খেলাধুলা সমাজের আয়না, সেই খেলাধুলা কোথায় হবে?

· Prothom Alo

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে এবারের অতিথি প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। জনপ্রিয় একাধিক খেলায় পারদর্শী এই ব্যক্তিত্ব পুরো জীবনকে জড়িয়ে নিয়েছেন খেলাধুলার সঙ্গে। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে শৈশব থেকে তাঁর খেলার প্রতি আগ্রহ, বেড়ে ওঠা, জাতীয় পর্যায়ে যুক্ত হওয়াসহ নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।

‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা পেয়েছি একজন কিংবদন্তিকে। তিনি একের ভেতরে তিন—বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশ হওয়ার আগে পাকিস্তানের জাতীয় দলের ফুটবল ও হকি খেলোয়াড়। তিনি ক্রিকেটও খেলতেন, হকির কোচ ছিলেন। প্রথম আলোর বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদের পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা লাভ করেছিলেন। নিজেকে তিনি পরিচয় দেন ‘মোহামেডানের প্রতাপ’ হিসেবে। আমরা পেয়েছি প্রতাপ শঙ্কর হাজরাকে। দাদা, আপনাকে স্বাগত জানাই।

Visit grenadier.co.za for more information.

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  থ্যাঙ্ক ইউ, ভাই, আপনাকে।

আপনার জীবনকাহিনি পড়ার চেষ্টা করছিলাম। আপনি একটা স্মৃতিকথা লিখেছেন, আশা করি, এটা বই হিসেবে বের হবে। পাণ্ডুলিপিটাই আমি পড়ছিলাম। ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসের ৩ তারিখে আপনার জন্ম।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ৩ তারিখে জন্ম আমার। এটা বাংলায় হচ্ছে ১৩ চৈত্র ১৩৫০।

ওই যে পঞ্চাশের মন্বন্তর!

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ।

আপনার বই আপনি লিখেছেন যে ওই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হচ্ছিল এবং দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। সেটা তো আপনার জানার কথা নয়, আপনি তখন জন্মগ্রহণ করছেন।


প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ওই চ্যাপ্টারটা তো শোনা কথা।

আপনার তো বিখ্যাত পরিবার, হাজরা পরিবার। আপনার পূর্বপুরুষেরা জমিদার ছিলেন। আপনি লিখেছেন যে মোগল আমলে এক হাজার সৈন্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর আপনারা জমিদার খ্যাতি লাভ করলেন। এদিকে ক্ষমতা লাভ করলেন এবং আপনাদের পূর্বপুরুষ হলো হাজরা বা হাজারী।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হাজারী উপাধি পেয়েছিলেন। তারপর সেখান থেকে অপভ্রংশ হয়ে হাজরা হয়েছে।

ফরিদপুরের শিবচরে আপনাদের আদি বাড়ি ছিল।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ, ফরিদপুরের শিবচরে।

কিন্তু আপনার জন্ম হয়েছিল মুন্সিগঞ্জ জেলায়।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমাদের যে জায়গা ফরিদপুরে ছিল, বর্ষাকালে ওটা ভেঙে যেত অনেকবার। ছয়বার ভাঙার পর সপ্তমবারে ওনারা এসে…জয়দেবপুরের শের থেকে বঙ্গ ব্যানার্জি নামের এক ভদ্রলোক এ জায়গার ইজারা নেন। সেখান থেকে আমার ঠাকুরদার বড় বাবা সেটা ইজারা নেন। ইজারা নেওয়ার পর দোগাছিতে আমাদের গ্রামটাকে প্রতিষ্ঠা করেন।

এটা মুন্সিগঞ্জ জেলায় তো?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  মুন্সিগঞ্জ জেলায়, শ্রীনগর থানায়।

হ্যাঁ, উপজেলা এখন। আপনার বাবা আর মায়ের নাম একটু বলেন।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমার বাবার নাম প্রিয় শঙ্কর হাজরা। উনি অ্যাডভোকেট ছিলেন ঢাকা বারের।

মা অন্নপূর্ণা।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  মা অন্নপূর্ণা হাজরা। উনি...

ভৌমিক ছিলেন আগে।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আগে ভৌমিক ছিলেন। উনি বেনারসে পড়াশোনা করেছেন, উচ্চমাধ্যমিক পড়তে পড়তে বিয়ে হয়ে যায়, আর পড়া হয়নি।

ওই সময় উচ্চমাধ্যমিক পড়াটাকে যথেষ্ট শিক্ষিত বলতে হবে। আর আপনার বাবা… ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েছিলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ভর্তি হয়েছিলেন।

এটা শিবপুরে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে।

তারপর সেটা না পড়ে এ অঞ্চলে এলেন ওকালতি পড়তে নাকি করতে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমার দাদি, মানে ঠাকুরমা (বাবার মা) বললেন, ‘তোমার মতো অনেক ইঞ্জিনিয়ারকে আমি বেতন দিয়ে পুষতে পারব। তোমার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার দরকার নেই, তুমি এখানে চলে আসো। এসে ওকালতি পড়ো।’ বাবা এসে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ল পাস করেন।

সে আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল পাস তো অনেক বড় ব্যাপার! তারপরে আপনারা আরমানিটোলাতেই স্থায়ী হলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আরমানিটোলা তো আমার ঠাকুরদার কেনা বাড়ি। সেখানে আমরা সবাই বড় হয়েছি ’৭৩ পর্যন্ত।

শৈশবে আপনি কলকাতায় ছিলেন, কাশীতেও ছিলেন কিছুদিন!

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  পঞ্চাশের দাঙ্গার সময় আমাদের পরিবারের সব চলে গেল ওখানে। শুধু বাবা এখানে ছিলেন। আর গ্রামে আমার এক বড় জ্যেঠী ছিলেন তার একটা মেয়েকে নিয়ে। আমরা সবাই প্রথমে কলকাতায় যাই। সেখান থেকে মায়ের বড় বোনের বাড়ি কাশীতে যাই। সেখানে থাকি নয় মাস। পরে রাঁচিতে আমার পিসির বাড়িতে থাকি প্রায় ছয় মাস। তারপর চলে আসি ঢাকায়।

আপনার বইয়ে শৈশবের স্মৃতিতে কাশীর বানরের বর্ণনা লিখেছেন, না?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  তখন আমার বয়স আট কি নয়। আজও বানর দেখলেই আমার সেই ঘটনা সাংঘাতিক মনে পড়ে, কী যে ভয় পেয়েছিলাম!

পুরান ঢাকায় তো এখনো বানর আছে।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমাদের ওয়ারী ক্লাবে, ওয়ারীতেই কত বানর ছিল!

পঞ্চাশের পর আপনি আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট স্কুলে ভর্তি হলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  বায়ান্নতে।

১৯৫২ সালে। আপনার বইতে বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনেরও বর্ণনা আছে। আমরা ওই প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং খেলাধুলায় আসি। আপনাদের আরমানিটোলার বাড়িতে টেনিস মাঠের সমান খুব সুন্দর ছোট্ট একটা লন ছিল, সেখানে অনেক খেলাধুলা হতো।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  লন ছিল। আমরা সবাই খেলতাম। বন্ধু-বান্ধব আসত, পাড়ার যেসব ছোট ছেলের মায়েরা চাকরি বা অন্য কিছু করেন, বিকেলে এসে দিয়ে তাদের রেখে যেতেন আমাদের এখানে। ছেলেরা আমাদের এখানে থাকত, আমরা সবাই খেলতাম।

আপনারা কয় ভাইবোন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমরা দুই ভাই, এক বোন।

আপনার ভাইও আপনার সঙ্গে খেলতেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ভাই  খেলত। কিন্তু ও খেলাধুলায় আগ্রহী ছিল না।

ছোটবেলায় তো সবাই খেলে। তবে আপনি যেভাবে খেলোয়াড় হয়েছেন, ওইভাবে উনি খেলোয়াড় হননি।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  না।

আরমানিটোলা স্কুল থেকে অনেক খেলোয়াড় বেরিয়েছে। আপনি লিখেছেন, ১৯৩০ সাল থেকে মোটামুটি আশির দশক পর্যন্ত বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে হকি খেলোয়াড় উৎপাদন করেছে প্রধানত আরমানিটোলা স্কুল।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  প্রধানত নয়, একমাত্র আরমানিটোলা স্কুলই। কারণ, এই স্কুল আশির দশক পর্যন্ত কোনো সময়ই রানার্সআপ হয়নি। প্রতিবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ’৫৮, ’৫৯ থেকে ’৬৪, ’৬৫ পর্যন্ত ঢাকার সব ক্লাবে আরমানিটোলা স্কুলের ছাত্ররা খেলত। যারা সিনিয়র, তারা ভিক্টোরিয়া ক্লাবে আসত, চ্যাম্পিয়ন হতো। ভিক্টোরিয়া, ওয়ারীতে যেত। আমিও তো দাদা ক্লাস এইটে থাকতে ওয়ারী ক্লাবে খেলি। ফার্স্ট ডিভিশন। তখন আমার বয়স কত? ১৩! এইভাবে সেই সময় থেকে আরমানিটোলা স্কুলের সব ছেলে যারা হকি প্লেয়ার ছিল, বিভিন্ন ক্লাবে খেলত।

হ্যাঁ, প্রথম ক্লাব আপনার ওয়ারী।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  প্রথম ক্লাব আমার ওয়ারী।

তারপর ভিক্টোরিয়া ক্লাবে কত সালে এলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  একষট্টিতে। ষাট সালে হকি খেলতে এলাম।

হকি খেলেন, ফুটবলও খেলেন তখন থেকেই?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ, হ্যাঁ।

প্রথম কবে হকি ফার্স্ট ডিভিশন খেলেছেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আটান্নতে।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। হকি, ক্রিকেট ও ফুটবল—তিন খেলাতেই পারদর্শী। এখন তিনি ক্রীড়া সংগঠক, খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। নিজেকে ‘মোহামেডানের প্রতাপ’ বলতে পছন্দ করেন

আর প্রথম ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবল খেলেছেন কবে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  একষট্টিতে।

কোন ক্লাবের হয়ে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ভিক্টোরিয়া।

আনিসুল হক: একটু আগে বলছিলেন যে আপনি ক্রিকেট খেলতেন। কমনওয়েলথ টিম যখন ঢাকায় আসে, একজনের খেলা দেখে আপনার কী মনে হয়েছিল, ওইটা বলেন।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  মনজুর হাসান মিন্টু, পাকিস্তানের জাতীয় দলের গোলকিপার, তাদের পারিবারিকমতো একটা টিম ছিল বিবিসি। সেখানে আমি ’৬৩, ’৬৫ পর্যন্ত ক্রিকেট খেলেছি। ’৬৬-তে কমনওয়েলথ টিম আসে খেলতে, সেখানে টম গ্রেভনি খেলে। আমি নিয়মিত ক্রিকেট খেলা দেখতাম। টম গ্রেভনির পুরো ইনিংসটা আমি দেখলাম। ৯৪-এ আউট হলো। ও যে ছয় মারছে, মনেই হয় না যে ছয় মারছে! আমরা তো গায়ের জোর দিয়ে মারি, ও শুধু ব্যাটটা উঠিয়ে দিল, ছয় হয়ে গেল। এই সব দেখে আমি ভাবলাম যে গ্রেভনি ক্রিকেট খেলে, আমরা ক্রিকেটের ওপরে অত্যাচার করি।

ক্রিকেটের ওপরে অত্যাচার।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  অত্যাচার করি। এ জন্য ক্রিকেট ছেড়ে দিলাম। ’৭৩-এ যখন আবার লীগ শুরু হলো, প্লেয়ার শর্টেজ। কারণ, বেশির ভাগ খেলোয়াড় চলে গেছে, অবাঙালিরা চলে গেছে। খেলোয়াড়ঘাটতি। তখন আমাকে খেলতে হয়। প্রথমে শান্তিনগরে খেলি কিছুদিন, তিন বছর। খেলোয়াড় আসার পরে আমি ছেড়ে দিই।

আপনি ইস্ট পাকিস্তান টিমে প্রথমে ডাক পান কিসের, হকিতে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হকিতে, ’৬২-তে।

তারপরে ফুটবলে ডাক পেলেন কবে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ফুটবলে ’৬৩-তে ডাক পেলাম।

আর হকিতে অল পাকিস্তান টিমে ডাক পেলেন কবে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হকিটা আমি অল পাকিস্তান খেলিনি, বাংলাদেশ টিমে খেলছি।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। নিজের গৌরবময় নানা ট্রফি ও ছবির পাশে

আচ্ছা। তাহলে তো আপনি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন দলে খেলেননি?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  না, আমি খেলিনি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন দলে। তবে চ্যাম্পিয়নদের সাথে খেলেছি, বিপক্ষে খেলছি।

একবার না অনেক গোল খেয়েছিলেন, ১৭ গোল!

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  না, সেটাতে আমি ছিলাম না। সেটা ছিল এশিয়ান গেমস। এশিয়ান গেমসের পাকিস্তানি কোচ ছিলেন একজন।

গাড়ি কিনে মাকে দেখাতে গিয়ে দেখি তিনি সাদা চাদরে ঢাকা

এটা তো বাংলাদেশ আমলে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ।

হ্যাঁ, আমরা তো পড়েছি।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  এটা ’৭৮-এর খেলা। তখন সেই খেলার উপযুক্তই ছিলাম না আমি।

একটু আগে বলছিলেন, আপনার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা অল পাকিস্তান টিমে সুযোগ পাওয়া। এটা একটু বলবেন?


প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ’৬৪-তে আমি প্রথম পাকিস্তান ফুটবল টিমের স্ট্যান্ডবাই প্লেয়ার হই। তাতে মনটা ভরছিল না। মা বলেছিল, স্ট্যান্ডবাই হোক, যা–ই হোক, টিমের প্লেয়ার তো। কিন্তু আমার ভালো লাগত না। মা আমাকে খুব সান্ত্বনাও দিত। ’৬৫-তে পেশোয়ারে ট্রায়াল হলো। সেই ট্রায়াল দিতে গেলাম। বাঙালি আমরা দুজন, আমি আর জহির ভাই। সেই ট্রায়ালে আমি সুযোগ পাই। তখন ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এয়ার মার্শাল আসগর খান। ওনার মতো ভদ্রলোক আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি। চান্স পাওয়ার পর শ্রীলঙ্কায় খেলতে গেলাম। শ্রীলঙ্কায় ছয়-সাতটা ম্যাচ খেলার পরে ঢাকায় এলাম। ঢাকায় আসার পর বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই মা আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, মনে হলো যেন আমি চার-পাঁচ মাসের ছেলে। বাচ্চা! আর কী যে আদর করেছিল, সেটা এখনো ভুলিনি। সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দ যে দেশের যে কাজই আমি করি, সেই কাজের টপ লেভেলে পৌঁছাতে পেরেছিলাম।

নিশ্চয়ই।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  এইটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়।

লাহোরে ছিলেন প্রথমে, না?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ক্যাম্প হয়েছিল পেশোয়ারে।

পেশোয়ারে। আর নূরজাহানের সমাধি যে দেখলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  এটা ছিল ’৬০-এ। আগে এই ’৫৭ থেকেই পাকিস্তান গভর্নমেন্ট ফুটবল, হকি, ক্রিকেটে ইউনিভার্সিটি, কলেজ এবং স্কুলের ছেলেদের ট্রেনিংয়ের বন্দোবস্ত ছিল। আমি ’৬০-এ হকিতে লাহোরে যাই। লাহোরে তখন হকি হতো লাহোরে, ফুটবল ঢাকায়, অ্যাথলেটিকস হতো অ্যাবোটাবাদে আর করাচিতে হতো ক্রিকেট। তা আমি লাহোরে যাই হকি নিয়ে। সেই সময় দেখছিলাম, সেই সময়ের ঘটনা এই ওটা।

বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কখনো ভুল করে না

নূরজাহান বলতে হচ্ছে আমাদের মোগল...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  মোগল সম্রাট শাহজাহানের দুহিতা।

শাহজাহানের নূরজাহানের কবর দেখলেন। কবরের গায়ে কী লেখা আছে, এখন মনে আছে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ, ওইটা বাংলা অনুবাদটা মনে আছে।…গরিবের ঘরে দীপ জ্বেলো না, ফুল দিয়ো না কেউ ভুলে। শ্যামা পোকার না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এটা অনুবাদ করছেন।

আপনি নিজেকে মোহামেডানের প্রতাপ বলেন কেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমার জীবনের প্রত্যেকটা কষ্টের সময়েই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল মোহামেডান। আর এই মোহামেডানই আবার যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এক এক বছরের পর বছর, তখন আনন্দও দিছে আবার সাংঘাতিক।

১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে প্রথম প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শঙ্কর হাজরা ও অন্যরা

আপনি মোহামেডানে জয়েন করলেন কত সালে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ’৬৩-তে।

ছাড়লেন কবে?


প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ছাড়িনি, এখনো আছি তো!

শুধু টাকা দিলেই হবে না, খেলোয়াড়দের প্রতিভা, ভালো কোচ ও সংগঠক থাকতে হবে

এই জন্যই আপনি মোহামেডানের...ভেরি গুড। আচ্ছা, আরমানিটোলা স্কুল থেকে এত খেলোয়াড় হলো কীভাবে? এটার কায়দাটা কী ছিল?


প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  দাদা, আরমানিটোলা স্কুলের সবচেয়ে বড়ই ছিল, ওখানে ব্যাচেলরস ট্রেনিং কলেজ ছিল। তাদের একটা মাঠ ছিল, আরমানিটোলা স্কুলের একটা মাঠ। তারপর আমাদের ক্লাস থ্রি থেকে খেলার জন্য বন্দোবস্ত করা ছিল আরমানিটোলা স্কুলে। থ্রিরা খেলত ছোট্ট মাঠে, একটা মাঝারি মাঠে খেলত ফাইভ, সিক্স, সেভেনের ছেলেরা, এইট, নাইন, টেন খেলত বড় মাঠে। এবং আমাদের ওখানে ফুটবল সিজনে ফুটবল, হকি সিজনে হকি, ক্রিকেটের সিজনে হকি অ্যান্ড ক্রিকেট একসঙ্গেই হতো, হকি অ্যান্ড ক্রিকেট খেলা হতো। এবং এটা আমাদের ভেতর একটা সিস্টেম ছিল সেই সময়ে, আমরা আরমানিটোলা স্কুলের ক্লাস থ্রি সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ক্লাস থ্রির সঙ্গে ম্যাচ খেলতাম। নিজের স্কুলেও, ওদের স্কুলেও। এটাই ছিল এই ইন্টার স্কুলের এই...

আর চারটা যে হাউস ছিল?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  চারটা হাউস ছিল, সেটা তো ইন্টার হাউস হতো। স্কুলের ছেলেরাই খেলত। সেটা ছিল আমি যখন ভর্তি হই, তখনই স্যার বললেন, ‘আমি কলিন্স হাউস।’ আমি তো কিছুই বুঝিনি। তো পরে যা বোঝানো হলো যে কলিন্স;আমরা চারটা হাউসে ভাগ করা হয় সিরিয়াল অনুযায়ী। প্রথম আমার টার্মে কলিন্স হাউসের টার্ম আসছিল, তাই আমি কলিন্স হাউস। কোনো চয়েস না কিন্তু এটা। কলিন্স হাউস, মি. কলিন্স ছিলেন আরমানিটোলা স্কুলের প্রয়াত হেডমাস্টার। এবং ফিজিক্যাল আমাদের আমরা এই স্কুলটা কিন্তু অ্যাকচুয়ালি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের টিচার্সদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউট হিসেবে ধরা হতো। আমরা যখন পড়ছি, তখন ওই টিচাররা এসে আমাদের ক্লাস নিতেন।

হাউসে হাউসেও তো খেলা হতো?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  সেখানে এই স্টার্ক সাহেব, ওয়েস্ট সাহেব অ্যান্ড বিস সাহেব ছিলেন ফিজিক্যালে ওই টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল। ওনাদের নামে...

ওয়েস্ট এটা ইস্ট-ওয়েস্টের ওয়েস্ট না, ওনার একটা নামই?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ, মিস্টার ওয়েস্ট।… ইন্টার হাউসেই খেলা হবে। …ক্লাস থ্রি, ফোর জুনিয়র লেভেল। ফাইভ, সিক্স, সেভেন হচ্ছে ইন্টারমিডিয়েট। এরাও ওই–ই খেলবে। কিন্তু মজা ছিল ফাইভ, সিক্স, সেভেন থেকে যদি কেউ ভালো খেলে তাকে সিনিয়র টিমে নেওয়া যাবে, কিন্তু সিনিয়র টিমের কাউকে জুনিয়র টিমে নেওয়া যাবে না। আর এইট, নাইন, টেন ছিল সিনিয়র গ্রুপস। এই গ্রুপের ভেতরে খেলা হতো। তো জীবনের প্রথম হাউসের খেলাতেই আমি রানার্সআপ হই কলিন্স টিমে। আর তখন আরমানিটোলা স্কুলের তো হকিতে রমরমা অবস্থা।

হকিতেই রানার্সআপ হলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ।

আপনি বলেছেন যে আপনি প্রায় তিন হাজার খেলা খেলেছেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  তিন হাজার ম্যাচ খেলেছি।

যদি ঐক্যবদ্ধ হতাম যে বেতার–টেলিভিশন বন্ধ করো.. তাহলে সবই হতো

আপনি পড়েছেন পরবর্তীকালে আরমানিটোলা স্কুল থেকে জগন্নাথ কলেজ? অনেক দিন ধরে, চার বছর ধরে ইন্টারমিডিয়েট পড়লেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  কী করব বলেন? প্রথমবারেই হকিতে খেলতে গিয়ে আঙুল ভাঙলাম, এক বছর গ্যাপ। দ্বিতীয়বার পাকিস্তানের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে চলে গেলাম। এই করে করে গ্যাপ পড়ছে আরকি!

তারপর আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিস্ট্রিতে দুই বছর পড়ছি রিয়ালি কিছুদিন। কারণ, ফার্স্ট ইয়ারে ছিলাম নন-কলেজিয়েট। …ফার্স্ট ইয়ারে পরীক্ষা দিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে উইদাউট ডিজ-কলেজিয়েট হয়ে গেলাম।

প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার অনুষ্ঠানে (বাঁ থেকে) জাকারিয়া পিন্টু, বিপ্লব ভট্টাচার্য ও প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে

না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো পাস করেছেন? স্নাতক...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  জগন্নাথ ছিল আমার জন্য খোলা দরজা, সব সময়য়েই। সাইদুর রহমান সাহেব আমার বাবার...

এটা তো শফিক রেহমানের বাবা সাইদুর রহমান? উনি প্রিন্সিপাল ছিলেন।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  শফিক রেহমানের বাবা। তখনকার দিনের প্রিন্সিপাল দেখেন, উনি তো আমাদের ক্লাস নিতেন না। উনি আমাকে হয়তো ম্যাক্সিমাম চার থেকে পাঁচবার দেখছেন। প্রায় ২৫ বছর পরে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার, ওনার বাড়ির সামনে। জহির ভাই আমাদের ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন, তাঁর একটা ওষুধের দোকান ছিল। সেখান থেকে বাইরে দেখি স্যারে আসছে। আমি গিয়ে স্যারকে প্রণাম করছি। কিচ্ছু বলিনি। উনি আমাকে ধরে মুখটা কাছে এনে, চোখে বিরাট পাওয়ারের চশমা, কাছে এনে বলেন, ‘তুই প্রতাপ না?’

আগেকার দিনের প্রিন্সিপালরা একেকজন কিংবদন্তি ছিলেন।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  বিশ্বাস করেন, আমার এখনো কান্না পেয়ে যায়। কী ছিলেন ওনারা!

আপনার বিয়ে হলো ১৯৭০ সালে।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ’৭০ সালে।

আমাদের বউদির নাম কী?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  নীতা। নীতা চৌধুরী ছিল, পরে হয়েছে নীতা হাজরা।

উনি আপনাকে দেখলেন কবে, না আপনি তাঁকে প্রথম কবে দেখলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  তখন সে ফ্রক পরে, ছোট্ট। আমাদের আমার বাবার দুঃসম্পর্কের নাতনির মেয়ে। কিন্তু এত দুঃসম্পর্ক যেটা আত্মীয়তা ধরে না কেউ। কিন্তু ওনাদের যাতায়াত ছিল বেশি।

পছন্দ করেই বিয়ে মনে হচ্ছে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  পছন্দটা বাবা-মারও আপত্তি ছিল না। পছন্দটা শুরুটা আমারই।

তো এখন আপনার দুই মেয়ে, ওরা ঢাকাতেই আছেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ঢাকাতেই আছি।

আর ১৯৭১ সালে...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  এখানে একটা কথা বলি দাদা।

জি।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  সৃষ্টিকর্তা তো নানাভাবে নানা লোককে আশীর্বাদ করে। উনি আশীর্বাদ করছেন আমার দুই জামাই দিয়ে। আমার বড় জামাই উনি যে শুভাশীষ বোস, রিটায়ার করছে কমার্স মিনিস্ট্রি থেকে সিনিয়র সেক্রেটারি হয়ে।

নিশ্চয়ই গৌরব করার মতো বিষয়।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আর ছোট জামাই গ্রামীণফোনের জেনারেল ম্যানেজার হয়ে সেলফ রিটায়ারমেন্ট নিয়ে ইউএনের একটা সংস্থায় চাকরি করছেন প্রায় ছয় বছর, ইউএনডিপিতে।

ওনার নাম কী?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  দেবাশীষ রায়। এবং এই দুইজনেই উচ্চশিক্ষিত।

খুব ভালো, জি। তো একাত্তর সালের ২৫ মার্চে আরমানিটোলার আপনাদের এই বাড়ি পুড়িয়ে দিল?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  পাকিস্তান আর্মি পোড়ায়ে দিল।

আপনি বেঁচে গেলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমার পরিবারের সবাইকেই নিয়ে বেঁচেছি। কেউ কোনো ক্যাজুয়ালটিস ছিল না সেখানে।

কেমনে, বের হলেন কীভাবে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  অ্যাকচুয়ালি কিছু ইন্সটিঙ্কট বোধ হয় মানুষের মনের...

থাকে।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  থাকে। আমার যেন মনে হচ্ছিল যে আজকের দিনটা বাঁচতে পারলে হয়তো বেঁচে যাব। তারপর সেই দিনই নয়াবাজারে নতুন বাজার যেটা নয়াবাজার, সেই বাজারে কাঠের গুদামে আগুন লাগিয়ে দেয় আর্মি এসে। তাতে আরও ভয় পেয়ে যাই। তখন আমরা করলাম কী, আমাদের বাড়ির মেইনগেট… সেগুলো তো বন্ধই থাকে, কিন্তু সাইডে একটা গেট আছে যে প্যাসেজ আছে, সেটার গেটটা ভালো করে…ছাদের কাঠ দিয়া ওটা ভালো করে ব্লক করে দিলাম। আর সবাইকে বললাম, তোমরা এখান দিয়ে চলে যাবে, আমি যদি সিগন্যাল দিই। যখন দেখলাম একটা জিপ এসে দাঁড়িয়েছে, ট্রাকটা ঘুরে উৎপলা সেন মানে সেই গায়িকা, তাঁদের বাড়ি আমাদের বাড়ির পাশেই। সেখানে …দেখে আমি চিৎকার শুরু করলাম, ‘পালাও পালাও, আর্মি আসছে।’ প্রায় আমাদের বাড়ির প্রায় ১৩ জন ১৪ জন মেম্বার আমরা তো ছিলাম।

রাত্রিবেলা—১২টা, ১টার পরে?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  এইটা সাড়ে ৯টায়।

সাড়ে ৯টায়?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  …সঙ্গে হলো কি, আর্মি আসছে শুনে আমাদের বাড়িতে পাশের বাড়ি শামসুদ্দিন স্যারের ফ্যামিলিরও কিছু লোক …মেয়েরা সব। যে–ই বাড়ি দিয়ে পার হব, ওনারা ’৫০-এর রায়টের সময় আমাদের পরিবারের সাংঘাতিক সাহায্য করছেন। ওনারা এই তিনজন তিনটা ফ্যামিলি কিন্তু আমাদের একটা ফ্যামিলির মতোই ছিলাম। যদিও দুজন মুসলমান, আমি হিন্দু। তো ওদের সব বাইরে নিয়ে যখন পার হই, ওইখানে গুনে দেখি ২৪ জন লোক আমরা। এদেরকে নিয়ে গিয়ে প্রথমে ওই যে সুইপার প্যাসেজ থাকে না আগেকার দিনের বাড়িতে, সেখান থেকে দড়ি দিয়ে শাড়ি খুলে দিল একজন, টেনে টেনে ওপরে উঠিয়েছি। ওপরে উঠিয়ে একটা ওয়াল পার হলাম, তারপর আবার গিয়ে আরেকটা ওয়াল পার হলাম, তারপর লাস্টে আর্মেনিয়ান চার্চের ওয়াল পার হয়ে আর্মেনিয়ান চার্চের শেল্টার নিলাম। কিন্তু ক্যাজুয়ালটিতে কোনো ইনজুরি আমাদের ছিল না। কেউ মারাও যায়নি, কোনো ইনজুরিও হয়নি।

তারপর কি ২৭ মার্চে আপনারা মুভ করলেন, নাকি ওই রাতেই করলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ওই সময় বাড়িতে এসে ওই বাড়ি থেকে তো কিছু নেওয়ার নেই, সব তো পুড়িয়ে দিছে। ওভাবে বিশেষ করে কম্বাইন্ডের সাদেক, আকমল এরা এসে আমাকে শার্ট-টার্ট দিল, ফ্যামিলিকে কিছু শার্ট-টার্ট দিল। সেখান থেকে তারাই গাড়ি করে নিয়ে গেল আমাকে মনিরুল ইসলাম সাহেবের ছোট ভাইয়ের বাড়িতে, মোহামেডান ক্লাবের প্রেসিডেন্ট।

মনিরুল ইসলাম সাহেবের ছোট ভাইয়ের বাড়ি। তারপরে তো...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  তারপরে সেখান থেকে দেশে চলে যাই।

গ্রামের বাড়ি গেলেন, গ্রামের বাড়ি থেকে পরে আগরতলা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  এখানে একটা ঘটনা, এখানেও একটা জিনিস আছে কিন্তু। এই যাওয়ার সময় আমাদের সাথী হয় … যাঁকে ‘মা’ টাইটেল দেওয়া হয়েছে?

জাহানারা ইমাম?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  জাহানারা ইমাম। জাহানারা ইমামের ছেলে...

রুমী?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  রুমী আমাদের সঙ্গে যায়। আমরা ওকে থামাতে চেষ্টা করি। এত সুন্দর ছেলেটা, ফুটফাট ফরসা, গোলগাল চেহারা। কিন্তু ও কিছুতেই শোনে না। সে মারা যায় যুদ্ধে।

আপনার ’৪২-এ জন্ম, তার মানে আপনার...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  (একাত্তরে) ২৮ বছর বয়স।

কিন্তু রুমী তো কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছে, এদিকে ইলিনয় শিকাগোতে ভর্তি হয়েছে। ওই ছেলে যুদ্ধে গেল এবং শেষ পর্যন্ত তো পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট ওদের ধরে নিয়ে যায়, ওরা ফিরে আসেনি। ওইখানে রুমী, বাকের, বদি, আলতাফ মাহমুদ, তারপরে আমি লিখেছি শহীদ আজাদের গল্প, সেই শহীদ আজাদ, এদেরকে ধরে নিয়ে যায়।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আলতাফ মাহমুদেরটাই সবচেয়ে বেশি স্যাড। সাচ আ জিনিয়াস ম্যান।

সবারটাই স্যাড। ওইখানে...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আরও কিছু দেশ পাইত হয়তো।

হ্যাঁ। আপনাদের আরেকটা হচ্ছে সেন্ট গ্রেগরির স্টুডেন্ট যারা ছিল ওরা, ওইখানে আপনাদের ফুটবল, বাস্কেটবল খেলত কাজি কামাল। উনি বেঁচে গেছেন।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ও, ও বেঁচে গেছে। ওকে তো ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

ও উনি...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ও দুইবার বাঁচছে, একবার না।

দুইবার বাঁচছে, না?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  একবার তো ওই সময়, তারপরে...

২৯ আগস্ট রাতে উনি গোলাগুলি করে আজাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে গেছেন। যাহোক, আর এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে জাহানারা ইমামের ছেলে রুমী, জামী আর শরীফ সাহেব, সবাইকে...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  এরা তো অপারেশন ট্রেনিং নিয়ে এসে অপারেশন করার সময় ধরা পড়েছে।

রাইট। আচ্ছা, এখন আপনি তো ওখানে গিয়ে আপনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক এবং সহ-অধিনায়ক।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  সহ-অধিনায়ক। ওই টিমে পিন্টু ভাই ছিলেন আমার সিনিয়র।

পিন্টু ভাই ছিলেন অধিনায়ক।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  তবে অটোমেটিক্যালি পিন্টু ভাই তখন কিন্তু নওগাঁতে যখন তাঁকে অধিনায়ক করা হয়। সেই বিষয়ে আমি একমাত্র পুরো মিটিং, ফুল বোর্ডের মিটিংয়ে প্রেজেন্ট ছিলাম। আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল এবং আমাকে মেম্বারও করা হয়। আমি, পিন্টু ভাই এবং ননী বসাক— এই তিনজন ছিলাম স্পোর্টসের সাইড থেকে মেম্বার, বাকি সব রাজনীতিবীদ।

তারপর মুক্তিযুদ্ধের পরে ফিরে এসেছেন, বাংলাদেশে খেলা হচ্ছে, আপনি মোহামেডানে খেলছেন, ফুটবল খেলছেন। হকিতে এই ’৭১-এর পরপর অনেক দিন বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় খেলাই ছিল। আস্তে আস্তে একটা ভাটা হয়ে গেল হকির, এটার কারণ কী?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ফুটবল খেলতে একটা ফুটবল লাগে।

ফুটবল খুবই গণতান্ত্রিক খেলা।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  একটা ফুটবল লাগে। ক্রিকেট খেলতে দুটি ব্যাট, একটা ব্যাট একটা বল দিয়েই খেলা হয়। কিন্তু হকি খেলতে ২২ জনেরই স্টিক লাগবে। কাজেই এটা...

এক্সপেনসিভ। আমরা রংপুরে বাঁশের ওই একটা ইয়ে কেটে...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ছাতা, ছাতার ডান্ডা দিয়ে, বাঁশের ডাল দিয়ে...

ওই সব দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু জনপ্রিয় ছিল। আস্তে আস্তে...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  জনপ্রিয় হলো কখন, যখন ঢাকাতে খেলা হলো পাকিস্তান আর ইস্ট পাকিস্তান। সে সময় জনপ্রিয় হলো খুব খেলাটা।

পরে মুক্তিযুদ্ধের পরেও আমাদের শৈশবে একবার পাকিস্তান আর বাংলাদেশের হকিতে ভালোই খেলা হয়েছিল। বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বাংলাদেশ হেরে গেল।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  না, এরপরে হলো কি অর্গানাইজারদের প্রবলেম। এখানে আমি দেখছি, আমি তো অর্গানাইজার হয়েছি অনেক পরে। আমি কিন্তু হকি ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত অনেক দিন।

আপনি কোচ হলেন কবে?


প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আমি কোচ হয়েছি ’৭৮-এ, পাতিয়ালায় চলে গেলাম। ওখান থেকে ট্রেনিং করে এসে কোচ হলাম। আমি টিমের দায়িত্ব পাই ’৮৬-তে।

এখন আমাকে বলেন, আমাদের শেষের দিকে আমরা এসেছি। ফুটবল একটা সময় এই যে মোহামেডান, আবাহনী কত জনপ্রিয় ছিল! মারামারি হতো, আমরা ছাত্র অবস্থায় ঝগড়া করতাম, মারামারি করতাম। আগা খান গোল্ডকাপে বাংলাদেশ একবার জয়েন্টলি চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল। কারণ, অমীমাংসিত হয়েছে, পরে বলল যে ঠিক আছে, টাইব্রেকারেরও দরকার নেই। বাংলাদেশের একটা ক্লাব আর ইয়ে...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  মোহামেডান অ্যান্ড কেপিটি।

… বাংলাদেশ আমলেও একবার মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল যৌথভাবে।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  না, বাংলাদেশ আমলে গোল্ডকাপ চ্যাম্পিয়ন...হ্যাঁ, হয়েছে তো। বাদল রায়ের আমলে দুইবার, আমাদের আমলে একবার। ’৬৮-তে আমরা হয়েছি।

ফুটবল তো জনপ্রিয় ছিল, হকি জনপ্রিয় ছিল। পরবর্তী সময়ে আবার ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়ে গেল। ওই খেলা দুটিতে আর আগের মতো মানুষ হয় না। এখন তো আবার দেখি ক্রিকেট নিয়েও আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এই বাংলাদেশ–শ্রীলঙ্কা খেলা হচ্ছে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কাকে হারাল, কারও কোনো গা নেই, কেউ...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  না, ব্যাপার হয়েছে কী বলি দাদা। এটা পৃথিবীর সবাই বাজে লোক বলে, কিন্তু আমি কিছু জায়গায় তার বক্তব্যকে সাংঘাতিক শ্রদ্ধা করি। উনি বলছিলেন, ‘স্পোর্টস ইজ আ...’ হিটলার, জার্মানির চ্যান্সেলর হিটলার বলেছিলেন, ‘স্পোর্টস ইজ আ মিরর অব দ্য সোসাইটি।’ খেলাধুলা সমাজের আয়না। তো আপনি ক্রিকেট বলেন, ফুটবল বলেন, হকি বলেন, আপনার সমাজ কোথায়? খেলাধুলা কোথায় হবে? তারা তো আয়না চায়। খেলাধুলা তো আয়না, সমাজের আয়না। আপনার সমাজ কোথায়?

স্কুলগুলো কোথায়? স্কুলের খেলাধুলার মাঠ কোথায়?

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আপনার সমাজ কোথায়? স্কুল তো হবে সমাজ থেকেই। আপনার সমাজ কোথায়?

তাহলে একদম...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  আপনি রাস্তায় বের হলেই ছিনতাইকারী, রাস্তায় বের হলেই মব। গ্রামে যেতে ভয় লাগে, কোন সময় মবের পাল্লায় না পড়ে যাব। তাহলে পর বলেন আপনি, কত স্বপ্ন নিয়ে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে গিয়েছিলাম! যাহোক, আমার কিন্তু পাকিস্তান...

আমার মনে হয়, আমাদের সমাজটাকে যদি আমরা আবার ফেরাতে চাই আলোর দিকে, তাহলে খেলাধুলাতে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকে বেশি জোর দিতে হবে। সেটাও সেই সব, বিশেষ করে ছোট বয়সে। নিয়মগুলো আমি শুনেছি।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  ছোট বয়সে। কারণ, ছোট বয়সে খেলাধুলায় জড়ালেই ড্রাগসও খাবে না, গুন্ডামিতেও যাবে না। প্লেয়ারদের নিজস্ব একটা স্বকীয়তা কিন্তু থাকে। নিজের ভেতর কিন্তু একটা ফিলিং থাকে, ‘আই অ্যাম আ স্পোর্টসম্যান।’

আপনি আপনার স্মৃতিকথার মধ্যে লিখেছেন যে স্কুলে যে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলো হতো, যেগুলোকে আমরা স্পোর্টস বলতাম, এটা আমরাও বলতাম, আপনিও লিখেছেন, ওইখানে যে অ্যাথলেটিকস যা–ই হতো, সেসব নিয়েও তখন উত্তেজনা ছিল।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  হ্যাঁ। পুরো স্কুলের যে দুই দিকে বিল্ডিং, সব ভরা থাকত। ছাদসহ। বাইরের লোকেরা এসে খেলা দেখত।

সেই খেলার জোয়ারটা স্কুল পর্যায় থেকে আবার শুরু করতে হবে। তা ছাড়া উপায় নেই। যদি এই বাংলাদেশটাকে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা:  তা ছাড়া উপায় নেই। এখন কী বলবেন বলেন, যত দিন যাচ্ছে, স্কুলের গেম টিচার নেই। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছি তখন দাদাদের কাছেও শুনছি যে গেম টিচার আছে। এখন গেম টিচার নেই। তো খেলাধুলা শেখাবে কে? খেলাধুলা হবে কী করে? আরেকটা কথা দাদা আমার বইতে পাবেন, মাঠ নিয়ে লিখেছি আমি। আগে ঢাকাতে ১০টা কি ১১টা স্কুল ছিল আমাদের আমলে, প্রতিটি স্কুলেরই মাঠ ছিল। পরে কিছু কিছু স্কুলের মাঠে হয়তো বিল্ডিং এক্সটেনশনের জন্য সেটা ব্যবহার করছে। কিন্তু এখন তো তিন শর মতো স্কুল। দুই-চারটা স্কুল ছাড়া বোধ হয় কোনো স্কুলেরই মাঠ নেই।

হুম।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: তো খেলাধুলা আপনি আশা করবেন কী? ওই সব টিমে স্কুলে খেলাধুলা করতে দেবেন কী করে?

প্রতাপদা, ১৯৪২-এ জন্ম, ব্রিটিশ আমল দেখেছেন, পাকিস্তান আমল দেখেছেন, পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন, পূর্ব পাকিস্তান দেখেছেন, পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে খেলেছেন, রায়ট দেখেছেন, রায়টের ফলে আপনাদের গ্রাম ছাড়তে হয়েছে, আবার কলকাতায় যেতে হয়েছে, আবার ফিরে এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, আবার ফিরে এসেছেন। আপনি বলছেন, এ সত্ত্বেও আপনার জীবনের একটা গৌরব হচ্ছে আপনার দুই মেয়েই বাংলাদেশে আছে, আপনি বাংলাদেশে থাকতে চান, কারণ এটা জন্মভূমি। সেই প্রসঙ্গে যদি কিছু বলেন, এটা দিয়ে আমরা শেষ করব।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: শোনেন, আমার মা সব সময় বলতেন যে ‘পৃথিবীতে একটা মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস, তোর জন্য আমি। আমি তোকে ছোটবেলা থেকে যেভাবে সেফগার্ড দেব, কেউ পারবে না। দরকার হলে আমি মরে যাব, কিন্তু তোকে বাঁচাব।’

নিশ্চয়ই।

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: মা বললেন, ‘চল যাই।’ আমি বললাম, ‘ কেন, আমি যাব না।’

… জন্মভূমি ছেড়ে, মাতৃভূমি ছেড়ে...

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা: মাতৃভূমি ছেড়ে আমি যাব না, আমার এটা জন্মভূমি। দোগাছি গ্রামের সেই ঘরটা এখনো আমি যাই যখন, ভেঙেচুরে সব নষ্ট হয়ে গেছে, মেইনটেন্যান্স করে না যারা দখলে রাখছে। সেই রুমটা এখনো গেলে আমার যেন কেমন শিহরণ হয়। তো সেই দেশ ছেড়ে আমি কী করে যাব? এটা আমার জন্মভূমি। আমি জন্ম–মাকেও ছাড়ব না, জন্মভূমিও ছাড়ব না। মা যদি আমাকে ছেড়ে দেয়, কিছু করার নেই।

সেই। এটাই কথা। মা, মাতৃভূমি, জন্মভূমি, এটা তো আমাদের পক্ষে ছাড়া সম্ভব নয়। আমরা এত বড় একজন খেলোয়াড়কে আমাদের মাঝে পেয়েছি, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। এতক্ষণ তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা শুনলাম। এটা নিশ্চয়ই আমাদের জন্মভূমিকে ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করবে। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন।

Read full story at source