ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রামপাল কীভাবে ক্যানসার চিকিৎসাসেবায় নতুন পথ দেখাতে পারছে

· Prothom Alo

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার বড় চ্যালেঞ্জ শুধু হাসপাতালের অভাব নয়। বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সংগঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে দূরত্ব। গ্রামে অনেক অসুখ নীরবে শুরু হয়। একজন মা স্তনের কোনো লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না, একজন বয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে অজান্তে থাকেন, একজন ডায়াবেটিসের রোগী নিয়মিত ফলোআপ না পাওয়ায় ওষুধ বন্ধ করে দেন, অথবা একটি পরিবার ভয়, লজ্জা, খরচ বা অনিশ্চয়তার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করে। অনেক সময় মানুষ যখন আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছান, তখন রোগ অনেক দূর এগিয়ে যায়।

এ কারণেই বাগেরহাটের রামপালে আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের কমিউনিটি অ্যাফেয়ার্স ও ডিজিটাল হেলথ সিস্টেম সাপোর্ট পরিকল্পনাটি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিকল্পনা হাসপাতালের বিছানা থেকে শুরু হয় না, এটি শুরু হয় গ্রামের ঘর থেকে, পরিবার থেকে, মানুষের আস্থার জায়গা থেকে।

Visit sports24.club for more information.

রামপাল উপজেলা একটি সুস্পষ্ট জনসংখ্যাভিত্তিক এলাকা: ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৮ মানুষ, ৪৪ হাজার ২৮১টি খানা, ১০টি ইউনিয়ন ও ১৩৪টি গ্রাম। এই জনসংখ্যার প্রায় ৮৯ শতাংশই গ্রামীণ। এই বাস্তবতা রামপালকে একই সঙ্গে একটি বাস্তব কমিউনিটি ও একটি পরিমাপযোগ্য জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে। মাইক্রোসফটের সহযোগিতায় আমাদের গ্রাম ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার এই মডেলে যুক্ত রয়েছেন ১০০ গ্রাম স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবক (হেলথ ভলান্টিয়ার), ১০ জন ইউনিয়ন সুপারভাইজার, একটি পেশাদার গবেষণা দল, একজন কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, ১০০টি কমিউনিটি হেলথ গেজেবো বা ‘গোল ঘর’ এবং কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত একটি স্টোর–অ্যান্ড–ফরওয়ার্ড ডিজিটাল মাধ্যম।

এ ধারণাটি সহজ, কিন্তু শক্তিশালী: অসুস্থ মানুষ কেন্দ্রের দরজায় আসবে শুধু এর অপেক্ষায় থাকা নয়; বরং গ্রাম থেকে স্বাস্থ্যসেবায় যাওয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি করা।

রামপালের আদলে গোলপাতা ও বাঁশের তৈরি ‘গোল ঘর’ ধারণাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলো ক্লিনিক নয় এবং এগুলোকে চিকিৎসক বা হাসপাতালের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলো হচ্ছে কমিউনিটির স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র, যেখানে মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যের পরীক্ষা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, রেফারেল নির্দেশনা ও ফলোআপ সহায়তা পায়। বাঁশ ও গোলপাতার তৈরি একটি ছোট গোল ঘর হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আস্থা অনেক সময় এমন সাধারণ জায়গায় শুরু হয়।

এ মডেলটি বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গেও মানানসই। অনেক মানুষের মুঠোফোন আছে, কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহার এখনো সীমিত। তাই স্টোর–অ্যান্ড–ফরওয়ার্ড অ্যাপ মাঠপর্যায়ে অফলাইনে তথ্য সংগ্রহ করে পরে সিঙ্ক করার সুযোগ দেয়। এটি এমন একটি বাস্তবসম্মত ডিজিটাল পদ্ধতি, যা গ্রামীণ জীবনের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খায়।

এর সঙ্গে একটি বেজলাইন জরিপ ও পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্য ডেটাবেজ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যানসারের সতর্কতামূলক লক্ষণ, তামাক ব্যবহার, প্রবীণদের স্বাস্থ্য চাহিদা, নারীর স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধিতা, পানি–স্যানিটেশন ও অন্যান্য ঝুঁকি সম্পর্কে একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে।

আমাদের গ্রামের গোল ঘর

ক্যানসার ও অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে আগেভাগে শনাক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি। একজন নারী যদি স্তনের সতর্কতামূলক লক্ষণ আগে বুঝতে পারেন, একজন পুরুষ যদি স্ট্রোকের আগেই তাঁর উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জানতে পারেন, অথবা একজন প্রবীণ রোগী যদি নিয়মিত ফলোআপ থেকে বাদ না পড়েন, এসব ছোট অর্জন নয়। এগুলোই মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি।

আমাদের গ্রাম স্বাস্থ্যসেবা মডেলের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার হলো, স্বাস্থ্য যোগাযোগ মানে শুধু নির্দেশনা দেওয়া নয়। গ্রামীণ পরিবারকে ভয় দেখিয়ে নয়, সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়। তাই এই পরিকল্পনায় বাড়ি পরিদর্শন, উঠান বৈঠক, নারীদের দলীয় আলোচনা, যুব ও স্কুলভিত্তিক সেশন, শিক্ষক, ইমাম, প্রবীণ ও স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। কারণ, স্বাস্থ্য সিদ্ধান্ত অনেক সময় ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত।

জনসংখ্যা অনুযায়ী এটি বছরে জনপ্রতি আনুমানিক ১৩৬ টাকায় সেবা নিশ্চিত করছে। ১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি মানুষের জন্য একটি জনসংখ্যাভিত্তিক স্বাস্থ্য নেভিগেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই বিনিয়োগ শুধু সেবার জন্য নয়, এটি জ্ঞান, প্রতিরোধ, আস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য বিনিয়োগ।

এই পরিকল্পনার বড় শক্তি হলো এটি স্বাস্থ্যসেবাকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা। রামপাল হয়ে উঠেছে একটি জীবন্ত গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার গবেষণাগার, যেখানে দেখা যাবে মানুষ কীভাবে লক্ষণ থেকে পরামর্শে, পরামর্শ থেকে রেফারেলে, রেফারেল থেকে রোগনির্ণয়ে এবং রোগনির্ণয় থেকে ফলোআপে পৌঁছায়। বাংলাদেশে এমন প্রমাণভিত্তিক মডেলের প্রয়োজন আছে। আমরা অনেক সময় স্বাস্থ্য প্রকল্পের সাফল্য মাপি কতজন রোগী দেখা হলো তা দিয়ে, কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন হলো—কে বাদ পড়ল, কেন বাদ পড়ল এবং কীভাবে তাকে আগে সেবার মধ্যে আনা যায়?

সমতা বা ইকুইটি এই মডেলের কেন্দ্রবিন্দু। দরিদ্র পরিবার, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও দূরবর্তী গ্রামের মানুষ যাতে বাদ না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা যদি শুধু তাঁদের জন্য হয়, যাঁরা খরচ বহন করতে পারেন বা সহজে কেন্দ্রে আসতে পারেন, তবে সেটি মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নয়। আমাদের গ্রামের ‘বৈষম্যহীন সেবা’–কে তাই রেফারেল, ফলোআপ, ডেটা সিস্টেম ও ভবিষ্যৎ সদস্যভিত্তিক বা খরচ ভাগাভাগির ব্যবস্থার মধ্যেও প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে।

রামপালের সামাজিক ও পরিবেশগত বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ স্যানিটেশনের সীমাবদ্ধতা, কাঠভিত্তিক রান্নার জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, পানির উৎসের ভিন্নতা ও আবাসনগত দুর্বলতা—এসব বিষয় ক্যানসার ও অসংক্রামক রোগ সেবার বাইরে নয়। এগুলো শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, কিডনির ঝুঁকি, নারীর ধোঁয়া–সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত। গ্রামীণ স্বাস্থ্য মডেলকে তাই শুধু রোগ নয়, পুরো পরিবার ও জীবন পরিবেশও দেখতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ শুধু আরও ভবন নির্মাণের মাধ্যমে তৈরি হবে না। ভবন প্রয়োজন, কিন্তু ব্যবস্থা আরও বেশি প্রয়োজন। একটি ক্যানসার ও এনসিডি বা অসংক্রামক রোগনির্ণয়ের কেন্দ্র তখনই সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়, যখন সেটি রোগীর সংকটের আগেই মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়, চিকিৎসার সময় পাশে থাকে এবং চিকিৎসার পরও ফলোআপ নিশ্চিত করে। আমাদের গ্রাম স্বাস্থ্যব্যবস্থার রামপাল মডেল সেই সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যেখানে গ্রাম পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবক, ইউনিয়ন সুপারভাইজার, ডিজিটাল টুল, কমিউনিটি স্পেস ও ক্লিনিক্যাল সেবা একসঙ্গে কাজ করছে।

এই ব্যবস্থা পুরোনো অর্থে দান বা চ্যারিটি নয়। এটি একটি সংগঠিত কমিউনিটি হেলথ ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা। এটি সেবা, শিক্ষা ও গবেষণাকে একটি নির্দিষ্ট গ্রামীণ জনসংখ্যার মধ্যে একত্র করার প্রয়াস। সততা, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা গেলে রামপাল দেখাতে পারে একটি গ্রামীণ ক্যানসার ও এনসিডি কেন্দ্র কীভাবে শুধু কেন্দ্রভিত্তিক সেবা থেকে বেরিয়ে এসে একটি জনস্বাস্থ্য শিক্ষণব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন মডেল, যা সাশ্রয়ী, বিশ্বাসযোগ্য, স্থানীয় বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যবান। রামপাল এমন একটি বিশ্বস্ত মডেল হয়ে উঠছে। প্রশ্নটি এখন আর শুধু এই নয় যে গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার কাছে আসবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্যসেবা কি মানুষের কাছে যাওয়ার সাহস দেখাবে?

রেজা সেলিম: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আমাদের গ্রাম ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, শ্রীফলতলা, রামপাল, বাগেরহাট

Read full story at source