কুকি চুরি করে যেভাবে পাসওয়ার্ড ছাড়াই অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রতারকেরা
· Prothom Alo

সকালে ব্যাংক হিসাবের ব্যালান্স দেখা, বিল পরিশোধ কিংবা অনলাইনে কেনাকাটার মতো কাজে একের পর এক ওয়েবসাইটে লগইন করলেন। কাজ শেষে ল্যাপটপ বন্ধ করে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু আপনার অজান্তেই হয়তো ব্যাংক হিসাবে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে গেছে প্রতারকেরা। আপনার লগইন সেশনের তথ্য চুরি করে তারা পাসওয়ার্ড ছাড়াই অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়তে পারে। সাইবার নিরাপত্তার পরিভাষায় এ ধরনের আক্রমণকে বলা হয় ‘সেশন হাইজ্যাকিং’। আর এ কাজে ব্যবহৃত একটি কৌশল হলো কুকি চুরি।
Visit rouesnews.click for more information.
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নর্ডভিপিএনের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মারিজুস ব্রেইডিসের মতে, হ্যাকারদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে কুকি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের শনাক্ত করা তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত এক বছরে অনলাইনে ছড়িয়ে থাকা চুরি করা তথ্যের মধ্যে ৫ হাজার ২০০ কোটি কুকি পাওয়া গেছে।
কুকি হলো ছোট আকারের তথ্য, যা কোনো ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীর যন্ত্রে সংরক্ষণ করে। কোনো ওয়েবসাইটে লগইন করলে ব্যবহারকারীর সেশন সচল রাখার জন্য একটি কুকি তৈরি হতে পারে। এর ফলে প্রতিবার নতুন পৃষ্ঠায় যাওয়ার সময় আবার পাসওয়ার্ড দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করতে হয় না। এই কুকিকে বলা হয় ‘সেশন কুকি’। একে ডিজিটাল চাবির সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা ব্যবহারকারীকে বারবার লগইন না করেই ওয়েবসাইট ব্যবহারের সুযোগ দেয়। সাধারণত লগআউট করলে সেশন শেষ হয়ে যায়। তবে ওয়েবসাইটে লগইন অবস্থায় থাকার সুবিধা চালু রাখলে কিংবা ব্যবহার শেষে যথাযথভাবে লগআউট না করলে সেশন দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারে। এ সময় প্রতারকেরা সেশন কুকি চুরি করতে পারলে নতুন করে পাসওয়ার্ড না দিয়েই সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারে।
মারিজুস ব্রেইডিস বলেন, ‘সেশন কুকিকে এমন একটি ডিজিটাল চাবি হিসেবে ভাবুন, যা ইতিমধ্যে তালায় লাগানো রয়েছে। আপনি কোনো ওয়েবসাইটে লগইন করে থাকলে এই কুকিই আপনার জন্য দরজা খোলা রাখে। হ্যাকাররা সক্রিয় কুকিটি চুরি করতে পারলে কার্যত তারা আপনার পরিচয় ধারণ করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে তাদের আপনার পাসওয়ার্ডের প্রয়োজন হয় না। নতুন করে লগইন করতে হয় না বলে অনেক সময় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সতর্কবার্তাও আসে না। এমনকি তারা অনেক ক্ষেত্রে একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থাও এড়িয়ে যেতে পারে।’
যেভাবে চুরি হয় কুকি
সাধারণত ব্যবহারকারীর যন্ত্র থেকে কুকি চুরি করা হয়। অসাবধানতাবশত ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার ডাউনলোড করলে এ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যন্ত্রে প্রবেশের পর ম্যালওয়্যার ব্রাউজারে সংরক্ষিত সক্রিয় সেশন কুকিগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো সংগ্রহ করে হ্যাকারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এরপর হ্যাকার ওই কুকি ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর সক্রিয় সেশনে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে মারিজুস ব্রেইডিস বলেন, এই প্রক্রিয়া ব্যবহারকারীর অজান্তে তাঁর ডিজিটাল পকেট থেকে চাবি চুরি করে নেওয়ার মতোই।
কীভাবে বুঝবেন কুকি চুরির শিকার হয়েছেন
কুকি চুরি হলে শুরুতে ওয়েবসাইট ব্যবহারে অস্বাভাবিক কিছু চোখে না–ও পড়তে পারে। আপনি স্বাভাবিকভাবেই লগইন করবেন, পাসওয়ার্ড দেবেন এবং প্রয়োজনে একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাই করবেন। কিন্তু এরই মধ্যে চুরি হওয়া সেশন কুকি ব্যবহার করে অন্য কেউ আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারে। ফলে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে দেরি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ই–মেইল অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ প্রতারকদের হাতে গেলে তারা আপনার পরিচয়ে অন্যদের কাছে বার্তা পাঠাতে পারে। পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে অর্থ চাইতে পারে কিংবা প্রতারণামূলক লিংক পাঠিয়ে অন্যদেরও বিপদে ফেলতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রতারকেরা অর্থ চুরির চেষ্টা করতে পারে। আবার অ্যাকাউন্টে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে আপনার পরিচয় ধারণ করে অন্যদের সঙ্গে প্রতারণাও করতে পারে। অনলাইনে কেনাকাটার সময় সেশন কুকি চুরি হলে প্রতারকেরা আপনার অর্ডারের তথ্য পরিবর্তন করতে পারে, পণ্য অন্য ঠিকানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারে কিংবা অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত অর্থ পরিশোধের তথ্য ব্যবহার করে কেনাকাটা করতে পারে। এতে আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে পারেন আপনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়েবসাইট থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সতর্কবার্তা পেয়ে বিষয়টি বুঝতে পারবেন। যেমন: অ্যাকাউন্টের তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা হলে ওয়েবসাইট থেকে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হতে পারে, আপনি নিজে এমন কোনো পরিবর্তন করতে চেয়েছেন কি না। তবে সব ক্ষেত্রে এ ধরনের সতর্কবার্তা আসে না।
কুকি চুরি থেকে নিরাপদ থাকবেন যেভাবে
কুকি চুরি ঠেকাতে সফটওয়্যার ও ব্রাউজার এক্সটেনশন ডাউনলোডের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত বা অবিশ্বস্ত উৎস থেকে ডাউনলোড করা সফটওয়্যারের আড়ালে প্রায়ই তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে তৈরি ম্যালওয়্যার লুকিয়ে থাকে। এ ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যারকে বলা হয় ‘ইনফোস্টিলার’। এগুলো যন্ত্রে সংরক্ষিত পাসওয়ার্ড, সেশন কুকিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করতে পারে। আপনার ল্যাপটপ বা ফোনে ম্যালওয়্যার প্রবেশ করেছে কি না, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। মারিজুস ব্রেইডিসের মতে, যন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ হঠাৎ ধীর হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক দ্রুত ব্যাটারির চার্জ শেষ হওয়া কিংবা ঘন ঘন হ্যাং করার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া উচিত। ব্রাউজার নিজে থেকে অন্য ওয়েবসাইটে চলে যাওয়া, বারবার পপআপ বিজ্ঞাপন দেখা কিংবা হোম পেজের ঠিকানা বদলে যাওয়াও ম্যালওয়্যার সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে। ব্যাংক বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে প্রবেশের সময় অনিরাপদ পাবলিক ওয়াই–ফাই ব্যবহার না করাই ভালো। যদিও এ ধরনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি কুকি চুরির ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তবু সংবেদনশীল তথ্য আদান–প্রদানের সময় সতর্ক থাকা জরুরি। অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের পর লগআউট করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শুধু ব্রাউজারের ট্যাব বন্ধ করলেই লগইন সেশন শেষ হয় না। মারিজুস ব্রেইডিসের পরামর্শ, সেশন কুকির কার্যকারিতা বন্ধ করতে এবং সেটিকে প্রতারকের কাছে মূল্যহীন করে তুলতে ব্যবহার শেষে নিজে থেকে লগআউট করতে হবে। ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ না করে আলাদা পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি নিয়মিত ব্রাউজারের কুকি মুছে ফেললে ডিভাইসে সংরক্ষিত কুকির পরিমাণ কমানো যায়। এতে চুরি হওয়ার মতো কুকির সংখ্যাও কমতে পারে। তবে শুধু কুকি মুছে ফেললেই সব ধরনের ঝুঁকি দূর হয় না। অ্যাকাউন্ট বা ডিভাইসের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ হলে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার দিয়ে ডিভাইস পরীক্ষা করুন। একই সঙ্গে সব ডিভাইস থেকে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোয় লগআউট করুন এবং পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন। অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা সেটিংসে অপরিচিত ডিভাইসের প্রবেশাধিকার থাকলে সেটিও বাতিল করুন। অনলাইন অ্যাকাউন্টে একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা বা মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (এমএফএ) চালু রাখুন। কুকি চুরির মাধ্যমে প্রতারকেরা কখনো কখনো এই নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে। তারপরও শুধু পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভর করার চেয়ে এ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সুরক্ষা দেয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন চোখে পড়লে দ্রুত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ হলে দেরি না করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। দ্রুত পদক্ষেপ নিলে আর্থিক ক্ষতি কমানো ও অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়তে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান