রূপক, বাস্তবতা ও ভয়ের এক জটিল জাল
· Prothom Alo

অনেকেই হররের আসল মানে বোঝেন না। এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন—সাইকোলজিক্যাল হরর, সুপারন্যাচারাল হরর, প্যারানরমাল হরর, গোথিক হরর, স্লেশের অ্যান্ড বডি হরর, কসমিক হরর, ফল্ক হরর, আরবান লিজেন্ড ইত্যাদি। মজার বিষয় হচ্ছে, ‘চক্র’ হলো এ সব কটিরই মিলিত রূপ।
সিরিজটি নিয়ে কথা বলার আগে, প্রথমে দুটি কাল্ট সোসাইটি নিয়ে কথা বলি, যাতে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হয়। প্রথমটি হচ্ছে ‘চিলড্রেন অব গড’, এটি ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডেভিড বার্গ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে শুরু হয়। এই গোষ্ঠীর অন্যতম বিতর্কিত কাজ ছিল ‘ফ্লার্টি ফিশিং’। এর মাধ্যমে নারী সদস্যরা পুরুষদের প্রলুব্ধ করে তাদের এই গোষ্ঠীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করত।
Visit newssport.cv for more information.
দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘হেভেন’স গেট’, এটি ১৯৭৪ সালে মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট এবং বনি নেটলস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি ইউএফওভিত্তিক ধর্মীয় গোষ্ঠী। ১৯৯৭ সালে যখন ‘হেল-বপ’ ধূমকেতু পৃথিবীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা বিশ্বাস করে যে সেই ধূমকেতুর আড়ালে একটি মহাকাশযান লুকিয়ে আছে। সেই যানে চড়ার উদ্দেশে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বাড়িতে ৩৯ জন সদস্য একত্রে আত্মহত্যা করেন। এটি ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণ-আত্মহত্যার ঘটনা।
‘চক্র ২’ এর একটি দৃশ্যএখন আসি ‘চক্র’–এ। এর মূল কাহিনি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একটি সত্য কাহিনির ওপর নির্মিত। ২০০৭ সালের ১১ জুলাই, ময়মনসিংহের কাশরে একটি পরিবারের নয়জন সদস্য রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে গণ-আত্মহত্যা করেন। কাশর রেললাইনের কাছে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়ার পর ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন এবং অন্য দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় পরে মারা যান। পরবর্তী তদন্তে তাঁদের বাড়ি থেকে ডায়েরি এবং প্রতীকী লেখা উদ্ধার করা হয়, যা থেকে জানা যায় যে তাঁরা নিজেদের আবিষ্কৃত ‘আদম ধর্ম’ নামক একটি ধর্মীয় মতে বিশ্বাসী ছিলেন। মনোবিজ্ঞানী ও তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল একটি ‘Shared Psychotic Disorder’ বা দলগত মানসিক বিভ্রমের উদাহরণ।
‘চক্র-১’: এখানে দেখানো হয় পুরান ঢাকার একটি পরিবারকে। মজিদ ও তার স্ত্রী, তাদের মেয়ে লুবনা, ছেলে হেলাল ও রাফি। তারপর যুক্ত হয় লুবনার ভার্সিটির শিক্ষক হুমায়ুন এবং তার স্ত্রী রুমকির কাহিনি। হুমায়ুন ও রুমকির পারিবারিক দ্বন্দ্ব আমাকে হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’ বইটির কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে প্রধান চরিত্রটি তার নিজের স্ত্রীকে খুন করে এবং পরবর্তী সময়ে তাকে দেখতে পায়। যাহোক, এরপর পরিচালক পরিচয় করিয়ে দেন বাংলাদেশের একটি কাল্ট সোসাইটির সঙ্গে, যার নাম ‘দ্য ফাইনাল ট্রুথ’। গল্প যত এগোতে থাকে, ততই কাজী ম্যাকের লেখা ‘আদম ধর্ম’ বইটি সুন্দর করে ব্লেন্ড করে দেওয়া হয়। এখানে ‘দ্য বুরারি ডেথ’–এরও রেফারেন্স আছে। লোভ-লালসা ও শয়তানের প্ররোচনায় মজিদ পরিবারটির সঙ্গে কী হয়, তা জানতে ‘চক্র-১’ দেখতে হবে।
নফসের গোলামি, কাল্টের অন্ধ গলি আর এক মনস্তাত্ত্বিক ময়নাতদন্ত‘চক্র-২’ : দ্বিতীয় ধাপে আমরা আরেকটি পরিবারকে দেখি। আহসান হাবীব ও পারভীন দম্পতি, তার এক ছেলে সিরাজ ও দুই মেয়ে এনি ও জেনি। এখানে দেখানো হয়, সিরাজের স্ত্রী মিতুর অনেক লোভ। আর এ লোভ পরিবারটিকে একটি বিশাল মৃত্যুফাঁদে নিয়ে যায়। এখানে ভেন্ট্রিলোকুইজম অদ্ভুত সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি দেখানো হয় আদম ধর্ম কীভাবে এল, শয়তান কীভাবে তার বংশবৃদ্ধি করে, হুমায়ুনের আসল পরিচয়সহ আরও মাথা নষ্ট করা প্লট। প্রতিটি পর্ব আপনাকে এমন অনুভূতি সৃষ্টি করবে যে পুরোটা শেষ না করে উঠতে পারবেন না।
এখানে একটি দৃশ্যে জেনি তার বয়ফ্রেন্ড রাহাতের বাড়িতে দেখা করতে যায়। তারপরের কাহিনি আপনাকে অবাক করতে বাধ্য। আর প্রতিটি খাবারের দৃশ্য লোমহর্ষক। এখানে পরিচালক ‘দ্য লাস্ট সাপার’–এর রেফারেন্স দিয়েছেন বলে মনে হয়। এ ছাড়া অনেক রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—মাঝি, দরজা ইত্যাদি। সব মিলিয়ে ডায়ালগ, লাইটিং, এনভায়রনমেন্ট ও সাউন্ড ডিজাইন অসম্ভব সুন্দর। ডান পাশে যদি আইস্ক্রিন না লেখা হয়ে নেটফ্লিক্স লেখা থাকত; তাতেও আমি অবাক হতাম না।
আমি যত সহজে শেষ করলাম, এতে গল্পের ৫ ভাগও বলা হয়নি। আপনারা সম্পূর্ণটি দেখতে পারেন আইস্ক্রিনে। আমার দেখা সেরা হরর থ্রিলার ওয়েব সিরিজ। ভিকি জাহেদের কাজ ব্যক্তিগতভাবে অনেক পছন্দ। এখন অনেক আগ্রহী ‘কালো বরফ’, ‘চক্র-৩’ ও ‘পুলসিরাত’ নিয়ে।
শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি