মেধা বনাম পুলিশি–গোয়েন্দা প্রতিবেদন: জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশেও কাটেনি ভেরিফিকেশন বৈষম্য
· Prothom Alo

মেধার সর্বোচ্চ লড়াইয়ে উত্তীর্ণ হয়েও অন্তত তিনটি বিসিএসের বিপুলসংখ্যক মেধাবী চাকরিপ্রার্থী এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ৪৩, ৪৪ ও ৪৮তম বিসিএসে পিএসসি কর্তৃক চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও শুধু ‘নেতিবাচক’ পুলিশি–গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে তাঁদের নাম বাদ পড়েছে চূড়ান্ত গেজেট থেকে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ৪৩তম বিসিএসে ৬৫ জন, ৪৪তম বিসিএসে ১১ জন (যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে) এবং ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে ২১ জন মেধাবী চিকিৎসক ক্যাডার পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
২০২৪ সালে ৮ আগস্টে ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে বাদ পড়া ২৮ থেকে ৪২তম বিসিএসের বঞ্চিত হাজারো প্রার্থীকে পুনর্বহাল করলেও তাঁদেরই সময়ে হওয়া পরবর্তী বিসিএসগুলোতে একই প্রথার পুনরাবৃত্তি মেধাবীদের ক্ষুব্ধ করেছে।
Visit rocore.sbs for more information.
শামীম ও উজ্জ্বলের স্বপ্নভঙ্গ: মেধার শীর্ষে থেকেও ব্রাত্য যাঁরা
৪৪তম বিসিএসে এক নজিরবিহীন স্বপ্নভঙ্গের গল্প তৈরি হয়েছে শামীম শাহরিয়ারকে ঘিরে। ৪৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেলেও তিনি যোগ দেননি শুধু পররাষ্ট্র ক্যাডারের টানে। কারণ, তাঁর বাবা স্বপ্ন দেখতেন ছেলে একদিন কূটনীতিক হবে। নিজের ওপর প্রবল আত্মবিশ্বাস থাকা শামীম ঝুঁকি নিয়েছিলেন এবং ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে সারা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অথচ অভাবনীয় এই সাফল্যের পরও নেতিবাচক পুলিশি প্রতিবেদনের ‘অদৃশ্য’ জালে তাঁর নিয়োগ আটকে গেছে, ফলে এক সময়ের নিশ্চিত প্রশাসন ক্যাডারের চাকরিটিও এখন তাঁর নাগালের বাইরে। কৃষক বাবা হাতেম আলী এখন বোবাকান্নায় দিন পার করছেন এবং ছেলের প্রতি এই অবিচারের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছেন।
অন্যদিকে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে (স্বাস্থ্য) বঞ্চনার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে চিকিৎসক উজ্জ্বল মল্লিকের ক্ষেত্রে। ফরিদপুরের নগরকান্দার এক দরিদ্র জেলে পরিবার থেকে উঠে আসা উজ্জ্বল মাঘের হাড়কাঁপানো শীতে বাবার কোমরসমান পানিতে জাল ফেলার কষ্ট দেখে বড় হয়েছেন। বাবার স্বপ্ন পূরণে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ঢাকা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে তিনি বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন; কিন্তু চূড়ান্ত গেজেটে নাম না আসায় উজ্জ্বলের বাবার সেই ‘সুদিন ফেরার’ স্বপ্ন আজ বিষাদে পরিণত হয়েছে, ‘জাইল্যা দেশের কী ক্ষতি করল! মেধায় টিকেও ছেলে চাকরি পাবে না?’ নারায়ণ মল্লিক রাষ্ট্রের কাছে এই প্রশ্ন রেখেছেন।
যে ১০ চাকরির ভবিষ্যৎ ভালোদ্বৈত গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যের সমন্বয়হীনতা
বিসিএস নিয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সাধারণত দুই স্তরের গোয়েন্দা প্রতিবেদন যাচাই করে বলে জানা যায়। এর একটি সম্পন্ন করে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং অন্যটি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। মূলত এই দুই সংস্থার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত নিয়োগ প্রদান করা হয়। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রে এক সংস্থার রিপোর্ট ‘ক্লিয়ার’ থাকলেও অন্যটি ছিল ‘নেতিবাচক’। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪৩তম বিসিএসের এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় ১৭তম বিজেএস পরীক্ষায় পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া ১৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হওয়ার পর নিয়োগ ফিরে পেয়েছিলেন। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন বাংলাদেশে এই বর্বর প্রথা আর থাকবে না; কিন্তু আমাদের সঙ্গে একই আচরণ করা হচ্ছে।’
নিচে তিনটি বিসিএসের ভেরিফিকেশন–সংক্রান্ত ডেটা চিত্র তুলে ধরা হলো:
বিসিএস ব্যাচ পিএসসির সুপারিশ গেজেট থেকে বাদ (ভেরিফিকেশন জটিলতায়) মন্তব্য
৪৩তম বিসিএস ২,১৬৩ জন ৬৫ জন তিন দফায় প্রজ্ঞাপনের পর চূড়ান্ত বাদ।
৪৪তম বিসিএস ১,৬৭৬ জন যোগাযোগকৃত ১১ ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
৪৮তম বিসিএস ৩,২৬৩ জন ২১ জন সুপারিশপ্রাপ্ত চিকিৎসক।
বঞ্চিতদের তালিকা ও আইনি প্রেক্ষাপট—
৪৩তম বিসিএসে বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ২০তম হওয়া কাজী আরিফুর রহমানের ঘটনাটি বিস্ময়কর। ৪১তম বিসিএসে রেলওয়ে ক্যাডারে প্রথম হওয়া এই কর্মকর্তা ৪৩তম বিসিএসে প্রশাসনে যোগ দিয়ে বিপিএটিসিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। অথচ কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
৪৪তম বিসিএসের বঞ্চিত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন শামীম শাহরিয়ার (পররাষ্ট্র-প্রথম), রাব্বি লেলিন আহমেদ (প্রশাসন), মসিউর রহমান, শরিফুল আলম সুমন, শফিউল ইসলাম সজন, শান্তনু দাশ, সাদমান ফাহিম, সোহানা আরেফিন, রোহান ইসলাম, সম্রাট আকবর, খালেদ সাইফুল্লাহ ইলিয়াস এবং সোয়ান ইসলাম সজীব। অন্যদিকে ৪৮তম বিসিএসের ২১ জন চিকিৎসক হলেন ডা. উজ্জ্বল মল্লিক, ডা. মো. পাভেল ইসলাম, ডা. সিরাজাম মুনিরা, ডা. শুভ্র দেবনাথ নীলু, ডা. ইলহামুর রেজা চৌধুরী, ডা. মুশফিকুর রহমান ভূঁইয়া, ডা. আলভি ফারাজী, ডা. মো. রাইসুল করিম নিশান, ডা. মেহেদী হাসান, ডা. মো. সাব্বির আহম্মেদ তুষার, ডা. মো. সুমন আহম্মেদ, ডা. সৌরভ সরকার দীপ্র, ডা. অনিন্দ্য কুশল পাল, ডা. অনুপম ভট্টাচার্য্য, ডা. নাহিদুর রহমান, ডা. ইমতিয়াজ উদ্দিন মানিক, ডা. আহমেদ মুনতাকিম চৌধুরী, ডা. সাদি বিন শামস, ডা. নাজমুল হক, ডা. এ এইচ এম সাখারব এবং ডা. সাবিহা আফরিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে প্রার্থীর পারিবারিক বা আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মেধাভিত্তিক সমাজের পরিপন্থী। সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকের সুযোগের সমতার কথা বলা থাকলেও ভেরিফিকেশনের এই প্রক্রিয়া সেই অধিকারকে লঙ্ঘন করছে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন বলেন, ‘পারিবারিক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করা সংবিধান, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সুশাসনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কেবল মেধা ও যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
চাকরি পেতে চান? কাগজের বদলে এবার তৈরি করুন ভিডিও সিভিতবে আশার কথা শুনিয়েছেন নতুন সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের বিষয়ে আমি দ্রুত খোঁজ নেব। অন্যায়ভাবে কোনো মেধাবী যাতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগবঞ্চিত না হন, সেটি আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আর পুরো পুলিশ ভেরিফিকেশন–ব্যবস্থাটা ঢেলে সাজানো হবে, যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি আর কখনো সৃষ্টি না হয়।’
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের কাছে মেধাবীদের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই শক্তিশালী ম্যান্ডেটের সরকারই পারবে তথাকথিত ‘গোপন প্রতিবেদনের’ ঊর্ধ্বে উঠে সরকারি চাকরিতে মেধাকে মূল্যায়ন করতে।
বিসিএস নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধা: প্রান্তিক বাবার চোখের জলের মূল্য কি দেবে রাষ্ট্র