উইকেটে ঘাস থাকুক বা না থাকুক, বোলারদের আতঙ্কের নাম এখন অভিষেক
· Prothom Alo

একসময় তাঁকে নিয়ে সমালোচকদের একটা বাঁধা কথা ছিল। ব্যাটিংয়ের জন্য আদর্শ উইকেট পেলেই নাকি তাঁর ব্যাট কথা বলে। বোলারদের শাসন করেন। উইকেটে একটু ঘাস থাকলে কিংবা বল নড়াচড়া করলেই সেই দাপট উধাও! ক্রিকেটের ভাষায় যাকে বলে ‘ফ্ল্যাট ট্র্যাক বুলি’।
অভিষেক শর্মা এখন সেই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার মিশনে নেমেছেন। ব্যাট দিয়ে। এমন ব্যাটিং করছেন যে বোলারদের কাছে তাঁর বাঁ হাতটা রীতিমতো আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে।
Visit sportbet.reviews for more information.
মঙ্গলবার ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৮ বলে ১১৩ রানের ইনিংসটি যেমন। ৯টি চার, ১১টি ছক্কা। অর্থাৎ ২০টি বাউন্ডারি থেকেই ১০২ রান! এই বিধ্বংসী সেঞ্চুরিতে টি-টুয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ স্থানও ফিরে পেয়েছেন ভারতের ২৬ বছর বয়সী বাঁহাতি।
ভারতীয় ক্রিকেটে এখন নতুন তারকার আগমনী সংগীত। রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলিদের ক্যারিয়ার যখন গোধূলিবেলায়, তখন নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন অভিষেক।
প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা তো তাঁকে ভারতের নতুন ক্রিকেট আইডলই মনে করছেন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘ভারতীয় ক্রিকেটে সে ইতিমধ্যেই পরবর্তী বড় তারকা হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয়, শুধু বিস্ফোরক ব্যাটিং নয়, ধারাবাহিকতা দিয়েও সে সবার নজর কেড়েছে। সে নতুন প্রজন্মের সুপারস্টার।’
অভিষেকের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কী? শুধু বল গ্যালারিতে পাঠানোর ক্ষমতা নয়। তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৯৬। কিন্তু এই ভয়ংকর আগ্রাসনের আড়ালে রয়েছে নিখুঁত টেকনিক। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, সমসাময়িকদের থেকে এখানেই আলাদা অভিষেক।
অভিষেকের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের দেখা মেলে সব কন্ডিশনেইপাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক সালমান বাট যেমন মনে করেন, অভিষেকের ব্যাটিংয়ে বেপরোয়া মারকাটারি ব্যাপারটা নেই। আছে হিসাবি ঝুঁকি নেওয়ার দক্ষতা। বাটের ব্যাখ্যা, ‘এটা হিসাব করে ঝুঁকি নেওয়ার ক্রিকেট। যেখানে ঝুঁকির পরিমাণ কম। কারণ, বল দেখে এবং বোলারের বল করার কোণ বুঝে সে ঝুঁকি নেয়। এটা চোখ বন্ধ করে মারা নয়, স্লগিংও নয়। পুরোপুরি ভেবেচিন্তে করা ব্যাটিং।’
নিউজিল্যান্ডের ড্যারিল মিচেলও অভিষেকের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ। ওয়েলিংটনের সেঞ্চুরির পর বলেছেন, ‘ওর কয়েকটি শট ছিল বিশ্বমানের। এ কারণেই নিজের কাজে সে বিশ্বের অন্যতম সেরা। এমন ব্যাটিং দেখে টুপি খুলে সম্মান জানিয়ে বলতে হয়, দারুণ খেলেছ।’
অথচ এই অভিষেককেই একসময় নির্দিষ্ট ধরনের উইকেটের ব্যাটসম্যান বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন কন্ডিশনে রান করে সেই ধারণা অনেকটাই বদলে দিয়েছেন তিনি। ভারতের সাবেক ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ কাইফ তাই বিরক্ত সমালোচকদের ওপর, ‘ও শুধু নির্দিষ্ট ধরনের উইকেটেই ব্যাট করতে পারে, এসব বলা বন্ধ করুন।’
অভিষেক শর্মাই এখন ছক্কার নতুন রাজাকাইফের চোখে অভিষেক ইতিমধ্যেই টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে সেরাদের একজন হয়ে ওঠার পথে। তাঁকে ওয়ানডে ক্রিকেটেও সুযোগ দেওয়ার দাবি তুলেছেন ভারতের সাবেক এই ব্যাটসম্যান।
অভিষেকের এই উত্থানের গল্পে আরেকজনের নাম না বললেই নয়। যুবরাজ সিং। পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া অভিষেকের ক্রিকেটীয় জীবনে ভারতের সাবেক এই অলরাউন্ডারের ভূমিকা অনেকটা গুরুর। করোনাকালে ভারতে যখন লকডাউন চলছিল, তখন যুবরাজের তত্ত্বাবধানেই নিজের ব্যাটিংকে শাণ দিয়েছেন অভিষেক। দুজনই বাঁহাতি। দুজনই আক্রমণাত্মক। যুবরাজের ব্যাটিংয়ে যেমন বলকে সীমানার বাইরে পাঠানোর একটা অনায়াস সৌন্দর্য ছিল, অভিষেকের ব্যাটিংয়েও সেই ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।
টি–টুয়েন্টির ছক্কার রাজা এখন অভিষেক শর্মাশিষ্যের ওয়েলিংটন-কীর্তি দেখে তাই অভিনন্দন জানাতে দেরি করেননি গুরু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুবরাজ লিখেছেন, ‘আমি ৩০ বা ৩৪ বলে সেঞ্চুরি করতে পারি না। দারুণ খেলেছেন, স্যার।’ গুরুর কাছ থেকে এমন প্রশংসা পাওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়!
অভিষেকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানও এখন বেশ সমৃদ্ধ। ৭১ টি-টুয়েন্টিতে ৪টি সেঞ্চুরিসহ ২২৬৭ রান। গড় ৩৩.৩৩। তবে এখনো ওয়ানডে কিংবা টেস্টে অভিষেক হয়নি তাঁর। অবশ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইটা সহজ ছিল না। এখনো নয়। ভারতের টপ অর্ডারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রবল। উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান সঞ্জু স্যামসন আছেন। আছেন বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশীও।
শারদা উগ্রার কথায় সেই প্রতিযোগিতার ছবিটা স্পষ্ট, ‘সবাই ভেবেছিল, বৈভবই পরবর্তী সুপারস্টার হতে যাচ্ছে। কিন্তু অভিষেক এসে সেই জায়গাটা ছিনিয়ে নিয়েছে। সে এমন একটা ব্যাটিংয়ের ধরন তৈরি করেছে, যার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া বিশ্বজুড়েই খুব কঠিন। এমন মানের এবং এত ধারাবাহিক একজন খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।’
মাঠের বাইরেও অভিষেকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তারুণ্যদীপ্ত চেহারা, সহজাত আকর্ষণ আর মাঠের পারফরম্যান্স তাঁকে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছেও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
অভিষেকের ক্রিকেটীয় যাত্রাটাও কম চমকপ্রদ নয়। ২০১৮ সালে রাহুল দ্রাবিড়ের অধীনে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন। এরপর আইপিএলে প্রথমে দিল্লি ক্যাপিটালস, সেখান থেকে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। হায়দরাবাদেই যেন নিজের আসল পরিচয় খুঁজে পান অভিষেক। অস্ট্রেলিয়ার ট্রাভিস হেডের সঙ্গে তাঁর উদ্বোধনী জুটি হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ বোলারদের দুঃস্বপ্ন। দুজন মিলে পাওয়ারপ্লেতে এমন ঝড় তোলেন, অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্যই নির্ধারিত হয়ে যায় প্রথম ছয় ওভারে।
মাঠের বাইরেও অভিষেকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তারুণ্যদীপ্ত চেহারা, সহজাত আকর্ষণ আর মাঠের পারফরম্যান্স তাঁকে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছেও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একের পর এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে। ভারতের নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে অন্যতম বিপণনযোগ্য মুখ হয়ে উঠছেন তিনি। তবে মাঠের বাইরের চাকচিক্য নয়, অভিষেকের আসল পরিচয় এখনো তাঁর ব্যাট।
ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন নায়কের অভাব কখনো ছিল না। সুনীল গাভাস্কার থেকে শচীন টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি থেকে রোহিত শর্মা। এক প্রজন্মের নায়ক বিদায় নেওয়ার আগেই আরেক প্রজন্মের কেউ এসে দরজায় কড়া নাড়েন। অভিষেক অবশ্য দরজায় কড়া নাড়ার অপেক্ষা করেননি।
ব্যাট হাতে দরজাটাই ভেঙে ঢুকে পড়েছেন!
টি–টুয়েন্টিতে ইনিংসের প্রথম বলে ছক্কা