রাজনীতিতে নারীকে সক্রিয় রাখাটা দয়া বা চ্যারিটি নয়
· Prothom Alo

ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারীদের দৃশ্যমান নেতৃত্বের অভাব নিয়ে তিনি শুরু থেকেই সোচ্চার। সমসাময়িক রাজনীতিতে নারীর অধিকার, সাইবার বুলিং এবং নেতৃত্বকাঠামোর সংস্কারসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈকত আমীন
Visit mwafrika.life for more information.
কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক নারী দিবস গেল। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা নারীদের সাহসী ভূমিকা দেখেছি, বিশেষ করে রাজপথে। কিন্তু পরে রাষ্ট্র সংস্কার বা নীতি নির্ধারণের জায়গায় সেই উপস্থিতি ততটা দেখা যায় না। এই বৈপরীত্যকে আপনি আসলে কীভাবে দেখেন?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: এটি আসলে ঐতিহাসিকভাবেই হয়ে আসছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আমাদের অনেক নারীনেত্রী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু আজ আমরা কয়জন তাঁদের নাম জানি? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের যে ভূমিকা, সেখানেও আমরা এক দুর্ভাগা জাতি। আমরা নারীদের বীরত্বগাথার চেয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার করুণ ইতিহাসকেই বেশি সামনে আনি। ‘বীরাঙ্গনা’ পরিচয় দিয়ে তাঁদের কেবল একাত্তরের সেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গল্পেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
একইভাবে ’৯০–এর আন্দোলন কিংবা ২০২৪–এর গণ-অভ্যুত্থান—আমরা যখনই রাজপথে নামি, সেটা একধরনের অলংকারের মতো মনে করা হয়। সমাজ ভাবে— নারীরাও তো ছিল, বাহ্ খুব ভালো! কিন্তু নেতৃত্বের মূল জায়গায় তাঁদের উপস্থিতি মেনে নিতে এই সমাজ প্রস্তুত নয়। কারণ, আমাদের মনস্তত্ত্বে শক্তি মানেই পুরুষের মুখ। নারীর কাজ হবে নার্স হওয়া—এটিই আমাদের সামাজিক কাঠামো শিখিয়েছে। সেই নারী যখন রাজপথ বা কর্মক্ষেত্রে তাঁর অধিকারের দাবি নিয়ে সোচ্চার হন, সমাজ তখন তাঁকে আর ‘স্বাভাবিক নারী’ হিসেবে গ্রহণ করে না, বরং ‘অ্যাগ্রেসিভ’ তকমা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়।
জুলাই আন্দোলনে আমরা দেখেছি সবাই এককাতারে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের ঠিক পরপরই কি নারী অধিকার এবং সমমর্যাদার ক্ষেত্রে চিত্রটা পাল্টে যাচ্ছে?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: ঠিক পরপরই পাল্টে যাচ্ছে না বলে বরং যদি বলি, সব রকম বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে গণ–অভ্যুত্থান হলো, তার ঠিক পরপরই আজন্ম বৈষম্যের শিকার যে নারী, তার প্রতি একই রকমের আচরণ কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। বিশেষত যে নারীর অগ্রণী ভূমিকায় এই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হলো, সেই নারী কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন তোলাটা কি খুব বেশি হতাশাজনক নয়? পলিটিক্যালি দেখলে ব্যাপারটা কিন্তু খুবই উদ্বেগজনক।
অভ্যুত্থানের পরপরই নারীরা সমাজে যে পরিমাণ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলেন, এটা তো মানবাধিকার লঙ্ঘন। দেখলাম না তো দলমত–নির্বিশেষে নারীর মর্যাদা রক্ষায় সব ভিন্নমত, ভিন্ন পেশার মানুষকে এককাতারে দাঁড়াতে। একটা নারী কমিশন হলো, তাদের নিয়ে যে একটা অশোভন আচরণ করা হলো, রাষ্ট্র তো তখনো প্রায় নিশ্চুপ!
তার থেকেও ভয়ংকর হলো, পলিটিক্যালি কানেক্টেড নারীরাও যখন নারী নেতৃত্ব কিংবা নারীর অধিকারসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিতর্কিত মতামতগুলোকে নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং নারীর দলীয় প্রধান না হতে পারার যুক্তিগুলোকে গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন, মেনে নেন; এর একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজে যে আছে, তা তাঁরা লক্ষ করেন না।
এ ছাড়া ডিজিটাল বুলিং কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি এক মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধিও প্রায়ই নারীর এগোনোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ একে আজ একধরনের সাহসিকতা বা গ্ল্যামারের রূপ দিয়েছে, যার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে ‘বেয়াদবি’। তারা একে অপরাধ না ভেবে স্বাভাবিকতা দিচ্ছে। পলিটিক্যাল ডিবেট হতে পারে, সিভিল লিবার্টি অনুযায়ী সমালোচনা করবেন করুন, সেটা তো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু এর নামে যখন কুৎসিত ব্যক্তিগত আক্রমণ আর গালিগালাজ চলে, তখন সমাজ হিসেবে আমাদের মাথা নত হওয়ার কথা।
ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আপনি যেমন রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। একাডেমিক জগতেও সমানে কাজ করেছেন। বিগত সরকারের সময় আপনার পরিবারকে নানা হয়রানি ও জুলুমের শিকার হতে হয়েছে, আপনার ওপরও সাইবার আক্রমণ হয়েছে। এই যে দীর্ঘ পথপরিক্রমার পর আমরা একটি গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার অংশ হয়েছি, এতে আপনার ব্যক্তিজীবনের চ্যালেঞ্জগুলো কতটা বদলেছে?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: এটি একটি বেশ জটিল ও গভীর প্রশ্ন। ব্যক্তিগতভাবে কখনোই রাজনীতিতে নামার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামিনি। আমি শিক্ষকতা নিয়ে থাকারই চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাবা তো আমাদের রক্তে–মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারাতেই সমাজের প্রতি ইনজাস্টিস শুরু হয়। বিবেককে অস্বীকার করতে পারিনি বলে বিভিন্ন সময়ে মাঠে নামা হয়েছে এবং প্রতিবারই প্রতিবাদে।
ব্যক্তিগত জায়গায় বললে, আমার কাছে ২০২৪ সালের চেয়ে ২০১৮ সাল ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ। তখন আওয়ামী ফ্যাসিবাদ চরম তুঙ্গে। আমার বাবাকে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় নির্বাচনের আগে ২৮৪ দিনের জন্য জেলখানায় পাঠানো হলো। বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, অথচ তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিটি মামলা ছিল সাজানো। ওই সময়ে আমাদের ওপর জুলুমের মাত্রা এমন পর্যায়ে ছিল যে দেখেছি হাইকোর্টে অ্যাটর্নি জেনারেল কীভাবে বুক ফুলিয়ে মিথ্যা মামলার পক্ষে সাক্ষ্য দেন। আমি দেখতাম ডিবি পুলিশ সাদাপোশাকে আমাকে তুলে নেওয়ার জন্য আদালতের বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। যেকোনো মুহূর্তে গুম হওয়ার একটা আতঙ্ক সব সময় কাজ করত।
জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ব্যাপক সক্রিয়তা দেখা গেলেও বর্তমান রাজনীতি বা নির্বাচনে তাঁদের অংশ নেওয়া বা জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের অনীহা বা বাধা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থানের পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের পথে বড় বাধা হলো দলগুলোর ভেতর তাঁদের গ্রুমিং বা সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ‘অপারেশনাল পলিসি’র অভাব। মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলগুলো যখন কেবল ‘জেতার সম্ভাবনা’ খোঁজে, তখন পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়া নারীরা একধরনের বিষচক্রে আটকা পড়েন। দ্বিতীয়ত, বর্তমান রাজনীতি প্রচণ্ড ব্যয়বহুল ও অর্থনির্ভর হয়ে পড়েছে। বিগত বছরগুলোয় টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনার যে অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেখানে অধিকাংশ নারী নিজস্ব পুঁজি বা উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে ন্যায্য হিস্যা না থাকায় এই অসম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া আমাদের সমাজ ও দলগুলো এখনো মনে করে নেতৃত্ব পেশিশক্তি আর উচ্চকণ্ঠের আস্ফালনে সীমাবদ্ধ।
ফলে সপ্রতিভ নারী রাজনীতিতে এলেও সংসদ বা রাজপথে তাঁর লড়াই করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। নিরাপত্তা বা সোশ্যাল সিকিউরিটির অভাবে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর সক্রিয় হওয়াকে দলগুলো তাঁর অধিকারের বদলে ‘ঝামেলার’ কাজ হিসেবে দেখে। মূলত এই কাঠামোগত নীতিহীনতা, আকাশছোঁয়া নির্বাচনী খরচ এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই নারীরা রাজনীতির মূল জায়গাগুলোয় আসতে পারছেন না।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন বেশ কিছু প্রস্তাব সামনে এনেছিল এবং ‘জুলাই সনদে’ অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বড় দলগুলোর মধ্যে এই নির্দেশের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাঁরা নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়াকে একধরনের ‘বাড়তি জটিলতা’ মনে করছেন বলে মনে হয়। এই অনীহাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: এই অনীহার মূলে একটি বড় গলদ রয়েছে। নারীদের রাজনীতিতে নিয়ে আসা বা তাঁদের জন্য পলিসি নেওয়াকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এখন পর্যন্ত স্রেফ একটি ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা’ (সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) বা ‘চ্যারিটি’ হিসেবে দেখে। যেন এটা দলগুলোর ওপর একটা বাড়তি বোঝা, যেটা তাদের দয়া করে পালন করতে হচ্ছে। তাঁরা এটা বুঝতে পারছেন না যে রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় হওয়াটা দলগুলোর নিজের প্রয়োজনে এবং দেশের স্বার্থে জরুরি। নারী নেতৃত্বকে যখন ‘চ্যারিটি’র বদলে ‘প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে দেখা শুরু হবে, তখন এই অনীহা কাটবে।
আরেকটি মজার বিষয় লক্ষ করুন। আমরা নারী অধিকার নিয়ে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কথা বলি ঠিকই, কিন্তু খালেদা জিয়ার মতো একজন জীবন্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের লড়াইটাকে কেবল তাঁর ‘সহনশীলতা’, ‘দেশপ্রেম’ বা ‘ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের’ ফ্রেমে বেঁধে ফেলি। অথচ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং একজন আইডল হিসেবে তাঁর যে লিডারশিপ—তা কি আমরা সাধারণ নারী-পুরুষ সবার জন্য আইডল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি? পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য তাঁকে একজন শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে সেভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। যত দিন নারী নেতৃত্বকে কেবল ‘পারিবারিক কারণে বা পরিস্থিতির কারণে’ বলে চালিয়ে দেওয়া হবে এবং আইডল হিসেবে নারীকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবজ্ঞা কাজ করবে, তত দিন অনীহা থেকেই যাবে।
ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌসজুলাই অভ্যুত্থানে পোশাকশ্রমিকসহ অনেক শ্রমজীবী নারীর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তি বা জনশক্তির বড় অংশ হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের আমরা সব সময় ‘প্রান্তিক’ হিসেবে চিহ্নিত করি। যখনই সংস্কার বা নীতিমালার আলোচনা আসে, তখন এই নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা ন্যায্য মজুরির প্রশ্নগুলো ঠিক কতটা গুরুত্ব পায় বলে আপনি মনে করেন?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: আপনি যখন তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা অধিকারের কথা বলছেন, তার আগে তাঁদের স্বীকৃতির প্রশ্নটি তোলা জরুরি। আপনি তো তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবেই গণ্য করছেন কি না, সেটি বড় বিষয়। কেন কাউকে আমরা সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে সংজ্ঞায়িত করব? কেন আমরা জাতিগত বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিচয়ে কাউকে আলাদা রাখব? সে কি এ দেশের নাগরিক হিসেবে শুধু একজন ‘বাংলাদেশি’ হতে পারে না? আমরা এখনো দেখছি অনেক জাতিগত জনগোষ্ঠী, যেমন বম নারীরা অনেক দিন ধরে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। যখন কারও অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন ওঠে এবং বারবার আপনি হিন্দু বা অন্য পরিচয়ে কাউকে সংখ্যালঘু তকমা দিয়ে আলাদা করেন, তখনই বিভাজন তৈরি হয়। আমি আশা করব বর্তমান সরকারের কাছে, যেন তারা এই বিচারিক প্রক্রিয়াটির আমূল পরিবর্তন করে। প্রতিটি মানুষ যে এ দেশের সমান অংশীদার, সেই ন্যায্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সুনিশ্চিত হওয়া দরকার।
জুলাই অভ্যুত্থানের নারীরা যদি অবহেলা বা হেনস্তার কারণে রাজনীতি থেকে হতাশ হয়ে সরে যান, তবে সেটি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কতটা উদ্বেগের? তাঁদের রাজনীতিতে ধরে রাখতে দলগুলোর মধ্যে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন দরকার?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: এটি কেবল উদ্বেগের নয়, এটি একটি জাতীয় ক্ষতির আশঙ্কাজনক দিক। রাজনৈতিক দলগুলোকে সবার আগে একটা কথা খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে—তাঁরা রাজনীতি করেন এ দেশের মানুষের জন্য। আর এ দেশের মানুষের অর্ধেকের বেশিই হলো নারী। ফলে অর্ধেকের বেশি মানুষকে বাদ দিয়ে বা তাঁদের সঠিক রিপ্রেজেন্টেশন ছাড়া কখনোই টেকসই জাতীয় নীতি প্রণয়ন সম্ভব নয়। আপনি বর্তমানে সংসদে নারীদের পরিসংখ্যানটি দেখুন, এটি আমাদের সবার জন্যই অ্যালার্মিং বা আশঙ্কাজনক। আমরা তো গত ১৭ বছর সংসদটাকে মৃত এবং হতাশাজনক রূপে দেখে এসেছি। সেখানে কেবল স্তুতিগান হতো। নতুন সংসদ কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মূল পরিবর্তন তখন আসবে, যখন অর্ধেকের বেশি মানুষের আকাঙ্ক্ষা যথাযথ প্রতিনিধি পাবে।
কেন নারীদের প্রতিনিধিত্ব জরুরি? দেখুন, আমি যতই বিশেষজ্ঞ হই না কেন, একজন পুরুষের হয়ে কি আমি নারীর জন্য শতভাগ চিন্তা করতে পারব? কিন্তু এখন কী হচ্ছে? পুরুষেরা বসেই নারীদের জন্য পলিসি ডেভেলপ করছেন। এতে সমস্যার প্রকৃত সমাধান আসে না। রাজনীতিতে নারীকে সক্রিয় রাখাটা কোনো দয়া বা চ্যারিটি নয়, এটি দলের টিকে থাকা এবং পলিসি গঠনের প্রয়োজনেই অনিবার্য হতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের ওপর আক্রমণ উদ্বেগজনক হারে চোখে পড়ছে, বিশেষ করে গত দুই বছরে। বর্তমান সরকার গঠনকারী দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নারী নিরাপত্তার বিষয়ে একটি শক্তিশালী অবস্থান দেখা গিয়েছিল। সেই অবস্থান বাস্তবে কতটা দৃশ্যমান হলো বলে মনে হয়?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ও কার্যকর কৌশলের অভাব প্রকট। গবেষণায় দেখা যায়, শুধু কঠোর আইন করে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং ভুক্তভোগীদের আড়াল করে দেয়। সহিংসতা শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভজাত এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি।
আরেকটি বড় সংকট হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বিচারিতা। একদিকে নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে নারী নেতৃত্ব নিয়ে চরম অসম্মানজনক মন্তব্য করা হচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক দলের নারী কর্মীরা যখন এসব আক্রমণাত্মক মন্তব্যকে লেজিটিমেট বা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছায়। এই প্রবণতা গ্রামাঞ্চলে নারীদের ওপর হামলা বা নির্যাতনের পেছনে ‘সামাজিক স্বীকৃতি’ হিসেবে কাজ করে। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক এই জায়গাটিতে পরিবর্তন না এলে কেবল ইশতেহার বা আইনের মাধ্যমে সহিংসতার সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব হবে না।
সর্বশেষ প্রশ্ন, দেশের নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সবচেয়ে জরুরি কোন পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? আর এসব লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই–বা কী?
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মর্যাদা রক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি। সরকারের নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়ন কার্যক্রমের প্রশংসা করে আমি মনে করি, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হলে তা নারীর অগ্রযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। নারী সহিংসতা রোধে শুধু কঠোর আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দ্রুত প্রয়োগ এবং তৃণমূল থেকে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও প্রশাসনের প্রতি সাধারণ নারীর আস্থার জায়গা তৈরি করা অপরিহার্য; যেন বিপদে রাষ্ট্রকে পাশে পাওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, বিসিএসে কোটা থাকা বা না থাকার চেয়েও বড় বিষয় হলো নারীর জন্য সহজ ঋণের সুবিধা ও প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমাজের সেই দৃষ্টিভঙ্গি, যা নারীকে এখনো স্বাধীন সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না। রাষ্ট্রের সংস্কার সার্থক করতে হলে এই মানসিক সংকীর্ণতা ভেঙে নারীর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করতেই হবে।
আপনাকে ধন্যবাদ।
চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস: আপনাকেও ধন্যবাদ। প্রথম আলোকে ধন্যবাদ।