নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে: জহরত আদিব চৌধুরী
· Prothom Alo

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কে না গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন দেশ হিসেবে আমাদের যারা স্বীকৃতি দিচ্ছিল, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু সেই সুযোগ আমরা নষ্ট করেছি। এ ছাড়া সঠিক পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন না করার কারণে বিদেশি অনেক সাহায্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে সেই প্রভাব এড়াতে না পেরে দুর্ভিক্ষসহ বিভিন্ন সমস্যা আমাদের ঘিরে ধরেছিল।’
বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর চতুর্থ পর্বের আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী এ কথা বলেন। ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ সেমিনার সঞ্চালনা করেন লেখক ও গবেষক তুহিন খান। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
Visit mwafrika.life for more information.
জহরত আদিব আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকের দ্বিতীয় ভাগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে যেখানে আমাদের স্বার্থ আছে, সেখানেই সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তিকে জনশক্তি হিসেবে বিদেশে রপ্তানির দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে শেখ মুজিব সরকার দেশের গণতন্ত্র নষ্ট করে বাকশাল কায়েম করেছিল, যা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছিল।’
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারত তাদের কৌশলগত স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকার এমনভাবে প্রচার করত, যেন ভারত স্বয়ং স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হতো।’ তিনি আরও বলেন, ভারত সব সময়ই তাদের স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে নতজানু হিসেবে দেখতে চেয়েছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান ক্যাম্পেইন করত যে বাংলাদেশ জন্মের মাধ্যমে মূলত একটি মুসলিম দেশকে দুই ভাগ করা হয়েছে। ফলত বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি দাঁড় করানো চ্যালেঞ্জিং ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান নতজানু পররাষ্ট্রনীতির দিকে গিয়ে সেই পথ আরও দীর্ঘ করেছেন।
সভাপ্রধানের বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে পররাষ্ট্রনীতির অবস্থা বুঝতে হলে মোটাদাগে শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথাই সামনে আসে। শেখ মুজিবের শাসনামল নিয়ে আমাদের প্রবীণ নাগরিকেরা বলতেন “পাকিস্তানকে কি বিদায় করেছি ভারতীয় গোলামি করার জন্য?” অর্থাৎ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘ লড়াই ছিল, সেটির পর যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন শেখ মুজিবুর রহমানের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে তারুণ্য পার করা নাগরিকদের মনে হলো, দেশ এখন পাকিস্তানের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে ভারতের হাতে চলে এসেছে। তারা এটা মেনে নিতে পারেনি।’
এহ্সান মাহমুদ আরও বলেন, ‘জিয়াউর রহমান “হিজবুল বাহার” নামের একটি জাহাজে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝেমধ্যেই সমুদ্রসীমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি সে দেশের তরুণদের নিয়ে দেখাতেন সমুদ্রসীমা, নিজে দেখাতেন, এটা আমাদের সার্বভৌমত্বের অংশ, যেন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার কারিগরেরা নিজে শিক্ষাটা পায়। তিনি বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের নাগরিকেরা যেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজ দেশকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন, সেই শিক্ষাও দিয়ে গিয়েছিলেন।’