বেকেরেল কীভাবে তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করলেন
· Prothom Alo

বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় বড় আবিষ্কার হয়েছে একদম হঠাৎ করে। মানে বিজ্ঞানীরা হয়তো খুঁজছিলেন একটা জিনিস, কিন্তু ভুল করে পেয়ে গেছেন অন্য দারুণ কিছু! একে ইংরেজিতে বলে সেরেন্ডিপিটি। আজ ১ মার্চ। বিজ্ঞানের দুনিয়ায় আজকের দিনটি বিশেষ। কারণ, ১৮৯৬ সালের ঠিক এই দিনেই ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল আবিষ্কার করেছিলেন তেজস্ক্রিয়তা!
Visit forestarrow.rest for more information.
কিন্তু পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, কোনো জিনিস রাতারাতি আবিষ্কার হয় না। যেকোনো আবিষ্কারের পেছনে গবেষকদের অনেক পরিশ্রম থাকে। কিন্তু সেই পরিশ্রম হয়তো অন্য কোনো বিষয়ের জন্য, কিন্তু আবিষ্কার হয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়! ভিন্ন যে বিষয়টি আবিষ্কার হয়, তা বোঝার ক্ষমতাও তো থাকতে হবে। প্রচলিত গল্প আছে, নিউটনের মাথায় নাকি আপেল পড়েছিল বলে তিনি মহাকর্ষ আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে নিউটনের অনেক বছরের পরিশ্রম ছিল।
অনেকে ভাবেন, নিউটনের মাথায় আপেল পড়েছিল বলে তিনি মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিলেনহয়তো আপেল পড়ার বিষটি দেখে তিনি একটা সূত্র পেয়ে যান। আবার আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনেসিলিন আবিষ্কারও অনেকটা সেরকম। তিনি বহু বছর রোগ প্রতিরোধ নিয়ে গবেষণা না করলে পেনেসিলিন আবিষ্কার করতে পারতেন না। ভাবুন তো, আমার বা আপনার মাথায় আপেল পরলে কি আমরা মহাকর্ষ আবিষ্কার করতে পারতাম? হয়তো মাথায় আপেল পড়ার যন্ত্রনায় একটু মাথায় হাত বোলাতাম। তাই, হুট করে কিছু আবিষ্কার সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকে বিজ্ঞানী বা গবেষকদের বহু বছরের শ্রম ও মেধা।
তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকমই। কিন্তু বেকেরলে আসলে কী আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন? তেজস্ক্রিয়তাই বা কীভাবে আবিষ্কার করেছিলেন? কী ঘটেছিল সেদিন?
চার প্রজন্মের বেকেরেলপ্রচলিত গল্প আছে, নিউটনের মাথায় নাকি আপেল পড়েছিল বলে তিনি মহাকর্ষ আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে নিউটনের অনেক বছরের পরিশ্রম ছিল।
দুই
তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের গল্পটা শুরু করার আগে আমাদের একটু পেছনে গিয়ে এই আবিষ্কারের প্লটটা দেখতে হবে। বুঝতে হবে, বেকেরেল কীভাবে তেজস্ক্রিয়তা পর্যন্ত পৌঁছালেন। ঘটনাটা ১৮৯৬ সালের কয়েক মাস আগের। ১৮৯৫ সালের শেষের দিকে জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেলম রন্টজেন একটি অদ্ভুত রশ্মি আবিষ্কার করলেন। তিনি এর নাম দিলেন এক্স-রে বা অজানা রশ্মি। এই রশ্মি মানুষের মাংসপেশি ভেদ করে হাড়ের ছবি তুলে ফেলতে পারত!
পুরো দুনিয়ায় তখন এক্স-রে নিয়ে হইচই পড়ে গেল। বিজ্ঞানীরা পাগলের মতো এক্স-রে নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় শুধু এক্স-রে ও হাড়ের ছবি। ১৮৯৬ সালের ২০ জানুয়ারি ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্সেসের একটা সভা বসেছিল। সেখানে বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী হেনরি পয়েনকারে রন্টজেনের এক্স-রে নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেলম রন্টজেনওই সভার দর্শকসারিতে বসে ছিলেন ৪৩ বছর বয়সী এক ফরাসি বিজ্ঞানী। নাম হেনরি বেকেরেল। এক্স-রের কথা শুনে তাঁর মাথায় একটা দারুণ বুদ্ধি এল।
বেকেরেলের একটা পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল। তাঁর বাবা এবং দাদাও ছিলেন বিজ্ঞানী। তাঁরা কাজ করতেন এমন কিছু পদার্থ নিয়ে, যেগুলো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ফ্লুরোসেন্স বা ফসফোরোসেন্স। সোজা কথায়, এগুলো হলো দ্যুতিময় পদার্থ। বেকেরেল ভাবলেন, এই দ্যুতিময় পদার্থগুলো কি সূর্যের আলো শুষে নিয়ে এক্স-রের মতো কোনো অদৃশ্য রশ্মি ছাড়ে? যদি ছাড়ে, তাহলে তো দারুণ ব্যাপার হবে!
কীভাবে পাই এক্স-রে১৮৯৫ সালের শেষের দিকে জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেলম রন্টজেন একটি অদ্ভুত রশ্মি আবিষ্কার করলেন। তিনি এর নাম দিলেন এক্স-রে বা অজানা রশ্মি। এই রশ্মি মানুষের হাড়ের ছবি তুলে ফেলতে পারত!
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেন। বেছে নিলেন ইউরেনিয়ামের লবণ। এর রাসায়নিক নাম পটাশিয়াম ইউরেনাইল সালফেট। এই পদার্থের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। সূর্যের আলোতে রাখলে এটি বেশ জ্বলজ্বল করে।
বেকেরেল দারুণ একটা পরীক্ষার ছক কষলেন। তিনি একটা ফটোগ্রাফিক প্লেট নিলেন। প্লেটটিকে মুড়িয়ে দিলেন দুটি মোটা কালো কাগজে। এমনভাবে মোড়ালেন যাতে কোনো সাধারণ আলো এর ভেতরে ঢুকতে না পারে। এরপর সেই কালো কাগজের ওপর একটা তামার ক্রস বা যোগচিহ্নের মতো পাত বসালেন। তার ওপরে রাখলেন ওই ইউরেনিয়ামের টুকরোটি। সবশেষে পুরো জিনিসটা নিয়ে রেখে দিলেন কড়া রোদে।
বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেলকয়েক ঘণ্টা পর তিনি ফটোগ্রাফিক প্লেটটা ধুয়ে ফেললেন। যা দেখলেন তাতে তাঁর চোখ ছানাবড়া! প্লেটের ওপর তামার ক্রসটির একটা স্পষ্ট ছাপ পড়েছে। চারপাশটা কালো হয়ে গেছে। বেকেরেল ভাবলেন, তাঁর ধারণাই ঠিক! সূর্যের আলো ইউরেনিয়ামের ওপর পড়ছে। ইউরেনিয়াম সেই আলো শুষে নিয়ে এক্স-রের মতো একটা অদৃশ্য রশ্মি তৈরি করছে। সেই রশ্মি কালো কাগজ ভেদ করে ফটোগ্রাফিক প্লেটকে কালো করে দিচ্ছে। আর যেখানে তামার ক্রস চিহ্ন ছিল, সেখানে রশ্মি ভেদ করতে পারেনি। তাই ক্রসের ছাপ পড়েছে।
তিনি তো মহাখুশি। ভাবলেন এই নতুন রশ্মি তৈরির পেছনে আসল কারসাজি সূর্যের আলোর। আলো ছাড়া এই পাথর কোনো কাজই করতে পারবে না।
ইউরেনিয়াম শব্দটি যেভাবে পেলামবেকেরেল ভাবলেন, তাঁর ধারণাই ঠিক! সূর্যের আলো ইউরেনিয়ামের ওপর পড়ছে। ইউরেনিয়াম সেই আলো শুষে নিয়ে এক্স-রের মতো একটা অদৃশ্য রশ্মি তৈরি করছে।
তিন
বিজ্ঞানে কোনো পরীক্ষা একবার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বেকেরেল চাইলেন পরীক্ষাটা আরও কয়েকবার করতে। তখন ছিল ফেব্রুয়ারির শেষ দিক। ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সব যন্ত্রপাতি নিয়ে তৈরি হলেন। কিন্তু প্রকৃতি বাঁধ সাধল।
প্যারিসের আকাশ তখন ঘন মেঘে ঢাকা। সূর্যের কোনো দেখাই নেই। বেকেরেল অপেক্ষা করলেন। কিন্তু রোদ আর উঠল না। বিরক্ত হয়ে বেকেরেল তাঁর সেই কালো কাগজে মোড়া ফটোগ্রাফিক প্লেট এবং ইউরেনিয়ামের টুকরোগুলো একটা অন্ধকার ড্রয়ারে রেখে দিলেন। ভাবলেন, রোদ উঠলে আবার পরীক্ষা করবেন। এই ড্রয়ারের ভেতরটা ছিল একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার, সাধারণত যেমন থাকে। তারপর হয়তো বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলেন সেই ড্রয়ারের কথা।
১৮৯৬ সালে ফটোগ্রাফিক প্লেটে ইউরেনিয়ামের প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত বিকিরণের ছাপএরপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন। ১ মার্চ, ১৮৯৬ সাল। বেকেরেল ড্রয়ার খুললেন। তখনো আকাশে ভালো রোদ ওঠেনি। হঠাৎ তাঁর মনে একটা অদ্ভুত খেয়াল চাপল। ড্রয়ারে রাখা ফটোগ্রাফিক প্লেটটা একটু ধুয়ে দেখলে কেমন হয়?
তিনি জানতেন, প্লেটে হয়তো খুব আবছা একটা ছাপ থাকতে পারে। কারণ ইউরেনিয়াম তো সূর্যের আলো পায়নি। ড্রয়ারের ঘুটঘুটে অন্ধকারে সে তো আর রশ্মি ছড়াতে পারবে না। তবুও মনের খুঁতখুঁতানি দূর করতে তিনি প্লেটটা ধুতে নিয়ে গেলেন।
ইউরেনিয়াম থেকে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়প্যারিসের আকাশ তখন ঘন মেঘে ঢাকা। সূর্যের কোনো দেখাই নেই। বিরক্ত হয়ে বেকেরেল তাঁর কালো কাগজে মোড়া ফটোগ্রাফিক প্লেট এবং ইউরেনিয়ামের টুকরোগুলো একটা অন্ধকার ড্রয়ারে রেখে দিলেন।
কিন্তু প্লেটটা ধোয়ার পর তিনি আক্ষরিক অর্থেই চমকে উঠলেন। আবছা ছাপ তো দূরের কথা, প্লেটের ওপর ইউরেনিয়ামের একদম গাঢ় ও স্পষ্ট কালো ছাপ! প্রথম দিনের কড়া রোদে রাখা প্লেটের চেয়েও এই ছাপটা অনেক বেশি স্পষ্ট!
বেকেরেল কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। এ কীভাবে সম্ভব? ড্রয়ারের ভেতর তো এক ফোঁটা সূর্যের আলোও ঢোকেনি। তাহলে এই শক্তিশালী রশ্মি এল কোথা থেকে? তার মানে কি ইউরেনিয়ামকে রশ্মি ছড়ানোর জন্য সূর্যের আলোর ওপর নির্ভর করতে হয় না?
বেকেরেল বুঝতে পারলেন, এই অদৃশ্য এবং শক্তিশালী রশ্মি ইউরেনিয়ামের ভেতর থেকেই নিজে বেরিয়ে আসছে। এর জন্য বাইরের কোনো শক্তি বা রোদের দরকার নেই। ইউরেনিয়াম নামের এই পাথরটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল শক্তির ভান্ডার।
ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুৎমেরি কুরি এবং তাঁর স্বামী পিয়ের কুরি দেখলেন, শুধু ইউরেনিয়াম নয়, থোরিয়াম, রেডিয়াম এবং পোলোনিয়ামের মতো আরও অনেক পদার্থের ভেতরেই এমন শক্তি লুকিয়ে আছে।
চার
বেকেরেল তাঁর এই নতুন রশ্মির নাম দিয়েছিলেন ‘ইউরেনিক রে’। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটি এক্স-রের চেয়েও ভিন্ন এবং অদ্ভুত কিছু।
তাঁর এই আবিষ্কারের কথা শুনে আরেক তরুণ বিজ্ঞানী গবেষণায় নেমে পড়েন। তাঁর নাম মেরি কুরি। মেরি কুরি এবং তাঁর স্বামী পিয়ের কুরি মিলে এই নিয়ে আরও অনেক গবেষণা করেন। তাঁরা দেখলেন, শুধু ইউরেনিয়াম নয়, থোরিয়াম, রেডিয়াম এবং পোলোনিয়ামের মতো আরও অনেক পদার্থের ভেতরেই এমন শক্তি লুকিয়ে আছে। মেরি কুরিই প্রথম এই নিজে থেকে রশ্মি ছড়ানোর ঘটনার নাম দেন রেডিওঅ্যাকটিভিটি। সেটাইকে আজ আমরা বাংলায় বলছি তেজস্ক্রিয়তা।
হেনরি বেকেরেল (বামে), পিয়ের কুরি (মাঝখানে) এবং তাঁর স্ত্রী মেরি কুরি (ডানে)এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯০৩ সালে হেনরি বেকেরেল এবং কুরি দম্পতি একসঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। এরপরের ইতিহাস তো সবার জানা। এই তেজস্ক্রিয়তা থেকেই মানুষ পরমাণুর ভেতরের গঠন জানতে পেরেছে। ক্যানসারের চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে তেজস্ক্রিয়তা। আবার এই শক্তি কাজে লাগিয়েই তৈরি হয়েছে পারমাণবিক বোমা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
ভাবুন তো, সেদিনের প্যারিসের আকাশ যদি মেঘলা না থাকত? বেকেরেল যদি বিরক্ত হয়ে ড্রয়ারে প্লেটটা না রাখতেন? কৌতুহলী হয়ে যদি ধুয়ে না ফেলতেন প্লেটটা? তাহলে হয়তো এই বিশাল আবিষ্কারটা আরও অনেক দিন পিছিয়ে যেত!
সূত্র: এপিএস ডটঅর্গ, নোবেল প্রাইজ ডটঅর্গ ও হিস্ট্রি ডটকমমেরি কুরি: আজন্ম যাঁর বিজ্ঞান সাধনা