সংকটের অর্থনীতি, আশার বাজেট
· Prothom Alo
বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এমন এক সময়ে প্রণীত হতে যাচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর প্রবৃদ্ধি, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মতো বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করছে। গত এক দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি সত্ত্বেও অর্থনীতির অভ্যন্তরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা এখন সরাসরি মানুষের জীবনমানকে প্রভাবিত করছে। মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় কমেছে, নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে আগামী বাজেট কেবল আয়–ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিপত্র।
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আর্থিক খাত, কম কর–জিডিপি অনুপাত ও বিনিয়োগ স্থবিরতাকে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বাস্তবতায় শুধু বড় বাজেট ঘোষণা নয়; বরং বাস্তবায়নযোগ্য ও মানুষকেন্দ্রিক বাজেট প্রণয়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। আগামী বাজেটের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা। অর্থাৎ ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হতে পারে ‘উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি’, যেখানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হবে মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের লক্ষ্য হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার।
Visit palladian.co.za for more information.
গত অর্থবছরের বাজেট: কী ছিল বাস্তবতা
২০২৫–২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ছিল মূলত একটি ‘সংকট ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের বাজেট’। জুলাই ২০২৪–এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করে, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কমে যাওয়া বিনিয়োগ ও জনআস্থার সংকট একসঙ্গে বিদ্যমান ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করা হয়, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তবে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়, যা গত এক দশকের অন্যতম উচ্চ পর্যায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং প্রকৃত আয় ও সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমতে থাকে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। বাংলাদেশের কর–জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে থাকায় সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও ডলার–সংকট শিল্প উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আইএমএফ ও এডিবিএর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আর্থিক খাত ও কর্মসংস্থানের সংকটকে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বাস্তবতায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রয়োজন একটি ‘বাস্তবভিত্তিক সম্প্রসারণমূলক বাজেট’, যেখানে ব্যয় বাড়বে, কিন্তু সেই ব্যয় হবে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে। অর্থাৎ আগামী বাজেটের মূল দর্শন হতে পারে ‘উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি’, যেখানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হবে মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারিত হবে জনগণের বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আগামী বাজেট হওয়া উচিত না অতিরিক্ত সংকোচনমূলক, না অযৌক্তিকভাবে সম্প্রসারণমূলক; বরং এটি হতে হবে একটি সংযত, সংস্কারমুখী, কর্মসংস্থানভিত্তিক ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক জাতীয় অর্থনৈতিক রূপরেখা, যেখানে উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হবে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা।
তাহলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট কত হওয়া যৌক্তিক
এখানেই মূল প্রশ্ন। কারণ, একটি জাতীয় বাজেট কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দলিল নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, অর্থনীতির সহনশীলতা ও সরকারের বাস্তবায়ন দক্ষতার প্রতিফলন। অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্যে অত্যন্ত বড় বাজেটের কথা বলা হয়, যেন বড় অঙ্কই উন্নয়নের একমাত্র সূচক। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। বাজেটের আকার নির্ধারণ করতে হয় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজস্ব সংগ্রহের বাস্তবতা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পটভূমিতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের পরিচালন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। খাদ্য আমদানি, কৃষি ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি কর্মচারীদের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির হার আগের মতো শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মূল্যায়নে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে বিনিয়োগের গতি কমেছে এবং বেসরকারি খাত এখনো আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তৃতীয়ত, রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা এখনো সীমিত। বাংলাদেশের কর–জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম, যা বড় বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ, ডলারের সংকট ও আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করেছে। গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে সুদ পরিশোধ ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ফলে অত্যধিক বড় বাজেট নিলে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার বিপরীতভাবে খুব সীমিত বাজেট বৃদ্ধি করলে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি–সহায়তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমুখী কর্মসূচিগুলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাবে না। অর্থাৎ সরকারকে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে, যেখানে অর্থনীতি চাঙা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় থাকবে, কিন্তু সেই ব্যয় আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না।
এ বাস্তবতায় অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য একটি যৌক্তিক বাজেট আকার হতে পারে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার কোটি থেকে ৮ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। এটি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা বাজেটের তুলনায় আনুমানিক ৬ থেকে ৯ শতাংশ সম্প্রসারণ। বর্তমান মূল্যস্ফীতি, সামাজিক ব্যয়ের প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বাস্তবতা বিবেচনায় এই প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সংযত, কিন্তু কার্যকর বলা যায়। এই বাজেটকে ‘সংযত সম্প্রসারণমূলক বাজেট’ বলা যেতে পারে। কারণ, এটি একদিকে অর্থনীতিকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলবে না, অন্যদিকে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো খাতে প্রয়োজনীয় সরকারি বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, যুব বেকারত্ব ও মধ্যবিত্তের ব্যয় সংকট বিবেচনায় সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনমুখী খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এখন অর্থনৈতিক প্রয়োজনেও পরিণত হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। বাংলাদেশের বড় সমস্যা বরাদ্দ নয়; বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতা। গত কয়েক বছরে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ ও নিম্নমানের বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে। ফলে আগামী বাজেটে ‘কম প্রকল্প, বেশি কার্যকারিতা’ নীতি গ্রহণ করা জরুরি। অর্থাৎ এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেগুলো সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ছাড়া আগামী বাজেটকে অবশ্যই রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো (২০২৬–২৭): কোন খাতে কত বরাদ্দ এবং কেন
বর্তমান বাস্তবতায় এমন একটি বাজেট কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়কে আরও ফলপ্রসূ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। অর্থাৎ আগামী বাজেটের মূল দর্শন হতে পারে—‘মানুষকেন্দ্রিক উৎপাদনমুখী অর্থনীতি’। সেই বিবেচনায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য একটি সম্ভাব্য ও বাস্তবসম্মত বাজেট কাঠামো নিম্নরূপ হতে পারে—
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ট্যাক্স–জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে। ফলে আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান কৌশল হওয়া উচিত করের হার বৃদ্ধি নয়; বরং করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। বর্তমানে দেশের বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো কর কাঠামোর বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যের নগর সম্পত্তি, অনলাইন ব্যবসা, ডিজিটাল লেনদেন ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি, অর্থ পাচার ও অপ্রদর্শিত সম্পদের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি। প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সীমিত বাজেট–ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয়। তবে সেই ঘাটতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ঘাটতি দীর্ঘ মেয়াদে ঋণনির্ভরতা বাড়ায়, সুদ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে আগামী বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ জরুরি। স্বল্প সুদে বৈদেশিক উন্নয়ন ঋণ, সুকুক বন্ড, প্রবাসী বন্ড ও সীমিত অভ্যন্তরীণ ঋণের সমন্বয়ে অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে উন্নয়ন ব্যয় অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পে বড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও সব প্রকল্প সমান অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারেনি। ফলে আগামী এডিপিতে ‘মেগা প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন’–এর পরিবর্তে ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী উন্নয়ন’ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। কৃষি, খাদ্য সংরক্ষণ, গ্রামীণ সড়ক, সেচব্যবস্থা, রেল, গণপরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় সামাজিক নিরাপত্তা এখন শুধু কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ, বয়স্ক জনগোষ্ঠী, বিধবা নারী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের ওপর। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত, তথ্যভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সরাসরি সহায়তা পান এবং অপচয় কমে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্তভাবে কর্মসংস্থানমুখী নয়। ফলে আগামী বাজেটে কারিগরি শিক্ষা, এআই ও প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, স্টার্টআপ সহায়তা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো এমন হওয়া প্রয়োজন, যা একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে, অন্যদিকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করবে। অর্থাৎ আগামী বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের জীবনমানের বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
এই বাজেটের রাজনৈতিক দর্শন কী হতে পারে
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের রাজনৈতিক দর্শন হতে পারে ‘উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি’। অর্থাৎ এই বাজেটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে মানুষ, কেবল পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি নয়। গত এক দশকে উন্নয়ন আলোচনায় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও আয় বৈষম্যের প্রশ্নগুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে আগামী বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে উন্নয়নের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।
এই দর্শনের মূল ভিত্তি হবে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা। বিশেষ করে কৃষিকে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, খাদ্যনিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে কৃষি সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে পারে।
একই সঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান আগামী বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বার্তা হওয়া উচিত। বর্তমানে শিক্ষিত বেকারত্ব অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাই আইটি, এআই, ডিজিটাল সেবা, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘চাকরি সৃষ্টি ছাড়া প্রবৃদ্ধি নয়’ নীতিকে সামনে আনা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতেও মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয় বিবেচনায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ জরুরি।
এই বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণের ফলে স্থানীয় সরকার কাঠামো দুর্বল হয়েছে। তাই ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ে সরাসরি উন্নয়ন বরাদ্দ বৃদ্ধি ও স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ই–গভর্ন্যান্স ও ব্যয় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে এই বাজেটের মূল রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে ‘রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রতিফলিত হয়।’
অর্থায়নের বাস্তবসম্মত উৎস: কীভাবে আসবে বাজেটের অর্থ
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে এই বিশাল ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং কীভাবে তা টেকসইভাবে পরিচালিত হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু করের হার বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন করজাল সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও অপচয় কমানো।
এই লক্ষ্য অর্জনে ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন ব্যবসা ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে কর কাঠামোর আওতায় আনা এবং উচ্চ মূল্যের নগর সম্পত্তির ওপর কার্যকর সম্পদভিত্তিক কর আরোপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে অপ্রদর্শিত সম্পদ ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি সম্ভব।
অন্যদিকে ব্যয় ব্যবস্থাপনায়ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ মেগা প্রকল্পে গেলেও সব প্রকল্প সমান অর্থনৈতিক সুফল দেয়নি। ফলে অপ্রয়োজনীয় বা কম ফলপ্রসূ প্রকল্প কমিয়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশ সফর, বিলাসী প্রশাসনিক ব্যয় ও অকার্যকর ভর্তুকি কমিয়ে ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। বাজেট–ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন। উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণের পরিবর্তে স্বল্প সুদে বৈদেশিক উন্নয়ন ঋণ, সুকুক বন্ড ও প্রবাসী বন্ডকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যুক্ত করা গেলে তা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প অর্থায়ন উৎস হতে পারে। সব মিলিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট অর্থায়নের মূল দর্শন হওয়া উচিত ‘করের চাপ বাড়িয়ে নয়; বরং অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপচয় কমানো ও উৎপাদনশীল অর্থায়নের মাধ্যমে রাজস্ব ও বিনিয়োগ বাড়ানো।’ কারণ, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্রীয় ব্যয়, রাজস্ব আহরণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। এই বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে শুধু এর আকারের ওপর নয়; বরং কতটা বাস্তবভিত্তিক, কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং কতটা মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে, তার ওপর। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আগামী বাজেট হওয়া উচিত না অতিরিক্ত সংকোচনমূলক, না অযৌক্তিকভাবে সম্প্রসারণমূলক; বরং এটি হতে হবে একটি সংযত, সংস্কারমুখী, কর্মসংস্থানভিত্তিক এবং সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক জাতীয় অর্থনৈতিক রূপরেখা, যেখানে উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হবে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা। কারণ, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় মানুষের জীবনের বাস্তব পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই।
লেখক: মো. হাছান উদ্দীন, অধ্যাপক, ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ এবং চেয়ারম্যান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী