ফাঁদ

· Prothom Alo

দুই প্রেমিকের একজন খুন হয়ে যাওয়ার পর নাহিন একই সঙ্গে মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েও নির্ভার বোধ করল। মানসিক দুশ্চিন্তার কারণ, তার খুন হয়ে যাওয়া প্রেমিকের কারণে না আবার বর্তমান প্রেমিক তথা স্বামীর মৃত্যুদণ্ড হয়! একই সঙ্গে দুজনের সঙ্গে তার প্রেম করার বিষয়টি ভাইরাল হয়ে পড়লে বিচ্ছু লোকজন ঠিকই খুঁজে বের করবে যে এই নাহিন খান আর কেউ নয়, বরং খুলনার মধুমতীতীরের প্রত্যন্ত রুদাঘরা গ্রামের নাজমা বেগমই ঢাকায় এসে নাহিন খান সেজে বসে আছে।

তার শিক্ষক তো ক্লাসে বলতই, ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।’ এই সৌন্দর্য দিয়ে যেমন সে রাজধানীর বিখ্যাত মহিলা কলেজে দলের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়েছে এবং পরিশেষে ইনকাম ট্যাক্স অফিসার ইমদাদকে বিয়ে করতে পেরেছে। নিজের পরিবারকে শহরতলিতে টেনে তুলে এনে যে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং আরামের জীবন নিশ্চিত করেছে—এসব সে হারাতে চায় না।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

এসব ভাবতে ভাবতেই তার মাথা ভারী হয়ে ওঠে। এর মধ্যে তার মা ফোন করে খুব তাড়াতাড়ি পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠাতে বলে। সঙ্গে সঙ্গে তার মেজাজ আকাশে উঠল। কদিন পরপরই এখন তার পরিবারের সদস্যদেরও হাজার হাজার টাকা লাগে। আরে, বেকার একটা মেয়ে কীভাবে টাকা কামাই করে তা নিয়ে বাপ-মায়েরই আর মাথাব্যথা নেই!

নাহিন সব সময় উপলব্ধি করে যে বড়মানুষি ভাব দেখানোটা তার আগামীর জন্য ঝুঁকিবহ। তবু পরিবারের কাছে নিজের ‘বড়ত্ব’ না জানান দিলে তার ভালো লাগে না। দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়ে ওঠার এই মনস্তত্ত্ব থেকে নাহিন কোনোভাবেই মুক্তি পায় না।

যদিও কয়েকজন ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাধর ব্যক্তি তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু নাহিন জানে, এদের কাউকে বিয়ে করা আর বারো থেকে বারোয়ারি নাম্বারের রক্ষিতা হওয়া সমান কথা। এখন সে নিভৃত আর নিশ্চিত একটা জীবন চায়। সেই চাওয়া থেকেই ইনকাম ট্যাক্স অফিসার ইমদাদের সঙ্গে তার প্রেমের অভিনয় পরিণতি পায় বিয়েতে। তার কিছুদিনের মাথায় খুন হয় রাজিন।

রাজিনের খুন নিয়ে তার ভেতর খচখচ করলেও কয়েক মাসের মধ্যেই সে নির্ভার বোধ করল। আসলে সে একসঙ্গে দুই সম্পর্ক এবং প্রেমিককে সামলাতে পারছিল না। যদিও সে সত্যিই ভালোবেসেছিল রাজিনকে। করপোরেট চাকরি করা রাজিনকে হিসাব কষে চলতে হয়। কিন্তু ইমদাদ যেন নাহিনের রূপের আগুনে প্রচুর অর্থ ঢেলেই আনন্দ পায়।

ইমদাদকে সে তো কোনো দিন বুঝতেও দেয়নি যে রাজিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক শরীর পর্যন্ত গড়িয়েছে। পুলিশ যদিও এর সঙ্গে ইমদাদের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পায়নি। অথচ একটা অদ্ভুত অনুভূতি তার ভেতরে কাজ করে—মনে হয়, রাজিনের খুনের পেছনে ইমদাদের হাত রয়েছে।

রাজিনকে হারানো তার জন্য খুব বড় একটা ক্ষতির কারণ হয়নি বলেই তার মনে হয়। শৈশব-কৈশোর জীবনের অভাব–অনটনের জীবনকে সে আর গ্রহণ করতে চায় না। সে বিভিন্ন ট্যুর গ্রুপের সঙ্গেও সখ্য গড়েছে। যখন ইচ্ছা সে বেড়াতে যায়। তাকে একটু বিরক্ত করে তার ভ্রমণসঙ্গী অনেক মহিলা। তার দামি পোশাক-আশাক আর বেশভূষা দেখে দু–একটা কটুকথা বলতেও ছাড়ে না,

আপা কি এয়ার হোস্টেস? নাকি আপনার স্বামী কোনো ইন্ডাস্ট্রির মালিক?

হারামজাদিগুলো বুঝতে চায় না, কয় পয়সার এয়ার হোস্টেসের চেয়েও নাহিন খানরা কত দামি। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের ঘোড়ারোগ যে প্রকট, তা নাহিন আজকাল ভালো করেই টের পায়।

২.

বছর যত গড়ায় এই নিষ্ঠুর দুনিয়াতে রাজিন নামের একটা মানুষের অনুপস্থিতি তার বুকে কেমন করে বাজতে থাকে। কোনো কোনো সন্ধ্যা আর রাত তাকে বিষণ্ন আর এত একাকী করে যে হঠাৎ মনে হয় সে নিজেকেই চিনতে পারছে না। সে স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারে, রাজিনের সঙ্গে তার আত্মাটাও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মনে হয় নদীর সান্ধ্যকিনারে কুয়াশার আস্তরণের কোথাও সে লুকিয়ে আছে। বাস্তবে ফিরলে একটাই প্রশ্ন তার বুকের কিনারে হাহাকার জাগায়,

রাজিনকে কে বা কারা খুন করল?

ইমদাদকে সে তো কোনো দিন বুঝতেও দেয়নি যে রাজিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক শরীর পর্যন্ত গড়িয়েছে। পুলিশ যদিও এর সঙ্গে ইমদাদের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পায়নি। অথচ একটা অদ্ভুত অনুভূতি তার ভেতরে কাজ করে—মনে হয়, রাজিনের খুনের পেছনে ইমদাদের হাত রয়েছে। ছোটবেলা থেকে নাহিন প্রেম-ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটা জীবন চেয়েছিল। এখন ‘প্রেম’ শব্দটাই ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইমদাদকে তার ভয় লাগে। বড্ড ভয়। ইমদাদের কাছে রাজিনকে সে পুরোপুরি লুকানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ধূর্ত ইমদাদের কাছ থেকে নিরীহ রাজিনকে সে কতটুকু নিরাপদ রাখতে পেরেছিল?

নাহিন আজকাল বুঝতে পারে, অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ করার রোগটা তার আগামী জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। রিসোর্টের এক রুমে বিদেশি দামি মদ খেয়ে অর্ধনগ্ন নাহিন নিজে যে অনেকের কাছে আরাধ্য, তা বোঝাতেই রাজিনের প্রসঙ্গ তুলেছিল। ইমদাদকে সে বলেছিল,

তুমি আমার চেয়ে আমার রূপ আর শরীরটাকেই বেশি বোঝো। রিসোর্টে এসেই…

এই কালে প্লেটোনিক প্রেম বলে কিছু নেই।

সেদিন ছিল তুমুল বৃষ্টিমুখর এক দিন। রাজিনের সঙ্গে সে দূরের কোনো এক রিসোর্টে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু ইমদাদ যদি ভিডিও কল দেয়? তা ছাড়া আজকাল ইমদাদ কীভাবে যেন তার সব অবস্থান স্মেল করতে পারে।

জি না। অনেক পুরুষ আছে, নাহিন খানের জন্য রাত জেগে জেগে কবিতা আর প্রেমপত্রও লেখে।

তাই নাকি? তা তুমি তাদের সঙ্গে আমাকে লুকিয়ে ডেট করো নাকি।

ডেট করলে তো, তোমার কাছে আসতাম না।

আহা, কেউ তোমাকে এমন করে ফিল করছে—তার জন্য তোমার একটুও মায়া হয় না?

মায়া হলেই, ডেট করতে হবে? নাহিন খানকে তুমি এত সস্তা মনে করো?

বলতে বলতেই নাহিনের ফোন বেজে ওঠে। বেশ কয়েকবার ওপাশ থেকে ফোনে নাহিনকে না পেয়ে রাজিন সমানে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠাতে থাকে। নাহিন নিজেকে লুকানোর স্মিত হাসি হেসে বলে,

দেখছ, আমি কত জ্বালাতন সহ্য করি। তুমি তো বিশ্বাসই করো না।

এ কথায় চিড়া ভিজল না। ইমদাদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল নাহিনের চোখে। তাকে ‘তুই’ সম্বোধন করে বলল,

ফোনটা আমার হাতে দে। নাহিন ফোনের রিংটোন ততক্ষণে মিউট করে দিয়েছিল। বলল,

বা রে! আমার ফোন তোমাকে দিতে হবে কেন? আমাকে বিশ্বাস করো না?

ফোনটা আমার হাতে দে, বলছি।

তোমার ফোন আমি হাতে ধরেছি কোনো দিন?

ইউ চিট…বলে নাহিনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইমদাদ। ধস্তাধ্বস্তির মাঝেই মিউট অবস্থায় অপর প্রান্তের রাজিনের কলটা রিসিভ হয়েছিল।

৩.

জীবন এক দাবার ছক। সাদা আর কালো বর্ণ দুটো শতরঞ্জিতে একইভাবে যেন একে অন্যকে ঘায়েলের ধান্দায় থাকে। ইমদাদ যে আচরণ তার সঙ্গে করে নাহিন ঠিক এক সময় রাজিনের সঙ্গে তেমন আচরণই করত!

সেদিন ছিল তুমুল বৃষ্টিমুখর এক দিন। রাজিনের সঙ্গে সে দূরের কোনো এক রিসোর্টে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু ইমদাদ যদি ভিডিও কল দেয়? তা ছাড়া আজকাল ইমদাদ কীভাবে যেন তার সব অবস্থান স্মেল করতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতে সে রাজিনকে কল দেয়,

রাজিন আমার শরীর খারাপ করেছে। অত দূর যাওয়ার এনার্জি নাই। তুমি বরং ওই কফি হাউসটায় আসো।

কিন্তু। কী সমস্যা? আচ্ছা, আসছি।

কফির অর্ডার দিতে দিতে রাজিন গভীর চোখে নাহিনের অস্থিরতা খেয়াল করল। মেয়েটা কেমন যেন দিন দিন নিজেকে হারিয়ে ফেলছে বলে রাজিনের মনে হয়। আগে সে খুব মনোযোগ দিয়ে রাজিনকে মুগ্ধ হয়ে দেখত। কিন্তু এখন সবকিছু থেকে কেন নাহিন নিজেকে লুকাতে চাইছে, তা নিয়ে এবার রাজিন সরাসরি প্রশ্ন করলে ভ্যাবাচেকা খাওয়া নাহিন বলল,

আরে না, এমনিতেই। বলেছি না, শরীরটা ভালো নেই।

ততক্ষণে নাহিনের মোবাইল ফোনে বারবার মেসেজের ক্লিং ক্লিং শব্দের সঙ্গে প্রতিবার নাহিন মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তোলে। এবার রাজিন নাহিনকে বলল,

নাহিন আমি কি তোমার মোবাইলটা একটু দেখতে পারি?

হোয়াট ফাকস? তোর সঙ্গে প্রেম করি বলে আমার সবকিছু তোর? মাগনা মাগনা অনেক কিছু পাইছিস। আর কী চাস?

নাহিন!

সেদিন আর কোনো কথা না বলেই নাহিন চলে এসেছিল। আর পেছনে ফিরে না তাকালেও সে রাজিনের অসহায়, বিব্রত আর লাজুক চেহারাটা ঝাপসা হৃদয় দিয়ে ঠিকই অনুমান করতে পেরেছিল। সে জানত, যত কষ্টই হোক; প্রবল আত্মসম্মানবোধের রাজিন আর কোনো দিন সীমানা অতিক্রমের চেষ্টা করবে না।

কিন্তু কি এক অমোঘ টানে রাজিনকে সে কললিস্ট থেকে ব্লকও করতে পারছিল না। খেটে খাওয়া, মেধাবী তরুণটার ক্লান্ত চেহারাটার জন্য আজও কেমন মায়া কাজ করে নাহিনের ভেতর!

৪.

বিয়ের আগে থেকেই নাহিন মাঝেমধ্যে ট্রাভেলার্স গ্রুপের মেয়েদের সঙ্গে বিভিন্ন পোজের ছবি তুললেও ওদের মন থেকে ঘৃণা করে। কেননা, সে স্পষ্ট করেই টের পায়, সবাই তাকে হিংসা করেও কেমন মিঠা মিঠা ভাব দেখায়। গ্রুপে না এসে সে একাই ঘুরে বেড়াতে চায়। কিন্তু ইমদাদকে সে কথা বললেই সে বলবে,

তোর আবার কোন নাং অন্য দিক দিয়ে গিয়ে তোর সঙ্গে মিলবে?

রাজিনের মৃত্যুর প্রায় এক বছর পূর্তির পর থেকে প্রতিটি দিন যেন রাজিনের মৃত্যু দিবস হয়ে উঠছে। নাহিনের ভেতরটা কেমন অবশ হয়ে থাকে। কখনো কখনো প্রেশার অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। গা ঘামতে থাকে। হঠাৎ মনে হয়, কী যেন নেই! সেই না থাকা জগৎটা তার চোখের সামনে শূন্য করে তোলে। ইমদাদই একদিন বলল,

তোমার তো না বেড়াতে পারলে দমবন্ধ লাগে। যাও, সাজেক থেকে বেড়িয়ে এসো। ইমদাদের সঙ্গ, ঢাকার জ্যাম আর দমবন্ধ পরিবেশ থেকে সাজেকে এসে সে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু রাজিনের আত্মা যেন বসে আছে পাহাড়ে, চাঁদের মায়াবী আলোর আস্তরণ হয়ে পাহাড়ের দূর রেখায় মিলিয়ে যাওয়া আকাশের সীমানায়। পাহাড়, সাগর, জল আর বন কোনো কিছুই যেন তার জীবনে রাজিন ছাড়া অর্থবহ নয়। এই সময়টা ছোটবেলার মাঠ, মধুমতি নদীর টলটল জলের বয়ে চলা—এক স্মৃতিমঞ্চ হয়ে তার বুকের ভেতর কেমন হাহাকার তোলে।

আবছা আলো–আঁধারিতে দূর পাহাড়ের কোলে একটা জুমঘর স্পষ্ট হয়। হ্যাঁ, সে জানে; ঠিক ওই ঘরটায় রাজিন তার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে অপেক্ষা করছে, হয়তো জন্মেরও আগে থেকে। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে। রাজিনকে নিয়ে সারা জীবনের জন্য সংসার সাজাতে নাহিন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

সাজেকে আসার পরদিন সকাল থেকে নাহিন অদ্ভুত একটা বিষয় খেয়াল করে। সবাই হেলিপ্যাডে বেড়াতে গেছে তাকে না নিয়েই এবং সবাই তাকে এড়িয়ে ছোট ছোট দল পাকিয়ে আড়চোখে দেখছে আর ফিসফিস করছে। নাহিনের মেজাজ বিগড়ে যায়। কিন্তু দুপুরের মধ্যে একটা ব্যাপার তার কাছে স্পষ্ট হয়। ঝরনার কাছে সে একাই গিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে পাহাড়ের বাঁক থেকে ওপরে ওঠার সময় ওপরে বসে থাকা দুজনের কথোপকথন তার কানে আসে,

হারামজাদি সাপের মতো সুন্দরী আর বিষধর। দেখছেন আপা, রূপ-যৌবন ব্যবহার করে সে কীভাবে তার প্রেমিককে খুন করেছে? তার স্বামীর বক্তব্য শুনছেন? ফেসবুকে এখন সে ভাইরাল।

নাহিনের বুকের ভেতর হাজার টনের এক বজ্রপাত হয়! কার উদ্দেশে সে যেন বলে,

এই কারণে আমাকে পাহাড়ে পাঠিয়েছ?

লতা-ঘাস-পাহাড়ি ছোট গাছে আচ্ছাদিত প্রকৃতির ভেতর নিচের দিকে নেমে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথটায় সে ধপ করে বসে পড়ল। শরীরের সব শক্তি যেন উধাও হয়ে গেছে। তবু নাহিনের মনে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা নিভে গিয়েও মাঝেমধ্যে জেগে উঠছে। এই পাহাড়ে তারা কীভাবে ফেসবুক ব্যবহার করছে? হয়তো তারা পুরোনো ঘটনার ভুল কিছু দেখে তার সঙ্গেই নাহিনকে জড়িয়ে ফেলছে!

একসময় সে নিজের ঘরে এসে অবশ আর নিস্তেজ শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয়। লম্বা ঘুম ভেঙে উঠে ঠিক বুঝতে পারে না, এটা কোন সময়? ভোর হচ্ছে নাকি বাইরে চাঁদের বিচ্ছুরিত আলোয় পাহাড় লাজুক প্রেমিকার মতো মুখ লুকিয়ে রাখছে? তার ঘোর ভাঙে। কে যেন তার কানে কানে বলে,

‘যার মৃত্যুদণ্ডের জন্য তুমি শঙ্কিত ছিলে, সে-ই তোমার মৃত্যুপথ নিশ্চিত করে দিয়েছে!’

কাঠের ঘরটায় বসে নাহিন জানালা দিয়ে দূরে তাকায়। মনে হয়, আকাশের নীল মেখে সবুজ পাহাড়টা গর্ভবতী। ‘গর্ভবতী’ শব্দটা মনে হওয়ামাত্র তার বমি বমি লাগে। তলপেটে আলতো হাত রাখে সে। আবছা আলো–আঁধারিতে দূর পাহাড়ের কোলে একটা জুমঘর স্পষ্ট হয়। হ্যাঁ, সে জানে; ঠিক ওই ঘরটায় রাজিন তার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে অপেক্ষা করছে, হয়তো জন্মেরও আগে থেকে। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে। রাজিনকে নিয়ে সারা জীবনের জন্য সংসার সাজাতে নাহিন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। সে স্পষ্ট অনুভব করে, জানালা থেকে লাফ দিলে অনেক নিচের ঢালুটা পেরিয়ে সে সহজেই জুমঘরের কাছে পৌঁছাতে পারবে। যে ঘরের বিছানার চাদরে আঁকা ফুলে রোদ-ছায়া খেলা করে। জোছনার আলোমাখা রাজিনের চোখে-মুখে কেমন অপার্থিব মায়া!

নাহিন এগিয়ে যায় জানালা হয়ে জুমঘর পর্যন্ত প্রলম্বিত, অপার্থিব, স্বপ্নময় পথের দিকে।

Read full story at source