মাটির মায়ায় বাংলার প্রকৃতি ও জীবন

· Prothom Alo

মাটির পাখি, মাটির গাছপালা, মাটির মানুষ। শুধু মাটি দিয়েই এক মনোরম শিল্পের জগৎ নির্মাণ করেছেন শিল্পী রেহানা ইয়াসমিন। এই দৃষ্টিনন্দন মৃন্ময় শিল্পসম্ভার সাজানো রয়েছে ২/৬ লালমাটিয়ার দ্য ইলুশনস গ্যালারিতে। সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গন আয়োজন করেছে ‘মাটির মায়া’ নামের ১২ দিন ব্যাপী এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী।

প্রদর্শনীতে শিল্পকর্ম রয়েছে ৪০টি। সব কটিই পোড়া মাটির। ‘টেরাকোটা’ নামেই যা পরিচিত। তবে এই শিল্পকর্মগুলোর সঙ্গে প্রচলিত টেরাকোটার বৈশিষ্ট্যগত বড় পার্থক্য রয়েছে। টেরাকোটা সাধারণত হয়ে থাকে দ্বিমাত্রিক। মাটির ফলকের ওপর খোদাই করে বা ছাঁচে ফেলে রিলিফ পদ্ধতিতে নকশা বা বিশেষ কোনো অলংকার করা হয়। এরপর সেই ফলকগুলো পোড়ানো হয় আগুনে। রেহানা ইয়াসমিনের কাজগুলো প্রধানত ত্রিমাত্রিক। ভাস্কর্য যেভাবে তৈরি করা হয়, তেমন করেই তিনি কাদামাটি দিয়ে শিল্পকর্মগুলো তৈরি করেছেন। এরপর বিশেষ কায়দার পোড়ানো হয়েছে। এ কারণে এই কাজগুলো হয়ে উঠেছে ভাস্কর্যের গুণসম্পন্ন।

Visit amunra-online.pl for more information.

বরেণ্য চিত্রশিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। প্রদর্শনী চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।

শিল্পী রফিকুন নবী প্রদর্শনীর কাজ দেখে বলেন, কাদামাটি দিয়ে এ ধরনের কাজ করা বেশ পরিশ্রমসাধ্য। একই সঙ্গে অনেক ধৈর্য ও মনোনিবেশেরও প্রয়োজন। রেহানা ইয়াসমিনের কাজে সৃজনশীলতার পাশাপাশি দক্ষতা ও করণকৌশলের চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা ও বিভিন্ন ধরনের পাখি বেছে নিয়েছেন। বিষয়বস্তুর কম্পোজিশনে নিজস্ব ধরন রয়েছে। কাজগুলো দর্শকদের মুগ্ধ করবে।

দর্শকেরা প্রতিদিনের অনেক চেনা দৃশ্য দেখতে পাবেন এই প্রদর্শনীতে। দেখতে পাবেন গাছের ডালে কিংবা দালানের কার্নিশে বসে থাকা কাক। পায়রা আছে অনেকগুলো। কতগুলো বসে আছে তাদের খোপে, গাছের গুঁড়ির পাশে, পুরোনো দালানের জানালার পাশে। পাখির মধ্যে আরও আছে শালিক ও প্যাঁচা। শিল্পী এসব পাখির শরীরে ভঙ্গি এবং তাদের পরিপার্শ্ব নির্মাণ করেছেন চমৎকারভাবে। এ ছাড়া আছে ছাগল নিয়ে কিছু কাজ। কসাইখানায় বেঁধে রাখা, ছাগল নিয়ে ঘরে ফেরা নারী, বাড়ির উঠানে বসে থাকা ছাগল ইত্যাদি। এসব পশুপাখি নিয়ে ছোট ছোট সিরিজের মতো কাজ করেছেন শিল্পী।

আরেক ধরনের কাজ আছে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ নিয়ে। দেখা যাবে বাউল শিল্পীরা একতারা-দোতারা বাজিয়ে গান করছেন। পাহাড়ি জনপদের এক নারীকে ক্লান্ত ভঙ্গিতে দেখা যাবে গাছের তলায় বিশ্রাম নিতে। জুমের ফসল নিয়ে ঘরে ফেরা, সন্তান কোলে নিয়ে পাহাড়ি পথ চলার দৃশ্য আছে। এ ছাড়া আছে দোলনায় দোল খাওয়া যুগল, কিছু অলংকৃত মৃৎপাত্র, প্রাচীন দরদালানের অংশবিশেষ প্রভৃতি।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন দর্শকেরা। এটি চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। ঢাকা। ২৫ অক্টোবর

প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম দেখে শিল্পসমালোচক মঈনুদ্দিন খালেদ প্রথম আলোকে বললেন, রেহানা ইয়াসমিনের এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের পরিচয়টি উঠে এসেছে। প্রকৃতি, মানুষের গৃহস্থালি, চারপাশের পশুপাখি—সব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। আগুনের তাপে কাদামাটি শুকিয়ে লালচে হয়ে ওঠা, কোথাও কোথাও ধোঁয়া লেগে কালচে ছোপ লাগা আমাদের প্রাচীন পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই কাজগুলো সাধারণ টেরাকোটার বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে স্বতন্ত্র ধারার ভাস্কর্যের গুণ অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার ও তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়টি আছে। ফলে প্রত্নবিদ্যা ও নৃবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এই শিল্পকর্মগুলো দেখলে এর নান্দনিকতা ও স্বরূপ উপলব্ধি করা সহজ হবে।

শিল্পী রেহানা ইয়াসমিনের এটি প্রথম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সিরামিক বিভাগ থেকে এমএফএ ডিগ্রি নিয়েছেন। দেশে ও বিদেশে তিনি দলবদ্ধ অনেক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া ‘কালারর্স অব থার্টিন’ নামে নারী শিল্পীদের একটি দলের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর নিয়মিত যৌথ শিল্পী কর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন করে যাচ্ছেন।

দর্শকেরা রেহানা ইয়াসমিনের ‘মাটির মায়া’ প্রদর্শনীর এই শিল্পকর্মগুলোতে দেখতে পাবেন বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও লোকজ জীবনের নান্দনিক ভাষ্য। শিল্পী পরিচিত পশুপাখি, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আর চেনা পরিবেশকে ত্রিমাত্রিক অবয়বে তুলে ধরে পোড়া মাটির শিল্পে যুক্ত করেছেন স্বতন্ত্র মাত্রা।

Read full story at source