শীতলক্ষ্যা থেকে গভীর রাতে ডাঙায় উঠে আসত যে রহস্যময় মাছ
· Prothom Alo
গভীর রাতে নদী ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসে এক অদ্ভুত মাছ। কখনো দেখা মেলে ক্ষীরাখেতে, কখনো নদীর পাড়ে। দেখতে অনেকটা সাপের মতো। একসময় শীতলক্ষ্যা নদীতে এমন মাছের দেখা মিলত। স্থানীয় মানুষের কাছে বাহোক, বাসুকি কিংবা ক্ষীরাবাইম নামে পরিচিত এই মাছকে ঘিরে আছে কত গল্প, কত লোকবিশ্বাস! রহস্যময় এই মাছ নিয়ে লিখেছেন বন্য প্রাণী সংরক্ষক, লেখক ও শিকারকাহিনি রচয়িতা সরওয়ার পাঠান
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
মধ্যরাতে ক্ষীরাখেতে অদ্ভুত অতিথি
ক্ষীরাখেতেও দেখা মিলত মাছটি; এ কারণে দেশের কোনো কোনো এলাকায় মাছটি ‘ক্ষীরাবাইম’ নামে পরিচিতমধ্যরাত। তারাভরা আকাশের নিচে নিজের ক্ষীরাখেতের এক কোণে সতর্ক শিকারির মতো ওত পেতে বসে আছেন মধ্যবয়সী কৃষক বুরুজ মিয়া। সে বছর চরসিন্দুরের চরে ক্ষীরার বেশ ভালো ফলন হয়েছে। বাজারে দামও ভালো। কিন্তু খেতটা দিনরাত পাহারায় রাখতে হয়। মানুষের পাশাপাশি কিছু প্রাণীও খেতের ফসল নষ্ট করে। বুরুজ মিয়া বসে আছেন তেমনই এক আগন্তুকের অপেক্ষায়।
রাত দেড়টার দিকে খেতের ভেতর থেকে এক বিশেষ শব্দ ভেসে এল। এই আওয়াজের অপেক্ষাতেই ছিলেন বুরুজ মিয়া। তিনি খেত থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে সোজা হাঁটা ধরলেন শীতলক্ষ্যা নদীর দিকে। এক হাতে শুকনা ছাইভর্তি পাটের ব্যাগ, অন্য হাতে বাঁশের লাঠি।
খেত বরাবর নদীর ধারে পৌঁছে টর্চের আলোয় কিছু একটা খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে সেই বিশেষ চিহ্ন পেয়েও গেলেন। প্রাণীটা এই পথ দিয়েই বুকে ভর দিয়ে খেতের দিকে গেছে। তিনি কিছুটা এগিয়ে সেই নির্দিষ্ট পথের ওপর শুকনা ছাই ছিটিয়ে দিলেন।
এরপর দ্রুত ফিরে এলেন খেতে। ভেতরে ঢুকে শব্দ করে প্রাণীটাকে ধাওয়া দিতে লাগলেন। সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে প্রাণীটা এঁকেবেঁকে ছুটল নদীর দিকে। কিন্তু ছাই বিছানো জায়গায় এসে থমকে গেল। তারপর গড়াগড়ি খেতে লাগল।
এই সুযোগে লাঠি হাতে এগিয়ে এলেন বুরুজ মিয়া। তাঁর আঘাতে নিথর হয়ে গেল প্রাণীটা। প্রায় চার ফুট লম্বা, সাত কিলোগ্রাম ওজনের অদ্ভুত সেই প্রাণীকে শিকার করে বুরুজ মিয়ার আনন্দের সীমা নেই। স্থানীয় মানুষের কাছে এর মাংসের স্বাদ নাকি অনেকটা খাসির মাংসের মতো।
সুন্দরবনের ২১০ জাতের মাছ আছে এই জাদুঘরে, দেখুন তো কয়টি চেনেনসাপের মতো দেখতে, আসলে মাছ
২০০১ সালে শীতলক্ষ্যায় ধরা বাহোক মাছএকসময় নরসিংদীর চরসিন্দুর চরের কৃষকেরা এভাবেই ছাই ব্যবহার করে যে প্রাণী শিকার করতেন, সেটি আসলে এক জাতের মাছ। রূপকথার মতোই বিচিত্র তার জীবন।
নদীর খাড়া পাড়ের গভীর গর্তে থাকতে পছন্দ করে এরা। অথচ স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতায়, রাত গভীর হলে কখনো কখনো জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসে। ক্ষীরাখেতেও দেখা মিলত। এ কারণেই দেশের কোনো কোনো এলাকায় মাছটি ‘ক্ষীরাবাইম’ নামে পরিচিত।
স্থানীয় মানুষের মুখে শোনা যায়, ক্ষীরা, শসা, শর্ষে এমনকি ধানের সন্ধানেও নাকি নদীর পাড় থেকে অনেক দূরে চলে যেত এরা। কখনো নদীতীরবর্তী বাড়ির গোলাঘরের ধানের গোলা ফুটো করার গল্পও শোনা গেছে। তবে এসবই স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও লোককথা; মাছটির স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য ভিন্ন।
আমার বাড়ির পাশের শীতলক্ষ্যা নদীতে একসময় এদের বিচরণ ছিল। প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল এক রাতে, ছিপ ফেলে বোয়াল মাছ ধরার সময়। আমার পাশ দিয়েই নদী থেকে উঠে চরের দিকে যাচ্ছিল একটি বাহোক।
দ্বিতীয় সাক্ষাৎ চাঁদনি রাতে, ক্ষীরাখেতের মধ্যে। অদ্ভুত প্রাণী ভেবে সেবার গুলি করে মেরেছিলাম। দেখতে ছিল হুবহু নাদুসনুদুস এক সাপের মতো। জলপাই রঙের শরীরটা প্রায় চার ফুট লম্বা।
বাহোক নামের পেছনে কি বাসুকি নাগ
বড় মাছটির নাম বাহোক, এই মাছের আরও কিছু আঞ্চলিক নাম আছে; যেমন তেলকোমা, বাওবাইম, বামোশ ইত্যাদিছোটবেলা থেকেই মাছটিকে বাহোক নামে চিনে এসেছি। অনেকে ডাকতেন বাসুকি মাছ বলে। গ্রামের মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, এই মাছ নাকি একসময় সাপ ছিল।
বাহোক, বাসুকি কিংবা বাসুক—এসব নামের সঙ্গে প্রাচীন বেহুলা-লখিন্দরের লোকপুরাণের বাসুকি নাগের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা গবেষণার বিষয়। তবে মাছটি ঘিরে লোকবিশ্বাসের যে জগৎ গড়ে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে কৌতূহলোদ্দীপক।
এই মাছের আরও কিছু আঞ্চলিক নাম আছে। যেমন তেলকোমা, বাওবাইম, বামোশ ইত্যাদি। ইংরেজিতে এটি Indian mottled eel বা Indian longfin eel নামে পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম Anguilla bengalensis।
মাছটি আকারে বেশ বড় হতে পারে। একসময় শীতলক্ষ্যায় বড় বড় বাহোক ধরা পড়ত।
১৯৮৮ সালে চরসিন্দুরের বান্ধব কটন মিলের কেয়ারটেকার রহমান মিয়া চিতল মাছ ধরার কোপা বড়শিতে একটি বাহোক পেয়েছিলেন। মাছটির ওজন ছিল প্রায় ৯ কেজি, দৈর্ঘ্য ৫ ফুট।
তখন রাত জেগে যাঁরা বড়শিতে কেঁচো গেঁথে বোয়াল মাছ ধরতেন, তাঁদের বড়শিতেও প্রায়ই আটকা পড়ত বাহোক।
পানির নিচে দুর্দান্ত শিকারি
একসময় দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও পাহাড়ি জলধারায় বাহোক মাছের দেখা মিলত। শীতলক্ষ্যায়ও ছিল এর বিচরণবাহোক বেশ শক্তিশালী ও দুর্দান্ত শিকারি মাছ। শুধু ডাঙায় বিচরণের গল্প নয়, পানির নিচেও এর জীবন কম বিচিত্র নয়।
বাবার কাছে শুনেছি, বাহোক এতটাই বেপরোয়া শিকারি ছিল যে নদীতে পেতে রাখা চাইয়ের ভেতর ঢুকে মাছ খেয়ে চাই ভেঙে পালিয়ে যেত।
বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, বাহোক মূলত নিশাচর মাংসাশী মাছ। ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এদের খাদ্য। তাই ক্ষীরা-শসা খাওয়ার প্রচলিত গল্পের পাশাপাশি এর প্রকৃত খাদ্যাভ্যাসের কথাও মনে রাখা দরকার।
কৈশোরে বাজার থেকে কিনে আনা কাচকি মাছের সঙ্গে সাদা রঙের সাপের বাচ্চার মতো কিছু প্রাণী দেখে খুব অবাক হতাম। এগুলো কেউ খেত না। মা আমার জন্য আলাদা করে রাখতেন। আমি সেগুলো ছোট ছোট করে কেটে বড়শিতে গেঁথে শোল মাছ ধরতাম। তখন মনে করতাম, এগুলো বাহোক মাছের বাচ্চা।
পরে খ্যাতিমান লেখক হরিপদ দত্ত আমাকে বলেছিলেন, ‘বাহোকের ছানাদের প্রধান খাদ্য হচ্ছে কাচকি মাছ। তাই ওরা কাচকির ঝাঁকের সঙ্গে মিশে থাকত। বৈশাখ মাসে কাচকির সঙ্গে বেলজালে উঠে আসত তারা।’
হরিপদ দত্ত নিজেও শীতলক্ষ্যাপারের মানুষ। বাহোক কিংবা বাসুকি মাছ নিয়ে তাঁরও অনেক স্মৃতি আছে।
যাচাই করুন আপনার দৃষ্টিশক্তি: ছবিটিতে কত দ্রুত ব্যাঙ খুঁজে বের করতে পারবেন?জন্ম সমুদ্রে, বেড়ে ওঠা নদীতে
এই মাছের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক এর জন্ম ও বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া। বাহোকের জন্ম সমুদ্রে। ডিম ফুটে বের হওয়া স্বচ্ছ, পাতার মতো লার্ভা সমুদ্রের স্রোতে ভেসে উপকূলের দিকে আসে। ধীরে ধীরে এরা ‘গ্লাস ইল’ বা স্বচ্ছ ছোট ইলের আকৃতি ধারণ করে নদীতে প্রবেশ করে।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রংও বদলায়। প্রথম জীবনের স্বচ্ছ দেহ ক্রমে ধূসর, বাদামি কিংবা জলপাই রং ধারণ করে। পূর্ণবয়স্ক মাছের গায়ে দেখা যায় গাঢ় ছোপ।
মিঠাপানিতে বেশ কয়েক বছর কাটানোর পর প্রজননের জন্য আবার সমুদ্রে ফিরে যায় বাহোক।
এদিক থেকে এর জীবনচক্র অনেকটা ইলিশের বিপরীত। ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীতে আসে ডিম পাড়তে। আর বাহোক নদী থেকে সমুদ্রে যায় প্রজননের জন্য।
শীতলক্ষ্যা থেকে কোথায় হারাল বাহোক
২০০৪ সালে শীতলক্ষ্যাএকসময় দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও পাহাড়ি জলধারায় এই মাছের দেখা মিলত। শীতলক্ষ্যায়ও ছিল এর বিচরণ। কিন্তু নদীর দূষণ, আবাসস্থলের অবক্ষয় ও অতিরিক্ত আহরণ এই মাছের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। আমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে গত ২০ বছরে শীতলক্ষ্যার কোথাও বাহোকের খোঁজ মেলেনি।
তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটবাজার, এমনকি রাজধানী ঢাকার মাছের আড়তেও মাঝেমধ্যে বাহোকের দেখা পাওয়া যায়। মাছটি সম্পর্কে মানুষের জানাশোনা কম। তাই একে ঘিরে নানা গল্প, ধারণা ও মন্তব্য শোনা যায়।
বাহোকের জীবন যেমন বিচিত্র, তেমনি রহস্যময়। এর বিচরণ, খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন ও আবাসস্থল নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। আমাদের নদী থেকে হারিয়ে যাওয়া এই অদ্ভুত মাছের গল্পগুলো যেন একদিন শুধু লোককথা হয়ে না থাকে।
নরসিংদীর জনবহুল এলাকায় বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীটি এল কীভাবে