জেনে রাখুন মাংস হজম করতে কত সময় লাগে

· Prothom Alo

কোরবানির ঈদে মাংসের প্রাচুর্য আনন্দেরই অংশ। তবে শরীরেরও আছে নিজস্ব সীমা ও ভাষা। হজমপ্রক্রিয়া বুঝে খেলে তবেই উৎসবের আনন্দ বজায় থাকবে, অস্বস্তি নয়—স্বাস্থ্যও থাকবে ভালো।

Visit michezonews.co.za for more information.

আমাদের দেশে কোরবানির ঈদ যেন অনেকাংশেই মাংস ভোজনের উৎসব। ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি এ সময় অল্প কয়েক দিনেই সারা বছরের তুলনায় অনেক বেশি মাংস খাওয়া হয়। তবে প্রশ্নটা শুধু মাংস ভালো না খারাপ—সেটি নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অতিরিক্ত মাংস আমাদের শরীর কতটা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গ্রহণ করতে পারছে।

সবার মাংস হজমের ক্ষমতা এক নয়

সব মানুষের হজমক্ষমতা এক রকম নয়। কেউ সহজেই ভরপেট মাংস খেয়েও স্বাভাবিক থাকেন, আবার কারও অল্পতেই দেখা দেয় অস্বস্তি, গ্যাস, বদহজম কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা। তাই শরীরের হজমচক্রকে বোঝা জরুরি। হজমপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকলে আমরা বুঝতে পারব, কতটা মাংস আমাদের শরীরের জন্য উপযোগী এবং কীভাবে খেলে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে সুস্থতাও বজায় রাখা সম্ভব।
মাংস মূলত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, যেখানে থাকে অ্যামিনো অ্যাসিডের দীর্ঘ শৃঙ্খল, কিছু পরিমাণ চর্বি এবং খুব সামান্য কার্বোহাইড্রেট। তাই এর হজমপ্রক্রিয়াও প্রধানত প্রোটিন ভাঙা ও শোষণের ওপর নির্ভরশীল। এই পুরো কাজ সম্পন্ন হয় দুইভাবে—মেকানিক্যাল প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ চিবানোর মাধ্যমে এবং কেমিক্যাল প্রক্রিয়ায়, যেখানে পাকস্থলীর অ্যাসিড ও বিভিন্ন এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মুখগহ্বর: প্রাথমিক পর্যায়ে দাঁত দিয়ে মাংস চিবিয়ে ছোট ছোট টুকরা করা হয় (Mechanical digestion)।
• লালা থেকে মিউসিন বের হয়, যা খাবারকে লুব্রিকেট করে গিলতে সাহায্য করে।
• এখানে প্রোটিন হজমের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য এনজাইম থাকে না। শুধু অ্যামাইলেজ কার্বোহাইড্রেটের জন্য কাজ করে (মাংসে কম থাকে)।
• সময়: কয়েক সেকেন্ড থেকে ১-২ মিনিট।

মাংসের প্রোটিন হজম শুরু হয় পাকস্থলীতে

পাকস্থলী: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় এখানেই মাংসের প্রোটিন হজম শুরু হয় সত্যিকার অর্থে। গ্যাস্ট্রিক জুস নিঃসৃত হয়:
• হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড pH কমিয়ে ১.৫-৩.৫ করে। এটি প্রোটিনের ডেনাচারেশন (আনফোল্ডিং) করে এবং ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে।
• পেপসিনোজেন, পেপসিনে রূপান্তরিত হয় (অ্যাসিডের উপস্থিতিতে)।
• পেপসিন প্রোটিনকে বড় পলিপেপটাইড চেইনে ভেঙে ফেলে।
• মাংসের ফ্যাট অংশ গ্যাস্ট্রিক লাইপেজ দিয়ে সামান্য ভাঙে।
• পাকস্থলীতে মাংস থাকে সাধারণত ৩-৬ ঘণ্টা (চর্বিযুক্ত মাংস বেশি সময় লাগে)।
• ফলাফল: আধা তরল অবস্থা, যাকে বলে কাইম।

ক্ষুদ্রান্ত্র: সম্পূর্ণ হজম ও শোষণ এটি হজমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
• অগ্ন্যাশয় থেকে আসে ট্রিপসিনোজেন ও ট্রিপসিন, কাইমোট্রিপসিন ও কার্বক্সিপেপটিডেজ।
• এরা পলিপেপটাইডকে ছোট পেপটাইড ও অ্যামিনো অ্যাসিডে ভাঙে।
• অন্ত্রের এনজাইম অ্যামিনোপেপটিডেজ ও ডায়পেপটিডেজ—শেষ পর্যায়ে পেপটাইডকে একক অ্যামিনো অ্যাসিডে রূপান্তর করে।
• ফ্যাট হজমের জন্য বাইল সল্ট (লিভার থেকে) ও প্যাংক্রিয়াটিক লাইপেজ কাজ করে। মাংসের ফ্যাট গ্লিসারল ও ফ্যাটি অ্যাসিডে ভাঙে।

শোষণ
• অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই ও মাইক্রোভিলাই দিয়ে রক্তপ্রবাহে শোষিত হয়।
• ফ্যাটি অ্যাসিড লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম দিয়ে যায়।
• সময়: ৩-৬ ঘণ্টা।

মাংসের হজম কম হয় বৃহদন্ত্রে

বৃহদন্ত্র
• মাংসের হজম এখানে খুব কম হয়।
• অবশিষ্ট পানি, ইলেকট্রোলাইট ও কিছু অপাচ্য অংশ শোষিত হয়।
• অবশিষ্টাংশ মলের সঙ্গে বের হয়।
মাংস হজমের টাইমলাইন

যা গুরুত্বপূর্ণ
• মাংস হজমে প্রোটিনের জন্য সবচেয়ে বেশি এনার্জি খরচ হয় (Thermic Effect of Food সবচেয়ে বেশি প্রোটিনে)।
• চর্বিযুক্ত মাংস হজম হতে বেশি সময় নেয়; কারণ, ফ্যাট পাকস্থলী খালি হতে দেরি করে।
• অতিরিক্ত মাংস খেলে কিছু লোকের পাকস্থলীতে অ্যাসিড বেশি তৈরি হয়, যা GERD রোগীদের সমস্যা বাড়াতে পারে।
• শরীর প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো মাংস থেকে খুব ভালোভাবে পায়।

এবার নিজে বুঝতে পারলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আমরা যদি একবার মাংস খাই, তাহলে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা সম্পূর্ণ হজমপ্রক্রিয়ায় সময় নিতে পারে, আর এই সময়তো সকালে নাশতায় পরাটা মাংস, দুপুরে ভাত মাংস, বিকেলে কাবাব, রাতে ডিনারে মাংসের নানা পদ; যা ঈদে একটি স্বাভাবিক চিত্র।

মাংস হজম হতে লাগে অন্তত ১২ ঘন্টা

আপনি যদি স্বাস্থ্যকর উপায়ে মাংস খেতে চান, তাহলে দিনে একবেলা পেট ভরে খান। আর ১২ ঘণ্টা নতুন খাবার না দিয়ে পেটটা ঠিক রাখতে পারেন। এগুলো স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য। যাঁরা মাংস খাওয়াটাকে প্রাধান্য দেবেন, তাঁরা বেশুমার মাংস খান।

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময়কেন্দ্র।
ছবি: পেকজেলডটকম

Read full story at source