দক্ষিণ এশিয়ার গণ-প্রত্যাখ্যান পর্বের শেষ কোথায়

· Prothom Alo

দক্ষিণ এশিয়ার চলমান রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে গণতন্ত্রের বৈশ্বিক ইতিহাসের নতুন এক নিরীক্ষা হিসেবে দেখা যায়। এর ‘ক্রোধে পোড়া অংশ’ কেবল এখন সামনে আছে। যাতে জ্বালানি জোগাচ্ছে ক্ষমতাহীনতার স্থায়ী এক সামাজিক বোধ। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বশেষ গণ–অভ্যুত্থান হয় গত বছর এ রকম সময়। নেপাল সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কষছে এখন। ঠিক সেই সময় ভারত-পাকিস্তানে তুমুল রাজনৈতিক বিক্ষোভ শুরু হলো। দিল্লি ও ইসলামাবাদ উভয় জায়গায় অসন্তোষে কাছাকাছি ধরনের কিছু দাবি আছে। নির্বাচনী দুর্নীতি প্রধান এক ক্ষোভের জায়গা। ভারতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে যেসব পুরোনো মিথ ছিল, শাসকদের দুষ্কর্মে তার অনেকখানি বিলীন হয়েছে ইতিমধ্যে। রাজপথে নামা তরুণেরা অবক্ষয়ের শিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুনর্গঠন করতে চান।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

পাকিস্তানের বেলায় ইমরান খানের মুক্তি প্রধান এক চাওয়া। ‘ক্যাপ্টেন খান’ ও তাঁর সহযোগীদের আটকিয়ে জেনারেল আসিম মুনির যে ছদ্ম সামরিক শাসন চালাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে পিটিআই–কর্মীদের ইন্তিফাদা চলছে। বেলুচিস্তান, আজাদ-কাশ্মীর ও পশতুন এলাকায়ও সেনা-জুলুমের বিরুদ্ধে নিয়মিত সহিংস বিক্ষোভ হচ্ছে।

সন্ধিক্ষণে দক্ষিণ এশিয়া: কোন পথে ভারত-পাকিস্তান

উভয় দেশে এলিটদের নিয়ে সামাজিক হতাশা ও বিরক্তির আরও অনেক গভীর ও বহুমাত্রিক কারণও আছে। অনেকটা নেপাল-শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের মতো। ভারত-পাকিস্তানের চলতি রাজনৈতিক আন্দোলনের বেশ পদ্ধতিগত মিলও দেখা যাচ্ছে ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা, ২০২৪ সালের বাংলাদেশ এবং ২০২৫ সালের নেপালের সঙ্গে। প্রশ্ন হলো দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে কেন রাজনৈতিক ক্ষোভ-বিক্ষোভ-অসন্তোষ? এর শেষ কোথায়? কেবল নির্বাচনব্যবস্থা এবং আর্থিক দুর্নীতিই কি সমাজদেহ থেকে উথলে ওঠা কূলভাঙা এই প্রত্যাখ্যানের কারণ?

এ রকম প্রশ্নমালার সাক্ষ্য-প্রমাণনির্ভর উত্তর পাওয়া মুশকিল। প্রকাশ্যে যা দেখা যাচ্ছে—কোথাও ধর্ম, কোথাও সমরবাদী লাঠিতন্ত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং আকাঙ্ক্ষাকে আটকে দিচ্ছে। কমবেশি আট দশক আগে বিদায় নেওয়া ঔপনিবেশিক প্রভুদের কৌশলেই টিকে আছেন স্থানীয় কুলীনরা। কোথাও উগ্র জাতীয়তাবাদ, কোথাও ধর্মের আবরণে জেঁকে বসা প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কে মানুষ ক্লান্ত। সেই ক্লান্তি সর্বগ্রাসী এক প্রত্যাখ্যান পর্বের জন্ম দিলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠন পর্বের হদিস নেই আপাতত।

# পাকিস্তান ও ভারতের শাসকেরা জন–অসন্তোষ দমনে যা যা করছে, ২০২৪-সালে বাংলাদেশেও তা–ই করা হয়েছিল। উভয় দেশে প্রকাশ্য ও গোপনে বিভিন্ন এজেন্সিকে লেলিয়ে দেওয়া আছে। # শ্রীলংকায় পুরানো দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে থেকে এসে জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) সরকার গঠন করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে পারেনি এখনো। # নেপালে গণ–অভ্যুত্থানোত্তর নতুন দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে রয়েছে; কিন্তু কেউ সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না।

ভারতে পচনের উন্মোচন বনাম লাঠিতন্ত্র

ভারতে দীর্ঘকাল গেরুয়াকরণ চলছিল নির্বিঘ্নে। ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকারা তার পচনশীল চেহারা উন্মোচন করতে শুরু করা মাত্র সেখানে রাস্তায় সারি সারি পুলিশ নামিয়ে দেওয়া হলো। নির্দলীয় ও অহিংস এই প্রতিবাদ বিরোধী দলগুলোকে কাছাকাছি আসা এবং পথে নামার সুযোগ করে দিয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজের মধ্যে দেশের উদারনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য উদ্ধারের আকুল তাগিদ দেখা যাচ্ছে।

তবে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ ও নির্বাচনী প্রশাসনের গভীরে হিন্দুত্ববাদীরা যে জাল বিস্তার করেছে, সেখান থেকে এ দেশকে সুপথে আনা কতটা সম্ভব—এ নিয়ে সন্দেহ কাটছে না। যদিও আরএসএস-বিজেপির নৈতিক ভিত্তি এবং বিপুল ব্যয়ে গড়ে তোলা মোদি-অমিত জুটির সুশীল ইমেজ ইতিমধ্যে ভেঙে দিয়েছেন তরুণেরা।

চলমান এই আন্দোলনের দৃশ্যাবলি থেকে একটু দূরে তাকালে ভিন্ন আরেক ছবিও বেশ নজরে আসে। সেটি হলো তীব্র ধনবৈষম্য এবং বেকারির ক্ষত। বিজেপির দেড় দশকে বড় ব্যবসায়ীদের ব্যাপক উত্থান ঘটলেও কম মজুরি-জীবনের বিশাল এক জনমণ্ডলীও তৈরি হয়েছে। ১৪-১৫ বছর আগে মোদির তথাকথিত ‘গুজরাট মডেল’ কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির যেসব গল্প শুনিয়েছিল, তার ভাঁওতা এখন স্পষ্ট। বেড়েছে কেবল গৌতম আদানির মতো গুটিকয়েক ক্রনি-ক্যাপিটালিস্টের ব্যাংক ব্যালেন্স। ২০২৬ সালে আদানি ফোর্বস–এর বিলিয়নিয়ার্স তালিকায় ৩১তম জায়গায় আছেন। অথচ এক দশক আগে তাঁর অবস্থান ছিল একই তালিকায় চার শর নিচে।

ককরোচ আন্দোলন ও দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

অল্প সময়ে মোদি-অমিত জুটি আদানির মতো একদল বিলিয়নিয়ার্স তৈরি করতে গিয়ে নিচুতলায় মোটাদাগে নিঃস্বকরণের জন্ম দিয়েছে। যদিও পশ্চিমে এই শাসকদের নিয়ে ব্যাপক জয়ধ্বনি ছিল শুরুতে। ডলার-বিশ্ব মূলত এভাবেই কাজ করে।

স্থানীয়ভাবে জনসমাজকে ধর্মের বয়ানে মশগুল রাখায় টিম-মোদি সফল ছিল মূলত কার্যকর বিকল্প রাজনীতির দুর্বলতায়। এখনো কংগ্রেসসহ বিরুদ্ধবাদীরা নিচুতলায় টানাপোড়েনে থাকা মানুষদের নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত করতে পারছে না। নেহা বোরা ও অভিজিৎ দিপকেদের ভাবমূর্তি শহুরে চৌহদ্দি পেরিয়ে এখনো মেঠো আবেদন তৈরি করতে পারেনি। তাঁদের দাবির ভেতর মেঠো মানুষদের অর্থনৈতিক স্বস্তির উপাদান নেই। বিজেপির ধর্মীয় কথামালার বাইরে সাধারণ জনগণকে কী রকম রাজনীতি আকর্ষণ করতে পারে, তা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক চলছে তাঁদের মধে৵।

তরুণেরা জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে ভারতকে নবসাজে সাজানোর কথা বলছেন। নিশ্চিতভাবে ভারতে দীর্ঘ পথের এক গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা এটা। যে পুরো প্রজন্ম গড়ে উঠেছে গেরুয়া ভাবাদর্শের সুনামির মধে৵ তাঁদের এই প্রত্যাখ্যান পর্বের রাজনৈতিক মূল্য অসামান্য। তবে ছোট কিছু সফলতা ছাড়া শিগগির এর বড় ফল দেখা যাবে বলে মনে হয় না।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে

শাসক শিবির গণতান্ত্রিক মুখোশ খুলে বেশ খোলামেলাভাবে লাঠিতন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত করার পথে নেমেছে। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাকালীন দুঃশাসনের পর পুলিশ প্রশাসনের এমন জংলি রূপ আর কেন্দ্রীয় ভারতে দেখা যায়নি। ১৯৭৫ সালের সেই জরুরি অধ্যায় পেরোতে গণতন্ত্রপন্থীদের প্রায় দুই বছর লেগেছিল। এবার প্রতিপক্ষ সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে অনেক শক্তিশালী ও নির্মম। নতুন জরুরি অবস্থার অবসান হতে নিশ্চিতভাবে বাড়তি সময় লাগবে।

যদিও বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি সব জোটসঙ্গীসহ প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকের কম পেয়েছিল; কিন্তু বিরোধীপক্ষ বহু আঞ্চলিক শিবিরে বিভক্ত এখনো। নেহা বোরাদের সামনে বহুধা বিভক্ত বিরোধী শিবিরকে এক কাতারে আনতে পারা একধরনের পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ইতিহাসের বড় কৌতুক হলো ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থাবিরোধী সংগ্রামে যাঁরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ছিলেন, এখনকার নিপীড়কদের বড় অংশ তাঁরাই।

পাকিস্তানে লড়াই মূলত ছদ্ম সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে

পাকিস্তানের পরিস্থিতি বর্তমান ভারতের চেয়ে অনেক বিস্ফোরক ধাঁচের। জেনারেলরা ২০২৪ সালে পিটিআইয়ের হাত থেকে নির্বাচনী ফল ছিনিয়ে ভুট্টো ও শরিফ পরিবারকে ক্ষমতা ভাগ করে দিয়েছিল; কিন্তু মানুষ ফুঁসছে ও ধুঁকছে। যেকোনো সুষ্ঠু ভোটে ইমরান খান সব প্রতিপক্ষকে একাই মোকাবিলা করতে সক্ষম এখনো; কিন্তু কেবল জনপ্রিয়তা তাঁকে কারামুক্ত করতে পারছে না। পশ্চিমের সমর্থনে আসিম মুনির পুরো দেশের জনমতের টুঁটি চেপে ধরে রেখেছেন। এদিকে জিনিসপত্রের দাম ক্রমে বাড়ছে। নাগরিক সেবার অবস্থা শোচনীয়। এসব নিয়ে কথা বলার মতো বিরোধী দল নেই।

পাকিস্তান ও ভারতের শাসকেরা জন–অসন্তোষ দমনে যা যা করছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশেও তা–ই করা হয়েছিল। উভয় দেশে বিরুদ্ধবাদীদের বিপক্ষে প্রকাশ্য ও গোপনে বিভিন্ন এজেন্সিকে লেলিয়ে দেওয়া আছে। ভারতে বিক্ষোভ বানচাল করতে যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বিমানে ঢুকেও নেতাদের আটক করা হচ্ছে। ককরোচ নেতাদের রাতে ঘুম থেকে তুলে কিডন্যাপ করা হয়েছে। পাকিস্তানে নিপীড়নের আরও নিষ্ঠুর উপায় জারি রয়েছে।

ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের চেয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিসরের প্রধান দুর্বলতা হলো এখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সাংগঠনিক রাজনীতিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি অতীতে। ভূস্বামী ও জেনারেলরাই সব নিয়ন্ত্রণ করেছে। ইমরানের পিটিআই মধ্যবিত্ত তরুণদের জন্য প্রথম একটা রাজনৈতিক পাটাতন হয়ে উঠতে শুরু করেছিল; কিন্তু ক্যাপ্টেন খান জনপ্রিয় হলেও তাঁর দল সুগঠিত ছিল না এবং সেনা চাপে এখন তার ছত্রভঙ্গ অবস্থা। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার একক ভরকেন্দ্র নেই। ছোট অনেকগুলো উপদল হুটহাট নানান সিদ্ধান্ত দিচ্ছে এবং সেটি বদল করছে। ফলে ইমরান যতটা জনপ্রিয়, ততটা আস্থা নেই তাঁর দলের প্রতি।

বাংলাদেশের লাল চব্বিশের সঙ্গে পাকিস্তানের চলমান আন্দোলনের বড় ফারাক হলো পিটিআই কর্মীদের মধে৵ মৃত্যুঝুঁকি নেওয়ার মতো আবেগও কম। ফলে আসিম মুনিরবিরোধী সংগ্রাম আইয়ুব বা হাসিনাবিরোধী গণ–অভ্যুত্থানের আদল নেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ কী চাইছে, কী পাচ্ছে

পাকিস্তানে মানুষ চাইছে এমন দল, যারা সৎ এবং যারা একই সঙ্গে তাদের বিদ্যুৎ বিল কমাবে, রাতে-দিনে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সমাজে শ্রমের বাজার চাঙা করবে, শিক্ষা ও চিকিৎসায় স্বস্তি বাড়াবে। সর্বোপরি উৎকট ধনবৈষম্য কমাবে। বাংলাদেশেও হয়তো প্রত্যাশা একই ধরনের। তবে পাকিস্তানে পিটিআই সেই প্রত্যাশা মেটাতে সক্ষম নয়; কিন্তু ইমরান জনপ্রিয়। যেভাবে শ্রীলঙ্কায় অনূঢ়া কুমার দিশানায়েকে কিংবা বাংলাদেশে তারেক রহমানও প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে।

শ্রীলংকায় পুরোনো দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে থেকে এসে জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) সরকার গঠন করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে পারেনি এখনো। ক্ষমতাসীনেরা এমন কোনো সংস্কার পদক্ষেপ এখনো নেয়নি, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি এবং সামরিক-বেসরকারি আমলাতন্ত্রকে চটানোর ঝুঁকি আছে। তামিল সমাজের বহুল প্রত্যাশিত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে সরকার একদম চুপ করে আছে।

পরিবর্তনকে মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত নিয়ে টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার ছিল। সেই উদ্যোগ ও উদ্যম অনুপস্থিত আপাতত। সেটি না ঘটলে মানুষ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতায় অংশ নেবে। অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার কারণ তাই সাধারণ মানুষ নয়, শাসক কুলীন সমাজ। এর মধে৵ ধর্মবাদীরা তৃণমূলের জনসমাজকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেও নাগরিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিতে অনিচ্ছুক।

দেশটির অর্থনৈতিক দেউলায়িত্ব কাটার খবরও বাংলাদেশের মানুষ শুনেছে। সত্য যে তাদের রিজার্ভ বেড়ে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে কোনো দেশের অর্থনীতি ভালো হওয়া মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাগ্য ফেরা নয়। বাংলাদেশের মতোই জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ; কিংবা তারও বেশি সেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে এখনো। রিজার্ভ বাড়ার খবরে যাদের জীবনের কিছুই অদলবদল হয়নি। তবে সরকার এখনো অজনপ্রিয় নয়।

নেপালেও বালেন্দ্র শাহর টিম নিয়ে মানুষ এখনো অপেক্ষা করতে ইচ্ছুক। সেখানে ‘অগ্রগতি’ এটুকু হয়েছে—পুরোনো রাজনীতিবিদেরা তাঁদের কৃতকর্ম নিয়ে বেশ কোণঠাসা। তবে যত দিন যাচ্ছে, প্রাচ্যের সমাজের অচলায়তন ভাঙা যে বহু সাধনার ব্যাপার, সেটি স্পষ্ট হচ্ছে শাসক রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) কাছে।

ইমরান খান কি ভুট্টোর ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছেনইমরান খানকে ‘শহীদ’ করার সাহস দেখাবে না সেনাবাহিনী

অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার পেছনে কুলীন সমাজ

দক্ষিণ এশিয়ার চলমান রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে গণতন্ত্রের বৈশ্বিক ইতিহাসের নতুন এক নিরীক্ষা হিসেবেও দেখা যায়। এর ‘ক্রোধে পোড়া অংশ’ কেবল এখন সামনে আছে। এতে জ্বালানি জোগাচ্ছে ক্ষমতাহীনতার স্থায়ী এক সামাজিক বোধ। ভারত-পাকিস্তানের এই পর্বে প্রবেশের আগেই শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ-নেপাল তাতে ঢুকেছে। শেষোক্ত তিন দেশে সমাজ-পুনর্গঠনের-তাগিদ দুঃশাসকদের তাড়ালেও পুরোনো বন্দোবস্তের জন্য সেটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়নি।

এ রকম পরিস্থিতির একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন আন্তোনিও গ্রামসি মুসোলিনির কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে। তাঁর মত ছিল—পুরোনো পৃথিবী মরে যাচ্ছে এবং নতুন পৃথিবী জন্ম নিতে লড়ছে বটে; কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়টা দানবদের। এই সময়টায় বহুবিধ অসুস্থ লক্ষণ দেখব আমরা।

নেপাল ও শ্রীলঙ্কার আগে-পরে বাংলাদেশেও অভ্যুত্থানোত্তর নির্বাচন হয়েছে। তাতে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সামান্যই সুরাহা হলো। ক্ষমতাচ্যুত বড় এক দলকে নিষিদ্ধ রাখা হলেও এই বিষয়ে টেকসই কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দাঁড়ায়নি। আগের দিল্লির জায়গায় এখন ওয়াশিংটনের ‘খাই খাই’ চাহিদা মেটাতে গিয়ে সরকার তার কথিত ‘জাতীয়তাবাদী’ ভাবমূর্তি হারাচ্ছে। আট মাসে জ্বালানির দাম বেড়েছে অন্তত তিনবার। আবার সঠিক রাজনৈতিক দিশার অভাবে অভ্যুত্থানকারী তরুণ-তরুণীদের অসন্তুষ্টি সাংস্কৃতিক যুদ্ধের ব্যাধির চেহারা নিচ্ছে ক্রমে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পেশোয়ারে তেহরিক–ই–পাকিস্তানের (পিটিআই) নেতাকর্মীদের লংমার্চ।

নেপালেও গণ–অভ্যুত্থানোত্তর নতুন দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে রয়েছে; কিন্তু কেউ সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের তিন নবীন সরকার অর্থনৈতিক অসাম্য এবং প্রশাসনিক প্রভুতন্ত্র নিজেদের পাপে নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। অতীত থেকে পাওয়া পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া হিসেবে গণ–অভ্যুত্থান ঘটে গেছে।

এই পরিবর্তনকে মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত নিয়ে টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার ছিল। সেই উদ্যোগ ও উদ্যম অনুপস্থিত আপাতত। সেটি না ঘটলে মানুষ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতায় অংশ নেবে। অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার কারণ তাই সাধারণ মানুষ নয়, শাসক কুলীন সমাজ। এর মধে৵ ধর্মবাদীরা তৃণমূলের জনসমাজকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেও নাগরিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিতে অনিচ্ছুক।

অন্যদিকে স্বাধীনতাপন্থীরা ব্যর্থ মাঠপর্যায়ের অর্থনৈতিক বঞ্চনা কমানোর বিশ্বাসযোগ্য উপায় দেখাতে। এই দুইয়ের ব্যবধান কমানোর রাজনীতিবিদ আসবেন নিশ্চিতভাবে নতুনদের মধ্য থেকে। সেই গঠন পর্ব কবে শুরু হবে, তার কোনো উত্তর নেই। দক্ষিণ এশিয়ার সেই আগামী পর্বে তাঁরাই এগিয়ে থাকবেন, যাঁরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে নিচুতলার রান্নাঘরগুলোতে নিতে পারবেন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় নিজেদের কাছে হবেন চূড়ান্ত দায়বদ্ধ।

  • আলতাফ পারভেজ, গবেষক ও লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source