পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: এভাবেই মৃত্যু হয় গণতন্ত্রের
· Prothom Alo

প্রায় ৭৫ বছর আগের কথা। ভারত স্বাধীন হয়েছে। চলছে প্রথম গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র গ্রহণের প্রস্তুতি। সেসময়, সেই শাসনতন্ত্রের অন্যতম রচয়িতা বি আর আম্বেদকর সাবধান করে বলেছিলেন, যে গণতন্ত্র আমরা প্রতিষ্ঠার কথা বলছি, তা ভারতের মাটির ওপর চমৎকার এক প্রলেপ মাত্র, কেকের ওপর যেমন ক্রিম মাখা থাকে। সে মাটিতে আঙুল ডোবান, দেখবেন তা আসলে প্রবল রকম অগণতান্ত্রিক।
কথাটা কতটা সত্যি, ভারতের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নির্বাচনের পর তা দিনের মতো ফরসা হয়ে পড়েছে। একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য ও ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রশাসনিক কারসাজির মাধ্যমে যে নির্বাচন হয়ে গেল, তা কাগজে-কলমে গণতান্ত্রিক হলেও এতে জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়েছে, তা বোধ হয় বলা যাবে না।
Visit h-doctor.club for more information.
ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং
সহজ হিসাবটা ধরুন। পশ্চিম বাংলায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি দখল করেছে মোট ২০৭টি আসন। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে দখল করেছে মাত্র ৮০টি আসন। প্রাপ্ত মোট ভোটের হিসাবে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে ফারাক মোটের ওপর তিরিশ লাখ। আনুপাতিক হিসাবে এই দুই দলের ব্যবধান মাত্র ৫ শতাংশ। মজার কথা হলো, ভোটার তালিকার নিবিড় নিরীক্ষার নামে যে লাখ তিরিশ মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি, তার পরিমাণও প্রায় ৩০ লাখ।
একে গণতন্ত্র বলে না, এ কথা বলেছেন কংগ্রেস–দলীয় সংসদ সদস্য শশী থারুর। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, নিবিড় নিরীক্ষার নামে যে ৯১ লাখ লোকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো, তাদের মধ্যে ৩৪ লাখ লোক আপত্তি জানিয়ে মামলা করেছিল। তাদের প্রত্যেকের বৈধ নথিপত্র ছিল, এমনকি কারও কারও পাসপোর্ট পর্যন্ত ছিল। বৈধ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশ ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। ‘একে কীভাবে গণতান্ত্রিক বলা যায়?’ তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
মজার বিষয় হলো, ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়াটি যে গণতান্ত্রিক নয়, তা–ও বলা যাবে না। প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে, ভোটে খুব বড় কোনো কারচুপি হয়েছে তা–ও কেউ বলছে না। এরপরও চোখের সামনে এমন পুকুরচুরির ঘটনাকে বুদ্ধিমান লোকেরা নাম দিয়েছেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং।
‘এবার রাম, পরে বাম’: বাম ভোটাররা যেভাবে নীরবে বিজেপিকে জেতালেনমাঠ যখন অসমান
ভারতকে আমরা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে হাততালি দিতে অভ্যস্ত। সত্যিই তো, জনবহুল, দরিদ্র এবং ধর্ম ও ভাষাগতভাবে বিভক্ত এমন একটি দেশে যে নিয়মিত নির্বাচন হয়ে চলেছে, সেটি একটি খুদে বিস্ময়। সেই ভারতে যখন ‘সূক্ষ্ম কারচুপির’ মাধ্যমে একটি দল নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভাগীদার হয়, তখন প্রশ্ন তুলতেই হয়: খেলার মাঠটি যখন এমন অসমান, সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র কি টিকে থাকতে পারে?
শুধু ভারতে নয়, পৃথিবীর অনেক পোশাকি গণতান্ত্রিক দেশেও একই অবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের কথা ধরুন। বিশ্বের প্রাচীনতম জনপ্রজাতান্ত্রিক এই দেশটিকে একসময় বলা হতো গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা—প্রেসিডেন্ট রিগানের ভাষায় ‘পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল নগরী’। সে আলো এখন নিবু নিবু। অন্য সবকিছু বাদ দিই, শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি যেভাবে নির্বাচনী ম্যাপ কাটাছেঁড়া করে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করার পথ বের করছেন, সেই হিসাবটা বিবেচনায় আনলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
ভারতে নিরীক্ষার নামে যে ভোটার তালিকা প্রস্তুত হলো, তারও উদ্দেশ্য নির্বাচনের ফলাফল আগেভাগে নিশ্চিত করা। এই ভোটার তালিকা থেকে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নয়তো নিম্নবর্গের মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে জেরিম্যান্ডারিংয়ের ফলে যারা অর্থপূর্ণভাবে ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় আফ্রিকান-আমেরিকান বা দরিদ্র বহিরাগত।
ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। দেশটিতে প্রতি ১০ বছর অন্তর জনসংখ্যা গণনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্বাচনী ম্যাপ পুনর্গঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু এবার মধ্যদশকে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে, দেশের দুই প্রধান দল প্রতিযোগিতায় নেমেছে কীভাবে এই ম্যাপ নতুন করে কাটাছেঁড়া করে যার যার নিজের জন্য সুবিধাজনক অবস্থার সৃষ্টি করা যায়।
কাজটা শুরু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একদিকে অর্থনীতির বেহাল অবস্থা, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ, এই দুই মিলে তাঁর জনসমর্থন পড়তির দিকে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের গোহারার কথা। এই অবস্থায় নিজের ভাগ্য বদলানোর জন্য তিনি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলোর নির্বাচনী মানচিত্র নতুন করে আঁকার দাবি তুললেন।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলই নিজেদের নিয়ন্ত্রিত রাজ্যে নতুন ভোটার মানচিত্র তৈরির লড়াই শুরু করেছে। যুক্তিটা হচ্ছে এ রকম—ভোটারের মত যখন বদলানো যাবে না, তখন ভোটের মানচিত্রটি বদলে ফেলা যাক।
ভারতীয় রাষ্ট্র বনাম পশ্চিম বাংলা: ২০২৬ দেখছে এক নজিরবিহীন নির্বাচনজেরিম্যান্ডারিং
স্বাভাবিক অবস্থায় ভৌগোলিক নৈকট্য মেনে ভোটার মানচিত্র আঁকার কথা। কিন্তু এখন অবস্থা ভিন্ন। এ দেশে কোন ভোটার কোন দলের সমর্থক, বা কার গায়ের রং কী—সে কথা আগে থেকে জানা থাকে। পুনর্গঠনের সময় ক্ষমতাসীন দল এমনভাবে ভোটার মানচিত্র আঁকে, যেন নির্বাচনী এলাকায় তাদের সমর্থকদের প্রাধান্য থাকে। এর ফলে ম্যাপের অবস্থা দাঁড়ায় এমন যে একজন ভোটার যদি মালিবাগে থাকেন, তো তালিকাভুক্ত পরের ভোটারকে পাওয়া যাবে ফার্মগেটে।
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী ম্যাপ নিয়ে এই যুযুৎসুর অন্য নাম জেরিম্যান্ডারিং। ব্যাপারটা শুরু করেছিলেন এলব্রিজ জেরি নামে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের এক গভর্নর ১৮১২ সালে। তিনি পরিবর্তিত যে ভোটার তালিকা প্রস্তাব করেন, প্রথামাফিক মানচিত্র না হয়ে তা হয়ে দাঁড়ায় সালাম্যান্ডার মাছের মতো, যা দেখতে অনেকটা গিরগিটির মতো। সেই সময় স্থানীয় এক পত্রিকা সে মানচিত্রের এক কার্টুন এঁকে লিখেছিল, এটা সালাম্যান্ডার নয়, এটা জেরিম্যান্ডার। সেই থেকেই ভোটার মানচিত্র নিয়ে সূক্ষ্ম কারচুপি—যা এখন আর মোটেই সূক্ষ্ম নয়—জেরিম্যান্ডারিং নামে পরিচিত।
জেরিম্যান্ডারিং এর উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনী ফলাফলকে ভোটের আগেই নিশ্চিত করা। বড় মুখ করে বলা হয়, ভোটারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। অথচ জেরিম্যান্ডারিংয়ের মাধ্যমে ভোটার নয়, ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরা ভোটের ফলাফল আগেভাগে নিশ্চিত করে ফেলেন।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: নাগরিক হয়েও আমরা কেন ভোট দিতে পারলাম নাভারতে নিরীক্ষার নামে যে ভোটার তালিকা প্রস্তুত হলো, তারও উদ্দেশ্য নির্বাচনের ফলাফল আগেভাগে নিশ্চিত করা। এই ভোটার তালিকা থেকে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নয়তো নিম্নবর্গের মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে জেরিম্যান্ডারিংয়ের ফলে যারা অর্থপূর্ণভাবে ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় আফ্রিকান-আমেরিকান বা দরিদ্র বহিরাগত।
তথ্য নিরীক্ষার নামে সাধারণ নাগরিকদের ভোট প্রয়োগের মতো মৌলিক অধিকার হরণ হলে ফল কী দাঁড়ায় সে তো পশ্চিম বাংলাতেই দেখতে পাচ্ছি। একই রকম ক্ষতিকর যুক্তরাষ্ট্রের জেরিম্যান্ডারিং। উদাহরণ দিয়ে বলি। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মার্কিন কংগ্রেস বা প্রতিনিধি পরিষদের জন্য নির্ধারিত সদস্যসংখ্যা ৯।
২০২৪ সালে নির্বাচনে যে মানচিত্রের অধীন এই রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে একটি আসন নির্ধারিত ছিল আফ্রিকান-আমেরিকানদের জন্য। অন্য যেকোনো আসন থেকে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে, কিন্তু জেতা কার্যত অসম্ভব। অশ্বেতকায়-প্রধান ভোটারদের স্বার্থ মাথায় রেখে মানচিত্র আঁকা হলে অন্তত একটি আসনে একজন কালো কংগ্রেস সদস্যের নির্বাচন আশা করা যেত। কিন্তু এখন সে মানচিত্র এমনভাবে আঁকা হয়েছে, যাতে ৯টি আসনের প্রতিটি রিপাবলিকান বা শ্বেতকায়দের পকেটে যাবে। অথচ টেনেসির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অশ্বেতকায় বা আফ্রিকান-আমেরিকান।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি যে কৌশলে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ খেলেছেপুনরায় আম্বেদকর
আম্বেদকর ভারতে গণতন্ত্র প্রসঙ্গে যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন তা স্মরণ করুন। রাষ্ট্রের গায়ে চরানো জামাটি দেখে গণতন্ত্র বিচার করবেন না, জামার ভেতরে নজর দিন। দেখবেন সেখানে চিত্রটি ভিন্ন।
একসময় বলা হতো, গণতন্ত্রের মৃত্যু হয় যখন রাস্তায় ট্যাংক নামে, জলপাই রঙের পোশাক পরা সেনারা রাস্তা টহল দেয়, শাসনতন্ত্র মুলতবি করা হয়। বাংলাদেশেও সেই ঘটনা ঘটেছে। এখন আফ্রিকার কিছু দেশ ছাড়া অন্য কোথাও সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যা করা হয় না।
এখন নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে যা করা হয়, যেমন ভারতে অথবা যুক্তরাষ্ট্রে, তা হয়তো গণতন্ত্রের বুকে সরাসরি ছুরিকাঘাত নয়, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্রে আঘাত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উভয় ক্ষেত্রেই জনগণের সম্মতি বা অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনীতিকেরাই ঠিক করে নেন কে ক্ষমতায় যাবে, কে ক্ষমতার বাইরের থাকবে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে মৃত্যু হয় গণতন্ত্রের।
হাসান ফেরদৌস লেখক ও প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব