খাবারের অপচয় ও আমাদের দায়

· Prothom Alo

বৃষ্টি আর জ্যামে বাসের মধ্যে বসে আছি ইপিজেডের সামনে। সকাল আনুমানিক সাড়ে ছয়টা। চারপাশে প্রচণ্ড ভিড়। রাস্তাজুড়ে বৃষ্টি-কাদা উপেক্ষা করে অসংখ্য পোশাককর্মী জীবিকার প্রয়োজনে হেঁটে যাচ্ছেন কর্মস্থলের দিকে।

Visit tr-sport.bond for more information.

বাসের ভেতরে বিশ্রী গরম। বসে থাকতে থাকতে আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম জীবনের নানা অমীমাংসিত দুশ্চিন্তায়।

হঠাৎ চোখে পড়ল জীর্ণশীর্ণ পোশাকের একজন মানুষকে। ময়লার স্তূপের ভেতর থেকে তিনি কিছু পচা পেয়ারা খুঁজে খুঁজে নিজের ব্যাগে রাখছেন। কিছুক্ষণ পর সেই পেয়ারা থেকে একটি তুলে গায়ের কাপড় দিয়ে মুছে পচা অংশটা দাঁত দিয়ে ফেলে দিলেন। তারপর বাকি অংশটুকু খেয়ে ফেললেন।

মুহূর্তেই আমার নিজের সব দুশ্চিন্তা যেন এক পাশে সরে গেল। চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ালেন সেই মানুষটি।

কোন সময়ে আমরা বাস করছি? এখনো মানুষকে ময়লার স্তূপ থেকে পচা খাবার তুলে খেতে হয়! আল্লাহ আমাদের মাফ করুন।

এই দৃশ্য আমাকে কয়েক দিন ধরে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। আমরা প্রতিদিন কত খাবার অকারণে নষ্ট করি! দাওয়াতের অনুষ্ঠানগুলোতে গেলে খাবারের অপচয়ের ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। অনেক মা–বাবা সন্তানকে দাওয়াতে যাওয়ার সময় বলেন, ‘বেশি করে মাংস খেয়ো।’ কেন আমরা এটাও বলতে পারি না—‘যতটুকু খেতে পারো, ততটুকুই নিও?’ খেতে পারলে অবশ্যই খান। ভালোভাবে খান। কিন্তু খাবার নষ্ট করার মধ্যে গর্বের কী আছে?

‘টাকা উশুল করতে হবে’—এই মানসিকতা দাওয়াতের অনুষ্ঠানেই হোক কিংবা বুফেতে, খাবার অপচয়ের কোনো যুক্তি হতে পারে না।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

খাবার মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। কারও কাছে খাবার যখন বিলাসিতা, তখন অন্য কারও প্লেটে পড়ে থাকা খাবার নষ্ট হওয়া আরও নির্মম। আমার কাছে মনে হয়, খাবারের কষ্টের মতো বড় কষ্ট আর কিছু নেই। পেট ভরা থাকলে জীবনের অন্য কষ্টগুলো নিয়ে ভাবারও সুযোগ থাকে। কিন্তু পেট যখন খালি, তখন পৃথিবীর অন্য সব চিন্তা তুচ্ছ হয়ে যায়। তাই দাওয়াতে গেলে যতটুকু খেতে পারি, ততটুকুই নিই। অপরের পয়সার খাবার বলে প্লেট ভর্তি করে খাবার নষ্ট করি না। নিজের টাকায় রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও সম্ভব হলে অতিরিক্ত খাবার সঙ্গে নিয়ে আসি। নিজে খেতে পারি, অথবা অন্য কোনো প্রাণীকে খাওয়াতে পারি।

আজ যে মানুষটি ময়লার স্তূপ থেকে পচা পেয়ারা তুলে খাচ্ছেন, তিনি সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্টি। আমরাও তাঁরই সৃষ্টি। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারি না—জীবনের কোন মোড়ে দাঁড়িয়ে কাল আমাকে, আপনাকে কিংবা আমাদের প্রিয় কাউকে সেই মানুষটির জায়গায় দাঁড়াতে হবে। তাই খাবারকে সম্মান করি। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই নিই। আর যতটুকু পারি, অপচয় না করে কাউকে খাওয়াই।

*লেখক: রোকসানা পারভীন, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source