চুয়েট উপাচার্যের চেয়ারে কেন সরকারের ছায়া!
· Prothom Alo

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত সহ–উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে শপথ পাঠ করিয়েছিলেন তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও শিক্ষার্থীরা (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, প্রথম আলো)।
Visit chinesewhispers.club for more information.
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আসেন অধ্যাপক ইয়াহ্ইয়া আখতার। গত বছরের জুলাইয়ে এই উপাচার্যের কার্যালয়ে এক শিক্ষকের পদোন্নতি আটকাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতা গিয়ে হট্টগোল করেন। সে সময় তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘আপনি নিজ যোগ্যতায় (উপাচার্য পদে) বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’ (৫ জুলাই ২০২৫, প্রথম আলো)।
প্রায় এক বছর পর চট্টগ্রামেরই আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে বাতিল করে আগের উপাচার্যকে বহাল রাখার দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যেই ১২ অক্টোবর ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেছেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম (১২ অক্টোবর ২০২৬, প্রথম আলো)।
পরপর এ তিনটি উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়। তিনটি ঘটনায় তিনটি ভিন্ন সংগঠন, তিনটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি দুটি ভিন্ন সরকারের সময়। কিন্তু চিত্রের কোনো হেরফের হয়নি। ঠিক পুরোনো কাঠামোর মতোই উপাচার্যের চেয়ারে কে বসবেন, কীভাবে বসবেন, বসে কী করবেন, তা ঠিক করে দিচ্ছেন ছাত্রনেতারা। সরকার বদলায়, সংগঠনের নাম বদলায়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ছাত্ররাজনীতির এই খবরদারির কোনো পরিবর্তন হয় না।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইন অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে এর কার্যনির্বাহী প্রধান হলেন উপাচার্য।
কিন্তু আমরা কী দেখছি? এক দল এসে উপাচার্যকে বলছে, আমরাই আপনাকে বসিয়েছি। আরেক দল শিক্ষার্থীদের চাওয়া–পাওয়ার বাইরে গিয়ে উপাচার্যকে চেয়ারে বসিয়ে দিচ্ছে। উপাচার্য কী করবেন আর কী করবেন না, তা ঠিক করার দায়িত্বও তারাই নিয়ে নিচ্ছে।
চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগের আড়ালে কী হয়েছেকী অদ্ভুত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কী অদ্ভুত আমাদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো! একজন উপাচার্য যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রধান হন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ভেতর থেকে তাঁর নির্দেশনায় সবকিছু হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের উপাচার্যদের চেয়ার এতটাই কাদামাটির ওপর বসানো থাকে যে কখন সেটি দেবে যায়, আবার কখন সেই চেয়ারের পায়া ভেঙে তিনি নিজেই পড়ে যান, তা কেউ জানে না।
ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতি উপাচার্যদের নরম অবস্থান আজকের নয়। কয়েক দশক ধরে উপাচার্যেরা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। যখনই উপাচার্য বিপদে পড়েন, সেটা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন ঠেকানো হোক কিংবা কর্মকর্তা–কর্মচারীদের আন্দোলন সামলানো, সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোকেই।
অন্যদিকে এসব সংগঠনের নেতাদের খুশি রাখতে উপাচার্যেরা কখনো পছন্দের ব্যক্তিদের টেন্ডার পাইয়ে দেন, শিক্ষক–কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়োগ দেন, আবাসিক হলে তাঁদের আধিপত্যের সুযোগ করে দেন। আবার আধিপত্য বিস্তারে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোকে দমন করতে তাঁদের প্রশাসনিক সহায়তাও দেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতা–চর্চার এই ভয়াবহ রূপ আমরা দেখেছি।
সদ্য নতুন উপাচার্যের নিয়োগের বিরুদ্ধে চুয়েটে শিক্ষক–শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিক্ষোভ।তবে এই দেনা–পাওনার চিত্র কখনোই বদলায় না। ফলে দলীয় শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় আনা হয়, আর তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব নেয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলো।
এর মাশুল গুনতে হয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে। যে উপাচার্য নিজের চেয়ারের জন্য কোনো ছাত্রসংগঠনগুলোর কাছে ঋণী হচ্ছেন, তিনি পরবর্তী সময় তাদের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নৈতিক শক্তি রাখেন না।
এই যে চুয়েটের কথাই ধরেন না। এখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা এক উপাচার্যের নিয়োগ বাতিলের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন পত্রিকাগুলোয় ফলাও করে নিউজ আসছে। কিন্তু দেখেন, আমাদের সরকার সেই খবরগুলো দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। গণমাধ্যমের খবরগুলো আমলেই নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ব্যাপারটি এমন হয়ে গিয়েছে, ওই উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম করতে না পারলে চুয়েটের শিক্ষার বারোটা বেজে যাবে। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে পেয়ে ধন্য ধন্য মনে করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকার এখানে নিজেকে গুটিয়ে রেখে প্রমাণ করতে চেয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো ‘সরকার’, এখানে শিক্ষার্থীরা ভেসে আসা কোনো উপাখ্যান।
চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগের আড়ালে কী হয়েছেঅন্যদিকে যে ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের নৈতিক আন্দোলনে শরিক হওয়ার কথা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে ঐক্য দেখানো, সেখানে ছাত্রসংগঠনটি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
ফলে সরকারের পরামর্শে চুয়েটের নিয়ম ভেঙে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমকে অনলাইনে যোগদান করিয়েছে, শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করিয়েছে, এবার তাঁকে চেয়ারে বসানোর দায়িত্ব দিয়েছে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের কাঁধে। ফলে এই পুরো বিষয়টি সরকারের দৃষ্টির বাইরে ঘটেনি; বরং সরকারের প্রত্যক্ষ অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বন্ধ থাকলেও সরকারের দৃষ্টি সেই পর্যন্ত পড়েনি। আমরা উপাচার্যের চেয়ারে বসানোর নোংরা চেহারা দেখলাম।
এখন প্রশ্ন হলো, আন্দোলনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কী হবে? ক্ষমতার দাপটে উপাচার্য এগিয়ে গেলেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক অধিকার ও ক্ষমতা চর্চায় যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রাধান্য পাওয়ার কথা, সেখানে তাঁরা আজ এই উপাচার্যের আক্রোশের শিকার যে হবেন না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন চুয়েট উপাচার্য। আজ দুপুরেযে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের চেয়ে ছাত্রনেতারা বড়, সেখানে জ্ঞানচর্চা ছোট হতে বাধ্য। চব্বিশে শিক্ষার্থীরা বৈষম্য আর দখলদারির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে এমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়া, যেখানে উপাচার্যের চেয়ার কারও দয়ায় নয়, যোগ্যতায় পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা আমরা দেখতে পাইনি; বরং অতীতের সব ধরনের রেকর্ড ভেঙে এবারের উপাচার্য নিয়োগে খেয়ালখুশিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
কোন মানদণ্ডে, কাদের মধ্য থেকে, কার সুপারিশে একজন অধ্যাপক উপাচার্য হন, তা কখনো প্রকাশ্যে আসে না। প্রক্রিয়া যেখানে অস্বচ্ছ, সেখানে যোগ্যতার বদলে দলীয় আনুগত্য আর রাজপথের শক্তিই হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তের মাপকাঠি। শিক্ষকরাজনীতিও এর বাইরে নয়। শিক্ষকদের একাংশ দলীয় পরিচয়কে পদ–পদবির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন, আর সেই সিঁড়িতে ওঠার জন্য তাঁদের প্রয়োজন হয় ছাত্রসংগঠনের সমর্থন।
প্রশ্ন হলো, সরকার কি সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কথা শুনতে পায়? ক্ষমতায় গেলে কেন তারা বুঝতে পারে না, ছাত্রসংগঠন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ক্ষমতার মালিক সাধারণ শিক্ষার্থীরা? সাধারণ শিক্ষার্থীরা কী করতে পারে, তা তো অতীতে এই দেশ দেখেছে।
এভাবে উচ্চশিক্ষার কাঠামো টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যেখানে উপাচার্যেরা চেয়ারের লোভে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, ছাত্রসংগঠনগুলোর কথায় ওঠবস করার মানসিকতা তৈরি করে ফেলেন, সেখানে উচ্চশিক্ষার ম্যাজিক লণ্ঠন আলোহীন হয়ে পড়বে।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]