রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোট ইস্যুতে এত বিতর্ক কেন

· Prothom Alo

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। এ বিতর্ক যে সামনে আসবে, সেটা অজানা ছিল না। সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের শপথকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মতবিরোধকে স্পষ্ট করেছে।

প্রশ্ন হলো, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জে পড়েছে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আলাপ গোড়া থেকে শুরু করতে হবে এবং এখানে সংস্কার কমিশনগুলোর গঠন, ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন, জুলাই সনদ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর ওপর আলোকপাত করতে হবে।

Visit freshyourfeel.com for more information.

চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের মাঝামাঝি সময় থেকে সুশীল সমাজে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমাজে, রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এক–এগারোর সরকার কিছু অধ্যাদেশও জারি করেছিল। সংস্কার আরোপ এবং উদ্দেশ্যে সততা না থাকায় সে যাত্রা সফল হয়নি। পূর্ণাঙ্গরূপে রাষ্ট্র মেরামতের আলাপ দল হিসেবে বিএনপি সামনে নিয়ে আসে এবং ৩১ দফায় তা আরও স্পষ্ট করে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনে কোটার উচ্ছেদ ও সরকার পতন প্রাধান্য পেয়েছিল; যদিও কর্তৃত্ববাদবিরোধী রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা সমাজে বহু পুরোনো, তারপরও যারা সংস্কার ইস্যুতে এখন সরব, তাদের অনেকেই ৫ আগস্টের আগে এত সরব ছিল না।

রাষ্ট্র সংস্কারের সামাজিক আকাঙ্ক্ষা থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন গঠন করেছিল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হবে, কমিশনগুলো অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত; যদিও স্বাভাবিকভাবে বোধগম্য নয় যে কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে তাঁরা নিয়োগ পেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, একই বিভাগে পাঠদান, একই এলাকার, এনজিও করার অভিজ্ঞতা ইত্যাদি গুরুত্ব পেয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন আছে। এমন অনেক কমিশন সদস্য আছেন, যাঁদের কর্তৃত্ববাদবিরোধী লড়াইয়ে তেমনভাবে দেখা যায়নি। অধিকাংশ কমিশনে আইনের অধ্যাপকেরা ছিলেন, লোকপ্রশাসনের অধ্যাপকেরাও ছিলেন কয়েকটিতে।

স্থানীয় সরকার ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের এই কমিশনগুলোয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো অধ্যাপককে রাখা হয়নি, যা এই কমিশনগুলোর প্রতিবেদনে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পদ্ধতি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাকে ইঙ্গিত করে এবং একাডেমিক বৈধতার জায়গা থেকে প্রতিবেদনগুলোকে ন্যূনতম চ্যালেঞ্জে ফেলে।

কমিশনগুলোর প্রতিবেদনসহ পরবর্তী জুলাই ঘোষণা, জুলাই সনদ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে রাজনৈতিক বিষয়ের চেয়ে আইনি ও আলংকারিক বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ফ্যাসিবাদের ফিরে আসা রুদ্ধ করতে কেন উচ্চকক্ষ বা আনুপাতিক নির্বাচন প্রয়োজন, তার যথার্থতা তুলনামূলক রাজনীতির আলোকে যাচাই করা হয়নি।

পাকিস্তানে আনুপাতিক নির্বাচন এবং উচ্চকক্ষ আছে, কিন্তু ডেমোক্রেসি ইনডেক্স ২০২৩ অনুযায়ী পাকিস্তান একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র। শ্রীলঙ্কায় আনুপাতিক নির্বাচন আছে, কিন্তু উচ্চকক্ষ পরিত্যক্ত হয়েছে এবং ফ্যাসিবাদের উত্থানও হয়েছে। নেপালে এ দুই ব্যবস্থা সত্ত্বেও সেখানে কয়েক মাস আগে গণ–অভ্যুত্থান হয়েছে।  

যেহেতু ঐকমত্য কমিশন প্রথম দিকে গঠিত কমিশনগুলোর প্রধানদের নিয়ে গঠিত হয়েছে, সেহেতু এর গঠনপ্রক্রিয়া বিষয়ে আগের আলাপের তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। সরাসরি ভোট গ্রহণ করা না হলেও যে প্রক্রিয়ায় ৩০টি দলের মধ্যে কয়টি দল একটি বিষয়ে একমত হয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে, সেটা দেখলে মনে হয় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই এক ভোট ছিল। বিএনপিরও এক ভোট এবং যে দলের কয়েকশ কর্মী আছে, তাদেরও এক ভোট। আলোচনায় অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে বড় দল হওয়া সত্ত্বেও মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে সে ছিল সংখ্যালঘু (৩০ ভাগের ১ ভাগ)। ফলে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায়ও রাজনীতিটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, ছিল সংখ্যা।

গণভোট নিয়ে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে জুলাই সনদ স্বাক্ষর, ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন এবং গণভোটের উত্থাপিত প্রশ্নের ধরনে ভিন্নতার কারণে। গণভোটে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে নয়, ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদনের প্রতিনিধিত্ব করে। সনদকে গুরুত্ব দিলে গণভোটে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ব্যাপারে জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জানা হতো।

সনদকে এড়িয়ে কমিশনের প্রতিবেদনকেই যদি গণভোটে দেওয়া হবে, তাহলে এত মাস ধরে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা বা এত ঘটা করে এই সনদ স্বাক্ষরের প্রয়োজন ছিল না। শুধু ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদকেই গণভোটে দেওয়া যেত এবং ছয় মাসের মধ্যেই নির্বাচন করা সম্ভব ছিল। তা ছাড়া গণভোটের প্রশ্নগুলো সহজভাবে বোধগম্য ছিল না। চারটি প্রশ্ন এমনভাবে নাগরিকদের ওপর আরোপ করা হয়েছিল যে, কোনো প্রশ্নে ভিন্নমত দেওয়ারও সুযোগ ছিল না।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে উক্ত সনদে স্বাক্ষর ও তাহা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করে।’ কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। কারণ, বিএনপিসহ কয়েকটি দল নোট অব ডিসেন্টসহ অঙ্গীকার করেছে। তা ছাড়া গণভোটের আগে এনসিপি সনদে স্বাক্ষর করেনি। সুতরাং পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ঐক্য ছাড়াই গণভোটের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিতে যাচাই না করা, রাজনৈতিক মতৈক্যের অভাব, ঐকমত্য কমিশনের উচ্চাভিলাষ ও নিরপেক্ষতার অভাব এবং সাংবিধানিক সংস্কারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংসদের আগে গণভোটে যাওয়ায় গণভোট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জে পড়েছে।

জুলাই আদেশ বাস্তবায়নের জটিলতা তৈরি হয়েছে সরকার ও ঐকমত্য কমিশনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের পুরোনো আইনি আলোচনার ওপর নির্ভরতার করণেই। অথচ গণভোটের আগে গণভোটে উত্থাপিত প্রশ্নের একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন ছিল। এ জন্য ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু দলগুলো সনদে নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে স্বাক্ষর করেছে, সেভাবে গণভোটের প্রশ্ন তৈরি না করায় প্রশ্নগুলো সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করে না।

অন্যদিকে ঐকমত্য কমিশনে ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রধান স্টেকহোল্ডার বিএনপির এক ভোটে সন্তুষ্ট থাকার উদারতা সত্ত্বেও ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে বিএনপি বিরোধীদের সংস্কারের দাবিগুলো এমনভাবে উত্থাপন করা হয়েছে যে বিএনপির সমর্থকদের পক্ষে তাদের অবস্থান প্রকাশ করা সহজ তো ছিলই না, বরং এর সমর্থকেরা তাদের দলের নোট অব ডিসেন্টের বাইরে গিয়ে নির্ধারিত মডিউলে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে। কমিশন বিএনপিবিরোধীদের ভালো না মন্দ বিষয়ে একমত, সে বিষয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কমিশন বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল, এমনকি জুলাই সনদকেও এড়িয়ে গেছে। এখানে ঐকমত্য কমিশনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা গণভোট বাস্তবায়নকে মূলত চ্যালেঞ্জে ফেলেছে।  

গণভোট অত্যন্ত শক্তিশালী একটি জনসম্মতি। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত চারবার গণভোট হয়েছে (১৯৭৭, ১৯৮৫, ১৯৯১, ২০২৬)। এর মধ্যে দুবার প্রশাসনিক এবং দুবার সাংবিধানিক। ১৯৯০ সালে ৩ জোটের (৫, ৭ ও ৮–দলীয় জোট) রূপরেখায় সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সংসদীয় সরকারে ফিরে আসার জন্য যে রাজনৈতিক ঐক্য হয়, তার ভিত্তিতে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদে আলোচনা সাপেক্ষে ৩০৭-০ ভোটে বিল পাস হয়। এ বিলে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করবেন কি না, সে বিষয়ে জনসম্মতির জন্য গণভোট হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের মধ্যে এবং দলগুলোর ওপর সরকার ও ঐকমত্য কমিশনের আস্থার অভাবে অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনুসৃত এ প্রথাও অনুসরণ করেনি এবং এ ক্ষেত্রে আগের মতো রাজনৈতিক ঐক্যও তৈরি করতে পারেনি; বরং বিভাজন তৈরি করেছে।  

গত ৫৪ বছরের অধিকাংশ সময়ে বাংলাদেশে মানুষ স্বৈরাচার, কর্তৃত্ববাদ, আধা কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদী শাসনে ছিল। ফলে জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। কিন্তু সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোটে উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোর যথার্থতা তুলনামূলক

রাজনৈতিক দৃষ্টিতে যাচাই না করা, রাজনৈতিক মতৈক্যের অভাব, ঐকমত্য কমিশনের উচ্চাভিলাষ ও নিরপেক্ষতার অভাব এবং সাংবিধানিক সংস্কারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংসদের আগে গণভোটে যাওয়ায় গণভোট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জে পড়েছে।

সর্বোপরি তথাকথিত সরকারি অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ স্বাক্ষরে এবং গণভোটে উত্থাপিত প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য উৎপাদনে ব্যর্থ হওয়ায় রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর সংকট থেকে উত্তরণ করতে গিয়ে জাতি নতুন সংকটে নিমজ্জিত। অথচ ১৯৯১ সালে ঐকমত্য তৈরির জন্য এ ধরনের অরাজনৈতিক কর্তৃপক্ষও ছিল না, সংকটও ছিল না। ফলে সংসদীয় সরকার পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত হয়নি।                    

এখন এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ঐকমত্য কমিশনের অসামাপ্ত কাজটি সমাপ্ত করতে হবে। যেসব ইস্যুতে দলগুলো দ্বিমত ছিল, সেগুলো সংসদে আলোচনা করে সবাই একমত হলে প্রয়োজনে পুনরায় গণভোটে যেতে হবে। সংস্কার ইস্যুতে কয়েকবার গণভোটে যাওয়ার উদাহরণও আছে পৃথিবীতে। ইনফরমাল মেকানিজমে না গিয়ে যতটা সম্ভব আইন ও প্রথা মেনে সংস্কার করলে ভবিষ্যৎ রেজিম পরিবর্তনেও সংস্কার টেকসই হবে। তা ছাড়া সংস্কারপ্রক্রিয়া এমনভাবে সম্পন্ন করতে হয়, যেন অভিযোজন হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে আর নারীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করে ১৯২০ সালে ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে, প্রায় ১৪৪ বছর পর। রাষ্ট্র সংস্কারে এই অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে না যে প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলেই বাংলাদেশে সুশাসন নিশ্চিত।

সব পক্ষকেই সতর্ক থাকতে হবে যে রাষ্ট্র সংস্কার যেন কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য না হয়, জাতীয় প্রয়োজনে এবং যৌক্তিকভাবেই যেন হয়। তবে সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়ায় যেহেতু বিএনপি নিজের অবস্থান জাতির সামনে ধারাবাহিকভাবে স্পষ্ট করেছে এবং জনগণও বিএনপিকেই সংবিধান সংশোধনের একক ক্ষমতা এবং দেশ পরিচালনার জন্য সম্মতি দিয়েছে, সেহেতু বাস্তবতা হলো, বল এখন বিএনপিরই কোর্টে।  

  • কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং পরিচালক, উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source