলো সুদৃঢ় নেতৃত্ব। যেসব খেলোয়াড়ের ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খেলার অনেকদিনের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের প্রতি দলটিতে অগাধ সম্মান রয়েছে।’
ব্রাজিলের ফুটবলারদের অনুশীলনএই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কারণে দলের ভেতরে একটি চমৎকার ‘চেইন অব কমান্ড’ বা শৃঙ্খলা তৈরি হয়। যা বিভিন্ন প্রজন্মের ফুটবলারদের একসঙ্গে মিলেমিশে থাকতে সাহায্য করে। তরুণ খেলোয়াড়রা যাঁরা ব্রাজিলের হয়ে ৮০, ৯০ বা একশর বেশি ম্যাচ খেলেছেন, তাঁদের ভীষণ সমীহ করেন।’
ক্লেমেন্ট বিশ্বাস করেন, তারকাখচিত ড্রেসিংরুম সামলানোর ক্ষেত্রে প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জন্য একটা বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করবে। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড চেলসি, পিএসজি, বায়ার্ন মিউনিখ ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে বড় বড় সব মহাতারকাদের সামলেছেন। এবারের ব্রাজিল দলেও অনেক তারকা ফুটবলার আছেন। তবে আনচেলত্তির জন্য তাঁদের সামলানো কঠিন হবে না।
ক্লেমেন্টের ভাষায়, ‘কার্লো কখনোই দ্বন্দ্বে জড়াতে চান না। তিনি মানুষের ভেতরের সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করেন। আমি নিজে দেখেছি, অত্যন্ত কঠিন বলে মনে হওয়া ড্রেসিংরুমও তিনি কতটা অবলীলায় সামাল দিয়েছেন।’
ব্রাজিলের প্রায় আড়াই দশকের দীর্ঘ শিরোপাখরাটা হয়তো এই ইতালিয়ান কোচের হাত ধরেই কাটবে—মেটলাইফের ড্রেসিংরুমে এখন সেই প্রার্থনারই সুর।
‘লোকে বলে এই ব্রাজিল সেই ব্রাজিল নয়, কিন্তু তারপরও এটা ব্রাজিলই’