এবার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চায় দুই সংসদ সদস্যের প্রতিষ্ঠানসহ নতুন জোট

· Prothom Alo

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড ও দেশি এমজিএইচ গ্রুপের পর এবার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে দেশি তিন প্রতিষ্ঠানের একটি জোট। জোটের দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছে বর্তমান সংসদের দুই সদস্য।

‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম’ নামে জোটটি গত ২৮ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ১৫ বছরের জন্য টার্মিনালটি পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এক মাসের বেশি সময় পর এখন বিষয়টি জানা গেল।

Visit rouesnews.click for more information.

প্রস্তাবটি এমন সময়ে সামনে এল, যখন ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া আবারও সক্রিয় হয়েছে। আবার ২৮ এপ্রিল একই দিন দেশি বহুজাতিক এমজিএইচ গ্রুপও এই টার্মিনাল পরিচালনায় প্রস্তাব দিয়েছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি চালু কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটিই সবচেয়ে বড়। গত বছর বন্দরে ওঠানো-নামানো মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ পরিচালিত হয়েছে এই টার্মিনালের মাধ্যমে।

কারা আছে নতুন জোটে

নতুন জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বর্তমান বন্দরের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটির অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। অন্য দুই অংশীদার বার্থ অপারেটর কসমস এন্টারপ্রাইজ ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড। তিনটি প্রতিষ্ঠানই দুই থেকে সাড়ে তিন দশক ধরে বন্দরে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোয় নিয়োজিত রয়েছে।

কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান হলেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সরকার দলের সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। আর এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম বর্তমানে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য।

বন্দর–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এনসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলেও দেশি কোনো পক্ষ তখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিকল্প প্রস্তাব দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নতুন প্রস্তাব ছিল না। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই নতুন নতুন দেশি প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে।

এ বিষয়ে কনসোর্টিয়ামের উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, আগের সরকার ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদেশি অপারেটরের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কারণে বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার বাস্তব সুযোগ ছিল না। নতুন সরকারের সময় দেশি উদ্যোক্তাদের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কী আছে নতুন প্রস্তাবে

নতুন জোটের প্রস্তাব অনুযায়ী, বন্দরের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখেই ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনা করবে কনসোর্টিয়াম। পরিচালনা, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও দৈনন্দিন ব্যয় নিজেদের অর্থে বহন করবে তারা। তবে জাহাজ ও কনটেইনার–সংক্রান্ত সব ধরনের মাশুল আদায় করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর বিনিময়ে প্রতি একক কনটেইনারে ৬৯ ডলার পরিচালন মাশুল চেয়েছে কনসোর্টিয়াম।

তাদের প্রস্তাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রতি একক কনটেইনার থেকে বন্দরের আয় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার, ব্যয় ৫৬ দশমিক ১৫ ডলার এবং নিট আয় ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার।

কনসোর্টিয়ামের দাবি, তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কোনো অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই বন্দর প্রতি একক কনটেইনারে ৯২ ডলার রাজস্ব ধরে রাখতে পারবে। পাশাপাশি আগামী ১৫ বছর জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল ব্যয়ের দায়ও বহন করতে হবে না।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, জার্মানির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিং টার্মিনালটির বার্ষিক সক্ষমতা ১১ লাখ একক কনটেইনার নির্ধারণ করেছিল। অথচ বর্তমানে দেশি অপারেটররাই বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো করছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড ও এমজিএইচের সঙ্গে পার্থক্য কী

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনার জন্য এখন পর্যন্ত তিনটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। প্রথম প্রস্তাব সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ও সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় ১৫ বছরের জন্য পুরো টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনা, মাশুল আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবে অপারেটরের হাতে। বিনিময়ে বন্দর নির্ধারিত রাজস্ব পাবে।

এমজিএইচ গ্রুপও একই ধরনের পিপিপি কাঠামোয় এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতি কনটেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় পাঁচ ডলার বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তারা।

অন্যদিকে নতুন কনসোর্টিয়ামের মডেল ভিন্ন। তারা টার্মিনাল ইজারা নয়, পরিচালন সেবা দিতে চায়। তাদের প্রস্তাবে টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা পুরোপুরি বন্দরের কাছেই থাকবে। কনসোর্টিয়াম শুধু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। প্রস্তাবিত ১৫ বছর মেয়াদে এই সেবার বিনিময়ে বন্দর থেকে কনটেইনারপ্রতি অর্থ আদায় করবে তারা।

নতুন জোটের অংশীদারেরা কী বলছে

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া কনসোর্টিয়ামের পক্ষে প্রস্তাবে সই করেছেন সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন, কসমস এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা অংশীদার হাসিন বিন আশরাফ এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন।

সাইফ পাওয়ারটেক বর্তমানে চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা করছে। ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি এনসিটিও পরিচালনা করেছে। তাদের দাবি, এ সময়ের মধ্যে তারা প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ একক কনটেইনার ও ১৫ হাজার ১৫৬টি কনটেইনার জাহাজ পরিচালনা করেছে।

প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালে বন্দরে কার্যক্রম শুরু করে। পরে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সিসিটি ও এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পায়।

জানতে চাইলে সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, জোটের তিন প্রতিষ্ঠানেরই বন্দরে দুই থেকে সাড়ে তিন দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দেশি অপারেটরদের সুযোগ দেওয়া উচিত। এই টার্মিনালে ১৭ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো সম্ভব।

কসমস এন্টারপ্রাইজ ১৯৮৯ সাল থেকে বন্দরে স্টিভিডোরিং বা বর্তমানে বার্থ অপারেটর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তারা প্রায় ২ কোটি টন পণ্য ও ৪৭ হাজার ৮০৬ একক কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে। কসমস এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা অংশীদার হিসেবে প্রস্তাবে সই করা হাসিন বিন আশরাফ হলেন সরকার দলের সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিনের সন্তান।

অন্যদিকে ১৯৮৮ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস বর্তমানে জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) একটি কনটেইনার জেটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৫৫ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ করেছে।

জানতে চাইলে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বন্দরের বিদ্যমান বিধিবিধান ও সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী চালু টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং দেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন জোট এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তাঁর মতে, এনসিটি খুবই স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থানের কারণে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে দেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

এখন কী হবে

নতুন প্রস্তাব জমা পড়লেও আপাতত তা বিবেচনার পর্যায়ে আসেনি। কারণ, এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের আলোচনা এখনো চলমান।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দর–কষাকষির পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক বিতর্ক ও আলোচনা কমিটির সদস্যদের বিভিন্ন আপত্তির কারণে গত ৯ ফেব্রুয়ারি প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়।

বর্তমানে নতুন করে মূল্যায়ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষির প্রক্রিয়া আবার শুরু হচ্ছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকায় নতুন প্রস্তাবগুলো এখনই বিবেচনার সুযোগ নেই। তবে আলোচনা সফল না হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। তখন দেশি-বিদেশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।

Read full story at source