হেমন্তের ভোরে শীতের পদধ্বনি
· Prothom Alo

ভোরের আকাশ তখনো পুরোপুরি ফরসা হয়নি। চারপাশে ছড়িয়ে আছে স্নিগ্ধ নীরবতা। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে মিটমিট করে জ্বলছে ভোরের আলো, দূরের গাছপালাগুলোকে ঘিরে কোথাও কোথাও জমেছে হালকা কুয়াশা। জানালার ফাঁক গলে আসা বাতাসে অনুভূত হচ্ছে মৃদু শীতলতা। চাদর মুড়ি দিয়ে আরেকটু ঘুমিয়ে থাকার ইচ্ছা জাগে। সকালের পথে মানুষের চলাফেরাতেও যেন একটু জড়তা। অথচ দিনের বেলা রোদের উষ্ণতা এখনো জানান দেয় শীত আসতে আরও কিছুটা দেরি। প্রকৃতির এই মৃদু বদল যেন নীরবে বলে যায়, শীত আসছে, তবে এখনো সে দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়নি।
Visit freshyourfeel.org for more information.
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রতিটি ঋতুর রয়েছে নিজস্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্য। শরতের বিদায়ের পর হেমন্ত আসে নতুন ধানের গন্ধ, সোনালি ফসল আর নরম রোদের আবেশ নিয়ে। মূলত পৌষ ও মাঘ শীতকাল হলেও হেমন্তের শেষভাগে শীতের উপস্থিতি ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। তবে তার আগাম আভাস মেলে হেমন্তের ভোরেই শিশিরভেজা ঘাসে, হালকা কুয়াশায় আর বাতাসের কোমল শীতলতায়। প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে আসন্ন ঋতুকে বরণ করে নেওয়ার জন্য।
ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে মিটমিট করে জ্বলছে ভোরের আলোগ্রামবাংলায় হেমন্ত মানেই পাকা ধানের সোনালি আভা, মাঠজুড়ে কৃষকের ব্যস্ততা আর উঠানে নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ। কোথাও ধান কাটা চলছে, কোথাও উঠানে ধান শুকানোর আয়োজন। বাতাসে ভেসে আসে নতুন ধানের গন্ধ। এই ব্যস্ততার মধ্যেই শীতকে ঘিরে শুরু হয় নানা পরিকল্পনা। খেজুরগাছ প্রস্তুত করার কথা ভাবেন গাছিরা, আর পিঠাপুলিপ্রেমীদের মনে উঁকি দিতে থাকে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা ও খেজুরের রসের স্বাদ। যদিও শীতের সেই চেনা আয়োজন এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি, তবু তার অপেক্ষা যেন আগেভাগেই ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে।
শহর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ঋতুবদলের এই ছবি আলাদা করে চোখে পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণে ভোরের হালকা কুয়াশা, গাছের পাতায় শিশির আর শান্ত পরিবেশ সকালের সৌন্দর্যকে অন্য রকম করে তোলে। শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও প্রকৃতির এই পরিবর্তন এনে দেয় একটুখানি প্রশান্তি। কারও মনে জাগে শীতের সকালের অলসতা, কারও মনে উষ্ণ পোশাক পরার প্রস্তুতি, আবার কেউ অপেক্ষা করেন কুয়াশায় মোড়ানো পথ ধরে হাঁটার জন্য।
ভোরের কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তাকটিয়াদীর ঢাকের হাট: ৪০০ বছরের ঐতিহ্যদিনের বেলায় উজ্জ্বল রোদ আর ভোরের মৃদু শীতলতার এই বৈপরীত্যই হেমন্তের বিশেষ সৌন্দর্য।
তবে শীতের আগমনী বার্তা সবার মনে সমান আনন্দ নিয়ে আসে না। শীতের প্রকোপ বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ ও ছিন্নমূল মানুষের জীবন হয়ে ওঠে কঠিন। পর্যাপ্ত গরম কাপড়ের অভাবে রাত কাটানো অনেকের জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই শীত পুরোপুরি নেমে আসার আগেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শীতবস্ত্র সংগ্রহ ও বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এখনো হেমন্তের দিন চলছে। শীত তার পূর্ণ রূপে হাজির হয়নি; সে যেন দূরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ভোরের কুয়াশা, শিশিরভেজা ঘাস আর হিমেল বাতাসের মৃদু পরশে প্রকৃতি কেবল তার আগমনী বার্তা শোনাচ্ছে। অপেক্ষা এখন সেই চেনা শীতসকালের, যখন কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্য উঁকি দেবে, ঘরে ঘরে পিঠার ঘ্রাণ ছড়াবে আর বাংলার প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে উঠবে।
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়