বিল বকেয়া, ২০টি সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে কাল থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ
· Prothom Alo

বকেয়া বিলকে কেন্দ্র করে সরকারি ২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে আগামীকাল বুধবার থেকে শিশুখাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকবে। অভিভাবকদের নিজ দায়িত্বে শিশুদের জন্য খাবার নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার অভিভাবকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এ বার্তা পাঠানো হয়েছে দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো থেকে।
Visit bettingx.bond for more information.
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘২০টি শিশু দিবাযত্ন স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় এই দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্প চলমান থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি পাঁচ মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা নিয়ে কেন্দ্রগুলোতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ৯ মাসের খাবার বিল বকেয়া থাকায় দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রগুলোতে খাবার সরবরাহ না করার ঘোষণা দিয়েছে।
এ নিয়ে মঙ্গলবার প্রথম আলোতে ‘সংকটে ২০ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, দুশ্চিন্তা’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছে। জানা গেছে, প্রথম আলোতে এ সংবাদ প্রকাশের পর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন সমস্যা দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশে বুধবার প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা ডাকা হয়েছে। পিএসসির প্রধান হচ্ছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষের পর ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। মেয়াদ বাড়ানোর পর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) সুপারিশ করে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি তা অনুমোদন করেনি। ফলে ঠিকাদারেরা খাবার সরবরাহ করলেও ৯ মাস ধরে বিল পাচ্ছে না। দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিল সোয়া কোটি টাকার মতো।
২০টি শিশুকেন্দ্রের প্রতিটিতে আসনসংখ্যা ৬০। ৪ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের সেখানে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত রাখা হয়। মা-বাবার আয়ের ওপর ভিত্তি করে মাসিক খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুর বয়স অনুসারে, মাসিক সেবামূল্য সর্বনিম্ন এক হাজার, সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা। ঢাকায় ১০টি ও ঢাকার বাইরে ১০টি কেন্দ্র রয়েছে।
খাবার সরবরাহ বন্ধ
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগারে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থেকে আজ হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপে অভিভাবকদের নিজ দায়িত্বে শিশুদের খাবার গুছিয়ে দিতে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
বার্তায় বলা হয়, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত ‘২০টি শিশু দিবাযত্ন স্থাপন’ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার পর খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারের সঙ্গে প্রকল্প কার্যালয় নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হয়নি। মৌখিক নির্দেশনায় শিশুখাদ্য সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘ ৯ মাসের বিল না পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগামীকাল ১ এপ্রিল থেকে শিশুখাদ্য সরবরাহ করবে না মর্মে জানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকল্প কার্যালয়ে একাধিকবার মৌখিকভাবে ও চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি অবগত করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান করা হয়নি। এ অবস্থায় আগামীকাল ১ এপ্রিল বুধবার থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুখাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
এই কেন্দ্রে নিজের আড়াই বছর বয়সী সন্তানকে রাখেন তানজিলা মোস্তাফিজ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, হুট করে এমন বার্তা পেয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। কেন্দ্র থেকে সকালে শিশুদের দুধ, পাউরুটি খাবার দিত। দুপুরে রান্না করা খাবার দেওয়া হতো। একেক দিন একেক রকম, যেমন মাংস, মুরগি, সবজি দিয়ে ভাত। বিকেলের নাশতায় ফালুদা, পুডিং, দই-চিড়া থাকত। তিনি জানান, আগামীকাল থেকে তিনি সন্তানকে সারা দিনের খাবার ব্যাগে গুছিয়ে দিয়ে আসবেন। ৬০ শিশুর অভিভাবকদের দেওয়া খাবার ফ্রিজে রাখা হবে কি না, সেসব খাবার গরম করে খাওয়ানো হবে কি না, সেটা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। কারণ, তাঁর সন্তান ঠান্ডা খাবার খায় না।
অপর দিকে পান্থপথে পানি ভবনে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে অভিভাবকদের কাছে পাঠানো বার্তায় বলা হয়েছে, ‘শিশুসেবা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু খাবার সরবরাহ না থাকায় আপনারা সবাই খাবার দিয়ে দেবেন।’
তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে স্থাপিত দিবাযত্ন কেন্দ্রের ‘দিবাযত্ন কর্মকর্তা’ মাহিয়া তাসনুভ প্রথম আলোকে বলেন, বকেয়া বিলের কারণে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাঁদের কেন্দ্রেও কাল থেকে খাবার সরবরাহ করবে না বলে জানিয়েছে। তাই তাঁরা অভিভাবকদের খাবার নিয়ে আসতে বলেছেন। অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যথাযথভাবে খাওয়ানোর চেষ্টা করব। এখানে খাবার রান্না হতো এবং একটি নিজস্ব সিস্টেম তৈরি হয়েছিল—কখন কোন খাবার খাওয়ানো হবে। তাই একেক অভিভাবকদের একেক রকম খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থাপনার বাড়তি চাপ আমাদের ওপর পড়বে।’
মাহিয়া তাসনুভ আরও জানান, তাঁদেরও আট মাসের বেতন বকেয়া ছিল। এবার ঈদের পর ২৪ মার্চ তিন মাসের বকেয়া দেওয়া হয়। এখনো পাঁচ মাস বেতন বাকি। তাঁরাও কষ্টে রয়েছেন, তবে শিশুদের দেখভালে অবহেলা করছেন না।
২০টি দিবাযত্ন কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রে ঢালী এন্টারপ্রাইজ ও ৫টি কেন্দ্রে তামান্না ট্রেডিং করপোরেশন খাবার সরবরাহ করে।
ঢালী এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মুরাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা কেন্দ্রগুলোতে শুকনা বাজার করে দেন মাসের ১ থেকে ২ তারিখের মধ্যে। মাছ ও মাংস কিনে দেন মাসে দু–তিনবার। কিছু শুকনা খাবার সপ্তাহে একবার কিনে দেন। এ ছাড়া প্রতিদিনের সবজি, দুধ, যেগুলো তাজা প্রয়োজন, সেটার জন্য কেন্দ্রগুলোতে টাকা দিয়ে আসেন। বুধবার থেকে তিনি সব কটি কেন্দ্রে বাজার দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তাঁর নিজের অনেক খারাপ লাগছে, কিন্তু তিনি আর কুলাতে পারছেন না। ৯ মাসে তাঁর বকেয়া বিল হয়েছে ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টাকা।
একই মন্তব্য করেন তামান্না ট্রেডিং করপোরেশনের কর্মকর্তা মো. আল মামুন। প্রথম আলোকে তিনি জানান, ৯ মাসে তাঁর ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। বুধবার থেকে তিনিও খাবার দিতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন।
বেতন–ভাড়া–খাবার বিল বকেয়া, সংকটে ২০ সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র‘সমাধান হবে’
সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শবনম মোস্তারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ মন্ত্রী মহোদয় আগামী বৃহস্পতিবার পিএসসি সভা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে বলেছেন। আশা করি, বৃহস্পতিবার বৈঠকে সমস্যার সমাধান হবে। মাঝের দুই দিন সন্তানদের জন্য খাবার নিয়ে যেতে হবে অভিভাবকদের।’